একুশের চেতনাকে যেভাবেই ব্যাখ্যা-বিশেস্নষণ করা হোক না কেন একুশের চেতনা যে মূলত মাতৃভাষার চেতনা সেটা অস্বীকার করার অর্থ বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়া। বিশ শতকের চল্লিশ দশকের অপরাধ আর পঞ্চাশ দশকের প্রথমার্ধ জুড়ে ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে বায়ান্নো সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালী প্রাণ দিয়েছিল বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য। সে জন্য বাঙালীকে একাত্তরে রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধ করতে হয়েছিল, সৃষ্টি করতে হয়েছিল জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ।
একুশের চেতনাকে যেভাবেই ব্যাখ্যা-বিশেস্নষণ করা হোক না কেন একুশের চেতনা যে মূলত মাতৃভাষার চেতনা সেটা অস্বীকার করার অর্থ বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়া। বিশ শতকের চল্লিশ দশকের অপরাধ আর পঞ্চাশ দশকের প্রথমার্ধ জুড়ে ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে বায়ান্নো সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালী প্রাণ দিয়েছিল বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য। সে জন্য বাঙালীকে একাত্তরে রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধ করতে হয়েছিল, সৃষ্টি করতে হয়েছিল জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ। তারপর বাংলাভাষা রাষ্ট্রভাষারূপে সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু সাংবিধানিক স্বীকৃতি এক কথা আর বাস্তবে রাষ্ট্রভাষা হওয়া আর এক কথা। রাষ্ট্রভাষা অর্থ শুধু সংবিধানে একথা লেখা থাকা নয় যে, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। রাষ্ট্রভাষা কথাটার অর্থ জাতীয় ও সমাজ জীবনের সর্বক্ষেত্রে মাতৃভাষার মাধ্যমে জীবন-যাপন করা। রাষ্ট্রভাষার অর্থ প্রশাসনের ভাষা, বিচার ব্যবস্থার ভাষা, শিক্ষার মাধ্যম, ব্যবসা বাণিজ্যের ভাষা, ব্যাংক-বীমার ভাষা। বাংলাদেশে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে মোটামুটি বাংলাভাষা ব্যবহ্নত হচ্ছে কিন্তু বিচার ব্যবস্থায় বিশেষত উচ্চ আদালতে এখনও বাংলাভাষা অপাংক্তেয়। স্বাধীনতার ৩৬ বছর পরে সেদিন আটত্রিশ খণ্ডে ‘ল’ কোড’ প্রকাশিত হলো ইংরেজি ভাষায় অথচ বাংলা ভাষায় আইনের বিধান প্রকাশিত হয়নি।
বাংলাদেশে বর্তমানে শিক্ষার মাধ্যম- ইংরেজি, বাংলা এবং আরবী ভাষা। উচ্চবিত্তের জন্য ইংরেজি মাধ্যম, মধ্যবিত্তের জন্য বাংলা মাধ্যম আর নিম্নবিত্তের জন্য মাদ্রাসায় আরবী মাধ্যম। বাংলাদেশে ইংরেজি মাধ্যম পরিচালিত প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে বাংলা নেই বললেই চলে। ইংরেজির মাধ্যমে পরিচালিত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কয়েকটিতে ছাড়া বাংলা ভাষার বিশেষ স্থান নেই। এমনকি দুইটি সাধারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় খুলনা এবং সিলেট শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ নেই। অথচ পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত ঢাকার বুয়েট এবং ময়মনসিংহের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বাংলাভাষার স্থান ছিল। মোট কথা বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষার মাধ্যম ক্রমে ক্রমে কেবলমাত্র ইংরেজি ভাষায় রূপান্তরিত হচ্ছে। বাংলাদেশে বাংলা ভাষার মাধ্যমে পরিচালিত একটিও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নেই। কেবলমাত্র একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা আবশ্যিক। আমরা এ কোন দেশ সৃষ্টি করলাম যে দেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা অথচ রাষ্ট্রের, সমাজ জীবনের ভাষা বাংলা নয়?
