আজ অমর একুশে ফ্রেবুয়ারি। খুব মনে পড়ছে রেজাকে।

কখনোই বন্ধু ভাবতাম না ওকে। কোন বেড়াল ছানা পায়ের কাছে আদুরে গলায় মিঁউ মিঁউ করতে থাকলে যেরকম মনে হতো সেরকম ছিল ও। ওকে ছাড়া আমার চলত না । আবার কখনোই নিজের সমকক্ষ হিসাবে ভাবতে পারতাম না। হাওয়ার মতো, ছায়ার মতো ওর অস্তিত্ব । টের পাই পদে পদে কিন্তু স্বীকার করতে চাই না।

কৈশোরে অন্নদা ইশকুলের মাঠে আমাদের আসর জমত। আকাশ ছুঁয়ে থাকা ঝাকড়া মাথার কড়ুই গাছটির অজগর সমান শেকড়ে বসে আমরা তখন বাদাম চিবোতাম। আড্ডা হতো পুরো বিকেল জুড়ে। তখনি লক্ষ্য করতাম - আমি হাসলে রেজার গোমড়া মুখ নিমিষে হাসিতে ভরে যেত। আমি যার প্রশংসা করছি সে তাকে শ্রদ্ধা করত। আর আমার না-পসন্দের মানুষের সঙ্গে কখানোই রেজাকে কথা বলতে দেখি নি। যে শিক্ষকের কাছে অংক কষতে যেতাম সে ঠিক তার মা-বাবাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে কদিন পর সেই ব্যাচে গিয়ে উপস্থিত হত।

আমরা বরাবরই একই সেকশনে পাশাপাশি বসতাম। কখনো কোন ক্লাসে রেজা আমার সেকশনে না পড়লে ঠিক ওর বাবাকে দিয়ে হেডস্যরকে বুঝিয়ে আমার সেকশনে আমারই পাশে বসতে শুরু করে দিত। রেজার আব্বা অন্নদা ইশকুলের টীচার। আব্দার করলেই হয়ে যেত। সবাই ওর পাগলামো দেখে হাসত।

মুখ ভরা হাসি, মিনারেল ওয়াটারের বোতলের মতো ছলকে উঠত যখন তখন। এখনও চোখ বুঁজলে সেই হাসির শব্দ আমি শুনি, একদম স্পষ্ট। একবার প্রচন্ড শীতের সময় রেজা বড় বোনের ঢাকার বাসায় এক মাসের জন্যে বেড়াতে এল। ফেরার পর ওর কথাবার্তার ঢং পাল্টে গেল। কথার সুরে কিঞ্চিৎ শুদ্ধ বাংলা বলার কসরত। একদিন দুদিন, তিনদিনের মাথায় আমি আর আরমান ওকে পুকুর পাড়ে নিয়ে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলাম পানিতে। প্রচন্ড ঠান্ডা সেদিন। কনকনে হিমেল হাওয়ায় গায়ে শীত কাঁটা দিচ্ছে। তবু সে সোয়েটার সমেত পানি থেকে উঠে এসে আমার দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগল। দাঁত ঠক ঠক করছে শীতে, তবু ফিকফিকিয়ে হেসে আমাকে বলল, ‘ তুই একটা আস্তা বিটলা।’

‘এ্যাইডা হেন্ডি ফেন্ডির শাস্তি।’ আরমান উত্তর দিল। ওর মুখে- চোখে কৌতুকের হাসি। কলকাতা ঘেঁষা ভাষাকে তখন আমরা হেন্ডিফেন্ডি বলতাম। কারো মাঝে ব্রাম্মণবাড়িয়ার ভাষা বাদে হেন্ডিফেন্ডির সামান্যতম স্ফূরণ দেখা দিলেও আমাদের বরদাশত হত না। আমাদের কাছে এসব বিজাতীয় বলে মনে হতো। সহ্য করতে পারতাম না। এক ধরনের প্রতিহিংসা আমাদের পেয়ে বসত। কেবলি ভাবতাম আমাদের রেজা আমাদের মতো কথা বলবে। সে কেন শেখা ভাষা আওড়াবে, তাও আমাদের সঙ্গে ? আমাদের চেয়ে বড় ভাবছে নিজেকে ? দেখাচ্ছি ব্যাটাকে, ব্যস, পানিতে ফেল । পানি খেলে আপনা থেকে মতি ফিরবে। তখন ঠিক বলবে,‘ কিতারে, কিতা করছ ? ’

তখন ক্লাস নাইনে । স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পথে হাঁটুর নীচ বরাবর একটা নেড়ী কুকুর কামড়ে দিল আমাকে। রেজা আমাদের বাসায় এসে আমার বিছানার পাশে গুম হয়ে বসে রইল অনেক্ষণ । কোন কথা নেই । যে ছেলে কথা কথায় ফিক ফিক করে হাসে সে এমন চুপচাপ বসে থাকলে সবারই অস্বস্থি লাগে । আমারও হচ্ছিল।

বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাঁথার তলা থেকে বলে উঠলাম,‘ কতা কছ না কেরে? মন খারাপ? ’

‘না , কুস্তা না। ’ বলে উঠে পড়ল। একটু পর একটা মড়া কুকুর হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে আমাদের উঠোনে ফেলে দিয়ে চীৎকার করে উঠল‘,শিমুল, এইডা তরে কামড়ায় নাই? ফুঙ্গির পুতেরে এক বাড়ি দিয়া শেষ কইরা ফালাইছি।’ নিরীহ গোবেচারা দেখতে রেজাকে তখন রীতমিতো হিংস্র মনে হচ্ছিল আমার ।

বিছানা থেকে তড়াক করে লাফ দিয়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম মাঝ উঠোনে। আমার বাবা ডাক্তার, কুকুরটি মারা যাওয়ায় তিনি চেঁচিয়ে রেজাকে ধমকাতে লাগলেন, ‘এ্যাই, তোরে কেডা কইছে কুত্তাডারে মারতে? কেডা কইছে?’

