National Events

National Days

(Page 1 of 5)   
« Prev
  
1
  2  3  4  5  Next »

 Articles by this Author

বাংলাদেশে অবিশ্বাস্য ঘটনা তো একটি-দুটি নয়, অসংখ্য, কিন্তু দুটি বিশেষ রকমের এবং পরস্পর সংলগ্ন অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটেছে। যে দুটি অত্যন্ত তাৎপর্যপুর্ণ এবং সত্য উন্মোচক। এরা উভয়েই বাংলা ভাষা সম্পৃক্ত। একটি হচ্ছে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠা এবং অন্যটি হচ্ছে প্রতিষ্ঠার পরপরই এক ধরনের বিসর্জনের সুত্রপাত।

ভাষার অধিকার, শুধু ভাষার অধিকার নয়, মনুষ্যোচিত সকল অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামের প্রতীক একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩ সাল থেকে এ দেশের সব থেকে গৌরবময় দিবস হিসাবে পালিত হয়ে এসেছে। তবে পাকিস্তান আমলে ও তারপর বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই দিবস পালনের ধরনের মধ্যে পার্থক্য ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়েছে। ১৯৭১ সালের পর এই অঞ্চলের জনগণের জীবনের মধ্যে যে পরিবর্তন এসেছে, বিশেষত মধ্য শ্রেণীভুক্ত ছাত্র বুদ্ধিজীবীদের ও শাসকশ্রেণীর বিভিন্ন অংশের চিন্তা-চেতনায় যে পরিবর্তন এসেছে তারই প্রতিফলন ঘটেছে এই পার্থক্যের মধ্যে।

বাঙলা আমাদের মাতৃভাষা। আমাদের আন্তর্জাতিক পরিচিতির ভাষা। আমাদের চিন্তা ও কর্মের ভাষা। সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, শিক্ষণ-প্রশিক্ষণের ভাষা। যুদ্ধ, শান্তি, প্রেম, বিরহ, প্রশংসা অসুয়ার ভাষা। রাজনীতি, অর্থনীতি ও দুর্নীতির ভাষা। এক কথায় বাঙলা আমাদের জীবনের সর্বস্তরের ভাষা। সকাল থেকে শুরু করে রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এই ভাষাতে আমরা কথা বলি। এই ভাষার চর্চা করি। তবে কবি-সাহিত্যিকদের চর্চায় বাঙলা ভাষার শ্রী বাড়ে। শব্দাবলী পায় ব্যবহারিক উৎকর্ষ। কখনো তারা সৃষ্টি করেন নতুন নতুন যৌগিক শব্দ।

একুশ শতকের এই তথ্য-প্রযুক্তির পৃথিবীতে বিশ্বায়নের ফলে একদিকে যেমন ভৌগোলিক সীমানার বাধা অতিক্রম করে দেশ-জাতিগুলো পরস্পরের কাছে চলে এসেছে, তেমনি মুক্তবাজার আর অবাধ বাণিজ্যের নামে একের পণ্য সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে অন্যের দরজায়। শুধু কি পণ্য? বিশ্বায়নের খোলা হাওয়ার ঝাঁপটায় আমাদের যে দুর্বল জানালাগুলো খুলে গিয়েছিল সেখান দিয়েও এখন অবাধে চলে আসছে অন্য দেশের, অন্য ভাষার, অন্য জাতির সংস্কৃতি।

২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস ও ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের মতোই ২১ ফেব্রুয়ারি জাতীয় দিবস হিসেবে মর্যাদা পেয়ে আসছে। এই দিবসটি দুর গ্রামাঞ্চল থেকে ঢাকা শহর পর্যন্ত একইভাবে পালিত হয়, সর্বজনীন উৎসবের মতো। কেন, কী কারণে? ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করেন। তদানীন্তন মুসলিম লীগ সরকার গুলি করে। সালাম বরকত রফিক জব্বারসহ অনেকে শহীদ হন। কেবল আন্দোলনের মাত্রা ও জঙ্গিত্ব যদি দেখি, তাহলে দেখব এর পরেও অনেক বড় বড় গণআন্দোলন হয়েছে।

বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে শিশু-শিক্ষার পাঠ-উপকরণ নিয়ে গবেষণামুলক আলেচানার সুত্রপাত হয়েছে, এটা অত্যন্ত সুখের ব্যাপার। বিভিন্ন গবেষকের গবেষণার আলোকে পাঠ্যবই পরিমার্জিতও হচ্ছে। এটি একটি উন্নয়ন প্রক্রিয়া। এই আলোচনার বিষয় প্রথম শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য রচিত পাঠ্যক্রম এবং সেই পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত ৩৩টি বই। 

একবিংশ শতকে আমরা যে ভাষা বিশৃঙ্খলা নামান্তরে ভাষা সন্ত্রাসের মুখোমুখি হচ্ছি তার সঙ্গে আপষ ছাড়া ঘরের ছেলেকে ঘরে ধরে রাখাই যেন দুষ্কর হয়ে পড়ছে। চলতি পথে রাস্তা ফুটপাতে, বাস ট্রেনে, টেলিভিশনের নাটক-টকশো, রেডিওতে কান পাতলেই এই ভাষা সন্ত্রাসের সরব নিবর্তন ধরা পড়ে। এর আগে বলে নেয়া ভালো, বাংলা ভাষা কি সব কালে একই রকম ছিল? না, মানুষের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন এবং যোগাযোগের মাত্রা ভেদের ওপর ভাষার পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। যে ভাষা তার নিজেকে পরিবর্তন করতে পারেনি, সে ভাষা টিকে থাকতে ব্যর্থ হয়েছে।

একুশের চেতনাকে যেভাবেই ব্যাখ্যা-বিশেস্নষণ করা হোক না কেন একুশের চেতনা যে মূলত মাতৃভাষার চেতনা সেটা অস্বীকার করার অর্থ বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়া। বিশ শতকের চল্লিশ দশকের অপরাধ আর পঞ্চাশ দশকের প্রথমার্ধ জুড়ে ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে বায়ান্নো সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালী প্রাণ দিয়েছিল বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য। সে জন্য বাঙালীকে একাত্তরে রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধ করতে হয়েছিল, সৃষ্টি করতে হয়েছিল জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ।

আত্মপরিচয়ের সংকীর্ণতা যদি আমরা বাদ দিতে পারি, তখন ভাষা সম্পূর্ণ এক নতুন দার্শনিকতায় আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়। প্রতিটি ভাষাই জগতকে নিজের ভাষার মধ্যে নির্মাণ করে। অধরা প্রকৃতির ততোটুকুই ভাষায় ধরা পড়ে যতোটুকু আমরা চিন্তায় ধরতে পারি। ভাষা ছাড়া চিন্তা নাই। তার মানে চিন্তায় ধরা মানে ভাষায় ধরা।

ভাষাকন্যা হালিমা খাতুন বাংলা ইংরেজি ও শিক্ষাশাস্ত্রে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব নর্দান কলোরাডো থেকে ডক্টরেট ইন এডুকেশন লাভ করেন ১৯৬৮ সালে। ইংরেজিতে এমএ পড়ার সময় ৫২’র ভাষা আন্দোলনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫৩ সালে খুলনায় অধ্যাপনার শুরু। ১৯৬১ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষনা ইনস্টিটিউটে কর্মরত ছিলেন। প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের চেয়ারম্যান ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। নেপালের ইকোয়াল এক্সেস অব উইমেন প্রকল্পে কয়েক বছর কাজ করেছেন। শিশুদের জন্য বাংলা ও ইংরেজিতে গল্প ছাড়া নাটক ও কবিতা লেখেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২৫ এর অধিক। তিনি বাংলা ১৪০৫ সালে শিশু একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।