National Events

ভাষা দিবসঃ ২১শে ফেব্রুয়ারী

(Page 1 of 3)   
« Prev
  
1
  2  3  Next »



একুশের আন্দোলনের উত্তাল সময়েও নিউইয়র্ক টাইমস-এর কোনো সাংবাদিক ঢাকায় ছিলেন না। রাজনৈতিকভাবে শহরটি তখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি। একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাস্তায় ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণের খবরটি পত্রিকায় ছাপা হয় বটে, তাতে তেমন গুরুত্ব ছিল না। ২২ ফেব্রুয়ারি কলকাতা থেকে নিজস্ব সংবাদদাতার বরাত দিয়ে দায়সারা গোছের খবরে বলা হয়, বাংলাকে সরকারি ভাষা করা হোক-এ দাবিতে ঢাকায় বিক্ষোভরত ছাত্রদের ওপর পুলিশ গুলি করেছে। এর ফলে ছয়জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন।

প্রথম শহীদ
একুশের প্রথম শহীদ রফিকউদ্দিন আহমদ। তিনি ছিলেন মানিকগঞ্জের আবদুল লতিফের বড় ছেলে। তাঁর মায়ের নাম রাফিজা খাতুন। সিংগাইর উপজেলার পারিল গ্রামে ছিল তাঁদের বাড়ি।

ঘটনার সময় শহীদ রফিকের বয়স হয়েছিল ২৬ বছর। পুলিশের লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসের কারণে ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ব্যারাকে আশ্রয় নেওয়ার সময় তাঁদের সঙ্গে ছিলেন রফিক। গুলিতে তাঁর মাথার খুলি উড়ে যায়। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে তখনই মারা যান তিনি।

প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট ওবায়দুল্লাহর উপস্থিতিতে তাঁর জানাজা পড়ান আজিমপুর মসজিদের ইমাম হাফেজ আবদুল গফুর। সংগোপনে, আত্মীয়-স্বজনের অজ্ঞাতে আজিমপুর কবরস্থানের অসংরক্ষিত এলাকায় দাফন করা হয় শহীদ রফিকের মরদেহ।

আমি এর সঙ্গে যোগ করতে চাই- অন্যায়, অবিচার, স্বৈরাচার, নারী নির্যাতন, অসহায়দের নির্যাতন, স্বাধীনতা ও দেশের সার্বভৌমত্ব বিরোধীঃ কোন অপশক্তির কাছেই ‘মাথা নত না করা’।

আমরা জানি এই মহান ভাষা আন্দোলন ও একুশকে ভিত্তি করেই গর্জে উঠেছিল ’৫২-তে সারাদেশ এবং তারপরেই ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে আমরা শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচারীদের কবল থেকে ছিনিয়ে এনেছি স্বাধীনতা-মহান স্বাধীনতা যে ইতিহাস- বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।

একটি মানবগোষ্ঠী তার উদ্ভবকাল থেকে যত দিন পর্যন্ত সে টিকে থাকছে তত দিন যাপিত গোষ্ঠীজীবনে অসংখ্য ব‘-উপাদান ও মনন-কল্পনাজাত ভাব-উপাদানের সম্মিলনে নিজের সংস্কৃতি নির্মাণ করে তোলে। জীবন যেহেতু তৈরি হয় স্থান, কাল ও পাত্রের চালচিত্রে তাই জীবন এক জায়গায় থেমে থাকে না, সমাজের মানুষ জ্ঞাতসারে কি অজ্ঞাতে পাল্টাতে পাল্টাতেই এগিয়ে যায়। কালস্রোতে মানুষের দৃষ্টিকোণ পরিবর্তিত হয়, সামাজিক আচরণ ও অভ্যাসে ভিন্নতা আসে, শিল্পের সাধনায় বৈচিত্র্য দেখা দেয়, মোড় বদল ঘটে। খাদ্যের অভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, বা‘নির্মাণ, ভাষা, ধর্ম, সামাজিক সংস্কার, এমনকি কুসংস্কার এবং মনের গড়ন ও কল্পনার ধাঁচ- সবই একটি জাতির সাংস্কৃতিক উপাদান। জীবনকে বাদ দিয়ে তাই সংস্কৃতির অস্তিত্ব নেই।

