আত্মপরিচয়ের সংকীর্ণতা যদি আমরা বাদ দিতে পারি, তখন ভাষা সম্পূর্ণ এক নতুন দার্শনিকতায় আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়। প্রতিটি ভাষাই জগতকে নিজের ভাষার মধ্যে নির্মাণ করে। অধরা প্রকৃতির ততোটুকুই ভাষায় ধরা পড়ে যতোটুকু আমরা চিন্তায় ধরতে পারি। ভাষা ছাড়া চিন্তা নাই। তার মানে চিন্তায় ধরা মানে ভাষায় ধরা।
আত্মপরিচয়ের সংকীর্ণতা যদি আমরা বাদ দিতে পারি, তখন ভাষা সম্পূর্ণ এক নতুন দার্শনিকতায় আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়। প্রতিটি ভাষাই জগতকে নিজের ভাষার মধ্যে নির্মাণ করে। অধরা প্রকৃতির ততোটুকুই ভাষায় ধরা পড়ে যতোটুকু আমরা চিন্তায় ধরতে পারি। ভাষা ছাড়া চিন্তা নাই। তার মানে চিন্তায় ধরা মানে ভাষায় ধরা।
ভাষা সম্পর্কে আমাদের প্রবল আবেগ আছে। বাহান্ন সালের ভাষা আন্দোলনের গৌরব নিশ্চয়ই তার কারণ; কিন্তু এই গৌরবের দিক বিপদের কারণও হয়ে উঠতে পারে, যদি ভাষার প্রতি আমাদের এই আবেগকে আমরা আত্মপরিচয়ের রাজনীতি থেকে আলাদা করতে না পারি। নিজের মধ্যেই আমরা বসবাস করি এটা নিছকই আবেগ বা রাজনৈতিক আত্মপরিচয় নির্মাণের অবস্থান নয়, কারণ প্রত্যেকেই যার যার নিজের ভাষায় বাস করে। ভাষার মধ্যে যে সুনির্দিষ্ট ভাব, ইচ্ছা, সংকল্প বা এককথায় মানুষের জগৎ দেশকালপাত্রে ধরা পড়ে তাকে ‘বাঙালি’ বলে ডাকনাম দেয়া যায় ঠিকই, কিন্তু এই ধরা পড়াটা ভাষার দিক থেকে শেষ কথা নয়। অর্থাৎ আগামীদিনে তার বিকাশ নানান প্রতিভা ও দীপ্তি নিয়ে অন্যরকম হয়ে উঠতে পারে। ‘বাঙালি এখন যা আছে চিরকাল তাই থাকবে তার কোন গ্যারান্টি নাই। কিংবা আগে ‘বাঙালি’ নামক যা কিছুই আমরা ধারণা করি তার মধ্যে কল্পনা বা অনুমান কতোটুকু? হয়তো ষোলআনাই অনুমান। এখনকার বাঙালির পূর্বপুরুষকে যে ‘বাঙালি’ই বলতে হবে তার কি মানে আছে? ইতিহাসের, নৃতত্ত্বের ভাষার এবং সংস্কৃতির এমন কি অনিবার্য তাগিদ ছিল যে বাঙালি নামক একটা শাশ্বত ব্যাপার গড়ে উঠতই। এখন যাদের আমরা ‘বাঙালি’ বলি, তারা বাস্তব অবশ্যই, কিন্তু তাদের পরিচয়ের ইতিহাস তো শুধু ভাষার ইতিহাস নয়। তাদের মধ্যে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান যেমন আছে, তেমনি মুসলমানও আছে। সেই কবে কোন কাল থেকে বাঙালি ‘আবহমান’ থাকতে থাকতে এখনো বাঙালি হয়েই বহমান এবং অনন্তকাল বয়ে যাবে- এই ধারণা বড়োজোর আবেগ হতে পারে, কিন্তু ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের কোন জ্ঞানদান করতে পারে না।
আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলি বা বাংলা ভাষা আমাদের মাতৃভাষা বলে আমরা অবশ্যই ‘বাঙালি’ কিন্তু তার মানে কি এই যে, এই ভাষাভিত্তিক আত্মপরিচয় আমাদের শত্রম্নমিত্র নির্ণয়ের মানদন্ড হবে? সত্যি যে বাংলা ভাষায় আমরা বাস করি। কিন্তু কোন একটি সুনির্দিষ্ট ভাষার মধ্যে বসবাস করাও সেই অধিকার কেউ হরণ করে নিয়ে যেতে চাইলে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এককথা, আর শুধু ভাষাই আমাদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ করে এবং রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে ভাষাকেন্দ্রীক আত্মপরিচয়ই একমাত্র সত্য- এটা অন্য বয়ান। শেষের অবস্থান প্রথম অবস্থানের সম্পূর্ণ উল্টা। বিপরীত। ভাষাভিত্তিক আত্মপরিচয় দাবি করে যে বাংলাদেশ শুধুই বাঙালিদের, এখানে অন্য জাতিসত্তার অধিকার নেই, বা যদি থাকেও তা দ্বিতীয় স্তরে। এই অবস্থানের জন্য আমাদের চরম মূল্য দিতে হয়েছে। আদিবাসী/বাঙালি বিরোধের জায়গাটা এখানেই তৈরি হয়েছে।
ভাষা শুধু কেন, যে কোন আত্মপরিচয়ের রাজনীতিরই বিপদ আছে। ভাষা নিয়ে যদি আত্মপরিচয়ের রাজনীতিতে আমরা খাবি খাই, যদি বলি ভাষা দিয়েই আমার জাতীয় পরিচয় ঠিক হবে এবং জাতীয় পরিচয় আর রাষ্ট্রীয় পরিচয় অভিন্ন হবে, তাহলে ধর্ম দিয়ে জাতি গঠন করা যাবে না কেন-এই প্রশ্নও ওঠে। আত্মপরিচয় নির্মাণের জায়গায় ভাষাকে ঠেলে দিলে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি যে অর্থে সাম্প্রদায়িক হয়, ঠিক একই অর্থে ভাষাভিত্তিক রাজনীতিও ঘোরতর সাম্প্রদায়িক হতে পারে। ‘জাতি’ কথাটা সাম্প্রদায়িক বটে। বাংলাভাষাই যদি জাতি গঠনের প্রধান মানদণ্ড হয়, ইসলাম সেই ক্ষেত্রে মানদণ্ড হতে পারে না কেন? কিংবা হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন বা খ্রিস্ট ধর্ম? আমরা একাত্তর সালের পর থেকে এই তর্কই করছি। প্রসঙ্গটা তুলছি কারণ আমি মনে করি এই তর্ক দুই সাম্প্রদায়িক ধারার ঝগড়া। একদিকে আছে ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতা আর অন্যদিকে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা। দুটোই একই মুদ্রার দুই পিঠ। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের দিক থেকে জনগণকে এই দুই ধারার বিরুদ্ধেই দাঁড়াতে হবে।
কেন? কারণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ব্যক্তির পরিচয় ভাষা, সংস্কৃতি বা ধর্মে নয়- তার পরিচয় নাগরিকত্বে এবং সেই নাগরিকত্বের সংজ্ঞা তাকে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসাবেই রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে -ধর্ম বা ভাষার ভিত্তিতে নয়। তার মানে কি এই যে আমরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বাঙালি থাকি না? কিংবা আমরা ধর্ম ত্যাগ করি? অবশ্যই নয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাছ ধর্ম, ভাষা বা সংস্কৃতির কারণে আমি কোন বিশেষ সুবিধা পেতে পারি না। অন্যদিকে প্রতিটি ভাষা, প্রতিটি ধর্ম বা প্রতিটি সংস্কৃতিরই চর্চার পক্ষে অন্তরায়গুলো দূর করার প্রতিশ্রুতি দেয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। কিন্তু সম্প্রদায়গতভাবে কোন গোষ্ঠীকে স্বীকার করে না। কারণ এখানে দাঁড়াবার জায়গা হচ্ছে ব্যক্তিঃ ব্যক্তির অধিকার ও ব্যক্তির মুক্তি। ব্যক্তির অধিকার ও মুক্তির ধারণা এ কালের দার্শনিকদের কাছে তর্কসাপেক্ষ ব্যাপার। সেই তর্ক এখানে তুলছি। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র মানে যে জাতীয়তাবাদী বা ধর্মীয় রাষ্ট্র নয় এই কথাটাই বোঝাতে চাইছি।
আত্মপরিচয়ের সংকীর্ণতা যদি আমরা বাদ দিতে পারি, তখন ভাষা সম্পূর্ণ এক নতুন দার্শনিকতায় আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়। প্রতিটি ভাষাই জগৎকে নিজের ভাষার মধ্যে নির্মাণ করে। অধরা প্রকৃতির ততোটুকুই ভাষায় ধরা পড়ে যতোটুকু আমরা চিন্তায় ধরতে পারি। ভাষা ছাড়া চিন্তা নাই। তার মানে চিন্তায় ধরা মানে ভাষায় ধরা।
যদি আমরা খানিক ভাবি যে ধর্মও ভাষার বাইরের কিছু নয়, তাহলে ভাষা ও ধর্মের মৌলিক ফারাকের জায়গাটা আমরা বুঝব। ধর্ম চর্চা ভাষাতেই হয়। ধর্মের কথা আমরা ভাষাতেই বলি।
তাহলে ধর্ম যে রূপ নিয়ে সমাজে হাজির হয় সেই রূপের সঙ্গে সেই সমাজের ভাষার বিকাশের সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গী। বাংলাভাষা ও সংস্কৃতি এখনো ধর্মতত্ত্বের পর্যায় (ঃযবড়ষড়মু) অতিক্রম করতে পারেনি, সেই কারণে বাংলায় ‘ধর্ম’ বা আরবিতে ‘দ্বীন’ বলতে ঠিক কী বোঝায় সেই বিষয়ে আমাদের এখনো হুঁশ হয়নি। একাত্তর সালে আমাদের বিশেষ ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার কারণে একদিকে ভাষা ও সংস্কৃতি আর তার প্রতিপক্ষ হিসাবে আমরা ধর্মতত্ত্বকে দেখেছি। এর ফলে একাত্তরের চেতনা বলতে আমরা ধর্মের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই বুঝেছি, এখনো তাই বুঝে থাকি- মুখে বলি আর না বলি। এর ফলে বাংলা ভাষায় ধর্মতত্ত্বের পর্যালোচনা দূরে থাকুক-বাঙালির সংস্কৃতির মানে হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসলামের প্রতিপক্ষ হিসাবে দাঁড়ানোর সংস্কৃতি।
এই বিভাজন ও মেরুকরণ বাংলাদেশের ভাষা, সংস্কৃতি বা ধর্মের প্রশ্ন হিসাবে নয় বরং একদিকে জাতীয় বা গণনিরাপত্তা আর অন্যদিকে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসাবে আমাদের টিকে থাকা না থাকার প্রশ্নের সঙ্গে এখন জড়িত হয়ে গিয়েছে।
এই বিভাজন ও মেরুকরণ রুখবার পথ কি? ঐটাই ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধান ও একমাত্র প্রশ্ন হওয়া উচিত বলে আমরা মনে করি। এর মীমাংসার ওপর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। এই কথাটা বলার জন্য এই অতি সংক্ষিপ্ত নিবেদন।
আমরা যেন বাংলাদেশকে লণ্ডভণ্ড না করি, এটাই অমর একুশে আমার প্রার্থনা।
**************************
ফরহাদ মজহার
দৈনিক ইত্তেফাক, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০০৮