ঐতিহ্যগতভাবে আমাদের দেশের সমাজ জীবনের যোগাযোগ এবং আনুষ্ঠানিকতার ভাষা বাংলা। মোগল আমলে ফার্সী আর ইংরেজ আমলে ইংরেজি রাজভাষা হলেও রাজস্ব ও বেসরকারি দলিল-দস্তাবেজের ভাষা ছিল বাংলা, সে ঐতিহ্য ক্রমশ বিসর্জিত। আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদির আমন্ত্রণপত্র ইংরেজ আমলেও বাংলা ভাষাতেই রচিত হতো, বর্তমানে জন্মদিন, গায়ে হলুদ, বিবাহ প্রভৃতি উৎসবের আমন্ত্রণপত্র ভুল-ভাল ইংরেজি ভাষায় লেখা হচ্ছে। যেখানে প্রয়োজন সেখানে আমরা ইংরেজি ভাষা দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারছি না আর যেসব ক্ষেত্রে প্রয়োজন নেই সেখানে অশুদ্ধ ইংরেজি ভাষা ব্যবহারের মাত্রা বাড়িয়ে চলেছি। এর দ্বারা ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমরা এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির আবর্তে হাবুডুবু খাচ্ছি। বাংলাদেশে কোনো সরকারি ভাষানীতি নেই, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের জন্য মাতৃভাষার প্রতি নেই শ্রদ্ধাবোধ। অদ্ভুত এক হীনমন্যতার শিকার দেশ ও জাতি। ঈশ্বরগুপ্ত ইংরেজ আমলে দুঃখ করে লিখেছিলেন, তদানিন্তন সমাজ দেশের ঠাকুর ফেলে বিদেশের কুকুর পূজা করছে। একুশ শতকে এসে আমাদের অবস্থাও অনেকটা ঐরূপ, যা কিছু স্বদেশী তা আমাদের কাছে অবজ্ঞার যা কিছু বিদেশের তা আদরের।
একুশ শতকে আমরা বিশ শতকের একুশের চেতনা বিসর্জন দিয়েছি। ফলে মাতৃভাষার উন্নয়নের পরিবর্তে অবমূল্যায়নে আমরা অধিকতর সক্রিয়। বাংলাদেশের সিনেমা হলগুলিতে প্রদর্শিত অধিকাংশ চলচ্চিত্রে যে ভাষা ব্যবহ্নত হয় তা অসহনীয় বিধায় রুচিশীল মানুষ সিনেমা হলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু বিনোদনের জন্য স্থূল ভাঁড়ামোর ভাষা সিনেমা হল থেকে এখন বিভিন্ন টেলিভিশন মাধ্যমে বাণিজ্যিক ও ধারাবাহিক অনুষ্ঠানে ঢুকে পড়েছে। বাংলা টেলিভিশন চ্যানেলগুলির ঐ শ্রেণীর অনুষ্ঠানে বর্তমানে বাংলাভাষা সবচেয়ে বেশি বিকৃত হচ্ছে। ফেব্রুয়ারি মাস এলেই বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে একুশে নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা, প্রতিটি সংবাদ বুলেটিনে একুশের কথা তুলে ধরা হয় আর পাশাপাশি বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে এবং কোনো কোনো ধারাবাহিক নাটকে বা ছায়াছবিতে এক অদ্ভুত মিশ্রভাষা ব্যবহ্নত হয়। যে ভাষার কিছুটা আঞ্চলিক কিছুটা ইংরেজি অর্থাৎ না ঘরকা না ঘাটকা! ঐ ভাষা বাংলাও নয় ইংরেজিও নয়, ঐ ভাষা আঞ্চলিকও নয় প্রমিত বাংলাও নয়। বাংলা ভাষার সৌন্দর্য, পরিমিত, পরিশীলিত, পরিমার্জিত রূপ সেখানে বিসর্জিত।