সাম্প্রতিক বাংলাদেশে সংস্কার প্রায় সার্বজনীন আকুতি হয়ে উঠেছে এবং তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণকারী নাগরিক কমই রয়েছেন। তবে এই সংস্কারসাধনের পথ ও পদ্ধতি নিয়ে বিতর্কের অন্ত নেই এবং এখানে মাথা চাড়া দিয়েছে সংস্কারের আরেক অর্থ, জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঘোষ সংস্কারের এই অর্থ নির্দেশ করেছেন ‘আজন্ম ধারণা’, এবং হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘ধারণা, বিশ্বাস’। আমরা বর্তমান রাজনীতিক পটভূমিকায় একে বলতে পারি আজন্ম লালিত লোকবিশ্বাস বা লোকধারণা

খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে বাগানে পায়চারি করতে করতে মুখে মুখে কবিতার স্তবক আওড়াতেন তিনি। কখনো রবীন্দ্রনাথ; পাবলো নেরুদা, নজরুল এমনকি বিষ্ণুদে, কখনো নিজের পুরনো কবিতা অথবা তখনই বানানো কয়েক লাইন। যার কিছু পরে লিপিবদ্ধ হয়েছে, আবার অনেক লাইনই মিলিয়ে গেছে বাতাসে। কালো অক্ষরে ঠাঁই পায়নি আর। এমন সব লাইন আওড়াতেন, কিশোর থেকে প্রবীণ যে কেউই উদ্বুদ্ধ হবে, সাহসে ভর করে বেঁচে থাকার আস্বাদ পেতে।

বাংলাদেশে চিন্তাচেতনার ধারা বিশেষ কোন ছকে আবর্তিত না হলেও এর মূলস্রোত ও সামষ্টিকতায় একটা ঐক্য লক্ষ্য করি। ঊনিশ শতকে নানা আঞ্চলিক, সম্প্রদায়গত, পেশানির্ভর, সমাবেশ ও সংগঠনগত বিরোধ-সংঘাত, দ্বন্দ্ব-মতদ্বৈধ, হিংসা-অসুয়ার ফলে সভা-সমিতি-আঞ্জুমানে তিলকে তাল করায় পরিস্থিতি মারামার-কাটকাট পর্যায়েও চলে যেত। মুসলমানদের নানা ধর্মীয় সম্প্রদায়-উপসম্প্রদায়ের হাতাহাতি-লাঠালাঠি ব্যাপার কিছু কম ঘটেনি। কিন্তু ধীরে ধীরে এসব জটিল বিদ্বেষ-বিবাদের অবসান ঘটেছে। ওহাবি-ফরায়জি-আহাম্মদি সমাজের তীব্র অবস্থান শিথিলও হয়েছে।

আজ অমর একুশে ফ্রেবুয়ারি। খুব মনে পড়ছে রেজাকে।

কখনোই বন্ধু ভাবতাম না ওকে। কোন বেড়াল ছানা পায়ের কাছে আদুরে গলায় মিঁউ মিঁউ করতে থাকলে যেরকম মনে হতো সেরকম ছিল ও। ওকে ছাড়া আমার চলত না । আবার কখনোই নিজের সমকক্ষ হিসাবে ভাবতে পারতাম না। হাওয়ার মতো, ছায়ার মতো ওর অস্তিত্ব । টের পাই পদে পদে কিন্তু স্বীকার করতে চাই না।

বায়ান্ন সালে আমি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র ছিলাম এবং পুরানা হোষ্টেলে বাস করতাম। ২১ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার, বিকেল ৩টার দিকে হোষ্টেলের সম্মুখভাগে যে নৃশংস ঘটনাবলী আমার চোখের সামনে সংঘটিত হয়েছিল, তা আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা। আজো চোখের পাতা নির্মিলিত করলে, স্মৃতির ক্যামেরায় সেই ভয়াবহ দিনটি এবং তার পরবর্তী দিনগুলির চরম ঘটনাবলী আয়নার মত জ্বল জ্বল করে ওঠে।

এ বছর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ৯ বছর পূর্তি হলো। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো কতৃêক অমর একুশের মর্যাদা ছড়িয়ে গিয়েছিল বিশ্বজুড়ে দিবস ঘোষণার মাধ্যমে। কিন্তু আমরা সবটুকু মর্যাদা অর্জন করতে পেরেছি কিনা তা খতিয়ে দেখার বিষয়টিও আমাদের দায়িত্ব। যতদূর জানি এখন পর্যন্ত এই দিবসের কথা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে পৌঁছায়নি।

(Page 1 of 3)   
« Prev
  
1
  2  3  Next »