শহীদ মিনার আজ আমাদের কাছে কোনো সাধারণ মিনার বা স্তম্ভ নয়, মিনারে উঠে কাউকে আহ্বান করার জন্যও নির্মিত হয়নি, অবনত মস্তকে দুঃখ ও ব্যথার স্মারক বাঙালির জীবন চিহ্ন; ভাষার দাবি, বাঁচার দাবি স্বাধীনতার সূত্রপাত, শপথের বেদী, সাহস, বীর্য, মুক্তির মন্ত্র এবং বাঙালি সংস্কৃতি আশা-আকাঙক্ষার প্রতীক। শহীদ মিনারে এলে হ্নদয়তাপের যত কথাগুলো সান্ত্বনা পায়, নতুন ভাবের, শব্দের শিল্পের কবিতার গানের রঙের মাধুর্যের চিরন্তনের স্পর্শ পাই। শহীদ মিনার অন্যায় অত্যাচার দুঃশাসন শোষণ বঞ্চনা নিপীড়ন যন্ত্রণাগুলি লাঞ্ছনা অপমান দুর্বিষহ জীবন সব করাল গ্রাসের হায়েনা হায়ের বিচার এজলাস। এই শহীদ মিনারে কোনো আঘাত এলে, আমাদের হ্নদয় ভারাক্রান্ত হয়, সারা বাংলা যেন সমুদ্র ঝড়ে মুচড়ে পড়ে; শহীদ মিনার প্রাণ যেন প্রাণ বায়ু নির্গত হবার উপক্রম।

ঢাকার মেডিকেল কলেজের প্রবেশ পথের পাশেই এ শহীদমিনার শিরিষ বৃক্ষ ছায়ে শুভ্র মেঘের চাঁদোয়া ঢাকা, এখন সম্মুখে চত্বর রাস্তা বেঁকিয়ে। কেন্দ্রীয় এ শহীদ মিনার এই একই স্থানে সেলাম দিচ্ছে তা নয়, এর চারাগাছ নিয়ে গেছে সারাদেশে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে শিক্ষা সংস্কৃতি প্রগতির আলো সেইখানেই শহীদ মিনার প্রশিক্ষণ দিতে খাড়া রয়েছে, কিন্তু কোনো মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলেও সেখানে নয়, এ আলো সেখানে হয়তো নাজায়েজ। শহীদ মিনার চারিয়েছে কোনো ভূমিতে নয়, বাঙালির বুকের ওপর। শহীদ মিনার উপড়ে নিতে গেলে রক্ত ঝরে।

এই যে শহীদ মিনার তাই বা এমন হল কেন? কেন হল সে কথা সকলেই জানে, কিন্তু প্রথমে কীভাবে হল সে কথা একটু বলতে চাই। শহীদ মিনার তো কারো ইচ্ছায় বা উদ্দেশ্যের তাড়নায় সৃষ্ট নয়, এটা হল বাঙালির শোক-চেতনার প্রতিনিধি। এ শহীদ মিনার একদিনে হয়নি, কোনো প্ল্যান পরিকল্পনা কিংবা আবেগের বশে হয়নি, দুঃখ আর বেদনা মিশ্রিত করে বহুবার বহু ঘা খেয়ে খেয়ে যা হবার তা না হয়ে জগাখিচুড়ি, তবু বুকের নিধি। এর পেছনে বহু সংগ্রাম গেছে, গড়তে গিয়ে বার বার করাল আঘাতে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে, এখন যা আছে তার ওপর যে আবার হবে না তাও কেউ হলফ করে বলতে পারে না। কেন্দ্রীয় বৃক্ষে আঘাত না হলেও বিভিন্ন অঞ্চলে চারাগাছ ‘উপড়ে’ ফেলার সংবাদ এখন মাঝে মাঝে পত্রিকার পৃষ্ঠায় পাওয়া যায়। তাই বলতে হয় এখনও আমরা শহীদ মিনার সম্পূর্ণ করতে পারিনি।

