একবিংশ শতকে আমরা যে ভাষা বিশৃঙ্খলা নামান্তরে ভাষা সন্ত্রাসের মুখোমুখি হচ্ছি তার সঙ্গে আপষ ছাড়া ঘরের ছেলেকে ঘরে ধরে রাখাই যেন দুষ্কর হয়ে পড়ছে। চলতি পথে রাস্তা ফুটপাতে, বাস ট্রেনে, টেলিভিশনের নাটক-টকশো, রেডিওতে কান পাতলেই এই ভাষা সন্ত্রাসের সরব নিবর্তন ধরা পড়ে। এর আগে বলে নেয়া ভালো, বাংলা ভাষা কি সব কালে একই রকম ছিল? না, মানুষের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন এবং যোগাযোগের মাত্রা ভেদের ওপর ভাষার পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। যে ভাষা তার নিজেকে পরিবর্তন করতে পারেনি, সে ভাষা টিকে থাকতে ব্যর্থ হয়েছে।

বাংলায় মুসলমান আসার পর এখানকার ভাষার জীবনে একটি দোলা লেগেছিল-এটি ঐতিহাসিক সত্য। দ্বাদশ শতকের শেষের দিকে বখতিয়ারের আগমন পর্যন্ত বাংলা ভাষা যেমন এখানে পুরোপুরি দানাবেঁধে ওঠেনি। এমনকি বখতিয়ার আসার প্রায় দু’শ’ বছরের মধ্যে স্হানীয় ভাষায় তেমন কোনো সাহিত্য পাওয়া যায়নি। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে ভাষার জীবনে যে চিৎপ্রকর্ষের সুচনা হয়েছিল সুলতানি আমলে তারই দু’কুল প্লাবী প্রকাশ বাংলাকে অচ্ছুৎ চাকরানী থেকে রাজরাণীতে পরিণত করেছিল। অবশ্য এ নিয়ে শ্লাঘা বোধের যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ নেই। কারণ পাল ও সেন আমলে বাংলা ভাষার উদ্ভব হলেও মাথা তুলে দাঁড়ানোর মতো শক্তি এ ভাষা তখনো অর্জন করেনি। তাছাড়া সংস্কৃত, অবহঠট কিংবা প্রাকৃতের খোলস থেকে ভাষা যেমন পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি, তেমন এ ভাষা ব্যবহারকারীরাও তখনো মান ভাষা বর্জিত ইতরজন। কিন্তু মুসলমান রাজরা যেহেতু ভিন্নভাষী, এমনকি ভারতের অন্য কোনো ভাষা যেহেতু তাদের নিজেদের ভাষা নয় সেহেতু প্রজার ভাষার প্রতি মর্যাদা দানই তাদের সুশাসন কৌশলের পরিচায়ক। তাছাড়া বাংলার সুলতানরা কার্যত সব সময় ছিলেন স্বাধীন, সুতরাং স্বাধীন দেশের ভাষা সাহিত্য বিকাশের প্রতি তাদের আগ্রহ থাকা অস্বাভাবিক নয়। আর আগ্রহের পরিচয়ও আমরা দেখতে পেয়েছি। ঐতিহাসিক দ্বিমত থাকলেও একথা সত্য সুলতানী আমলে সংস্কৃত, হিন্দি, আরবি ও ফারসি থেকে বাংলা ভাষায় প্রচুর অনুবাদ সম্পাদিত হয়েছিল। রাজদরবারের হিতবাদী চেতনা ছাড়া এ ধরনের কাজ প্রায় অসম্ভব।

সুলতানী আমলের শুরু এবং নবাবী আমলের শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ চারশ’ বছর বাংলার কবিকুল কেবল নিজেদের প্রতিভা ও প্রয়োজন অনুসারে ভাষার উৎকর্ষ সম্পাদন করেছিলেন। এই সময় পর্বেও বাংলা ভাষা কম চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেনি। যার প্রমাণ হিসেবে আমরা সপ্তদশ শতকের কবি আবদুল হাকিমের সখেদ উক্তি শুনতে পাই। কবি আবদুল হাকিমের সময়কালে দিল্লির মসনদে আসীন ছিলেন সম্রাট শাহজাহান। আর সম্ভবত বাংলার মুসলিম সুবেদার ছিলেন কাশেম খান কিংবা তার উত্তরসুরিরা। তাহলে একজন বাঙালি মুসলিম কবি তার কাব্য রচনার ক্ষেত্রে এমন কোনো প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়েছিলেন যে তিনি তার নুরনামা কাব্যগ্রন্হ রচনাকালে বলতে বাধ্য হলেন, যারা বাংলায় জন্মগ্রহণ করে বাংলায় বসবাস করে বাংলার বিরোধিতা করে তারা বেজন্মা। তিনি তাদের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে চলে যেতে বলেছেন। কারা বেজন্মা তিনি তাদের প্রতিও ইঙ্গিত করেছেন, যারা বাঙালি হয়েও আরবি ফারসি ভাষার ওকালতি করে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, মধ্য যুগে বাংলাকে আরবি ফারসি ভাষার আধিপত্য থেকে নিজের কুলীনতা রক্ষায় কম ব্যস্ত থাকতে হয়নি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, মধ্যযুগের কবিরা প্রায় সবাই ছিলেন, বহু ভাষাভাষী, আরবি, ফারসি, হিন্দি, সংস্কৃত তারা ভালোই জানতেন। কারণ এ সময়ের অধিকাংশ গ্রন্হই ছিল মুলত এসব ভাষা থেকে অনুবাদ। তাই বলে, তখন কবিদের ইংরেজি জানার দরকার হয়নি। এমনকি বাংলা ভাষায় তখন পর্যন্ত একটিও ইংরেজি শব্দ ছিল না। ইংরেজির অনুপ্রবেশ ইংরেজ জাতির মতো উপনিবেশিক বিষয় হিসেবে দেখা দিয়েছে। একটি ভাষা যে অপর ভাষার ওপর আধিপত্য করে, তার কারণ যত না সে ভাষার ক্ষমতার জন্য, তার চেয়ে ঢের বেশি সে ভাষাভাষীর আর্থ-সামাজিক ক্ষমতা প্রয়োগের সামর্থেøর জন্য। গণভাষা বিকাশের ক্ষেত্রে অভিজাততন্ত্রের বিরোধ প্রাচীন। আবার গণভাষাকে স্বীকৃতিদান এবং মান ভাষায় উন্নীত করার ক্ষেত্রে অভিজাত শ্রেণীর পৃষ্ঠপোষকতা অবশ্যম্ভাবী। এখানে অভিজাত শ্রেণী কেবল আর্থ দ্বারা শক্তিশালী নয়। জ্ঞান এবং লিপি দ্বারাও তারা গণমানুষ থেকে আলাদা। গণমানুষের ভাষার স্বীকৃতি এবং ভাষার প্রতি সমর্থন এই মুচ্ছুদ্দি সমাজে পুরোপুরি অর্থবহন করে না। এ ধরনের সমাজের বাংলা ভাষার সার্বিক স্বীকৃতির অর্থ কেবল এই দাঁড়ায়,- এ ভাষার ব্যবহারকারীদের সংখ্যা সম্প্রসারণ করা। কারণ কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণীও এখান থেকে তাদের ভাষা শিক্ষার জ্ঞানের ভিত্তিতেই কেবল রাষ্ট্র নির্ধারিত সুবিধা লাভ করতে পারে।

ইদানীং আমরা ভাষার ব্যাপারে এই বলে সরব হয়ে উঠছি যে, উনিশ শতকের আগে বিশেষ করে ইংরেজের উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার আগে বাংলা ভাষার বিকাশ তার সহজাত পথেই এগিয়ে চলছিল। এ মতের সঙ্গে আমিও দ্বিমত পোষণ করি না। ইংরেজ পার্দিদের দ্বারা পরিচালিত শ্রীরামপুর মিশন কিংবা ফোর্ট উইলিয়ামের তত্ত্বাবধানে বাংলা গদ্যের একটি কর্তৃত্বপরায়ন ধারার সুচনা না হলেও সময়ের প্রয়োজনে বাংলা গদ্য তার আপন পথে এগিয়ে যেতে পারত। অর্থাৎ প্রাকৃত পালি, গৌড়িয় প্রাকৃত কিংবা মৈথিলী থেকে বাংলা ভাষা বৈয়াকরণদের অনুশাসনের বাইরে যেভাবে বেড়ে উঠছিল, পরবর্তীকালে আরবি, ফারসি কিংবা তুর্কি ভাষার বাঙালিকরণের মধ্যে ঠোঁট ও বাগযন্ত্রের উপযোগী করে যে ভাষা গড়ে উঠছিল ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ তাতে বাদ সেধেছে। বাংলাকে সংস্কৃতের দুহিতায় পরিণত করেছে। সজীব জনভাষার পরিবর্তে বিশেষ করে শব্দঋণের ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় সংস্কৃতের দ্বারস্হ হয়েছে। ফলে লেখ্যভাষার সঙ্গে কথ্যভাষার বিস্তর দুরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এ কথা ভুললে চলবে না, ভাষার এ পরিবর্তন কেন সাধিত হয়েছিল। আমরা জানি সংস্কৃত ভাষা পাণিণি, পতঞ্জলি ও ভবভুতির মতো বৈয়াকরণ জন্ম হলেও বাংলা ভাষার কোনো ব্যাকারণ তৈরি হয়নি। এ ভাষার প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ব্যাকরণ লেখার কাজে এগিয়ে আসেন বিদেশি পর্তুগিজ কিংবা ইংরেজ পার্দিরা। এ কথা সত্য, এ ভাষা শেখার ক্ষেত্রে তাদের ব্যবসায়িক কিংবা স্বর্গীয় লাভালাভের ব্যাপার ছিল। তবে ইংরেজ আসার ফলে জনজীবনে যে পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল, ভাষা ও চিন্তার যে অভিঘাত শুরু হয়েছিল, বহুপ্রান্তর থেকে আসা কোলকাতা কেন্দ্রিক নগর জীবনে ভাষার যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল, তাকে ব্যাকরণবদ্ধ করা ছাড়া আর কি কোনো উপায় ছিল। অনেকেই প্রশ্ন করবেন, ভাষা কি ব্যাকরণ মেনে চলে? প্রশ্নটি মোটেও ব্যাকরণের নয়, ভাষার শব্দ একটি আধার বই নয়। শব্দ বস্তু এবং চিন্তাকে ধারণ করে থাকে। সুতরাং অন্যভাষা থেকে শব্দঋণ করলে ভাষাটি মোটেও পরিবর্তন হয় না। মুখের ভাষা মুখে মুখেই চালু থাকে। যে কারণে লোক ভেদে, অঞ্চল ভেদে মুখের ভাষা পরিবর্তিত হয়ে ভিন্ন ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে। কিন্তু লিখিত ভাষার সব নিয়ম মুখের ভাষার সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করা যায় না। কারণ লেখার ভাষাকে একটি ঐক্যবদ্ধ রূপ লাভ করতে হয়। যা একই ভাষার সব আঞ্চলিক রূপগুলোকেও একই সঙ্গে গ্রন্হিত করে। যে কারণে লিখিত ভাষা, ভাষার শব্দ ও নিয়ম-কানুন শিখতে হয়। যেমন সিলেটি বাংলা, চাটগাঁইয়া বাংলার সঙ্গে বাংলার লিখিত রূপের যে পার্থক্য তা একটি নতুন ভাষা রূপের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার প্রায় সমান বলে মনে হয়। তাই এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে কোনো কোনো ভাষাতাত্ত্বিক বলতে চেয়েছেন, অসামীয়া বা উড়িয়া ভাষার সঙ্গে বাংলা মান ভাষার যে পার্থক্য তা অনেক অঞ্চলের উপভাষার চেয়ে বেশি নয়। আর সে কথা মানলে তো এ কথা সত্য প্রমাণিত হতে খুব দেরি হয় না যে, লিখিত ভাষা আর মুখের ভাষা এক নয়। সুতরাং লিখিত ভাষার যে রূপ দাঁড়িয়েছে, বিবর্তিত পরিবর্তিত হচ্ছে তার সঙ্গে মুখের ভাষার সর্বাংশে মিল থাকতে হবে তার নিরঙ্কুশ দাবি যৌক্তিক নয়। মুখের ভাষায় লেখার দাবি বালখিল্য চিন্তার পরিচায়ক। কারণ, প্রথমেই আমাদের ভাবতে হবে, একটা ভাষায় আসলে কি লেখা হয়, শুধু কি সেই ভাষাগোষ্ঠীর দিন যাপনের সংলাপ (যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে টেলিভিশনের নাটক শুনলে অনুধাবন করা যায়।) ভাষার সাধারণ ভোক্তাদের ধারণা এর চেয়ে বেশি নয়। প্রাত্যহিক সংলাপের মধ্যে আমরা মানব চিন্তনের সবখানি ধরতে পারি না। মানুষ ভাষার মাধ্যমে তার নিজের, গোত্রের এবং পরিণামে মানব জাতির অর্জনও লিপিবদ্ধ করতে চায়। যেমন একটি ভাষাকে সাহিত্য বাদেও দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস ও ব্যবসায়িক জটিল বিষয়গুলো লিপিবদ্ধ করতে হয়। তার সব শব্দই আঞ্চলিক উপভাষা কিংবা কথ্য সংলাপের মধ্যে থাকে না। তখন তাকে দ্বারস্হ হতে হয়, শত শত বছর ধরে গড়ে ওঠা ভাষার সঞ্চিত ভান্ডারের কাছে। আর সেই ভান্ডারে সবখানি পাওয়া না গেলে সহজগম্য, সহজশর্ত শব্দঋণের দিকে এগুতে হয়। শব্দঋণ ব্যতিরেকে কোনো ভাষা আজকের দিনে চলতে পারে না। আর যে ভাষা চলতে পারে, তা মৃত কিংবা দরিদ্র। সে ভাষা সর্বক্ষেত্রে মানভাষা নয় সে কথা বলা যায়।

