বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে শিশু-শিক্ষার পাঠ-উপকরণ নিয়ে গবেষণামুলক আলেচানার সুত্রপাত হয়েছে, এটা অত্যন্ত সুখের ব্যাপার। বিভিন্ন গবেষকের গবেষণার আলোকে পাঠ্যবই পরিমার্জিতও হচ্ছে। এটি একটি উন্নয়ন প্রক্রিয়া। এই আলোচনার বিষয় প্রথম শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য রচিত পাঠ্যক্রম এবং সেই পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত ৩৩টি বই।
বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে শিশু-শিক্ষার পাঠ-উপকরণ নিয়ে গবেষণামুলক আলেচানার সুত্রপাত হয়েছে, এটা অত্যন্ত সুখের ব্যাপার। বিভিন্ন গবেষকের গবেষণার আলোকে পাঠ্যবই পরিমার্জিতও হচ্ছে। এটি একটি উন্নয়ন প্রক্রিয়া। এই আলোচনার বিষয় প্রথম শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য রচিত পাঠ্যক্রম এবং সেই পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত ৩৩টি বই। ১৯৭৬ সাল থেকে রচিত এই ৩৩টি বই হচ্ছে একটি শব্দের জগৎ। এ শব্দের জগতে বাংলা বইয়ে প্রায় ৫৬ হাজার, প্রাথমিক গণিতে প্রায় ৩৬ হাজার, ইংরেজিতে প্রায় ২৬ হাজার, সমাজ পরিবেশ পরিচিতিতে প্রায় ৫০ হাজার, বিজ্ঞান পরিবেশ পরিচিতিতে প্রায় ৪৯ হাজার শব্দ ছিল। আমাদের প্রাথমিক শিক্ষায় ধর্মশিক্ষার জন্য বই রয়েছে ৪টি। তাতে গড়ে শব্দ সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। এই শব্দের জগৎকে যদি আমরা শ্রেণীভিত্তিক বিভাজন করি তাহলে দেখব-
প্রথম শ্রেণীতে শব্দের সংখ্যা হচ্ছে প্রায় ৪ হাজার
দ্বিতীয় শ্রেণীতে শব্দের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার
তৃতীয় শ্রেণীতে শব্দের সংখ্যা ৪৮ হাজার
চতুর্থ শ্রেণীতে শব্দের সংখ্যা ৮১ হাজার
আর পঞ্চম শ্রেণীতে শব্দের সংখ্যা ১ লাখ ১৪ হাজার
এই পরিসংখ্যান বর্তমানে প্রচলিত বইয়ের ক্ষেত্র প্রযোজ্য নয়; পরিমার্জন-পুর্ববর্তী বইয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
এই শব্দের পরিসংখ্যান দেখে বিস্মিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। এগুলো টোকেন শব্দ বা রকমারি শব্দ। টোকেন শব্দগুলোকে যদি আমরা টাইপ বা সকর্মারি হিসেবে গোনাগুনতি করি তাহলে তার সংখ্যা অনেক কমে যাবে। কেউ কেউ ভাবতে পারেন, শব্দের এই হিসাব আমরা কোথায় পেলাম। উত্তরে সবার অবগতির জন্য একথা বলা সঙ্গত হবে যে, ৬ মাস ধরে আমি এবং আমার ৩ জন গবেষণা সহকারী (শ্যামলী আকবর, রুপা চক্রবর্তী, সাজ্জাদুর রহমান) প্রতিদিন ৩ ঘণ্টা করে ক্রমাগত প্রথম শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত ৩৩টি বইয়ের শব্দ গণনা করেছি, বাক্য গণনা করেছি; গভীর বিশ্লেষকের মনোভঙ্গি নিয়ে বইগুলো পাঠ করেছি। বাক্যের ধরন পরীক্ষা করেছি, শব্দের