- Home
- ভাষা দিবসঃ ২১শে ফেব্রুয়ারী
- মহান একুশের স্মৃতি
মহান একুশের স্মৃতি
- By National Days
- Published 02/26/2008
- ভাষা দিবসঃ ২১শে ফেব্রুয়ারী
- Unrated
বায়ান্ন সালে আমি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র ছিলাম এবং পুরানা হোষ্টেলে বাস করতাম। ২১ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার, বিকেল ৩টার দিকে হোষ্টেলের সম্মুখভাগে যে নৃশংস ঘটনাবলী আমার চোখের সামনে সংঘটিত হয়েছিল, তা আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা। আজো চোখের পাতা নির্মিলিত করলে, স্মৃতির ক্যামেরায় সেই ভয়াবহ দিনটি এবং তার পরবর্তী দিনগুলির চরম ঘটনাবলী আয়নার মত জ্বল জ্বল করে ওঠে।
আমি পুরানা হোষ্টেলের তিন নাম্বার ব্যারাকের এক নাম্বার রুমে থাকতাম এবং আমাদের ব্যারাকের কিছুটা উত্তরে যে ফাঁকা জায়গাটি ছিল, সেখানেই গোলাগুলি সংঘটিত হয়েছিল। কাজেই নিজের চোখে যা কিছু পর্যবেক্ষণ করেছি, তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। তবে তার আগে, সেই সময়ে পুরানা হোষ্টেলের পজিশন কি ছিল, সে সম্বন্ধে কিছু বলা দরকার, কেননা বর্তমানের চাইতে আগের পজিশন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তখনকার পুরানা হোটেল ছিল মূলী-বাঁশের ব্যারাক, যার শুধু বেড়াই মূলী বাঁশের ছিল না, চালও ছিল মূলী বাঁশের। ছোট-বড় ২০টি লম্বা লম্বা ব্যারাক ছিল এবং সেগুলি তিনটি সারিতে সন্নিবেশিত ছিল। পূর্ব দিকের সারিটি ছিল সবচেয়ে বড়, যার উত্তর পার্শ্বে কিছুটা খোলা জায়গা ছিল এবং সেখানেই গোলাগুলি হয়েছিল। এই সারির পশ্চিম পার্শ্ব দিয়ে, উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে, একটি কোণাকুণি রাস্তা ছিল, যা দিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ মাঠের দিকে বের হওয়া যেত। এই রাস্তাটি পাকা ছিল না তবে ইটের ছোলিং ছিল। রাস্তার পশ্চিম পার্শ্ব দিয়ে ব্যারাকের দ্বিতীয় সারিটি ছিল। আর অল্প সংখ্যক ব্যারাকের তৃতীয় সারিটি ছিল তারও পশ্চিমে। এই ব্যারাকগুলির উত্তর-পশ্চিম পার্শ্বেও কিছুটা খালি জায়গা ছিল, যেখানে পুরানা ইটের একটি পাঁজাও ছিল। হেস্টেলের চতুর্দিকে কাঁটা তারের বেড়া ছিল। উত্তর-পশ্চিমের গেট ছিল প্রধান গেট, যা দিয়ে পুলিশরা ঢুকে গোলাগুলি করেছিল, আর পূর্ব-দক্ষিণের গেটটি ছিল ছোট, যা দিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ মাঠের দিকে বের হওয়া যেত।
এছাড়াও পূর্বদিক দিয়ে একটি ছোট্ট প্রাইভেট গেট ছিল, যা দিয়ে আমরা সরাসরি মেডিক্যাল কলেজ এবং হাসপাতালে যাতায়াত করতাম এবং এই গেট দিয়েই গোলাগুলিতে আহত রোগীদেরকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছিল।
উত্তর-পশ্চিম গেটের পার্শ্ব দিয়ে একটি পাকা রাস্তা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও সলিমুল্লাহ হলের ুদিকে গিয়েছিল। বর্তমানেও সে রাস্তাটি আছে বটে, তবে অনেকটা পশ্চিমে বেঁকে গিয়েছে। এই রাস্তার পশ্চিম পার্শ্বে অনেকগুলি ছোট ছোট দোকান ছিল, যার কয়েকটি ছিল খাবার হোটেল বাকিগুলি ছিল লন্ড্রি, মনোহারী ও পান-বিড়ি-সিগারেটের দোকান। এর একটি খাবার হোটেলে এতো সুস্বাদু গরুর ভুনা-গোশত পাক হতো যে আজো তার স্বাদ ভুলতে পারি না। মাত্র আট-আনায় যে গোস্ত-ভাত আমরা তৃপ্তি সহকারে পেটপুরে খেতাম, এখন বিশ টাকায়ও তা পাওয়া যাবে না।
পুরানা হোষ্টেলের পুরা এলাকায়ই এখন বিভিন্ন কন্সট্রাকশন হয়ে গেছে, যেমন মেডিক্যাল আউটডোর, ডিসপেন্সারী, নার্সিং হোষ্টেল, নার্সিং ইনস্টিটিউট, মহিলা স্টুডেন্ট হোষ্টেল এবং বিরাট শহীদ মিনার। শহীদ মিনারের আদ্য অংশটুকু মোটামুটিভাবে ঠিক জায়গায়ই আছে কিন্তু সিঁড়িগুলি জায়গার সংকুলানের জন্য বেশ পশ্চিমে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।
এবার ২১ ফেব্রুয়ারি এবং তার পরবর্তী দিনগুলিতে যেসব লোমহর্ষক দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল, পাঠকগণের অবগতির জন্য, এখানে তা তুলে ধরছি।
২১ ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান এ্যাসেম্বলীর মিটিং ছিল এবং সেই মিটিং-এ বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করার জন্য, সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে, এ্যাসেম্বলীতে প্রতিনিধি পাঠানো হবে-এই উদ্দেশ্যে ঐদিন সমগ্র প্রদেশে ধর্মঘট ও প্রতিবাদ দিবস পালনের আহ্বান করা হয়েছিল। কিন্তু ২০ ফেব্রুয়ারি বিকালেই, আন্দোলনের উত্তপ্ত আবহাওয়া লক্ষ্য করে, সরকার দীর্ঘ এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করেন। এই ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে, কি হবে না, এ সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার জন্য, ২০ ফেব্রুয়ারি রাতেই নওয়াবপুরস্থ আওয়ামী লীগ অফিসে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের এক মিটিং বসে, যেখানে সভাপতিত্ব করেন জনাব আবুল হাশিম। বহু বাক-বিতণ্ডার পর, মেজরিটি ভোটে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। তবে পরের দিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আবারো মিটিং করা হবে বলে আরো একটি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার সিদ্ধান্তটি অনেক নেতাই, বিশেষ করে ছাত্র নেতাগণ, মনে প্রাণে মেনে নিতে পারেননি। তারা ধূমায়িত অসন্তোষ নিয়েই হলে ফিরে আসেন এবং রাত্রেই নিজেদের মধ্যে ঘরোয়া মিটিং করে সিদ্ধান্ত নেন যে, যে কোন মূল্যে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতেই হবে। যে ১১ জন ছাত্রনেতা এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তারা হলেন, হাবিবুর রহমান শেলী, গাজিউল হক, এস·এ· বারী, এ·টি, মুহাম্মদ সুলতান, এম·আর· আখতার মুকুল, জিল্লুর রহমান, আব্দুল মোমিন, কমরুদ্দিন শহুদ, আনোয়ারুল হক খান, আনোয়ার হোসেন এবং মঞ্জুর।
পরের দিন, ২১ ফেব্রুয়ারি, বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এ ব্যাপারে আবারো মিটিং বসে। সেই মিটিং-এ বহু তর্ক-বিতর্কের পর, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এবং আরো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” এই শেস্নাগান দিতে দিতে, ১০ জন করে ছাত্র একসঙ্গে গেটের বাইরে যাবে, যাতে শৃঙ্খলা বজায় থাকে এবং দীর্ঘ সময় ধরে মিছিল চলতে থাকে। এই সিদ্ধান্ত অনুসারে, ১০ জন করে ছাত্র একসঙ্গে শেস্নাগান দিতে দিতে গেটের বাইরে বের হচ্ছিল এবং সঙ্গে সঙ্গে গেটের সম্মুখে দণ্ডায়মান পুলিশরা মিছিলকারীদেরকে পুলিশ ভ্যানে উঠিয়ে, সেন্ট্রাল জেল, লালবাগ থানা অথবা টঙ্গীর দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু এতো করেও পুলিশরা ছাত্রদেরকে দমাতে না পেরে, বেলা ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় (বর্তমানে মেডিক্যালের ইমারজেন্সি বিভাগ) এবং মেডিক্যাল কলেজ ও হোস্টেল এলাকায় টিয়ারগ্যাস ছোঁড়া শুরু করে। আমি তখন মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল এলাকায় ছিলাম এবং টিয়ারগ্যাসের যন্ত্রণায় আমার চোখ দিয়েও দর দর করে পানি ঝরতে ছিল। এমন সময় একজন অভিজ্ঞ ছাত্রনেতা মাইকে প্রচার করলেন যে, “
টিয়ার গ্যাসের প্রচণ্ড আক্রমণে পুলিশ সাময়িকভাবে কৃতকার্য হল। বেলা ১টার মধ্যে সমস্ত ছাত্র ও বাইরের জনতা হুটহাট করে এদিক-ওদিক সরে পড়ল এবং সমস্ত এলাকা কিছুটা স্তব্ধ ও শান্ত আকার ধারণ করল। পুলিশরাও যার যার জায়গায় সরে পড়ল। মনে হল, বাংলাভাষা যেন বাঙ্গালির বুকেই আটকা রয়ে গেল, তা আর কণ্ঠ ভেদ করে বাইরে বের হয়ে আসার পথ খুঁজে পেল না। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে অবস্থার আবার দারুণ পরিবর্তন হল। ছুটছাট জনতা কোথা থেকে একপা, দু’পা করে এসে মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলে জড়ো হল। বাঙালীর বুকে যে বারুদ ছিল, তাকে টিয়ারগ্যাস দিয়ে আর কতক্ষণ দমিয়ে রাখা যায়? দক্ষিণা হাওয়ায় যে মেঘ কিছুটা সরে গিয়েছিল, কিছুক্ষণের মধ্যেই উত্তরে হাওয়ায় আবার তা কাল-বৈশাখীর রূপ ধারণ করল। হোস্টেলের পশ্চিম পার্শ্বেই ছিল পরিষদ ভবন এবং ৩টায় সেখানে ছিল সংসদ-মিটিং। মন্ত্রীগণ এবং এ্যাসেম্বলির সদস্যগণ তখন এ্যাসেম্বলির দিকে যাত্রা শুরু করেছেন। তাদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য রাস্তায় তখন শুধু পুলিশ আর পুলিশ। বেলা আড়াইটার দিকে পরিস্থিতি আবার ভয়ানক আকার ধারণ করল। ছাত্রগণ আবার সংঘবদ্ধ হয়ে পিকেটিং শুরু করল। পুলিশরাও মারমুখো হয়ে ছাত্রদের উপর লাঠিচার্জ করে বসল। এমতাবস্থায় ছাত্র-জনতাও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল।
মেডিক্যাল হোস্টেলের পশ্চিম পাশে খোলা জায়গায় পুরনো ইটের পাঁজা ছিল। ক্ষিপ্ত ছাত্র-জনতা সেগুলি হাতে তুলে নিল এবং পুলিশের উপর ইট-বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। ফলে পাশের রাস্তায় মানুষ ও গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে গেল। আর ঠিক এই সময়, বেলা আড়াইটার দিকে, একজন পুলিশ সার্জেন্টের ইঙ্গিতে, কিছুসংখ্যক রাইফেলধারী পুলিশ অতর্কিতে হোস্টেলের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল এবং সমানে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে লাগল। মিনিটের মধ্যে হোস্টেলের সম্মুখ ভাগটা একটা রণাঙ্গনে পরিণত হল। বোমারু বিমান যেমন বোমা ফেলে চলে যায়, পুলিশরাও তেমনি গোলাগুলির কাজ শেষ করে হুট করে সরে পড়ল। কিন্তু আহতদের বুক-ফাটা ক্রন্দনে মেডিক্যালের আকাশ-বাতাস হল প্রকম্পিত, আর শহীদদের তাজা রক্তে হোস্টেলের সম্মুখভাগ হল রক্তাক্ত। সেদিনের শহীদদের সেই তাজা রক্তে বাংলার মাটিতে বাংলা-ভাষার যে বীজ প্রোথিত হয়েছিল, কালের কপোলতলে, আজ তাই বিরাট মহীরুহে পরিণত হয়েছে।