রেজা নির্ভয়ে উত্তর দিল, ‘কেউ না। শিমুলরে কামড়াইছে, হেই লাইগা মাইরা ফেলাইছি।’

‘ওই কুত্তাডারে যে পনর দিন দেইখ্যা রাহন লাগে, হেইডা মাথাত আছে? গোঁয়ার কুনহানের। যদি রেজার কিছু অয় তোরে জেলের ভাত খাওয়ামু।’ আব্বা রীতিমতো উত্তেজিত। পারলে রেজাকে পেটাতে যায়।

রেজা কিছু না বুঝে বোকার মতো আমার আব্বার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। সে ঠিক বুঝতে পরছে না গলদটা তার কোথায়। আমি ওকে হাত ধরে উঠোনের এক পাশে নিয়ে বুঝিয়ে বলি - কামড়ে দেবার পর কুকরটি পাগল হল কিনা তা খতিয়ে দেখতে হয়।কারণ পাগল হওয়া কুকর কামড়ালে জলাতঙ্ক হয়। এজন্য মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

রেজা শুনল মনোযোগ দিয়ে আমার কথা। কাঁদ কাঁদ গলায় বলল, ‘কুকরটিরে মারন তাইলে ঠিক অয় নাই আমার?’

আমি মাথা নাড়লাম না বোঝাতে। আর তাতেই সবার সামনে ভেঁউ ভেঁউ করে কাঁদতে শুরু করে দিল রেজা, ‘আমারে মাফ কইরা দেন চাচা। আমি বুঝতে পারি নাই।’ বলে কখনো পা ধরতে যায় আব্বার। কখনো মাটির উপর উবু হয়ে বুক চাপড়াতে থাকে।

দৃশ্যটা এখনো মনে পড়ে। শেষ দিকে আমার রীতিমতো হাসি পাচ্ছিল। আমার ছোট ভাই আর আম্মার মুখে চোখেও হাসির রেখা। আব্বা কেবল বিরক্ত হচ্ছিলেন। ভুরু জোড়া কুঁচকে বলতে লাগলেন,‘ সামাদ মাস্টারের পোলাটা তো মহা পাগল। আচ্ছা ফ্যাসাদে পড়লাম। যা তো বাবা । দয়া করে যা। বলছি তো তোর বন্ধুর কিছু হবে না। ডাক্তারের পোলার সহজে কিছু অইব না। বাড়ি গিয়ে নিশ্চিতে ঘুমা। যা তো বাবা।’

ক্লাস নাইনে উঠে আমি আর আরমান নিলাম কমার্স। আব্বা ইচ্ছে করে আমাকে কমার্স পড়তে উৎসাহ দিলেন। কারণ তার ধারণা, ডাক্তারী পেশার চাইতেও কমার্স নিয়ে এগোলে ভবিষ্যতে উজ্জ্বল কিছু করার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু সামাদ স্যর ছেলেকে সায়েন্স পড়াবেন। রেজা বেঁকে বসল । শিমুল পড়ছে কমার্স নিয়ে, সে কিভাবে সায়েন্স পড়ে? দিনের পর দিন না খেয়ে থাকল সে। তিনদিনের জন্যে নিরুদ্দেশ হয়ে বাজিতপুরের খালার বাসায় লুকিয়ে রইল। আত্মহত্যার হুমকি পর্যন্ত দিল। কিন্তু সামাদ মাস্টার অত্যন্ত শক্ত মনের মানুষ। কিছুতেই ছেলের কথায় কান দিলেন না। প্রথম দিকে সায়েন্সের প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস ছেড়ে মাঠে এসে বসে থাকত রেজা। আড্ডা পেটাত কড়ুই তলায়। কিন্তু সামাদ মাস্টার তাও বেশিদিন বরদাশত করেন নি। দুদিনের প্যাদানিতে সে ফের মনোযোগী হয়ে ওঠে ক্লাসে। এর ফল হাতে হাতে পেল রেজা। বোর্ডে নিজের স্থান করে নিয়ে সে এসএসসি পাস করল। আমি আর আরমান স্টার পেলাম।

ঢাকায় এসে কলেজে পড়ার ইচ্ছে ছিল খুব। বিশেষ করে ইডেন কলেজের পাশে ঢাকা কলেজের ছাত্র হবার খুব খায়েশ ছিল আমাদের তিনজনেরই। কিন্তু তখনকার রাজনৈতিক অবস্থা ভাল না হওয়ায় অমাদের গার্জিয়ানরা ব্রাম্মণবাড়িয়া কলেজে ভর্তি হতে বাধ্য করলেন। কদিন মন ব্যাজার করে ঘুরে বেড়াতাম। ভাল লাগত না। তিন জন কলেজের মাঠে বসে অভিভাবকদের নিকুচি করতাম আর মেয়েদের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতাম। আমাদের সময় শিক্ষকদের পিছন পিছন ছাত্রিরা ক্লাসে ঢুকত আবার ক্লাস শেষ হলে একইভাবে শিক্ষকের পদাঙ্ক অনুসরণ করে মেয়েদের কমনরুমে ফিরে যেত। এরই মাঝে আমাদের দেখাদেখি, ভাল লাগা মন্দ লাগা, গসিপ বিনিময় ইত্যাাদি।