বানান পরীক্ষা করেছি, হ্রস্ব ই-কার ও দীর্ঘ ঈ-কারের বানান-বিভ্রাট লক্ষ্য করেছি, প্রশ্নোত্তরের সঙ্গতি লক্ষ্য করেছি, অনুশীলনের যৌক্তিকতা অনুধাবন করার চেষ্টা করেছি। সেই সঙ্গে আমরা দেখার চেষ্টা করেছি, পাঠক্রমের যেসব অর্জনোপযোগী প্রান্তিক যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেগুলো পাঠ-উপকরণে কতটা গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
আমরা এই কাজের জন্য যে প্রতিষ্ঠানটির সাহায্য পেয়েছি সে প্রতিষ্ঠানটির নাম শিক্ষা প্রকল্প ও উন্নয়ন গবেষণা ফাউন্ডেশন। আমাদের গবেষণা প্রতিবেদন ‘প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকের ভাষাতাত্ত্বিক মুল্যায়ন’। আমাদের গবেষণা প্রতিবেদনটি পুর্ণাঙ্গ এমন দাবি আমরা করি না, তবু বলা যায় এর পৃষ্ঠা সংখ্যা ৭৫। এর একটি সংক্ষিপ্তসার আমাদের কাছে আছে।
যাই হোক, আজকের বিষয় পাঠ্যপুস্তক নয় এবং তার উন্নয়ন কৌশলও নয়। আজকের আলোচ্য বিষয় প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাক্রম যা বিগত শতাব্দীতে ১০ বছর ধরে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার মৌল সুত্র হিসেবে কাজ করছে, তার মুল্যায়নকৃত ও পরিমার্জিত সংস্করণের চুড়ান্তকরণ। মনে রাখা দরকার, আমাদের পুরনো শিক্ষাক্রমটি বিংশ শতাব্দীতে নির্ধারিত হয়েছিল, এখন একবিংশ শতাব্দী। একটি নতুন শতাব্দীতে এসে আমরা তার পরিমার্জন করছি। এ প্রসঙ্গে কয়েকটি বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করব। প্রথমেই আমি বঙ্গদেশে আধুনিক শিক্ষার সুচনায় যারা শিক্ষাক্রম ও আধুনিক পাঠ-উপকরণ তৈরি করেছিলেন তাদের কথা স্মরণ করিযে দিতে চাই। তাদের সবার কথা নয়, তাদের থেকে মাত্র দু’জনের কথা স্মরণ করাতে চাই, সে দু’জন হলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও মদন মোহন তর্কালঙ্কার।
বিদ্যাসাগরেরও আগে একদল ব্রিটিশ ও উপমহাদেশীয় বিদ্বান সম্মিলিত প্রজ্ঞা ও প্রচলিত ঐতিহ্যের সমন্বয় সাধন করে ‘স্কুল বুক সোসাইটি’ ও ‘ক্যালকাটা বুক সোসাইটি’ (১৮১৭) প্রতিষ্ঠা করে পাঠক্রম তৈরি করেছিলেন। তারা যে পাঠক্রম তৈরি করেছিলেন এবং সেই পাঠক্রমের অনুসরণে যে বইগুলো রচনা করেছিলেন তাতে ভারত উপমহাদেশের পুর্বাঞ্চলে আধুনিক জ্ঞান, বিদ্যা ও বিজ্ঞানের একটি নবজাগরণ ঘটেছিল-যাকে বাঙালিরা ‘বেঙ্গল রেনেসাঁ’ হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। রসায়নবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, ভুগোল, জ্যামিতি, হিসাববিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা, ইতিহাস-এক কথায় উনিশ শতকের ইউরোপীয় জ্ঞান প্রচারিত ও প্রসারিত হয়েছিল।
