ভাষা আন্দোলনের রাজনৈতিক মাত্রার যতটা বিস্তার ঘটেছে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক দিকের ততটা প্রসার ঘটেনি। এমনকি বাংলা ভাষা চর্চার মান নিয়েও ইদানীং প্রশ্ন উঠছে। নির্ভুল বাংলা লিখতে সক্ষম লেখক-সাংবাদিক খুঁজে পেতে এখন বেশ কষ্ট হচ্ছে। ভাষা আন্দোলনকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন একদিকে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদকে অন্যদিকে শ্রমিক শ্রেণীর আন্তর্জাতিকতাকে দূরে হঠিয়ে নতুন জাতীয়তা ও একটি আধুনিক জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বিস্ময়কর সাফল্যের স্বাক্ষর রাখার পরও এমন অবনতি সহজে গ্রহণীয় হতে পারে না।

ভাষা আন্দোলনের সোপান বেয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও এর শাসন ক্ষমতায় যখনই যারা এসেছেন তারা সমাজের অধিপতি শ্রেণীর ভাষাই ব্যবহার করতে অধিকতর স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছেন। এ কারণে সরকারী কাজ-কর্মে বাংলা ব্যবহারের চাপ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘকাল যাবৎ বাংলার চাইতে ইংরেজী ভাষা ব্যবহার করার ঝোঁক বেশি লক্ষ করা গেছে। এখনও সমাজের অধিপতি শ্রেণী তার উত্তর পুরুষদের বিপুল অর্থ ব্যয় করে ইংরেজী মাধ্যমে লেখা-পড়া শিখিয়ে যাচ্ছেন। গ্লোবাল মাদার টাং হিসেবে ইংরেজী শেখার দরকার আছে। রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক, কূটনৈতিক কারণ ছাড়াও বিদেশে গিয়ে কাজ, অধ্যয়ন ও গবেষণা করার জন্য একটি নয়, একাধিক বিদেশী ভাষা শেখার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়েছে মাতৃভাষা বাংলা শেখা ও শেখানো নিয়ে। প্রাইমারী থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পড়ানোর বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা চালু থাকলেও অংক, ইংরেজীর মতো বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পাঠদানের জন্যও অভিজ্ঞ শিক্ষকের অভাব রয়েছে।

একথা অনস্বীকার্য যে, বাংলা ভাষার উপর সত্যিকারের দখল অর্জন করতে হলে সংস্কৃত, আরবি, ফারসি এমনকি ইংরেজী ভাষারও জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। কারণ, এসব ভাষা গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে। এজন্য উপরোক্ত ভাষাসমূহের উপর স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের ভালো দখল না থাকলে বাংলা ভাষার শব্দসম্ভার সম্পর্কে, বানান রীতি ও ব্যাকরণ সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সম্যক ধারণা দেয়া কিভাবে সম্ভব? এই সময়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংস্কৃত ভাষায় পন্ডিত ও আরবি-ফারসি ভাষায় বিজ্ঞ মৌলভির অভাব প্রকট।

ভাষা আন্দোলনের পর অর্ধ শতাব্দী অতিক্রান্ত হয়েছে। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের বয়সও সাঁইত্রিশ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। কিন্তু বাংলা ভাষার নিজস্ব ব্যাকরণ পুনর্গঠন করার কোন উদ্যোগ আজো গ্রহণ করা হয়নি। বানানের ক্ষেত্রে যা চলছে তাকে স্বেচ্ছাচারিতা বললেও কম বলা হয়। মহল বিশেষ বানানের প্রমিত রূপ হিসেবে প্রতিবেশী দেশের গোষ্ঠি বিশেষের বানান রীতি এখানে চালু করার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের সন্ধি, সমাস, কারক, বিভক্তি ইত্যাদি পড়ানো হলেও যারা পড়াচ্ছেন তারা এ বিষয়ে কতোটা অভিজ্ঞ তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বাংলা ভাষার এসব বিষয় মূলত সংস্কৃত ভাষার ব্যাকরণের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। সংস্কৃত ভাষার ব্যাকরণ না জানলে বাংলা ভাষার এসব বিষয়ে ঠিকমতো জ্ঞানদান করা কঠিন। সংস্কৃত থেকে আগত বাংলা ভাষায় ব্যবহ্নত শব্দের বুৎপত্তি জানার জন্যও সংস্কৃত ভাষার জ্ঞান অপরিহার্য। অন্যদিকে বাংলা ভাষায় তিন থেকে চার হাজার শব্দ এসেছে আরবি, ফারসি, উর্দু, ইংরেজী ইত্যাদি ভাষার শব্দভান্ডার থেকে। এসব বিদেশী শব্দ সম্পর্কেও সম্যক ধারণা দেবার যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের সত্যিকার অর্থেই অভাব রয়েছে আমাদের স্কুল-কলেজে। এজন্যই ভালো বাংলা জানা লোক খুঁজে পেতে কষ্ঠ হচ্ছে।