গোলাগুলির পর যে দু’টি লাশ সেখানে পড়েছিল, তা শহীদ আব্দুস সালাম ও আব্দুল জব্বারের বলে সনাক্ত করা হয়েছিল। একজনের মাথার খুলি একেবারে উড়ে গিয়ে মগজ বের হয়ে গিয়েছিল, আরেকজনের বুকে গুলি লেগেছিল। এই দুটি লাশ ছাড়াও, গেটের অনতিদূরে ড্রেনের মধ্যে, ১১/১২ বৎসরের একটি ছেলের লাশ পড়েছিল, যা অনেকেরই দৃষ্টিগোচর হয়নি এবং ছেলেটি পথচারী ছিল বলে তার পরিচয় জানাও সম্ভব হয়নি। অন্য আহতগণ এদিক -ওদিক পড়েছিলেন এবং হোস্টেলের ভিতরের ছোট্ট গেট্ দিয়ে তাড়াতাড়ি তাদেরকে হাস্পাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয় কিন্তু পরে তাদের মধ্যে থেকেও কয়েকজন মারা যান। শহীদদের মধ্যে যে ৪ জনের নাম বিশেষভাবে জানা গিয়েছিল, তাঁরা হলেন, (১) আব্দুল জব্বার, (২) আব্দুস্ সালাম, (৩) আবুল বরকত এবং (৪) রফিক উদ্দিন। মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রগণ অতন্ত্র প্রহরীর মত অনেক রাত পর্যন্ত এই লাশগুলো হাসপাতালে পাহারা দিয়ে রেখেছিলেন কিন্তু গভীর রাতে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর লোক এসে লাশগুলো ছিনিয়ে নিয়ে যায় এবং আজিমপুর গোরস্থানে গোরস্থ করে।
পরের দিন ২২ ফেব্রুয়ারী, শুক্রবার, শহীদদের গায়েবানা জানাজার প্রোগ্রাম করা হয়েছিল মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলে। আকাশে আকাশে বজ্রাঘাত হলে, সে শব্দ যেমন চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে, পুলিশের গুলিতে ছাত্র-হত্যার খবরও তেমনি সারা শহরে, এমনকি সারা প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ল। অফিস-আদালত, দোকান-পাট, গাড়ি-ঘোড়া সব অটোম্যাটিক বন্ধ হয়ে গেল। চতুর্দিক থেকে অগণিত লোক, পঙ্গপালের মত, মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলে জমায়েত হতে লাগল। ছাত্র-শিক্ষক, উকিল-মোক্তার, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার, কর্মচারী-কেরানী, ব্যবসায়ী-জোতদার, কামার-কুমার, কৃষক-শ্রমিক, কুলি-মজুর, গাড়ীওয়ালা-ঘোড়াওয়ালা, রিক্সাওয়ালা-ভিস্তিওয়ালা-কেউ বাদ রইল না। মওলানা আঙ্গুল হামিদ খান ভাসানী এলেন সবার পরে, বেলা দশটার দিকে। তিনি আসার সঙ্গে সঙ্গে গায়েবানা জানাজা শুরু হল। জানাজা পড়ালেন অন্য এক মওলানা সাহেব কিন্তু মোনাজাত ধরলেন মওলানা ভাসানী নিজে। তাঁর দীর্ঘ মোনাজাতের ভিতর দিয়ে তিনি শুধু শহীদদের আত্মার মাগ্ফেরাতই কামনা করলেন না, বরং অগণিত বাঙ্গালীর অব্যক্ত বুকের ব্যথার কথা তিনি আল্লাহর দরবারে এমন করুণভাবে পেশ করলেন যে, আল্লাহর আরশ যেন কেঁপে উঠ্ল। পরম করুণাময় আল্লাহ্তায়ালা হয়তবা সেদিন জালেমদের বিরুদ্ধে মজলুমদের এই করুণ ফরিয়াদ কবুল করে নিয়েছিলেন, কারণ এর পরবর্তীতে প্রত্যেকটা ঘটনার ভিতর দিয়ে আমরা তার প্রমাণ পেয়েছি।