শহীদ মিনার গড়ার ইতিহাস খুবই করুণ। প্রেক্ষাপট তো জানাই আছে- জিন্নার উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে নো নো উচ্চারণ, জিন্না সেই যে গেছে আর ফেরেনি, খাজা নাজিমউদ্দিন হল পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল জিন্নার বদলে, তখনও পাকিস্তানে প্রেসিডেন্ট প্রথা চালু হয়নি। জিন্নার রোগে ধরেছিল নাজিমুদ্দিনকে, ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি তিনি ঢাকা সফরে এলেন এবং ঘোষণা দিলেন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি ধূলিকণাকে তিনি ইসলাম দিয়ে ভিজিয়ে দেবেন আর উর্দু দিয়ে মুড়িয়ে দেবেন? তার এ প্রলাপ জিন্নারই পুনরাবৃত্তি মাত্র, অর্থাৎ কায়েদে আজম যা বলে গেছেন সেটা তার কাছে কুরআন-হাদিস। ঘোষণার সাথে সাথে ঢাকার সকল মহলে ভীষণ প্রতিক্রিয়া হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সরগরম, রাষ্ট্রভাষা বাংলা দাবির সংগ্রাম কমিটি আন্দোলনের প্রস্তুতি গ্রহণ করল। ৪ এবং ১১ ফেব্রুয়ারি প্রতিবাদ সভা এবং হরতাল ঘোষণা করা হল। প্রতিবাদে মুখর এবং হরতালও সম্পূর্ণরূপে সফল। এর ফলশ্রুতিতে যে সিদ্ধান্ত হল তাতে ২১ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বাত্মক হরতাল এবং মিছিলের কর্মসূচি নেওয়া হল, সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে ভাষা আন্দোলনের মূল লক্ষ্য বিবৃত করে ‘ভাষা আন্দোলন কি এবং কেন’ এই নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করা হল, তাতে ১২টি এজেন্ডা বা বিষয়সূচি দেওয়া হল।

২১ তারিখ সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়, তখনকার বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা হচ্ছে বর্তমান মেডিকেল কলেজের দক্ষিণ অংশ, উত্তরাংশের কিছু ভবন নিয়ে মেডিকেল, পুলিশ গিজ গিজ সমগ্র মেডিকেল চত্বরসহ, তবু ছাত্ররা আন্দোলনের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে সংঘবদ্ধ হয়ে মিছিল করতে প্র‘ত হল। অবশ্য ২০ ফেব্রুয়ারি পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে ‘মিছিল শেস্নাগান নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে’, কিন্তু ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করল এবং শেস্নাগানে গগনবিদারি আওয়াজ তুলল ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, নাজিমুদ্দিন গদি ছাড়’। এই সময় পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন চলছিল, ছাত্রদের ইচ্ছা অধিবেশন পর্যন্ত মিছিল নিয়ে যাবে। তখন প্রাদেশিক পরিষদ ভবনটি ছিল বর্তমান জগন্নাথ হলের দক্ষিণ অংশ। অধিবেশনে একমাত্র জনপ্রতিনিধি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে ভাষা রাষ্ট্র ভাষা করার পক্ষে আলোচনা উত্থাপন করেন, পরে তা বাতিল করা হয়। মুখ্যমন্ত্রী, তখন প্রধানমন্ত্রী বলা হত, নুরুল আমিন ছাত্রদের মিছিল ও ১৪৪ ধারা ভঙ্গ, তাছাড়াও অধিবেশনের দিকে এগিয়ে আসছে শুনে তৎক্ষণাৎ মিছিলের ওপর গুলি চালাবার নির্দেশ দিলেন। বেলা অপরাহ্ন একটা হবে আন্দাজ গলিতে মেডিকেলের সামনে বর্তমান শহীদ মিনারের স্থলে রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়লেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্র আবুল বরকত। মিছিল অধিবেশন মুখো হতে না পেরে মেডিকেল থেকে হাইকোর্ট-কার্জন হল অভিমুখে যাত্রা করল, সেখানে গুলি করা হলে রাস্তায় অনেকে নিহত হয়েছিল; অসংখ্য লাশ, কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার যে সেখান থেকে একটি লাশও খুঁজে পাওয়া যায়নি, গুলিতে শুয়ে যাওয়া মাত্রই ব্রিটিশের শেখানো পদ্ধতি পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে পেট্রোল ঢেলে তা সব পুড়ে ছাই করে ফেলল। এত লাশ ফেললেও পুলিশ কিছুতে উত্তেজনা থামাতে পারেনি, কোথা থেকে এসে এদিকে সেদিকে খণ্ড খণ্ড মিছিল করতে লাগল, মনে হল যেন বলতে লাগল, মারো, যত ইচ্ছা মার, আমরা মরতে এসেছি।