বাংলা ভাষার জ্ঞান জীবিকা অর্জনে যথেষ্ট ইংরেজির মতো সহায়ক নয় বলে উচ্চবিত্তদের দেখাদেখি এখন নিম্নবিত্তরাও কষ্ট স্বীকার করে সন্তান-সন্ততিদের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াতে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এদেরকে দোষারোপ করে লাভ নেই। এরা হয়তো এখনও শিক্ষাকে বিত্তবান শ্রেণীর বিশেষ অধিকার হিসেবেই দেখতে অভ্যস্ত। তবে যারা সত্যিকার জ্ঞানী-গুণী তারা স্বীকার করবেন যে, শিক্ষার মাধ্যমের উপর শিক্ষার মান কখনোই নির্ভর করে না। শিক্ষার মান নির্ভর করে জ্ঞান অর্জনের মানের উপর। এ মান তখনই বৃদ্ধি পায় যখন জ্ঞানের তৃষ্ণা মাতৃভাষায় মেটানোর সুযোগ থাকে। ইংরেজ, ফরাসী, জার্মান, রাশিয়ান, চাইনিজ, জাপানিজ প্রমুখ উন্নত ও সভ্য জাতিসমূহ এ কারণেই মাতৃভাষায় পারদর্শী হয়ে অন্য ভাষা শিখেছে। কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবন থেকেও আমরা এ ব্যাপারে শিক্ষা নিতে পারি।

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিবৃত্তের দিকে তাকিয়ে একথা নিদ্বির্ধায় বলা যায় যে, কৃষক-প্রজার স্বার্থ রক্ষার আন্দোলন জোরদার হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে অনেক আগেই এ দেশ থেকে জমিদারী-মহাজনী ব্যবস্থার উচ্ছেদ হয়েছে। এ কারণে এক সময়ের অধিপতি শ্রেণী হিসেবে জমিদার, মহাজন ও তাদের স্নেহধন্যরা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় এবং সমাজ জীবনে যে গুরুত্ব ও প্রাধান্য পেতেন তাদের সে গুরুত্ব ও প্রাধান্য আজ আর তেমন অবশিষ্ট নেই।

আমাদের লেখক-সাহিত্যিকদের বৃহত্তর অংশটি এই স্বাধীন বাংলাদেশকে কৃষক-প্রজার বাংলাদেশ, মেহনতি জনতার বাংলাদেশ, ডাল-ভাতের বাংলাদেশ হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং তারা নিজেদের যা আছে তাই নিয়েই গর্বিত। এই পদ্মা-মেঘনা-যমুনা, রূপসা-সুরমার অবিরাম ভাঙ্গা-গড়া, বঙ্গোপসাগরের বুক থেকে উঠে আসা বিধ্বংসী ঝড়-ঝঞ্ঝার সঙ্গে বোঝাপড়া এবং লড়াই করে বেঁচে থাকা মানুষের সুখ-দুঃখের জীবন, তাদের স্বপ্ন, আশা ও ভালবাসার কথা আপন সৃজনী ক্ষমতায় তারা রূপ দিয়ে চলেছেন। অন্যের অনুকরণে পারঙ্গম না হয়ে নিজের মুখের ভাষাকে সাহিত্যের ভাষা করে তোলার ক্ষেত্রে তাদের সাহস ও স্বকীয়তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। ভাটিয়ালি গানের ‘নাও বাইয়া’ ও ‘ঘাটে লাগাইয়া’র বদলে ‘নৌকা বেয়ে’ ও ‘ঘাটে লাগিয়ে’ বলার হাস্যকর চেষ্টা চালাবার মতো হীনমন্যতায় তারা ভুগতে যাবেন কোন দুঃখে! কবি শামসুর রাহমান, কবি আল মাহমুদ, কথাশিল্পী শওকত ওসমান, কবি হাসান হাফিজুর রহমান, কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, কবি ও কথাশিল্পী সৈয়দ শামসুল হক, কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক, কবি ও কথাশিল্পী আবুবকর সিদ্দিক, জনপ্রিয় কথাশিল্পী হুমায়ুন আহমেদ প্রমুখের নাম এ প্রসঙ্গে উল্লেখই যথেষ্ট।