এই সময়টায় সবাইকেই সবার একবার হলেও ভাল লাগে। চশমা পরা ক্ষীণকায় রাণীকে মনে ধরল আরমানের।কথা শুরু হলে একবার হলেও রাণীর প্রসংগ উঠবে। রাণী ভাল মেয়ে , ওর পরিবারে সবাই শিক্ষিত, এসএসসিতে স্টার মার্ক পেতে পেতে হাত ছাড়া হয়ে গেছে। এজন্য রাত ভর কেঁদেছে সে। গানের গলা অসাধারণ। গান শিখলে সাবিনা ইয়াসমীনের কাছাকাছি জায়গা পেত এদ্দিনে। যে একবার খালি গলায় ওর গান শুনেছে সে কোনদিন ভোলে নি। আরমানের বড় ইচ্ছে ওর গলায় ‘তুমি যে আমার ’ গানটা শোনার। এটাই আরমানের আখেরি খায়েশ। সব মিলিয়ে অন্যরকম মেয়ে সে, পাইক পাড়ার যে কারোকে ওর নাম বললেই বলে দেবে - সে কেমন মেয়ে। এজন্য পাইক পাড়ার কিছু বন্ধু বান্ধবও জুটে গেছে ওর। কাজ একটাই - সুযোগ পেলেই রাণী প্রসঙ্গ টেনে এনে ওদের মুখ থেকে মেয়েটির প্রশংসা শোনা। সেই আসরে আমাদেরও থাকতে হত। মেয়েটির সঙ্গে আরমানের কোন পরিচয় কথাবার্তা নেই। তবু আরমান চাইত আমি যেন রাণীর প্রশংসা শুনে ওরই মতো আপ্লুত হই।

আরমানের মতো আমিও ইরা নামের এক ক্লাস মেটের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ি। লম্বাটে গড়ন। হাঁটার সময় প্রায়ই কলেজের মাঠে ওড়না গড়ায়। একবার কলেজ থেকে বাসায় ফিরতে গিয়ে রিক্সার চাকার সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে চলন্ত রিক্সা থেকে রাস্তায় পড়ে গেছিল। দুদিন আসে নি কলেজে। কনুইর ছাল উঠে যায় কংক্রিটের রাস্তার ঘষা খেয়ে। রাস্তায় দাঁড়িয়েই নাকি খুব কেঁদেছিল ইরা রহমান। শুনে আমার বুকটা ফেটে গিয়েছিল। রেজাকে নিয়ে আমি কাজিপাড়ায় ওদের বাড়িটির সামনে দিয়ে কতবার করে যে হেঁটে গেছি। জাম্বুরা গাছওলা ওদের বাড়িটির দিকে তাকিয়ে কতবার করে যে জিজ্ঞাসা করেছি , ‘রিক্সা থেইক্যা পইড়া গিয়া বলে খুব কানছ রাস্তাত দাঁড়াইয়া? আমি যদি রিক্সাওলা অইতাম তো কুনদিন এই ঘটনা অইতে দিতাম না। কসম খোদার। খুব লাগজে, না? নাইলে কি তুমার মতন বিদূষী মাইয়া এই রহম বেলাজের মতন রাস্তার মাইজখানে দাঁড়াইয়া গলা ছাইরা কান্দে?’

রেজা আমার কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,‘ চিন্তা করিছ না দোস্ত। অইব একটা ব্যাপার।’ আমি অবাক হয়ে রেজার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। টিএ রোডের নরেন্দ্র টী স্টলে বসে সিঙাড়া চা খেতে খেতে রেজা ফের বলল,‘ চিন্তা করিছ না। এই মাইয়ারে তর পাও ফালাইতাছি। একটু সবুর কর।’

আমি কিছু না বুঝেই আবগের তোড়ে ভাসতে লাগলাম। নিজের কলাই করা সিলভারের প্লেট থেকে আরো একটি সিঙাড়া ওকে দিয়ে বলে ঊঠলাম, ‘নে আরেকটা খা।’

এর দুদিন বাদে লেজার পিরিয়ডে মেয়েদের কমনরুম থেকে একটি পুঁচকে মতন ছেলে এসে আমাকে বলল,‘ ইরা পা ডাকে।’ তখন পর্দা ঘেরা কমন রুম ছিল আমাদের কাছে এক রহস্যময় গুহার মতন। ওদিকে তাকালে ভেতরে অন্যরকম এক অনুভূতি হত, যা বলে বোঝানো দায়।

আমি কমনরুমের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই পর্দা তুলে সহজ গলায় ইরা বলল, ‘আমি নাকি তোমার খুব ফেভারিট? বাসায় আস না কেন? বিকালে আইস। মুড়ি চানাচুর খাওয়ামু। আইস। তুমার ওই পাগলা বন্ধুটারে নিয়া আইস । আম্মারে বলছি। আইবা ত?’

‘জ্বে। আমু।’ বলে কোনরকমে সেখান থেকে পালিয়ে বাঁচলাম। কোথ্বেকে কী হল কিছুতেই মাথায় ঢুকছিল না। মাঠে রেজাকে চেপে ধরতেই সে রহস্যময় হাসি হেসে উত্তর দিল,‘ দাওয়াত দিয়েছে? চল তাইলে?’

আমি আর রেজা ঠিকই গেলাম একদিন ওদের মাইছপাড়ার নতুন করা বাড়িটিতে। মূল বাড়ি গ্রামে। বাবা সরকারি চাকুরে। রিটায়ার করার পর দোতলা এই বাড়িটি করেছেন। ইরা মা-বাবার কনিষ্ঠ সন্তান। আমাদের দুজনকে পেয়ে ওদের মাবাবা খুব খুশি। বিকেল ভর আড্ডা হল ইরার সঙ্গে। কিন্তু যা চেয়েছিলাম তা আর পেলাম না। কদিন পর জানলাম ইরাদের বাসায় আমাদের ক্লাসমেটদের অনেকেরই যাওয়া আসা রয়েছে। তুমল আড্ডা হয় সেখানে। সবার মুখেই এক কথা। ইরাদের ফ্যামিলি খুব লিবারেল। মা-বাবা খুব ফ্রি। মেয়েরও পাত্র ঠিক। বিদেশে থাকে। ইরার এইচ এস সি পরীক্ষা সম্পন্ন হলেই তুলে নিয়ে যাবে।

শুনে কদিন মন খারাপ, চাপা হাহাকার আর হতাশায় ভরে উঠল মন, বাউলা হয়ে ঘুরে বেড়াতে ইচ্ছে হল কদিন, ধীরে ধীরে তাও থিতু হয়ে এল। শুধু একদিন রেজার উপর খেপে গেলাম,‘তুই আমার অত বালা চাস ক্যা?’

