National Events

স্বাধীনতা দিবসঃ ২৬শে মার্চ


(Page 1 of 3)   
« Prev
  
1
  2  3  Next »



গঙ্গাঋদ্ধি থেকে বাংলাদেশ-এর উপসংহারে আমি বলেছিলামঃ ‘বাঙালি নাকি কোনো দিন স্বাধীন ছিল না! যে অর্থে আমরা “স্বাধীন” বা “স্বাধীনতা”র কথা ব্যবহার করি, তা দু’শ বছর আগে সে অর্থে ব্যবহৃত হতো না। এখনো কথাটা খুব পরিষ্কার নয়। অর্থনৈতিক অর্থে ‘স্বাধীন’ শব্দটা আন্তর্জাতিক পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে কখনো ভাসছে, আবার কখনো ডুবছে। এই অর্থে পৃথিবীতে কয়টি স্বাধীন রাষ্ট্র আছে তা আমরা হাতের আঙ্গুলে গুনতে পারব। ব্যাপক অর্থে সেই দেশকে প্রকৃত স্বাধীন বলা যেতে পারে, যে দেশের প্রতিটি মানুষের জীবনে স্বাধীনতার আশীর্বাদ সহজে পরিলক্ষিত হয়। এই অর্থে স্বাধীন হতে আমাদের বহুযুগ অপেক্ষা করতে হবে। সাধারণ অর্থে “স্বাধীন” মানে রাজনৈতিক স্বাধীনতাই বোঝায়। বাংলার বাংলা যা অতীতে সমতট ও বঙ্গ বলে পরিচিত ছিলো তা অন্যান্য অঞ্চল থেকে সবচেয়ে কম পরাধীন ছিলো। রাঢ় ও বরেন্দ্রের ভাগ্য তেমন সুপ্রসন্ন ছিলো না, ওগুলোর ওপর দিয়ে অনেক ঝড়-ঝাপটা বয়ে গেছে।

মার্চ ১৯৭১-এ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাস করছিলেন তাঁর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ৬৬৭ নম্বর বাড়িতে। সে সময় কার্যত তাঁরই নির্দেশে চলছে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান। এই বাড়ি থেকেই তিনি জারি করছেন বিভিন্ন নির্দেশ। ২৫ মার্চ রাতে পাক সেনারা নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। একই সঙ্গে ওই বাড়ি থেকে তারা গ্রেপ্তার করে বঙ্গবন্ধুকে। ২৫ মার্চ ১৯৭১ সারা দিন ওই বাড়ি ও সড়কে কী ঘটেছিল, তা তুলে ধরা হলো এই লেখায়।

এবার দেশে এসে কোনো সাক্ষাৎকার দেব না-এটাই ঠিক করে রেখেছিলাম। এ লেখাটাও আসলে লেখা নয়। কথোপকথনের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। প্রথম আলো থেকে আমাকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। আমি এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে প্রাসঙ্গিক কিছু কথা বলব।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের শুরুতেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকা বেতার কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। পাকিস্তানিরা রেডিও স্টেশনটির নতুন নাম দেয় ‘রেডিও পাকিস্তান ঢাকা’। এ কেন্দ্র থেকেই তারা সামরিক আইন জারির ঘোষণা দেয়। বাঙালিদের কণ্ঠ রোধ করতে ইতিমধ্যেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর তৎপরতা শুরু হয়ে গিয়েছিল। তবে বাঙালিরা ঠিকই প্রতিরোধ গড়েছিল এবং লড়াইয়ে ফিরে এসেছিল। শুরু হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ।