ফোর্ট ইউলিয়াম কলেজের বাংলা রচয়িতাদের কাছে জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত বাংলা মার খেয়েছিল সে আলোচনা কিছুটা হলেও রাজনীতিক। আর এ কথা সত্য যে, ইংরেজ শক্তির কাছে সব কিছু পদাবনত হলে ভাষা কি করে তার কুমারিত্ব ধরে রাখে। আমরা চাইলে কি দু’শ’ বছরের ইংরেজ শাসন এবং তার কু কিংবা সুফল ঝেড়ে ফেলতে পারি। ইতিহাসের চাকাকে পেছনে ফেরানো সম্ভব না হলে ভাষার চাকাকে কীভাবে পেছনে ফিরে নিয়ে পুনরায় শুরু করা যায়। অনিবার্য যে শব্দ ভান্ডার এবং ভাষার যে শৈলী উনিশ শতকে আমরা লাভ করেছিলাম তা নিঃসন্দেহে বাংলা ভাষার অনন্য সম্পদ। ইংরেজ চলে গেছে (স্বামী বিবেকানন্দের ভাষায় রেখে গেছে টন টন ভাঙ্গা ব্রান্ডির বোতল) কিন্তু সময়ের সঙ্গে যে চিহ্ন ও দাগ অঙ্কিত হয়েছে তা মুছে ফেলতে গিয়ে নতুন করে ঘা সৃষ্টি করার সঙ্গে আমি একমত নই। এ ভাষা সংস্কৃত থেকেই আসুক কিংবা গৌড়িয় প্রাকৃত বা মৈথিলি থেকেই আসুক তার চেয়ে বড় সত্য এ ভাষাটির বর্তমান রূপ যা আছে তা-ই এই ভাষা। আর যা হয়েছিল তা কোষ্ঠী গণনার সঙ্গে জড়িত। হাজার বছর ধরে নানা বাক ও পথ পেরিয়ে আজ বাংলা ভাষা যেখানে এসে উপস্হিত হয়েছে তাকে তার আপন গতির মধ্যে সমৃদ্ধ করে তোলা জরুরি হয়ে পড়ছে। কেবল কথ্য ভাষা পরিবর্তন হলেই ভাষার পরিবর্তন হয়েছে এ কথা বলা যায় না। ভাষাকে সমৃদ্ধ করে তোলেন সে ভাষার শক্তিশালী কবি সাহিত্যিক, পরিভাষা ও অভিধান প্রণেতা, ভাষাতাত্ত্বিক ব্যাকরণবিদ আর বিভিন্ন বিষয়ে স্বভাষায় লেখার ক্ষমতাসম্পন্ন লেখকরা। ফোর্ট উইলিয়মের প্রচেষ্টার সঙ্গে যদি সংস্কৃত শাস্ত্রী, বিদ্যালঙ্কার-তর্কালঙ্কারগণ যোগ না দিতেন, কিংবা বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, মধুসুদনের মতো লেখকরা আবির্ভাব না হতেন তাহলে কি তাদের প্রচেষ্টা ফলপ্রসু হতো। আর বাংলা ভাষার এ সব মহান লেখকের কাছে তাদের সামর্থø ও পরিধির বাইরে অন্য রকম আশা করা কি অযৌক্তিক নয়। আর সমকালীন সামর্থ্যবান লেখকদের পেছনের পায়ে হাঁটার অর্থই ভাষার মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা- ঈশ্বর ব্যাবিলনের মানুষদের মধ্যে যা করেছিলেন।

আর এ কথা ভুললে চলবে না, লেখ্যভাষাও সব সময় এক রকম থাকেনি ফোর্টউইলিয়মের সংস্কৃতঘেঁষা সাধু ভাষা আজ বিলুপ্ত। সে ভাষার অযোগ্যতা প্রমাণিত হয়েছে বহু আগে। তদস্হলে দাঁড়িয়েছে প্রমথীয়-রাবীন্দ্রিক চলতি ভাষা। চলতি ভাষার ঠাট ও গতি অক্ষুণ্ন রেখে লেখ্যভাষা তার আজকের রূপ লাভ করেছে। কিন্তু প্রমথীয়-রাবীন্দ্রিক ক্রিয়া বিশেষ্যের ক্ষেত্রে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। আর এ ধারার শতবর্ষ পরে বাংলা ভাষার