জানাজার পর শহীদদের রক্তাক্ত জামা-কাপড় সরু বাঁশের লাঠিতে বেঁধে এবং সেগুলি সম্মুখে উঁচু করে ধরে, লাখ-জনতার মিছিল এগিয়ে চল্ল। মিছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের দিকে গিয়ে, রশীদ বিল্ডিং-এর মোড় পেরিয়ে, ইউনিভার্সিটি স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে। কার্জন হলের মোড় ঘুরে, পুরাতন হাইকোর্টের গেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল এবং তখন পর্যন্তও মিছিলের শেষপ্রান্ত মেডিক্যালের গেট পার হয়ে সারেনি। মিছিলে লোকের সংখ্যা কতছিল, তা অবশ্য নির্ণয় করা কঠিন ছিল, তবে এর আগে ঢাকার বুকে এতবড় মিছিল আর কোনদিন হয়নি, কেননা এটাই ছিল ছাত্র-জনতার উপর পুলিশের প্রথম গুলিবর্ষণ।
আমি মিছিলের একেবারে সম্মুখভাগে অবশ্য ছিলাম না কিন্তু কিছুটা পিছনে থেকেও মনের যোশে সর্পিল গতিতে এগিয়ে সম্মুখের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছিলাম এবং প্রায় সম্মুখভাগে পৌঁছে গিয়েছিলাম। এমন সময় মিলিটারীরা হাইকোর্টের মোড় থেকে বিরাট মিছিলের উপর অতর্কিতে ষ্টেইনগানের গুলি ছোঁড়ে। হঠাৎ করে এই আচমকা গুলিতে আমরা এমন দিশেহারা হয়ে পড়িযে-কোন্ দিক থেকে কোন্ দিকে যাই, তার কোন পথ খুঁজে পাই না। কারণ পশ্চিম দিকে রয়েছে হাইকোর্টের উঁচু শিকের বেড়া, পূর্বদিকেও রয়েছে অনুরূপ বেড়া, দক্ষিণ দিকে রয়েছে জন-সমুদ্র, আর উত্তর দিকে রয়েছে মিলিটারীদের স্টেইনগান, এখন আমরা ভাগি কোন্ দিকে? কিন্তু চরম বিপদের সময় মানুষের উপস্থিত বুদ্ধি যে কোথা থেকে কিভাবে মাথায় এসে যায়। তা আগে থেকে চিন্তাই করা যায় না। সেই দারুণ বিপদে কি করে যে আমরা এত উঁচু লোহার শিক্ ডিঙ্গিয়ে, অর্ধেক লোক হাইকোর্টের দিকে, আর অর্ধেক লোক কার্জন হলের দিকে লাফিয়ে পড়লাম, তা আজো ভেবে অবাক হই।
ষ্টেইনগানের নজল একটু উপরের দিকে তাক্ করা ছিল বলে সেদিন আমরা বেঁচে গিয়েছিলাম, নইলে যে ঘন-মিছিলের উপর গুলি ছোঁড়া হয়েছিল, তাতে লাশের উপর লাশ পড়ে সমস্ত হাইকোর্টের রাস্তা সেদিন রক্ত-স্রোতে ভেসে যেত। তবু ঐ সময়ে গুলিতে একজন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছিল। সেদিনকার এই মরণ অভিযানে আমার একান্ত সান্নিধ্যে ছিলেন টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর থানার ডাক্তার মজিবর রহমান।
গুলির ফলে মিছিল আর উত্তর দিকে বা সেক্রেটারীয়েটের দিকে এগুতে পারলনা। ছত্রভঙ্গ জনস্রোত তখন, আষাঢ়ের বাঁধ দেয়া খরস্রোতা নদীর ন্যায় তার গতিপথ পরিবর্তন করে, ভিন্নপথে প্রবাহিত হতে লাগল। একদল রশীদ বিল্ডিং এর মোড় থেকে রেলওয়ে হাসপাতাল ও গুলিস্থান হয়ে নবাবপুরের দিকে ধাবিত হল, আর অন্যদল নাজিমুদ্দিন রোড হয়ে চক্বাজারের দিকে এগিয়ে চল্ল। সেদিন সারাদিন ধরে বিভিন্ন দিক থেকে বিভিন্ন মিছিল বিভিন্ন রাস্তায় বের হয় এবং নানা জায়গায় বিক্ষিপ্ত গোলাগুলি হয়। ফলে বেশ কিছুলোক হতাহত হয়।
২২শে ফেব্রুয়ারী রাতে মেডিক্যাল কলেজ হোষ্টেলে কিছু সংখ্যক নেতৃবৃন্দের এক গোপন বৈঠক বসে। এই বৈঠকে ডাঃ গোলাম মওলা (ভি·পি), ডাঃ বদরুল আলম, ডাঃ মঞ্জুর এবং বাইরের আরো কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে একটি শহীদ মিনার স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। শুধু সিদ্ধান্ত নিয়েই তারা ক্ষান্ত হন না, মেডিক্যাল কলেজের উচ্চ শ্রেণীর ছাত্র, জনাব বদরুল আলমের নক্সা অনুসারে সেই রাতের অন্ধকারেই অমানুষিক পরিশ্রম করে, হোষ্টেলের সেই পুরানা ইট দিয়েই গুলি বর্ষণের স্থানে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করেন।