১৯৭১ সালে মানবতার বিরুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের অপরাধের বিচার করতে ব্যর্থ হওয়ায় আমাদের স্মৃতিবিলোপ ঘটছে। স্মৃতিতে ফিকে হচ্ছে একাত্তর। দায়মুক্তির কারণে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিজেদের দেশে বারবার ‘জাতির ত্রাতা’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। একই কারণে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীরা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। বিস্তার করেছে রাজনৈতিক প্রভাব। তাদের বিচারের ব্যর্থতা আঘাত হেনেছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে; নিজেদের বিশ্বাস, পরিচয় ও লৈঙ্গিক কারণে যাঁরা একাত্তরে সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে নতুন করে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ এখনো অতীতের সঙ্গে ফয়সালা করে ওঠেনি আর অতীতও কখনোই তাকে ছেড়ে যায়নি| যে সমাজে মারাত্মক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এবং যেখানে বিশালসংখ্যক মানুষ তার শিকার হয়েছে, এমন সন্ত্রস্ত সমাজে অতীতের বিষয় নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু করা এক জটিল ব্যাপার| অতীত সেখানে বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে তাড়া করে ফেরে| এ রকম এক ক্ষতবিক্ষত সমাজের পক্ষে সম্ভব নয় অতীতের ক্ষত ভুলে যাওয়া বা যারা দায়ী তাদের ক্ষমা করা| তা তখনই সম্ভব, যখন অতীতের সঙ্গে একটা বোঝাপড়ার পথ বের করা হয়| কিন্তু প্রায় চার দশকে পা দেওয়া বাংলাদেশ তা করতে ব্যর্থ হয়েছে| একজন খ্যাতনামা বিশ্লেষকের ভাষায় বললে, এটাই বাংলাদেশের ‘আদি পাপ’|

ডিসেম্বর ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদগুলোর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) মোট ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসনে এবং প্রাদেশিক পরিষদের (পূর্ব পাকিস্তান) ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়। আওয়ামী লীগের এই বিজয় ছিল পাকিস্তানের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানি তথা বাঙালি জনগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ এবং শান্তিপূর্ণ বা অহিংস প্রতিবাদ।

‘স্বাধীন’ এবং ‘স্বাধীনতা’ নামক দুটো শব্দের সাথে কম-বেশি সবাই পরিচিত। স্বাধীন শব্দটি উচ্চারিত হলে বাধাহীন, মুক্ত বা আজাদ কিংবা অনন্যনির্ভরতাকে বোঝায়। স্বাধীনতার অর্থ দাঁড়ায় বাধাহীনতা, আজাদি এবং স্বচ্ছন্দতা। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে একসাগর রক্তের বিনিময়ে। সেও আজ ৩৬-৩৭ বছর আগের কথা। কিন্তু বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থে কতটা স্বাধীন এবং কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে ‘স্বাধীন’ এবং ‘স্বাধীনতা’র আলোকে সেই বিষয়টি পর্যালোচনার সময় এসেছে আজ।

স্বাধীনতার সাঁইত্রিশ বছরেও দেশে এবার আবার তীব্র খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে। এ খাদ্যাভাব উত্তরবঙ্গের বার্ষিক মঙ্গা নয়। সরকার এবং সেনাবাহিনীর নানা শুভ উদ্যোগ সত্ত্বেও গোটা দেশে হাহাকার পড়ে গেছে। জিনিসপত্রের, বিশেষ করে চালের দাম এতটাই বেড়ে গেছে যে, তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নেই।

গত বছর দু’বার বন্যায় ফসলহানি ঘটেছে। ঘটেছে সিডরে। তা ছাড়া বিদ্যুৎ, সার, বীজ ইত্যাদি কৃষি উপকরণের অভাব তো ছিলই। কাজেই খাদ্যঘাটতি ছিল অবশ্যম্ভাবী।

আসলে সুজলা-সুফলা এই দেশেও খাদ্যাভাব নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতার আগে পাকিস্তানি আমলে দেখেছি, আমাদের টাঙ্গাইল জেলায় চৈত্র-বৈশাখ মাসে খাদ্যাভাব লেগেই থাকত। অঘ্রান মাসে কৃষকরা যে ধান পেতেন, চৈত্র মাসের আগেই তা শেষ হয়ে যেত। চাল কেনার টাকাও থাকত না তাদের হাতে। অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়ে দিন কাটাতেন তারা।

ধারণা করা গিয়েছিল, স্বাধীন দেশের সরকার কৃষির উন্নতির দিকে নজর দেবে। সহজলভ্য হবে কৃষি উপকরণ। উৎপাদন বাড়বে। খাদ্যাভাব থাকবে না।  বাস্তবে তা হয়নি। সঙ্কট রয়েই গেছে।

গত বছরের ২১ জুলাই একটি পত্রিকা জানায়, দেশে খাদ্য মজুদ প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। ধান-চাল আমদানি এবং সংগ্রহ­ কোনোটাতেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যায়নি। ফলে দুর্ভিক্ষ প্রায় অনিবার্য।

