পরিচিতি

ভাষাকন্যা হালিমা খাতুন বাংলা ইংরেজি ও শিক্ষাশাস্ত্রে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব নর্দান কলোরাডো থেকে ডক্টরেট ইন এডুকেশন লাভ করেন ১৯৬৮ সালে। ইংরেজিতে এমএ পড়ার সময় ৫২’র ভাষা আন্দোলনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫৩ সালে খুলনায় অধ্যাপনার শুরু। ১৯৬১ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষনা ইনস্টিটিউটে কর্মরত ছিলেন। প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের চেয়ারম্যান ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। নেপালের ইকোয়াল এক্সেস অব উইমেন প্রকল্পে কয়েক বছর কাজ করেছেন। শিশুদের জন্য বাংলা ও ইংরেজিতে গল্প ছাড়া নাটক ও কবিতা লেখেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২৫ এর অধিক। তিনি বাংলা ১৪০৫ সালে শিশু একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি

’৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে এমএতে ভর্তি হই। এখানে এসেও পার্টির কাজে যুক্ত হয়েছি। তখন মণি সিংহকে চিনি না। মনে আছে, বায়ান্নর জানুয়ারিতেই মিটিং করেছি কীভাবে ভাষার দাবিতে কাজ করতে হবে। স্কুলে স্কুলে গিয়ে ছেলে-মেয়েদের উদ্বুদ্ধ করেছি। ’৪৮ এর পর থেকেই সবার মনে আগুন জ্বলছিল। এর মধ্যে নাজিমুদ্দীন সাহেবের ঘোষণার পর সবাই বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। আমরা বুঝতে পারলাম উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে এদেশের মানুষ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না- পদানত থাকবে সারাজীবন। ফেব্রুয়ারি থেকেই গাজীউল হক, তোহা ভাই, সুলতান ভাই, কেজি মোস্তফা, আব্দুস সামাদ আজাদ আমরা সবাই মিলে মিটিং-মিছিল করছি। এখন যেখানে জগন্নাথ হল সেখানে ছিল পূর্ব পাকিস্তানের সংসদ ভবন। ওখানেই বাজেট সেশনে উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা এই বিলটি পাস করা হবে। সর্বদলীয় ভাষা সংগ্রাম কমিটি এর বিরোধিতা করে। ২১ ফেব্রুয়ারি সারা ঢাকায় ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। আর স্কুল-কলেজসহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সংসদ ঘেরাও করবে- এই বিল পাস না করার দাবিতে। দেয়া হবে স্মারকলিপি। ২০ তারিখ রাতে বার লাইব্রেরির সভায় তমুদ্দিন মজলিশসহ সব ছাত্র সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিল। এই মিটিং-এ সিদ্ধান্ত হয়- এখন যেখানে মেডিক্যাল কলেজের ইমার্জেন্সি সেখানে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন- সেখানে সবাই জড়ো হবে। আমার ওপরে দায়িত্ব ছিল মুসলিম গার্লস হাইস্কুল, বাংলাবাজার গার্লস হাইস্কুল, মিটফোর্ড মেডিক্যাল স্কুল প্রভৃতি স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিয়ে আসার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের হলের মেয়েরা আসতে চাইছিল না। তখন আমি ২০ তারিখ রাতেই কবীর চৌধুরীর বোন নাদেরা বেগমের চিঠি নিয়ে আসি। মেয়েরা তাকে মানতো। তিনি পুলিশের কাছে বন্ড দিয়ে এসেছিলেন বলে প্রকাশ্যে আন্দোলনের কাজে আসতে পারছিলেন না। তবুও হোস্টেলের মেয়েরা তেমন আগ্রহী হলো না। ৩০ জনের মধ্যে ৪/৫ জন এসেছিল ২১ তারিখ সকালে। তাদের মদ্যে রওশন আরা, সোফিয়া খান, রোকেয়া খাতুন, শামসুন্নাহারের নাম মনে পড়ছে। তবে মেয়েদের স্কুলগুলো থেকে অনেকেই এসে জমায়েত হয়েছিল সেদিনের কলাভবন মাঠের আমতলায়। বাংলাবাজার স্কুলের মেয়েরা তো বাউন্ডারি দেয়াল ভেঙ্গে রেখেছিল এই মিছিলে আসার জন্য।