পরের দিন ২৩শে ফেব্রুয়ারী শনিবার তেমন কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেনি, তবে হরতাল পালিত হয় এবং অফিস-আদালত বন্ধ থাকে। ২৪ ফেব্রুয়ারী রবিবার মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং হোস্টেলে দু’টি বিশেষ ঘটনা ঘটে। মাইকের প্রচার কার্য বন্ধ করে দেয়ার জন্য ঐদিন সকালের দিকেই সেনাবাহিনীর লোক এসে মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং হোষ্টেলের মাইক দু’টি কেড়ে নিয়ে যায় এবং সেই সঙ্গে শহীদ মিনারটিও ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলে। এরপর শুধু সলিমুল্লাহ হলের মাইকটিই বাকি থাকে, যা দিয়ে দিনে-রাতে প্রচার কার্য চলতে থাকে এবং এইটাই ছিল তখন সমস্ত প্রচার কার্যের কেন্দ্রস্থল। এই মাইকের ঘোষণা শোনার জন্য এবং নির্দেশনামা জানার জন্য সকাল-দুপুর-সন্ধ্যায় বিভিন্ন স্থান থেকে দলে দলে লোক এসে হলের সম্মুখের মাঠে ভিড় জমাত। মাইকটি দোতলায় ছিল বলে বেশ সুরক্ষিত অবস্থায় ছিল।
২৬ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার সলিমুল্লাহ হল ঘেরাও হয়ে গেল। ভাগ্যক্রমে ঐ সভায় আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। কেননা আমি ইকবাল হল থেকে মেইন রোড ধরে মেডিক্যাল হোস্টেলের দিকে যাচ্ছিলাম। বেলা তখন প্রায় দশটা। শত শত দর্শকদের মধ্যে আমিও মেইন। রোডে দাঁড়িয়ে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছিলাম। সেনাবাহিনী পুলিশের একটি যৌথ দল হলটি ঘেরাও করে ফেলল। এক দল ইকবাল হলের দিক থেকে এবং অন্যদল মেইন রোড থেকে হলের মেইন গেটের দিকে অগ্রসর হল। এক আর্মি মেজর এই অপারেশনের কমান্ডার ছিলেন এবং হলের প্রভোস্ট সাহেবকেও ডেকে আনা হয়েছিল। অন্ততঃ এক ঘন্টা ধরে সার্চ কার্য চলতে থাকে এবং বহু কাগজপত্র তছনছ করা হয়। শেষে কয়েকজন ছাত্রনেতাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় এবং সেইসঙ্গে হলের মাইকটিও কেড়ে নিয়ে যায়। ফলে আন্দোলন তখনকার মত বন্ধ হয়ে যায় এবং আমরাও যার যার গ্রামের বাড়িতে ফিরে যেতে বাধ্য হই।
আন্দোলন তখনকার মত স্তব্ধ হয়ে গেলেও বাঙ্গালীদের মন থেকে তা মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি। বাঙ্গালীরা এর দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়েছিল ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে, হক-ভাসানীর যুক্তফ্রন্টে একচেটিয়া ভোট দিয়ে এবং মুসলিম লীগের ভরাডুবি ঘটিয়ে। যার ফলে ১৯৫৬ সালে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দিতে পাকিস্তান সংসদ বাধ্য হয় এবং এই আন্দোলনের সূত্র ধরেই ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিতর দিয়ে দেশবাসী স্বাধীনতা লাভ করে।
**************************
ডাঃ (ক্যাপ্টেন) আব্দুল বাছেত
দৈনিক ইত্তেফাক, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০০৮