লেখ্যরূপের সঙ্গে কথ্যরূপ কি ধরনের সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে তা বিবেচনার বিষয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তর থেকে আগত নাগরিকদের মুখের কথা, প্রযুক্তির সর্বব্যাপ্ত উন্নয়ন আর আন্তর্জাতিক শ্রম ও বাণিজ্যিকীকরণের প্রেক্ষাপটে বাংলা ভাষার একটি পরিবর্তন আসা অসম্ভব নয়। তবে প্যারাডক্স হলো, ইংরেজ শাসনকালে বাংলাকে ইংরেজির খপ্পরে পড়তে হয়নি। এমনকি ইংরেজি থেকে সব ধরনের ভাষান্তরের ক্ষেত্রেও প্রকৃত বাংলা, তদ্ভব বা তৎসমের দ্বারস্হ হতে হয়েছে। কিন্তু উপনিবেশ প্রভুদের বিদেশি ভাষা অনুপ্রবেশের ফুরসৎ পায়নি। কিন্তু স্বাধীন দেশে চাইলেও আমরা ইংরেজির অনুপ্রবেশকে রুখে দিতে পারব না। কারণ আন্তর্জাতিকভাবে এ ভাষার দৌরাত্ম্য আজ সর্বব্যাপ্ত। ইংরেজি আজ প্রযুক্তির ভাষা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ভাষা। ইংরেজি না জানলে বৈষয়িক উন্নয়নের সম্ভাবনা ক্ষীণ। ইংরেজি না জানলে দ্বিভাষীদের দ্বারা পদাবনত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। তাই কাজ চলার মতো, কথা বলার মতো ইংরেজি আমাদের শিখতেই হবে। আর এই ভাষা শেখা বাধ্যতামুলক হলে কথ্য ভাষায় এ ভাষার ছাপ আসতে বাধ্য। আর এ কথ্য ভাষা ইংরেজি শব্দ বা শব্দাংশ গ্রহণ করলে লেখ্যভাষা পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নিতে পারবে না। এমনকি এ ভাষা থেকে যারা সংস্কৃত বর্জন করতে চান, তারাও বাংলার মধ্যে হরহামেশা ইংরেজি চালিয়ে দেন।

কিন্তু প্রশ্ন এই পরিবর্তন চলমান বাংলা ভাষা ধারণ করতে সক্ষম কিনা। মাতৃভাষার গুরুত্ব সব ভাষাভাষীর কাছে সমান হলেও সব ভাষা সমান নয়। সব ভাষা মান ভাষা নয়। সব ভাষা সমানভাবে বিকশিত হয়নি। ভাষার বিকাশ রাতারাতি সম্ভব নয়। ভাষার ব্যবহারকারীরা মিলেই ভাষাকে গড়ে তোলে। তবে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া রাষ্ট্রভাষার সুষ্ঠু বিকাশ সম্ভব নয়। তবে বাংলা একটি পরীক্ষিত মানভাষা। এ ভাষার সাহিত্য, অভিধানভুক্ত শব্দ সম্ভার, পরিভাষা মোটেও অপ্রস্তুত নয়। নিয়মিত সুষ্ঠু চর্চার দ্বারা এ ভাষা উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে। এজন্য দরকার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পৃথক একটি ভাষা একাডেমি। দেশজ ও আন্তর্জাতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে চালু এবং পরীক্ষিত শব্দ সম্ভার ও বাগধারার প্রচলন রীতিসিদ্ধ করা। এমনকি পরিবর্তনের ধারাকে অক্ষুণ্ন রেখে ভাষার শুদ্ধ-অশুদ্ধ নির্ণয়ের কর্তৃত্ব অর্পণ করা। বর্তমান বাংলা একাডেমী, ভাষা ইনষ্টিটিউট কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়সমুহের ভাষাতত্ত্ব বিভাগ এ ব্যাপারে কিছু কাজ করলেও একটি ঐক্যবদ্ধরূপ তৈরি তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। বরং এসব প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি পৃথক একাডেমী অধিক কার্যকর হতে পারে।

**************************
মজিদ মাহমুদ
দৈনিক আমারদেশ, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০০৮