এক প্রাচীন কবি বলেছেন, তিনি সেই দেবীকে নমস্কার করেন যিনি সব প্রাণীতে ক্ষুধারূপে বিরাজমান। বেঁচে থাকতে হলে ক্ষুধাকে তুষ্ট বা প্রশমিত করা দরকার। কিন্তু শুধু নমস্কারে তা করা যায় না। রুচি ও প্রয়োজনমতো পানাহার করতে হয়। রবীন্দ্রনাথও বলেছেন, ‘সুরের খাদ্যে’ ‘নরের মিটে না ক্ষুধা’। ক্ষুধা মেটাতে যা লাগে, তা সহজলভ্য নয়। কোথাও নয়। সবার কাছে তো নয়ই।

‘দ্য ড্রিম সঙস’ গ্রন্থে মার্কিন কবি জন বেরিম্যান বলেছেন, তিনি ‘অনাহারী’। বলেছেন, খেতে হবে সম্ভবত ‘কিছুই না’। এর আগে এই কাব্যের নায়ক হেনরি দৃশ্যমান সবকিছুই খেয়ে ফেলেছিলেন। ক্ষুধার জ্বালায় মানুষ কখনো কখনো সত্যি তা খেতে বাধ্য হয়।

ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশে ১৯৮৪ সালে ভীষণ খাদ্যাভাব দেখা দেয়। তখন সেখানকার এক গো-উপাসক পরিবার গোমাংসে জীবন রক্ষা করেছিল। পরিবারের কর্তা বার্তা সংস্থা ইউএনআইকে জানানঃ ‘ঘরে খাবার ছিল না। হাতে ছিল না টাকা। বাড়ির সবাই উপোসী ছিলাম। পালের গরুগুলোও। সবাই মরতাম। তার আগে ওগুলোকে কেটেকুটে খেয়ে ফেললাম। তাই প্রাণে বেঁচে রয়েছি।’

জীবন রক্ষার এমন উপায়ও সবার থাকে না। তখন? সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তার উটপাখি কবিতায় প্রশ্ন তুলেছেন, ‘অখিল ক্ষুধায় শেষে কি নিজেকে খাবে?’

ক্ষুধায় মানুষ আত্মহননেও বাধ্য হয়। একবার ফিলিপাইনের ডাভো প্রদেশের এক প্রত্যন্ত এলাকায় ৬৪ ব্যক্তি খিদের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে জেনে-শুনে বিষ খেয়েছিল।

বিশ্বব্যাংক হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে, ২০৩০ সালে বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে লোকসংখ্যা দাঁড়াবে ১ হাজার ৫৪০ জন। এখন এই সংখ্যা এক হাজার। এখনই বাংলাদেশ পৃথিবীর সর্বাধিক ঘণবসতিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম।

পৃথিবীর জনসংখ্যা বছরে ৮০ লাখ ৬০ হাজার করে বাড়ছে। ঢাকায় এক কর্মশালায় বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, প্রাচুর্যের দেশ আমেরিকাতেও অন্তত ১ কোটি লোক অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটায়। আমরা জানি, পৃথিবীতে অন্তত ৮ কোটি লোক প্রায় অভুক্ত থাকেন। তাদের মধ্যে অনেকেই শিশু। অনাহারীদের মধ্যে অন্তত ৫০ লাখ লোক অপুষ্টিজনিত রোগে মারা যায়।
‘কোয়ান্টাম ইভোলিউশন’ (ছৎথষয়ৎশ ঊংসলৎয়মসষ) গ্রন্থের লেখক অধ্যাপক জনযো ম্যাকফেডেন (ঔসভষযসপ গধঋথননপষ) তার এক নিবন্ধে (দ্য নেশন, ব্যাংকক, আগস্ট ২৪, ২০০৫) এসব পরিসংখ্যান দিয়ে বলেছেন, আগামী ২০ বছরে জনসংখ্যা পরিস্থিতি যা দাঁড়াবে, তার সাথে তাল মিলাতে হলে ধান চাষের উৎপাদন অন্তত ৩০ শতাংশ বাড়াতে হবে।

কি করে তা সম্ভব? তিনি বলেছেন, হয় আবাদি জমির পরিমাণ বাড়াতে হবে, না হয় বাড়াতে হবে উৎপাদনের পরিমাণ।

আবাদি জমির পরিমাণ না বাড়িয়েও উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যেই সৃষ্টি হয়েছে জেনিটিক্যালি মডিফাইড (জিএম) ধান। এই ধান অতি উচ্চফলনশীল, খরা-বন্যা প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ মোকাবেলা করতে সক্ষম। এর চাষে সেচের তেমন প্রয়োজন পড়ে না। লাগে না কীটনাশকও। ফলে উৎপাদন ব্যয় খুবই কম পড়ে। কীটনাশকের খারাপ প্রভাবও এড়ানো যায়।