আধুনিকতা পাঠ্যপুস্তকের ভেতর দিয়ে এ দেশের মানুষের অন্তরকে বিকশিত করেছিল। উনিশ শতকের পাঠক্রমের জ্ঞানের বীজ যাদের জীবনে পুষ্পিত এবং পল্লবিত হয়ে এ অঞ্চলের মানুষকে যে পৃথিবী জ্ঞান-ভান্ডারের সক্রিয় অধিকারীতে পরিণত হয়েছিল, তার প্রমাণ রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মদন মোহন তর্কালঙ্কার, মাইকেল মধুসুদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মীর মশাররফ হোসেন, সৈয়দ আমীর আলী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রমথ চৌধুরী, জগদীশ চন্দ্র বসু, সত্যেন বসু, প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, কাজী মোতাহার হোসেন, সত্যজিৎ রায়, কাজী নজরুল ইসলাম, আবদুল ওদুদ, আবুল হোসেন, আবুল ফজল ও আরো অগণিত সৃজনশীল মানুষ।
আমরা সেই ইতিহাস আলোচনা করতে চাই না। আমরা বলতে চাই একটি জাতির পাঠক্রমের সঙ্গে তার অগ্রগতি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। অজ্ঞতা, কুসংস্কার, অন্ধত্ব, মৌলবাদিতা, সাম্প্রদায়িকতা, সন্ত্রাস, ফ্যাসিবাদ, অসহনশীলতা এসব জিনিস কোনো জাতির, কোনো সভ্যতার অগ্রগতির সুচক হতে পারে না। যে জাতির ভান্ডারে মুক্তবুদ্ধি ও জ্ঞানের পরিমাণ ও প্রজ্ঞার ব্যাপ্তি যত বেশি সে জাতি ততই উন্নত।
বাংলাদেশকে অনেকেই দরিদ্র দেশ বলে থাকে। এ কথার সঙ্গে পুরোপুরি একমত হওয়া যায় না। কারণ যা অনেক দেশের নেই, সেই সম্পদ আমাদের আছে। সেই সম্পদ মানব-সম্পদ আর প্রাকৃতিক সম্পদ। আমরা যদি মানব-সম্পদকে অজ্ঞানতা, কুসংস্কার ও মানসিক জড়তা থেকে বুদ্ধির মুক্তির পথে এগিয়ে নিয়ে মানব-সম্পদে রুপান্তর করতে পারি তাহলে আমাদের দারিদ্র্যের অপবাদ সইতে হবে না। আর প্রাকৃতিক সম্পদকে যদি ব্যবহার করতে পারি তাহলে পশ্চাৎপদতার গ্লানি থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। আমাদের মুক্ত করতে পারে একটি আলোকিত শিক্ষাব্যবস্হা। শিক্ষাব্যবস্হার সবচেয়ে বুনিয়াদি স্তর হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা।
বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা মানে ৬ থেকে ১১ বছরের শিশু শিক্ষা। সেই শিশুর শারীরিক শক্তি, মানসিক শক্তি, সেই শিশুর ধারণার শক্তি, কল্পনার শক্তি, উপলব্ধির শক্তি একজন বয়স্ক মানুষের অনুরুপ শক্তির তুল্য হতে পারে না। সে কারণে শিশুর জন্য যখন আমরা, অভিভাবকরা খাবার নির্ধারণ করি, তখন সেই খাবার হয় শিশুখাদ্য, তাদের জন্য যখন ওষুধ ও পথ্য নির্ধারণ করি, তখন তাও বয়স্ক মানুষ থেকে হয় পৃথক। শিশুর ভৌতিক ও আধিভৌতিক জ্ঞানের পরিধি অপরিসীম নয়। যে কোনো মানুষকে তার শক্তি ও সামর্থেøর অধিক ভার আরোপ করলে হিতে বিপরীত হয়-একথা আমরা জানি। শিশুর শিক্ষার ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য।