‘ক্যা? ইরা তরে দাওয়াত করে নাই?’ ফিকফিক করে হেসে রেজা উত্তর দেয়।

‘ আমি এই রহম চাইছিলাম? গাধা কুনহানের। আমি চাইছি প্রেমিকা আর হালার পুতে আমা হাতে ধর্মের বইন ধরাইয়া দিছে। যা ভাগ।’ নিজেকে আর চেপে রাখতে পারলাম না। বলে দিলাম। কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল আমার দিকে। তারপর সেই ভেঁউ ভেউ কান্না‘, আমি বুঝতে পারি নাই ফ্রেন্ড। মাফ কইরা দে। আমার লাইগা তর এই ক্ষতি অইল। মাফ কইরা দে।’ কলেজের মাঠে ঘাসের কার্পেটে বসে রেজার সেই কান্না থামাতে আমার অন্তত ঘন্টা খানেক লেগেছিল সেদিন।

ভার্সিটিতে ভর্তি হতে এসেও রেজা আমার পিছু ছাড়ে নি। সামাদ স্যরের ইচ্ছে ছিল ছেলে ডাক্তর হবে। কিন্তু আমি আর আরমানের সঙ্গে ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয়ে পড়বে ভেবে সে মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি ফর্ম পর্যন্ত তোলে নি। সামাদ স্যরের বয়েস হওয়ায় তার পক্ষে ঢাকায় এসে ছেলের উপর আর নজরদারি করা হয় নি। সেই সুযোগে নিজেবাজে সিদ্ধান্ত নেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার।

দুই মেয়ের পর একমাত্র ছেলে। তাই, সামাদ স্যরের আশা ভরসার একমাত্র জায়গা এই রেজা।

আমার খুব খারাাপ লেগেছিল বিষয়টি জানতে পেরে। কলা ভবনের মাঠে বসে আমি ওকে সরাসরি বললাম, ‘তুই কী পাইছিস? সামাদ স্যর আমারে পর্যন্ত বাসায় ডাইক্যা তর মেডিক্যালে পরীক্ষা দেওনের কতা কইল। আর তুই ফাঁকি মারলি? কেরে?’ আমার কণ্ঠ কর্কশ। আমার খারাপ লাগছিল। কেবলি স্যরের চেহারাটা চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। আমার হাত দুটো চেপে ধরে বললেন‘ তোমারে ও বড় মানে। তুমি কইলেই হে পরীক্ষা দিব। আর পরীক্ষাত বইলে হেরে হারানের শক্তি কেউর নাই। আমার পোলা তো। বালা কইর‌্যাই বুজি।’ স্যরকে কথা দিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু রেজারে মানাতে পরলাম না। সে আমাকেও ফাঁকি দিয়ে মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা দিতে বসে নি। কদিন গা ঢাকা দিয়ে রইল। হাজার খুঁজেও ওকে পাওয়া গেল না। খুব রাগ হল আমার।

ফের বললাম,‘ তুই ভর্তি পরীক্ষায় বইলি না কেরে?’

‘তর লাইগা।’ সোজা সাপ্টা উত্তর রেজার।

‘মানে?’ রাগে ঘর ঘর করতে থাকি। কেউ কারোকে অনুসরণ করে উপরে উঠে গেলে গর্ব হয় । বড় গলায় বলা যায়। কিন্তু কেউ কারো করণে অধঃপাতে গেলে তর দায়িত্ব কে নিতে চায়?

‘আমরা এক লগে এক জায়গায় পড়ুম হেই লাইগা।’ ঘাসের ডগা দাঁত দিয়ে চেপে ধরে নির্বিকার উত্তর দেয় রেজা ।

‘আমার লগে তর কি? আমি মরলে কি তুই মরবি ব্যাটা আম্মক? রাগে চেঁচিয়ে উঠি । সব কিছুর একটা মাত্রা থকা চাই। আম সঙ্গে লেপ্টে থাকার বিষয়টি এখন মাত্রার বাইরে চলে গেছে।

‘মরুম । তর আপত্তি না থাকলে।’ বলেই ছোটবেলার সেই নির্বোধ হাসিটা হেসে চলল।

‘তুই কি আমার পোষা কুত্তা না বিলাই ? তর এত গায়ে গায়ে লাইগা থাকনের শখ কেরে? তর লগে কতা কইতে ইচ্ছা করে না। তুই একটাঃ।’ উত্তেজনায় কথা আমার শেষ হয় না । হিস হিস করতে থাকি ক্রমাগত। আমি কিছুতেই ওর এই ন্যাওটাপনাকে মেনে নিতে পারছি না। যত দিন যাচ্ছে তত সে যেন আমার কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ওর আব্বা নিশ্চয় ভাববে এই কাজটি তার ছেলেকে ফুঁসলে -ফাসলে আমিই করিয়েছি, আমার নিজের ফায়দার জন্যে।

আশির মাঝামাঝি সময়ে কথায় কথায় মফঃস্বলের কারো সঙ্গে যোগাযোগ করা যেত না। মোবাইল আশীর্বাদ নেই ঘরে ঘরে তখন। তাই, যত স্যরের কথা ভাবছি তত ভেতরে ভেতরে উত্তেজিত হয়ে পড়ছি। রাগের চোটে চিৎকার করে উঠলাম‘, তুই যাইবি আমার সামনে থেইক্যা? যাইবি কিনা?’