সরকারের তরফ থেকে বলা হয়, চিন্তার কারণ নেই। উৎপাদন বেড়েছে। মজুদও রয়েছে ভালো। উৎপাদন বৃদ্ধির সরকারি পরিসংখ্যান বা খাদ্যাভাবের কারণ শুনে মানুষের পেটের খিদে মেটে না। কখনোই না।

আধুনিক আরবি ভাষার অন্যতম প্রধান কবি সালহ নিয়াজী তার ‘তৃতীয় বিশ্ব’ কবিতায় বলেছেন, ‘আজকের কবি ওসব অঙ্কটঙ্কে তুষ্ট নন/ তার আগামীকাল মানে এক্ষুনি/খিদে পেলে তিনি শাসকের পথ আগলে দাঁড়ান/শীত লাগলে টেনেহিঁচড়ে নেন পতাকা।’

বাংলাদেশের রফিক আজাদ আরো এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছিলেন। রফিক শুধু কবি নন, মুক্তিযোদ্ধাও। দেশকে তিনি ভালোবাসেন। এখনো ভালোবাসেন বঙ্গবন্ধুকে। তবু ১৯৭৪ সালে তিনি দাবি করেছিলেন, ‘ভাত দে হারামজাদা!’ হুমকি দিয়েছিলেন, ভাত না পেলে তিনি ‘মানচিত্র’ খাবেন।

‘উজান’ উপন্যাসে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ও ক্ষুধার্ত মানুষের এই মারমুখী অবস্থার কথা বলেছেন। আসলে খাদ্যের জন্য কান্নাকাটি আর হানাহানি চলে আসছে বাইবেল কথিত ‘সৃষ্টির ষষ্ঠ দিন’ থেকেই। তবু নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ভাষায় বলা যায় না যে, ‘এখানে মন বড় কৃপণ এখানে থাকব না।’ মানুষের বিরুদ্ধে কৃপণতার অভিযোগ যেমন সত্য, তেমনি সত্য তার ঔদার্যের কথাও।

ছোটবেলায় মির্জাপুরে দেখেছি, দানবীর রণদাপ্রসাদ সাহা প্রতি বছর অন্তত একবার করে ‘লঙ্গরখানা’ খুলতেন। শত শত মানুষকে খাদ্য দান করতেন। মার্কিন কংগ্রেস সদস্যরা ১৯৮৫ সালে প্রস্তাব করেন, প্রতি বছর ২৪ নভেম্বর সবাই উপবাস করে যে খাদ্য বাঁচানো যাবে, তা দুর্ভিক্ষপীড়িত এলাকায় পাঠানো হবে।

ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের এমন কোনো কোনো সাহায্য সব সময় প্রকৃত প্রাপকের হাতে পৌঁছে না। সাতে-ভূতে খেয়ে ফেলে। ধরা যাক, বিশ্বের খাদ্যভাণ্ডার বলে পরিচিত পাশ্চাত্যের দেশগুলোয় এমন ঘটে না। অনুমান করা যাক, সেখানে হাতেমতাইয়ের সংখ্যাও অনেক। আমেরিকার মতো উদ্বৃত্ত এলাকার মানুষ তবু ক্ষুধামুক্ত নয় কেন? অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, অন্তত ১৫ লাখ আমেরিকানের দিন কাটে অন্নকষ্টে।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন তার ছবিতে মন্বন্তরের পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন। ছেঁড়াছেঁড়াভাবে এখনো তার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। এখনো অনেকের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কথিত ‘গরম ভাত’ জোটে না।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রাকৃতিক কারণে ফসলহানি, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং উৎপাদন বাড়াতে ব্যর্থতার ফলে খাদ্যাভাব হয়।

আমাদের দেশে খরা, বন্যা প্রভৃতি প্রতি বছরই ঘটছে। গত আড়াই দশকে জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এদের আবাসিক ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে লেগেছে বিপুল পরিমাণ আবাদি ও আবাদযোগ্য জমি। এদিকে চাষাবাদের আধুনিক পদ্ধতি ও উপকরণ এখনো অনেকের নাগালের বাইরে। মোটকথা, খাদ্যশস্যের চাহিদা যতটা বাড়ছে, উৎপাদন ততটা নয়। তবু স্বীকার করতে হয় যে, খাদ্য সঙ্কটের মূল কারণ খাদ্যের অভাব নয়, অপ্রাপ্তি।