সেদিন সেভাবে কাটল, ২২ ফেব্রুয়ারি আবার মিছিল; এবার নবাবপুর রোড, বংশাল আর রথখোলার মোড়, অবশ্য ঢাকা তখন গুলিস্তান থেকে দক্ষিণে ছিল, উত্তরে ডোবা খাল, খোলা মাঠ। প্রথম দিনের শহীদ বরকত ছাড়াও রফিক, জব্বার, সালাউদ্দিন, সালাম এবং নাম না জানা আরো তিন চার জন কিশোর। ২২ ফেব্রুয়ারি মিছিলেও একই ভাবে গুলি চলে, সেদিনের শহীদ শফিউর রহমান, আবদুল আওয়াল এবং আরো নাম না জানা তিনজন। শহীদ বরকত আর শফিউর রহমানের লাশ ছাড়া আর কারো লাশের হদিস পাওয়া যায়নি। পুলিশ এ দুজনের লাশের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল, নানা বাসায় হলে হামলা পড়েছিল, তবু কড়া নিরাপত্তার ভেতর রাতের আঁধারে তাদের কবর দেওয়া হয়েছিল রক্তাক্ত অবস্থায় আজিমপুরে। কেউ বোঝেনি, মুর্দাফরাসকে পুলিশ বার বার জেরা করেছিল, তারাও পুলিশকে কোনো সহায়তা করেনি। তাদের এ সহযোগিতার জন্য দুজন শহীদের সামান্য চিহ্ন এবং মাজার আমরা পেয়েছি, আমি মনে করি একুশের ‘ভাষা সৈনিকদের’ বাখানি এখন না করে সে মুর্দাফরাসদের খুঁজে বের করা উচিত।

অন্যদের লাশ না পাওয়া গেলেও সেদিনের আকাশ কাঁপানো শেস্নাগান ছিল ‘শহীদ স্মৃতি অমর হোক’। তাঁদের অমর করে রাখার জন্য চাই প্রতীক, কোনো একটা এমন প্রতীক যা চিরদিন বাংলার বুকে টিকে থাকবে এবং যাকে বুকে নিয়ে বাঙালি বেঁচে থাকবে, বাংলা ভাষা বেঁচে থাকবে, বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে বলতে পারে মাতৃভাষা-মাতৃভূমির জন্য আমরা অকাতরে জীবন উৎসর্গ করতে পারি। আর প্রতিবছর এমন দিনে আমরা উজ্জীবিত হয়ে শহীদদের স্মরণ করে শ্রদ্ধা জানাতে পারি। এর জন্য মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের ভূমিকা ছিল অগ্রণী, তাদের চিত্তে উদয় হয়েছিল তাদেরই কলেজ প্রাঙ্গণে বরকতের রক্ত যেখানে রয়েছে ঠিক সেখানে, তখন সেখানে ছিল মেডিকেলে ছাত্রদের ছাত্রাবাস, একটি স্মৃতিস্তম্ভ করে ফেলতেই হবে, শহীদ মিনার গড়তেই হবে। ২৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার আঁধারে ইট সিমেন্ট জোগাড় করে সকলের অজান্তে নিজেদের মনের সমস্ত অনুভূতি ঢেলে রাত দুটোর ভেতর একটি মিনার গড়ে ফেলল।