রেজা সেই আগের মতোই প্রথমে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল আমার দিকে। তারপর একসময় ঝরঝর করে কাঁদতে শুরু করে দিল। এখন সামান্য লজ্জা শরম হয়েছে। তাই লাফ ঝাপ বাদ দিয়ে কেবল চোখের জল ঝরাতে লাগল। একসময় হাতের তালু দিয়ে চোখের জল মুছে বলল, ‘সরি ফ্রেন্ড , সরি। আমি বুঝি নাই। তর লগে একলগে থাহুম, এ্যাইডাই একটা এট্রাকশন। তুই যে এর লাইগা হার্ট অইবি আমি বুঝি নাই।’

‘আমার কতা বাদ দে। তর আব্বার কতা ক। যদি তর আব্বা জানে যে তুই ইচ্ছা কইরা মেডক্যিালের পরীক্ষা দেওন বাদ দিছস তাইলে স্যর হার্টফেল করব। তর খেয়াল আছে? তুই তর আব্বার এক পোলা না?’ বোঝাবার চেষ্টা করি ওকে। সে চুপচাপ বসে থাকে আমার সামনে। তারপর অনেক্ষণ পর বলে উঠল, ‘ঠিক আছে, সামনের বছর আমি মেডিক্যালের ভর্তি পরীক্ষা ঠিকই দিমু। কতা দিলাম। ’

‘ওয়ার্ড।’

আমার হাতে হাত রেখে রেজা বলে উঠল, ‘ওয়ার্ড।’ সকাল বেলার প্রথম আলোর মতো চোখে মুখে হাসি ঠিকরে বেরোয়। আমার খুব ভাল লাগে। দুজন মিলে টিএসসিতে গিয়ে দুই প্লেট করে বিরানি খেয়ে দুমাসের জন্যে ভাড়া নেয়া হাতির পুলের মেসে ফিরে এলাম।

শেষ পর্যন্ত রেজা ভর্তি হল বায়োকেমিস্ট্রী ডিপার্টমেন্টে। আমি আর আরমান হিসাব বিভাগে। ভর্তি পর্ব শেষ করে ব্রাম্মণবাড়িয়া ফিরে গিয়ে কদিন বেশ হৈ চৈ করলাম। আত্মীয় স্বজনদের সবার মুখে আমাদের প্রশস্তি। সবাই জানতেন আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাব। এমন মেধাবী ছাত্র, এরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া আর কোথায় যাবে? আমরাও নিজেদের কৃতিত্বকে বড় করে দেখাবার চেষ্টা করছি-যশোর বোর্ডের একটি ছেলে, স্টার পাওয়া ছাত্র, তবু চান্স পায় নি, আহা ! রেজাল্ট পেয়ে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে। ভীষণ খারাপ লাগল। এসব।

আশির গোড়ার দিকে ভর্তি পর্বটা এখনকার মতো যুদ্ধযুদ্ধ খেলায় পরিণত হয়নি। মার্কসের যেমন বাড়বাড়ি কম, কোচিং কাম মডেল টেস্টেরও কোন বালাই নেই। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বলেও কিছু নেই তখন। গাঁটের টাকা খরচ করে কেউ আবার পড়ে নাকি? মেধাবী ছাত্র-সে তো প্রায় নিখরচায় পড়বার সুযোগ পাবে। তার আবার হা- পিত্যেশ করতে হবে কেন? ঢাকা শহরের মতোই নিরিবিলি নির্ঝঞ্ঝাট দূষণ মুক্ত প্রতিযোগিতা সবখানে।

ভর্তি হয়েই চলে এলাম হলে। নিজেকে বড় বেশি স্বাধীন বলে মনে হচ্ছে তখন। যা করছি তা কেবল নিজের সিদ্ধান্তে। খাচ্ছি দাচ্ছি ঘুমাচ্ছি ঘুরে বেড়াচ্ছি ক্লাসে যাচ্ছি লাইব্রেরী ওয়ার্ক করছি-সব নিজে বাজে। কোথাও মাবাবার ভ্রম্নকুটি নেই। রাত বারোটার সময় চা খেতে চাংখার পুলে দল বেঁধে গেলেও কেউ না বলবে না। এ এক অন্যরকম অনুভুতি। বলে বোঝানো দায়।

আমি আর আরমান সূর্যসেন হলে উঠে পড়লাম এক বড় ভাইর হাত ধরে। দেখাদেখি একই হলে সংযুক্ত হয়ে রেজাও উঠে এল। হাজার বোঝাবুঝিতেও সে তার ফ্যাকালটির কাছাকাছি কোন হলে গিয়ে উঠল না।

চাইলে রেজা বোনের বাসায় থেকেও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসতে পারে। বোনের বাসা শান্তিবাগে। একথা বললেই রেজার সোজা উত্তর, ‘ভাল লাগে না। দুলাভাই খুব কড়া। কলেজেরে শিক্ষক তো । খালি নীাতি ফলায়।আর বোনের বাসায় তগোরে পামু কই? এই মজা?’ বলেই ফিক ফিক করে হাসতে শুরু করে দেয়। দেখাদেখি আমরাও।

শুরু হল আমাদের হল জীবন। রাত বিরাতে চাদরের তলায় মুখ লুকিয়ে বেগম বাজারে গিয়ে ববি কিংবা মোকাদ্দের কা সিকান্দার কিংবা নিষিদ্ধ কোন ইংরেজি ছবি উপভোগ করার উত্তেজনা। অবাধ স্বাধীনতার স্বাদ কত অপূর্ব তা তখনই আমরা প্রথম টের পেলাম।

আরমানের ভেতর বরাবরই নৈতিকতার ব্যাপার সেপারগুলো তীব্র। সব কিছুতেই নিজেকে সাফ সুতরো রাখবার একটা তীব্র চেষ্টা ওর আছে। কিন্তু কৌতূহল প্রচন্ড । এরকম কোন অভিযাত্রা শেষ করে হলে ফিরে সে তিনবার তওবা করে আল্লাহর কাছে মাফ চাইবে। তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে বলবে,‘কোন গুনাহ কইরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে আল্লাহপাক তা অনুমোদন করেন।’

‘ওইডা তো না জাইনা শুইনা গুনাহর বেলায়। তুই তো জাইনা শুইনা খারাপ ছবি দেইখা আইলি।তর বেলায় কী অইব?’ ইচ্ছে করেই মজা করি আরমানের সঙ্গে। ওর সারল্যের সঙ্গে খেলা করে আমি আর রেজা বাড়তি অনন্দ উপভোগ করি।