দেশপ্রেম থাকলে দেশের অবস্থা নেতারা এমন করে তুলতো না

একুশের জন্যই আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। আজ এতদিন পর সে দিনগুলোর দিকে ফিরে তাকালে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা বেড়েছে। কোর্টে এখনো চালু না হলেও সরকারি অফিসগুলোতে বাংলা ভাষা চালু হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের গৌরব দেশ-বিদেশে ছড়িয়েছে। তার ফলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি মিলেছে। আমাদের বইমেলা দেখেই কলকাতার বইমেলা শুরু হয়েছে। এগুলো যা হয়েছে সেটা ভালো দিক। কিন্তু ভাষার মাধ্যমে মানুষের যে উন্নতি হবার কথা ছিল তা হচ্ছে না। তার কারণ রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থনৈতিক অমাবস্যা। এখন আমার দেশের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী শাসকশ্রেণী পাকিস্তানের তৎকালীন শাসকশ্রেণীর চাইতে বেশি খারাপ। এরা তখনকার চাইতে বেশি অত্যাচার করে। আমরা যারা তখন আন্দোলন করেছি- যেসব নেতা এখন দুর্নীতির দায়ে জেলের মধ্যে বসে আছে এরা কেউ ছিল না। দেশপ্রেম থাকলে এই বাংলার অবস্থা তারা এমন করে তুলতো না। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সমস্ত কিছু নষ্ট করা হয়েছে নিজেদের পকেট ভারি করার জন্য। আমরা আন্দোলন করতাম পশ্চিম পাকিস্তানী শোসকশ্রেণীর বিরুদ্ধে। এখন যাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে হয় তারা কোন্‌ দেশের মানুষ? আমরা ভুলে যাই, দেশের জনগণই আমাদের সম্বল। তাদের দুইবেলা খাবারের বাইরে চাহিদাও কম। সেইসব মানুষকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়। এসব দেখে খুব দুঃখ লাগে। মনে প্রশ্ন জাগে- এজন্যই কী আমরা স্বাধীনতার বীজ রোপণ করেছিলাম, রাস্তায় নেমেছিলাম।

স্বাধীনতার বীজ ছাত্রদের রক্ত দিয়ে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে রোপণ করা হয়েছিল

এখন যেখানে শহীদ মিনার সেখানে তখন ছিল চালাঘর। ছাত্রদের হোস্টেল। ওখানে গিয়ে দেখলাম পুরো জায়গাটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। পুলিশের গুলি আর অত্যাচারে এমন অবস্থা হয়েছিল। বাংলাদেশের পতাকার লাল সূর্যটা ওই সেদিনের রক্তের কথা মনে করিয়ে দেয়। তাই মনে হয়, সেদিনই স্বাধীনতার বীজ ছাত্রদের রক্ত দিয়ে এখনকার শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে রোপণ করা হয়েছিল। ২২ তারিখে বিশাল মিটিং হয়। সেদিনও মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। কয়েকজন শহীদ হয়। যতদূর মনে পড়ে, সেদিন রাতেই ছাত্র হোস্টেলের জায়গাটিতে শহীদ মিনার তৈরি করা হয়েছিল। সম্ভবত ঢাকার মাজেদ সর্দার সেদিন সব ইট, বালি, সিমেন্ট দিয়েছিলেন। তৈরিও তারাই করে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ছাত্ররা তা চায়নি। এই শহীদ মিনার পুলিশ ভেঙ্গে দেয়।

চেতনার জমিনে আন্দোলনের স্পর্শ

বাগেরহাটের শহরতলীতে আমার বেড়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই রবীন্দ্র, শরৎ, নজরুলের সাহিত্য থেকে দেশপ্রেমের পাঠ গ্রহণ করেছি। স্কুলে থাকতেই নেতাজী সুভাষ চন্দ বোসের আদর্শে অনুপ্রাণিত হই। তখন থেকেই ব্রিটিশবিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। ১৯৪০ দশকে আমার চাচার হাত ধরে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হই। ’৪৭ সালে কলেজে শিক্ষকদের সংস্পর্শে এসে পার্টির কাজে বেশি করে সম্পৃক্ত হই। এরই মধ্যে ’৪৮-এ ঢাকায় ভাষার দাবিতে আন্দোলন হয়েছে। আমরাও তখন বাগেরহাটে মিটিং-মিছিল করেছি। এভাবে মনের জমিন শক্ত হয়েছে মানুষের জন্য কাজ করতে হবে - সেই চিন্তায় বিভোর থেকেছি।


স্কুল পড়ুয়া মেয়েরাও শেস্নাগান দিচ্ছিল ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’

মাঠটি পুরো ভরে গিয়েছিল। স্কুল পড়ুয়া মেয়েরাও শেস্নাগান দিচ্ছিল- ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’- ‘রাজবন্দীদের মুক্তি চাই’- ‘চলো চলো অ্যাসেম্বলি চলো’। এরই মধ্যে সিদ্ধান্ত হয় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছেলেদের ১০ জনের একটি করে দল আর মেয়েদের চারজনের একটি করে দল পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙ্গে বাইরে বের হবে। যতদূর মনে পড়ে আমার দলটিই প্রথম ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছিল। আমার সঙ্গে ছিল আখতারী, নুরী, পুতুল। পুলিশ কি করবে প্রথমে বুঝতে পারেনি। প্রথম দুইটি দল সে সুযোগে রাস্তায় বেরিয়ে আসে। এর পরের দল দুইটির সবাইকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে শুনেছি তাদের ধরে নিয়ে তেজগাঁও এলাকায় নিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। এরপর বন্যার স্রোতের মত বাইরে বেরিয়ে আসে ছাত্ররা। পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছোঁড়ে। লাঠিচার্জ শুরু করে। পুলিশের নির্বিচার পিটুনিতে আমরা মিছিল নিয়ে বেশি দূর এগুতে পারলাম না। বেলা ৩টার দিকে পুলিশ গুলি চালায়। খানিক পরেই দেখলাম স্ট্রেচারে করে আহতদের হাসপাতালে নিয়ে আসা হচ্ছে। এদিকে ছাত্রদের ওপর গুলি চালানোর প্রতিবাদে সংসদ থেকে মাওলানা তর্কবাগীশসহ অনেকে ওয়াক আউট করলেন।

**************************
দৈনিক ইত্তেফাক, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০০৮