পরদিন ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোতে সকলে দেখে পাকিস্তানকে চূর্ণ করতে এ মিনারের উদ্যত হয়, একি আকাশকে শাসন করছে। সকালবেলাতে নাজিমুদ্দিন সে কথা জেনে গেলেন করাচিতে বসে, নুরুল আমিন ধড়ফড়াতে লাগলেন বর্ধমান হাউসে, যা বর্তমান বাংলা একাডেমী, সব কুচক্রী আর্তচিৎকার দিতে লাগলেন, হায় সর্বনাশ, যেমন করে পারো এ অগ্নিশিখা ভাঙ্গো, হায় নাজিম, অগ্নিশিখা ভাঙ্গা যায় না, তার ভেতরে আছে ভিসুবিয়াসের অগ্নি উত্তাপ।

ব্যাপার হল, ছোট এ মিনার, সাঈদ হায়দারের নকশায় এবং বদরুল আলমের রেখায় আকীর্ণ, অতি উজ্জ্বল স্বপ্নের মতো ২৪ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি এ মিনার ছাত্রদের বুকের মাঝখানে সুদৃঢ় অবস্থানে টিকে ছিল, কিন্তু না, আর পারল না; ২৪ ফেব্রুয়ারি ঠিক বারোটা কুড়ি মিনিটে নাজিম-নুরুলের হিংস্র হায়েনা সশস্ত্র বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল এ তাজা প্রাণ ছোট মিনারের ওপর, একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল মুহূর্তে, এমন কি একটুকরা ইটও তারা রেখে গেল না, কিন্তু তাতে কী? শহীদ মিনার তো পাঁচদিন রাজত্ব করল বাংলার অধীশ্বর হয়ে, তার দূত ছড়িয়ে গেল এ সময় বাংলার প্রতি নগর গঞ্জ গ্রামে সবখানে, শহীদ মিনারের অস্তিত্ব রইল না বটে, কিন্তু বাতাসে তো মিশে রইল তার গৌরব, অমলিন স্মৃতি জেগে রইল। এক কবি তখন লিখলেন,


স্মৃতির মিনার ভেঙ্গেছো তোমরা
আমরা তো আছি চার কোটি পরিবার
সকলের মনে জেগে আছে সে মিনার।

পুলিশ সারাক্ষণ সে এলাকায় পাহারা থাকত আর কোনো মিনার গড়ে উঠে নাকি, না উঠতে পারেনি ১৯৫৭ সাল অবধি। অথচ মাঝখানে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন হয়ে গেল, পাকিস্তানের ভরাডুবি হল, নুরুল আমিনকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হল, তবু তো মিনার ওঠে না, সকলেই বলে মিনারের কী হল? মিনারের ওপর ৯২ক ধারা, উঠতে দেবে না। অথচ যুক্তফ্রন্টে একুশ দফার দাবি, একুশের আন্দোলন থেকে সৃষ্ট এ যুক্তফ্রন্ট, তার অন্যতম দফা হচ্ছে শহীদ মিনার গড়া, তারা যখন রাস্তায় আন্দোলনে ছিলেন তখন মুখ খুলে দাবি করলেও এখন দায়িত্ব পেয়ে দেখলেন বাধা কত, কেন্দ্রীয় প্রশাসন তো আছেই তবু তা বাস্তবায়নের ওয়াদা পূরণ করতেই হবে, দায়িত্ব দেওয়া হল তৎকালীন চীফ ইঞ্জিনিয়ার এম,এ জব্বারের ওপর, অবশ্য সেটা যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর পরই ১৯৫৬ সালে। সেই সময় শিল্পী হামিদুর রহমান শিল্পকলায় ডিগ্রি নিয়ে লন্ডন থেকে ফিরে এসেছেন দেশে, তাকে চীফ ইঞ্জিনিয়ার সাহেব নকশা করার জন্য অনুরোধ করলেন। হামিদুর রহমানের সেই নকশাকে জয়নুল আবেদীন এবং আন্তর্জাতিক বিখ্যাত স্থপতি ডক্সিয়াডেস অনুমোদন করলেন। হামিদুর রহমানের মূল নকশার মটিভ আর কৌশল ছিল বর্তমানের রূপের চাইতে আলাদা। তার বর্ণনা মোটামুটি এরকম, বর্তমানের মতো চারটি স্তম্ভ কিন্তু তাতে বতর্মানের মতো লোহার শিক পোরা নয়। স্তম্ভগুলোর ভেতরে থাকবে অজস্র চোখ, লেমন হলুদ আর গাঢ় নীলের স্টেইন্ট গস্নাসের তৈরি হবে এসব চোখ। মিনার যেখানে ঝুঁকে পড়ে বাংলা ভাষাকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে সেই প্রশস্ত জায়গায় থাকবে মার্বেল পাথরের চত্বর। এই চত্বরে চোখের ছবিতে রঙিন আলোর দৃষ্টিপাত সূর্যের আলোতে খেলা করবে, নানা বর্ণালী আভা তাতে ছড়িয়ে যাবে। আর পুরো মিনার এলাকা জুড়ে থাকবে রেলিং-এ ঘেরা। রেলিং-এ থাকবে বাংলা মায়ের দুঃখিনি সমস্ত বর্ণমালা, যেন দেখে বুঝতে পারে শহীদ মিনার তাদের প্রতি শ্রদ্ধাবনত। তারপর তার গোড়াতে মোজাইক পাথরে লেখা থাকবে-

আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি?

যে প্রশস্ত জায়গাটি মিনারের সামনে পড়ে থাকবে তাতে লাল মার্বেলের তৈরি অনেক রক্ত মাখা পদছাপ থাকবে। এই মিনারের পাশে থাকবে একটা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পাঠাগার আর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের গ্রন্থাবলী। সেই পাঠাগারের দেওয়ালে ফ্রেসকো অথবা তৈলচিত্র শোভিত থাকবে। এ সবের সামনে থাকবে একটা ঝর্ণা, একটা চোখের ভেতর থেকে সেই ঝর্ণাতে অবিরত পানি ঝরবে, অশ্রু সে পানি। সে অশ্রু একটা জলাশয়ে জমা থাকবে, যেন মহাকাশ বা মহাসাগর এখানে আবদ্ধ।

এই মিনারের পাশে আবার একটা মিনারের মতো বেদী থাকবে, যাতে জলাশয় হতে ঢেউ-এর প্রতিক্রিয়া অনুভূত হয়। একটা বিশাল এলাকা জুড়ে শহীদ মিনারের গোটা কমপ্লেক্সের ছড়ানো বাগান আর তাজমহলের পথের মতো করা ঝাউ গাছ। মিনার থেকে স্টেইন্ট গস্নাসের চোখ বেয়ে যেসব বর্ণালী সৃষ্টি হবে তাতে কাল্পনিক ঘড়ি আর সময় গণনার সুযোগ থাকবে। একজন শিল্পীমনের কাছে বিভিন্ন রং ছড়ানোরর জন্য বিভিন্ন সময় গোণা হবে, যেমন সকাল আটটায় বেগুনি, দুপুরে নীল, সন্ধ্যায় কমলা ইত্যাদি।

শিল্পীর নকশা অনুসারে ১৯৫৭ সালের নভেম্বর মাসে শহীদ মিনারের নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং খুব দ্রুত ১৯৫৮ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখে তিন স্তম্ভ, মঞ্চ এবং চত্বরের খানিকটা তৈরি হয়ে যায়, যার ভেতর আবার ভাষা আন্দোলনের এক হাজার বর্গফুটের মতো লম্বা একটি ম্যুরাল শিল্পী মিনারের পাশে কক্ষে থাকেন। কিন্তু এই অপূর্ব সম্পদ ১৯৭১ সালে বিশ্বঘৃণ্য বর্বর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ধ্বংস করে ২৫ মার্চ কাল রাতেই, সম্পূর্ণ শহীদ মিনার গুড়িয়ে দেয় এক সাথে। সেখানে আরও অনেক বিশ্বখ্যাত সম্পদ ছিল, ‘শিল্পী নাভেরা আহমদের তিন অমূল্য ভাষকর্য অপূর্বভাবে ন্যস্ত ছিল, সেগুলোও নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে।