‘অ, আল্লাহপাক তরার মতন। মাফ চাইলে সব গুনাহ ক্ষমা করেন রাব্বুল আলআমীন। তোদের মতন নাপাক দিল লইয়া কি পরওয়ারদিগারের মাহাত্ম্য বোঝা যায়?’ চোখ গোল গোল হয়ে যায় আারমানের। টকটকে ফর্সা গাল দুটো লাল হয়ে যেত এসময়। মনে হত শরীরের সমস্ত রক্ত একসঙ্গে মুখে উঠে এসেছে।

আমরা এ ব্যাপারটাকেই মাঝে মধ্যে কচলে নিয়ে আলগা অনন্দ নিই। একবার এক রিক্সাওলার উপর ভাড়া নিয়ে চড়াও হবার পর আমরা ওর নৈতিকতাবোধকে উসকে দিয়ে বলে উঠি,‘ এই নিরীহ রিক্সাওলাটাকে মারা ঠিক অয় নাই দোস্ত। ’ সে তওবা পড়ল। প্রথম মদ্যপানের পর খোঁচা দিলাম যথারীতি,‘ দোস্ত সুরা পান করা মহা গুনাহ। ’ সে তওবা বলল। প্রথম টাকার বিনিময়ে নারী গমনের পরও সে তওবা করেছিল। কিন্তু তখন আমাদের দিকে তাকিয়ে অপরাধী চোখে বলেছিল‘, তরা এক একটা ইবলিশের বাইস্তা। তগোরে আল্লাপাকই ঠিক করব। তখন ঠ্যালা বুঝবি।’

ধীরে ধীরে আমরা রাজনীতিতেও জড়িত হয়ে পড়লাম। পরক্রমশালী দল। আমরা তিনজনের বুদ্ধি বিনিময়ের ফলে খুব তাড়াতাড়ি সামনের কাতারে চলে এলাম। হলের সবাই তো চেনেই । ক্যাম্পাসেও খুব দ্রুত পরিচিতির সংখ্যা বাড়তে থাকে। আমরা তিনজনই বক্তৃতা দিই কড়া। গলার জোর এত বেশি যে মাইকের দরকার হয় না। বড় ভাইদের প্রশংসা পাই যখন তখন। ফাউ খাওয়ার সুযোগ হাতের মুঠোয়। মুখ খুললেই বিনি পয়সার চা সিগারেট আর খাওয়া। কারো না বলবার জো নেই। সাধারণ ছাত্রদের থেকে আমরা এক কাঠি উপরে তা আমরা রাজনীতি দিয়ে প্রমাণ করে ছেড়েছি। এখন মিছিলের আগে ভাগে আমাদের স্থান। ব্যানার নিয়ে যখন করিডোরে করিডোরে কিংবা ক্যমাপাস থেকে পীচের রাস্তা ধরে মিছিল নিয়ে এগাতে থাকি তখন নিজেদের হিরো ভাবতে ইচ্ছে করে। পত্রিকায় প্রায়ই ছবি থাকে। ছাত্র নেতা আরমান ,শিমুল আর রেজা এই সেই বলেছে। মুষ্টিবদ্ধ হাত আকাশের দিকে তাক করা। মুখে কঠিন প্রতিজ্ঞা। ছবি দেখে আমাদের অব্বারা চিঠি লেখেন ,‘ পড় নাকি শুধুই রাজনীতি কইরা বেড়াও। ’

আমরা হাসি। আব্বাদের ধারণা সেকেলে। আমরা লড়ছি সুন্দর ভবিষ্যতের জন্যে। লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই। এ্যাকশন এ্যাকশন ডাইরেক্ট এ্যাকশন। বড় বড় ভাবনা চিন্তা আমাদের মাথায়। ভিসি ডিনদের সঙ্গে ওঠবস আমাদের। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোন অনুষ্ঠানে আমাদের জায়গা প্রথম সারিতে। চা সিগারেট আর মধুর ক্যান্টিনের আড্ডা। এই সমস্যা সেই সমস্যা-এই করে করেই সময় কাটে। শ্বাস ফেলার সময় নেই। বড়ভাইদের ধারণা- আমরা রাজনীতিতে ভাল করব। খেটে যাও। ভবিষ্যত তো তোমাদের হাতে। মন্ত্রী-এমপি তো তোমাদেরই হতে হবে। তোমরাই তো জাতির বিবেক, আগামী সকাল। এগিয়ে যাও। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।

আমাদের এক বড় ভাই একদিন আমাদের তিনজনকে ডেকে নিয়ে গেলেন নিজের রুমে। নিজের হাতে টী-ব্যাগ দিয়ে চা করে খাওয়ালেন। তারপর সোজাসুজি বলে উঠলেন,‘ একটা এসাইনমেন্ট আছে।’

‘কন।’

‘একুশে ফ্রেব্রুয়ারীতে এইবার তোমরাই প্রথম মালা ঝুলাবে মিনারের ডগায়। গতবারও আমরাই করেছি। এবার তুই করবি।’ আমার দিকে চোখ বড় ভাইর।

‘আমি ?’

‘হ্যা। প্রেসিডেন্ট সাহেবের ফুল দেয়া হয়ে গেলে তুই জাস্ট ফুলের মালাটা এক ঝটকায় পরিয়ে দিবি বড় মিনারটার চূড়ায়। ব্যস। পরানোর সঙ্গে সঙ্গে শেস্নাগানে শেস্নাগানে ভরে উঠবে পুরো শহীদ মিনার। তুমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা। পারবি না?’

‘পারুম।’ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলে দিলাম। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি বেকায়দায় পড়ে গেছি খুব। চোখের নিমিষে এত বড় মিনারের চূড়ায় উঠে ফুলের মালা পরানো কি এতই সহজ কাজ?