আমরা যদি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হতাম তাহলে আমরা এত দ্রুত এক আত্মবিস্তৃত ও আত্মঘাতী জাতিতে পরিণত হতে পারতাম না। আমাদের মাতৃভাষার প্রতি যদি আমাদের শ্রদ্ধা থাকতো, আমাদের বর্ণমালার প্রতি যদি আমাদের ভালবাসা থাকতো তাহলে আমরা আমাদের মাতৃভাষা নিয়ে এমন খিস্তি করতে দিতে পারতাম না, বাংলা বর্ণমালা বিসর্জন দিয়ে রোমান হরফে বাংলা লিখতে পারতাম না। রাজধানী ঢাকার রাজপথে এবং বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় স্থাপনাগুলোর নাম এবং নামফলকের দিকে দেখলে এখন আর ঢাকাকে বাংলা ভাষাভাষী দেশের রাজধানী মনে হয় না অথচ ত্রিশ বছর আগেও ঢাকার যে কোনো দিকে তাকালেই বোঝা যেত এটা বাঙালির দেশ, এখন আর তা মনে হয় না, এখন মনে হয় এটা অ-বাংলা ভাষাভাষীদের দেশ, একুশ শতকে এসে আমরা শুধু একাত্তরের নয়, একুশের চেতনাকেও বিসর্জন দিয়েছি, আমরা আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের ভাষা সব কিছু বিস্মৃত হতে বসেছি। ঊনিশ ও বিশ শতকে বাঙালী মুসলমান সমাজে পত্র-পত্রিকায় একটি হাস্যকর বিতর্ক চালু ছিল, বিষয়টি ছিল বাঙালী মুসলমানের মাতৃভাষা বাংলা না উর্দু? কেউ কেউ এমন ফতোয়া দিয়েছিলেন যে, আশরাফ বা উচ্চশ্রেণীর মুসলমানের মাতৃভাষা উর্দু আর আতরাফ বা নিম্নশ্রেণীর মুসলমানের মাতৃভাষা বাংলা। পাকিস্তানে বাংলা ভাষা আন্দোলনের ফলে ঐ বিতর্কের অবসান ঘটেছিল।
একুশ শতকে এসে বাংলাদেশে সম্ভবত নতুন এক বিতর্ক সৃষ্টি হতে যাচ্ছে যে বাংলাদেশের মানুষের মাতৃভাষা কি ইংরেজি না বাংলা? এর উত্তর সম্ভবত আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে। সম্ভবত এমন উত্তর পাওয়া যেতে পারে যে, বাংলাদেশের আশরাফ বা উচ্চবিত্ত শ্রেণীর মাতৃভাষা ইংরেজি, মধ্যবিত্ত শ্রেণী আর নিম্নবিত্ত শ্রেণীর বা আতরাফদের মাতৃভাষা বাংলা। বাংলায় ভাষা আন্দোলনে আতরাফরা জয়ী হয়েছিলেন, একাত্তরের মুক্তিযুুদ্ধেও বিজয়ী হয়েছিলেন আতরাফরা। বায়ান্ন সালে আশরাফরা উর্দু ভাষার পক্ষে ছিল, একাত্তরে তারা অনেকেই ছিল রাজাকার কিন্তু একুশ শতকে এসে দেখছি এক চরম বিশৃঙ্খলা। ভাষার প্রশ্নে আশরাফ-আতরাফ, সবাই বিভ্রান্ত। বাংলাদেশে এখন আমরা কোনো ভাষাই যথার্থভাবে শিখছি না, মাতৃভাষা বা দ্বিতীয় বা তৃতীয় অর্থাৎ বাংলা বা ইংরেজি বা আরবী কোনো ভাষাই নয় কারণ আমরা মাতৃভাষা ভালোভাবে না শিখে অন্য ভাষা শিখতে চেষ্টা করছি। বাংলাদেশে ভাষা পরিস্থিতি এখন চরম নৈরাজ্য ও বিভ্রান্তিকর অবস্থার মধ্যে যা থেকে আমাদের পরিত্রাণ নেই সহজে যদি না আমরা মাতৃভাষা নিয়ে হীনমন্যতা পরিত্যাগ করতে পারি।
**************************
রফিকুল ইসলাম
দৈনিক ইত্তেফাক, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০০৮