স্বাধীনতার পর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার নতুন করে সেই স্বপ্নের শহীদ মিনার পুনঃêিনর্মাণের দায়িত্ব গ্রহণ করে, শিল্পী হামিদুর রহমানের মূল পরিকল্পনাকে সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত করার জন্য বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দেন, এবং এতে দৃঢ় শপথও নেওয়া হয়েছিল। অবশ্য এর জন্য দেশের বরণ্য শিল্পীরা আরো নানা নকশা সংযোজন করে জমা দিয়েছিলেন। ১৯৭৩ সালের ৫ মে পূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয় যে স্থপতি এম,এ জাফর মূল পরিকল্পনার বিষয়ব‘ পরিশীলিত করে শহীদ মিনারের বিরাট শিল্প সৌন্দর্য সৃষ্টি করবেন যা জাতি চিরদিন মুগ্ধ হয়ে দেখবে। তা ৭ নভেম্বর মন্ত্রণালয়ে পেশ করা হয়। তারপর কী কারণে যে ফাইল বন্দি হয়ে যায়, আজ পর্যন্ত তার কোনো হদিস আমরা পাইনি। ইচ্ছা করলে যে কেউ এ নিয়ে গবেষণা করতে পারেন।

ইতিমধ্যে ধ্বংসকৃত শহীদ মিনারকে ১৯৭৩ সালের একুশের আগে সিএন্ডবি আগের মতো তাড়াহুড়া করে নির্মাণ করে ফেলে। জোড়াতালি দেওয়া সেই শহীদ মিনার মোটেই আগের সে চেহারা পায় না, কিম্ভূতকিমাকার একটা রূপ নিয়ে সিএন্ডবি’র গুণ গাইছে। সেই গোজামিলকে এর সঙ্গে সরকার জায়েজ করার জন্য মূল মঞ্চ ও স্তম্ভগুলোকে ঠিক রেখে সামনের তিন পাশের চত্বরের বিস্তৃতি আর শহীদ মিনারের সামনের রাস্তাটি ঘুরিয়ে দেয়। বর্তমানের শহীদ মিনার যে আকার ধারণ করেছে তা বলতে গেলে গজকচ্ছপ ধরনের, এর না আছে ঐতিহ্য রক্ষা কৌশল, না আছে দেশজ স্থাপত্য শিল্পকলার কোনো নিদর্শন। শহীদ মিনার যেখানে সারাদেশের প্রাণপ্রিয় স্থাপত্য অনুভূতির দাবি রাখে তাজমহলের আর পিরামিডের যে বিপুল অহংকার এবং স্থায়ী অবলম্বন তার চাইতে কম নয়। বাঙালি বড়ই মন্দভাগ্য জাতি, তার আশা-আকাঙক্ষা কখনও পূর্ণ হবার নয়, স্বাধীনতা যেমন গোজামিল, সংবিধান ভাংচুর আর শহীদ মিনার এর ভালো আর কী হতে পারে?

বহু রক্তপাতের বদলে স্বাধীনতা, ভাষার দাবি, শহীদ মিনার, অথচ যার জন্য ঢাকার বুকে কিংবা সারাদেশে যে রক্তজোয়ার আত্মত্যাগ তার কোনো মূল্য কিংবা সার্থকতা আমরা সৃষ্টি করতে পারিনি। অথচ দেখুন, খুনি নাজিমুদ্দিনের কবর কী আকাশচুম্বী কারুকার্যে নির্মিত, আবার তা শহীদ মিনারের পার্শ্ববর্তী, আরও যারা খুনি তাদেরও কবর তেমনি। ভাগ্যের কি পরিহাস!


**************************
শামসুল আলম সাঈদ
দৈনিক ইত্তেফাক, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০০৮