আরমান বলল, ‘তোর রাজনৈতিক কমিটমেন্ট কতুটুকু তা বাজাইয়া দেকতেছে বড় ভাই। বুঝলি না?’

‘আমরা কি কম খাটি পার্টির লাইগা? আরো কী বাহি থাহে? কমীগো উৎসাহ দিব। না, আজাইরা কামে হেগোরে জড়াইয়া একাট বিপাকে ফালইব। এইডা বস্তির পোলাপানগো কাম না? মিনার বাইয়া উডন। ফালতু।’ রাগে ঘর ঘর করতে থাকি আমি। যত আমি রাগছি তত আরমান আমাকে প্রবোধ দিতে থাকে। নানান দোয়াদুরূদ আর গায়েবী শক্তির দোহাই দিয়ে আমাকে শক্তি জোগাতে চেষ্টা করে। কিন্তু আমার মন কিছুতেই এই কাজে সায় দিতে চাইছে না। আব্বা-আম্মার খবরদারিতে মফস্বলের ছেলে হয়েও খুব একটা ডানপিটেপনা দেখাতে পারি নি। অসম্ভব নিয়মমাফিক জীবন আমার। একটা ছোট খাটো সুপারি গাছে ওঠার অভিজ্ঞতা আমার নেই। সেখানে ফুলের মালা নিয়ে কিভাবে বাঁদর হয়ে উপরে উঠি?

সন্ধ্যার পর শহীদ মিনারে গিয়ে বেশ কদিন মকশো দিলাম। কিন্তু যুৎসই কিছু হচ্ছে না। সারাক্ষণ ভয়-এই বুঝি পড়ে গেলাম। এত ভয় আর শঙ্কার মাঝে কিভাবে কাজ হাসিল হবে? বিরোধী পক্ষের ছেলেগুলোও তে হা করে থাকবে । সামান্য হেরফেরে ওরা তো মালা পরিয়ে দেবে। তখন? বড় ভাই মুখের উপর বলে দেবে, ‘তোমারে দিয়া এইটুকুন কাজ অইল না? আশ্চর্য! জাতির সেবা কিভাবে করবা?’

আমি ভাল করেই আমাদের বড় ভাইকে চিনি। মারাত্মক ঠোঁটকাঁটা। যে কারেকে যখন তখন নাকচ করে দেবার ক্ষমতা রাখেন তিনি। বছরের পর বছর তিনি হলে রয়েছেন। আদুভাই, মেয়ে ক্লাস সিক্সে পড়ে। ভাবী উদয়ন স্কুলে মেয়েকে দিয়ে হলে এসে রেস্ট নেন। তিনি ভাইর ক্লাস -মেট ছিলেন একসময়। এখন চুটিয়ে সংসার করছেন। ধানমন্ডির দিকে বাসা। বৃহস্পতিবার এলে বড় ভাই নিজের ভাড়া বাসায় তশরিফ রাখেন। শুক্রবার দিন থেকে ফের চলে আসেন হলের রুমে। অনার্স মাস্টার্স বহু আগে করে ফেলেছেন। এখন একটি ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হয়ে কেবল ছাত্রত্ব বাজায় রাখা। হাই লেভেলের প্রচন্ড আস্তাভাজন নেতা তিনি। তাই বছরের বছরের পর তিনিই ছাত্র নির্বাচনে পাস করে চলেছেন। তার অনুগ্রহ ছাড়া কিছু হয় না দলে। তার নির্দেশ কিভাবে অমান্য করি?

দেখতে দেখতে একুশে ফেব্রুয়ারি চলে এল। রাত ভর উত্তেজনা। আমাদের আর্মস ক্যাডাররা নিরীহ চেহারা নিয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল। পুলিশ ও আর্মির গোয়েন্দাদের কারণে কাছে ঘেঁষতে না পারলেও আশে পাশেই রয়েছে তাদের অবস্থান।

এদের দেখলে মোটেই ক্যাডার মনে হয় না। একেবরে নিরীহ গোবেচারা চেহারা সুরত। হুটহাট সন্দেহ করা যায় না। অথচ এদের সবারই কর্নেল সাহেবের বাসায় গিয়ে শুটিং প্র্যাকটিস করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। এবং এদের বেশির ভাগই ঢাকার আশে পাশের কলেজের ছাত্র। হায়ার করে আনা। একুশের আগের দিন গোপন এক বৈঠকে এদের সঙ্গে আমাদের পরিচয়, বড় ভইর রুমে।

প্রেসিডেন্ট সাহেবের ফুল দেয়া হয়ে গেলেই সরকারি গোয়েন্দারা কেটে পড়বে। ব্যস, তখনি মিছিল সহ ওরা আমাকে নিয়ে বেদীতে উঠে আসবে। বিরোধী দলের কোন কিছু বোঝার আগেই সার্কাসের প্লেয়ারের মতো আমি এক লাফ দিয়ে সবচেয়ে উঁচু মিনারটিতে আমাদের রাজনৈতিক দলের নাম লেখা মালাটি ঝুলিয়ে দেব, ব্যস, কাজ শেষ আমার। যদি বিরোধী দল এ নিয়ে কোনরূপ চেঁচামেচি করে তাইলেই শুরু হবে গুলি বিনিময়। এটা তখনকার রেয়াজ, শহীদ মিনারে দুপক্ষের মাঝে মারামারি রক্তারক্তি হবে-এটা অতি সাধারণ এক নিয়ম। কত মন্ত্রী মিনস্টিারকে পর্যন্ত এ জায়গায় দিগম্বর হয়ে বড়ি ফিরতে হয়েছে। আহারে!