এই অপ্রাপ্তির প্রধান দুটো কারণ­ সামাজিক এবং অর্থনৈতিক।
মোপাসাঁর গল্পে একটা বুড়ো ঘোড়া যে মাঠে অনাহারে প্রাণ হারায়, সেখানে তার নাগালের বাইরে ঘাসের অভাব ছিল না। কিন্তু দড়ি খুলে সে তা খেতে পারেনি।

গত শতাব্দীর সাত বা সত্তরের দশকে বাংলাদেশ, ভারত ও ইথিওপিয়াসহ বহু দেশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। উন্নত বিশ্বে যে পরিমাণ খাদ্যশস্য পশুকে খাওয়ানো হয়, তার মাত্র ১০ শতাংশ দিয়ে এই ঘাটতি মেটানো সম্ভব ছিল।

আলাদাভাবে চীন, ভারত ও বাংলাদেশের পরিস্থিতি ছিল আরো অবাক করা।
চীনের ঘটনাটা কমিউনিস্ট শাসনের প্রথম দিকের। তখন আইন করা হয় যে, চাষিরা রাষ্ট্রের পক্ষে সমবেতভাবে শস্য ফলাবেন আর রাষ্ট্র সবাইকে প্রয়োজনমতো অন্নবস্ত্র দেবে। কাগজে-কলমে গোলাভরা ধানের এই সুসময়ে, ১৯৫৮ সালে, চীনে প্রায় ৩০ লাখ লোক অনাহারে প্রাণ হারান।
ভারতে ১৯৭৮ সালে ধান ও গমের ফলন এমন ভালো হয় যে, তা মজুদ রাখাই সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তখনো সে দেশের শতকরা অন্তত ৩০ জন অনাহারে-অর্ধাহারে কাটায়।

বাংলাদেশে প্রায় একই ঘটনা ঘটেছিল সাতের দশকের মাঝামাঝি সময়ে। তখন মোট এবং মাথাপিছু চাহিদার তুলনায় খাদ্যশস্যের যোগান বেশি থাকা সত্ত্বেও কোনো কোনো এলাকায় দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। জনশ্রুতি, বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষাবস্থা সৃষ্টির ব্যাপারে অন্তত তিনটি মহলের হাত ছিল। একশ্রেণীর যাজক চাচ্ছিলেন, দুর্ভিক্ষ দীর্ঘস্থায়ী হোক। তারা ক্ষুধার্তকে খাদ্য দিয়ে বশ করে ‘ধর্ম’-এর দীক্ষা দেবেন। রাজনীতিবিদদের এক অংশ চাচ্ছিলেন, ক্ষুধার্তরা ক্ষেপে গিয়ে সরকারের পতন ঘটাক। একটি বিদেশী সরকার চাচ্ছিলেন, খাদ্যের প্রয়োজনে বাংলাদেশ সরকার তাদের কাছে মাথা নোয়াক।

খাদ্যাভাব কাটাতে হলে সবার ক্রয়ক্ষমতার ব্যবস্থা করতে হবে। উপার্জনের সুযোগ দিতে হবে সবাইকে। উৎপাদন বাড়ানো এবং চাষের খরচ কমানো গেলে দামও কম হবে। তখন ধান সহজলভ্য হবে অনেকের কাছেই। অন্যথায় সমস্যা থেকেই যাবে।

খাদ্য সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করার সাথে সাথে বাড়াতে হবে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা। ‘দুর্ভিক্ষপ্রবণ’ এই দেশের সরকারের সে ইচ্ছা থাকা চাই। অবিলম্বে সম্মিলিতভাবে সে উদ্যোগ না নিলে মুক্তি নেই। স্বাধীনতাও অর্থহীন হবে তা হলে।


**************************
লেখকঃ অরুণাভ সরকার
কবি ও সাংবাদিক
দৈনিক নয়াদিগন্ত, ২৬ মার্চ ২০০৮

বাংলাদেশের জন্য এখন চরম দুঃসময়। ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের পর আর কখনো এত দুঃসময়ের মুখোমুখি হয়নি বাংলাদেশ। আর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এত সর্বব্যাপী ষড়যন্ত্রও হয়নি আগে কখনো। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি গত সাত বছরের ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রের ফসল।

(Page 1 of 3)   
« Prev
  
1
  2  3  Next »