ভাষা আন্দোলনের আবেগকে শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশে যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে মাতৃভাষা পড়তে ও লিখতে সক্ষম জনসংখ্যার শতকরা হার অনেক আগেই পঞ্চাশ অতিক্রম করে যেতো। এখনও এ আবেগকে কাজে লাগাবার সুযোগ রয়েছে। যদিও উৎসব এবং আনুষ্ঠানিকতার দিকে আমাদের ঝোঁক বেশি। সরকারী দিক-নির্দেশনা এ পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে সহজেই।

জনসংখ্যার যে অংশটি বিদ্যায়তনী শিক্ষা লাভের সুযোগ পাচ্ছে সেই ভাগ্যবান অংশটিও কিন্তু বাংলা-ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ ইতিহাসের সঙ্গে সম্যকভাবে পরিচিত হবার সুযোগ পাচ্ছে না। সবেধন নীলমণি ‘চর্যাপদ’-ই হচ্ছে প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের একমাত্র উদাহরণ। মধ্যযুগের সাহিত্যকীর্তি হচ্ছে হাতে লেখা পুঁথি। যা ‘কীটনাশক ওষুধের দ্বারা সংরক্ষণের চেষ্টা যত প্রবল, তা অধ্যয়ন এবং অনুশীলনের চেষ্টা তত প্রবল নয়।’ আর আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তো হিন্দু কবি-সাহিত্যিকদের উজ্জ্বল দীপ্তির কাছে মুসলিম কবি-সাহিত্যিকগণ অনেকটা নিষ্প্রভ। তারপরও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচনায় খ্যাতিমান গবেষক-সমালোচকরা সবসময় তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে উদার ও নিরপেক্ষ রাখতে পারেননি। একশ্রেণীর হিন্দু গবেষক মুসলমান লেখকদের রচনাকে করেছেন অবজ্ঞা। কারণ, তাদের রচনায় তারা পেয়েছেন ‘পিঁয়াজ-রসুনের উৎকট গন্ধ’। সম্ভবত এ গন্ধের কারণেই তারা দোভাষী পুঁথি স্পর্শ না করেই তাকে নানা দোষে দুষ্ট বলে প্রচার করেছেন। আর আমরা তাদের মনের মুকুরে মুসলমান সাহিত্যিকদের প্রতিবিম্ব দেখে অনেক সময় ‘সংকোচে ম্রিয়মাণ’ হয়েছি। যে সাহিত্যের পরিচয় জানার সুযোগ ছিল না, শ্রেণীকক্ষে শিক্ষকদের মুখে তারই সমালোচনা আমাদেরকে শুনতে হয়েছে।

মধ্যযুগের লেখক-সাহিত্যিকদের দুর্ভাগ্য যে, তাদের রচনা পড়ার ভিত্তিতে পাঠকমত বা জনমত তৈরী হতে পারেনি। এ জন্য ভাষা আন্দোলনের পর আমাদের উচিত ছিল মধ্যযুগের পুঁথিগুলো গ্রন্থাকারে মুদ্রিত করা। সেই সঙ্গে বিদেশী গ্রন্থাগারে রক্ষিত আমাদের লেখকদের দুষ্পাপ্য রচনাগুলো এনে মুদ্রণের ব্যবস্থা করা। সাহিত্যের সমৃদ্ধ ইতিহাস তৈরীর স্বার্থে এ কাজটি করা জরুরী ছিল, এখনও রয়েছে। ভাষা শহীদদের স্মৃতিবাহী জাতীয় প্রতিষ্ঠান ‘বাংলা একাডেমী’ এ মহতী কাজের পরিকল্পনা নিলে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের পরিচয় আরো বিস্তৃত ও গভীর হতো। সেই সঙ্গে সংরক্ষণের কাজটিও সুন্দরভাবে সম্পন্ন হতো।

আমরা যে সামনে এগুতে পারছি না তার জন্য অনেক কিছুর অভাব কাজ করছে। বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধ ইতিহাসের অভাবও আমাদের পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ। আজ সময় এসেছে ভাষা আন্দোলনের আবেগকে কাজে লাগিয়ে এদেশের কবি, লেখক, সাহিত্যিকদের জন্য এমন একটা আর্থ-রাজনৈতিক অনুকূল ও স্থতিশীল অবস্থা তৈরি করা, যে পরিবেশে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতি উৎকর্ষের দিক দিয়ে শিখরস্পর্শী হতে পারে।

**************************
সৈয়দ তোশারফ আলী
দৈনিক ইত্তেফাক, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০০৮