আমাদের মিছিলটি আজিমপুর গোরস্থানে শহীদদের কবরে ফুল দিয়ে জগন্নাথ হলের সামনে অপক্ষো করতে থাকে। বড় ভাই ইশারায় আমাকে প্রস্তুত থাকতে বললেন, একটু পর ফিস ফিস করে উঠলেন, ‘ভয় পাবা না। তৈরি হও।’ একথায় বুক আরো দুরু দুরু করতে লাগল। ফ্যাকাশে চোখে বর বার করে একবার রেজা আর একবার আরমানের দিকে তাকাতে লাগলাম। ফাগুণ হলেও কুয়াশার হাওয়াই মিঠাই শক্তিশালী ফ্লুরোসেন্ট আলো ভেদ করে পোকা মাকড় সহ চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে। হালকা হিমেল হাওয়া ঝাপটা দিয়ে যাচ্ছে শরীরে। কিন্তু আমি রীতিমতো ঘামছি।

একটু বাদে প্রেসিডেন্ট সাহেবের ফুল দেওয়া হয়ে গেল। বিডিআর পুলিশের কর্ডন প্রত্যাহার করা হয়েছে। আমরা খালি পায়ে কালো ব্যাজ বুকের সফেস পাঞ্জবীর গায়ে লাগিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম। সুরে সুরে গেয়ে উঠলাম , আমার ভাইএর রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?

সবার আগে আমাদের মিছিল। ক্যাডাররা প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমরা যেই মাত্র বেদীতে উঠে এলাম ওমনি বড় ভাই ফিস ফিস করে বলে উঠলেন, ‘গো।’

আমার হাতে ফুলের মালা। দৌঁড়ে ফুলের মালাটি মিনারে ঝুলিয়ে দেবার কথা। কিন্তু অমার পা সরছে না। হাত পা রীতিমতো কাঁপছে। রাব্বুল আল আমীন, হে পরওয়ারদিগার, আমার উপর রহম করো-বলে আরমানের শেখানো সবগুলো দোয়াদুরূদ বিড় বিড় করে ঢেলে দিলাম আকাশে বাতাসে। বড় ভাই ফের বললেন, ‘গো।’ উত্তেজনা চেখে মুখে।

ঠিক এসময় ছোঁ মেরে আমার হাত থেকে মালাটি কেড়ে নিয়ে রেজা তর তর করে মিনারের মাথায় উঠে নিমিষের ভেতর ফুলের মালাটি পরিয়ে দিল। পূর্ব পাশ থেকে বিরোধী পক্ষ ধর ধর বলে চিৎকার করে উঠল। গুলির শব্দ ওপাশ থেকে। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ক্যাডাররা উত্তর দিয়ে দিল। ঠা ঠা ঠা। সাধারণ ছাত্র ছাত্রিদের ভেতর দৌঁড়াদৌঁড়ি শুরু হয়ে গেল।

আমি আর আর আরমান স্থির চোখে তাকিয়ে রয়েছি রেজার প্রতিটি আচরণের দিকে। রেজা দ্রুত গতিতে নেমে আসছে। শেস্নাগান হচ্ছে আমাদের মিছিল হতে। এ্যাকশন এ্যাকশন ডাইরেক্ট এ্যাকশন। দুম করে আরো একটা গুলির শব্দ। মনে হল রেজা পড়ে যাচ্ছে। আরমান চিৎকার করে উঠল, ‘রেজার গুলি লাগছে। কোন্‌ শুয়োরের বাচ্চা।’ বলে আমি আর আরমান ছুটে গেলাম সেদিকে। ততক্ষণে সব শেষ। একটা গুলির ছোট একটা ছিদ্র। মাথার বাঁপাশে। ওপাশের পুরো খুলি আলগা হয়ে মগজ ছিটিয়ে পড়েছে চারপাশে। ফুলের উপর ওর ছিটানো মগজ। গোলাপ আর রক্ত একরকম। চেনা দায়।

আমি সমস্ত শক্তি গলায় এনে বলে উঠলাম, ‘রেজা !’

শেষ বারের মতো রেজা তাকাল আমার দিকে। দুফোঁটা অশ্রম্ন চোখের কোণে। আমার মনে হল-মিটিমিটি হাসছে রেজা, ‘ফ্রেন্ড, জিইতা গেছি আমরা। না? বড় ভাই আর তোকে ছোট ভাবতে পারবে না। না?’

মেডিক্যালে নিতে নিতেই রেজা চোখ বুঁজল। প্রচন্ড আক্রোশে আরমান আর আমি একটি পিস্তল নিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি করতে চাইলাম বিরোধী শক্তিকে। কিন্তু নিমিষের ভেতের আমাদের চারপাশের ক্যাডাররা উধাও হয়ে গলে। কোথাও এদের দেখতে পেলাম না।

লাশ নিয়ে মিছিল মিটিং হল। পার্টির সবাই এল। হাইলেভেলের লোকজন গরম গরম কথা বলে গেল। শ্লোগানে শ্লোগানে কদিন মুখর হয়ে উঠল ক্যাম্পাস। ফুলেফুলে রেজার কফিন ভরে উঠল।

কফিন নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যাওয়ার পর তেড়ে এলেন সামাদ স্যর আমাদের দিকে, উন্মাদের মতো বলতে লাগলেন, ‘তরা, হ তরাই আমার পুতেরে খাইছস। তরাই। আমার পোলা ডাক্তার অইয়া বাড়ি ফিরত। আর তরা হেরে লাশ বানাইলি। হো হোঃ হোঃ’ বলে লুটিয়ে পড়লেন মৃত ছেলের কফিনে।

আজ আমি আর আরমান দুটো ব্যাংকের দ্বিতীর সারির কর্তা ব্যক্তি। দুজনই চার্টার্ড একাউন্টেন্ট, লব্ধ প্রতিষ্ঠ দুজন মানুষ। ফেব্রুয়ারি এলেই প্রতিবার আরমানকে জিজ্ঞাসা করি আমি, ‘যাবি ফ্রেন্ড?’

‘কই?’

‘শহীদ মিনারে?’

‘চল।’

আমরা দুই বন্ধু মিলে ফুল দিই। সালাম বরকতের সঙ্গে রেজাকেও। আমাদের বন্ধু রেজা। কোথায় পাবো তারে?


**************************
মণীশ রায়
দৈনিক ইত্তেফাক, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০০৮