আমরা অনেক সময় শিশুদের ভবিষ্যতের উন্নতির জন্য, মঙ্গলের জন্য, পরিপুষ্টির জন্য, আমাদের বয়স্ক বিবেচনা অনুযায়ী কাজ করতে গিয়ে শিশুর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির কারণ ঘটাই। সেজন্য ডাক্তাররা বলে থাকনে, শিশুদের জন্য যে ওষুধ, যে পথ্য, যে খাবার-সেগুলো তাদের দিতে হবে। বয়স্কদের খাবার শিশুদের দিলে তাতে হিতে বিপরীতের সম্ভাবনাই থাকে।
আমরা আমাদের যে সামান্য গবেষণার কথা আগে উল্লেখ করেছি তাতে লক্ষ্য করেছি, প্রথম শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত যে ‘ভাববস্তু’ দেয়া হয়েছে সেই ‘ভাববস্তু’ বহন কার জন্য ভাবলোক শিশুদের সৃষ্টি হয়নি। ‘ভাববস্তু’কে ‘বিষয়বস্তু’তে রুপান্তর করার জন্য যে প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়েছে তাতে ‘ভাববস্তু’র ষোলআনা প্রতিফলন ‘বিষয়বস্তু’তে ঘটেনি। শুধু তাই নয়, ভাববস্তুতে সীমাবদ্ধতা আছে-তার মধ্যে যৌক্তিক পারস্পর্যের ঘাটতি রয়েছে বহুল পরিমাণে। অনেকেই জানেন, পাঠ-উপকরণ নির্মাণ করা একই সঙ্গে একটি বৈজ্ঞানিক কর্ম এবং একটি শৈল্পিক কর্ম। সেই সঙ্গে একটি দার্শনিক কর্মও বটে। একটি দার্শনিক কর্মও একটি প্রায়োগিক কর্ম। এরকম একটি কঠিন কর্ম যারা করেছিলেন তারা অবশ্যই আমাদের শ্রদ্ধেয়। তারা তাদের জ্ঞান, শ্রম, মেধা, প্রজ্ঞা সবটুকু ব্যবহার করে পাঠ্যবস্তু ও পাঠক্রম তৈরি করেছিলেন। আধুনিক ভাষাতাত্ত্বিক জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে শিক্ষাতত্ত্বের দেশীয় পরিস্হিতিতে তার প্রয়োগ পরিপুর্ণ হয়নি।
আজ সময় এসেছে সেই পথিকৃৎ পাঠ-উপকরণ নির্মাতাদের প্রথামিক প্রয়াসে যেসব সীমাবদ্ধতা ছিল, অভিজ্ঞতার আলোকে সেগুলোর উন্নয়ন সাধন করা। নতুন শিক্ষাদর্শনের আলোকে, নতুন তথ্য ও উপাত্তের আবির্ভাবে এবং নতুন পাঠ নির্মাণ-কৌশলের আলোকে আধুনিক পৃথিবীর উপযোগী, একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী, একটি জ্ঞানভিত্তিক ও সৃজনশীল সমাজের উপযোগী পাঠক্রম নির্মাণ করা এবং এই পাঠক্রমের আলোকে পাঠ-উপকরণ তৈরি করা।
যারা পাঠ্যপুস্তক লেখার কাজ করছেন তারা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানুষ সৃষ্টির কণ্টকাকীর্ণ পথকে কুসুমাস্তীর্ণ করার ব্রত নিয়ে কাজ করছেন। আশা করি, উনিশ শতকের নবজাগরণের দৃষ্টান্তটি সবাই মনে রেখে আমরা সবাই আমাদের দায়িত্ব সম্পন্ন করব।
এ প্রসঙ্গে একটি সতর্কতা অবলম্বনের দিক উল্লেখ করতে চাই। আমি তিনটি সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্হার দুর্গতির কথা জানি-একটি রাশিয়ার, অন্যটি শ্রীলঙ্কার আর তৃতীয়টি আফগানিস্তানের। সোভিয়েত রাশিয়ার শিক্ষাব্যবস্হার মতাদর্শগত ভিত্তি ছিল মার্কসবাদ। যতদিন পুর্ণ মানবতাবাদ তার শিক্ষাব্যবস্হায় ছিল ততদিন তাদের রাষ্ট্র ও সমাজ অগ্রগতি অর্জন করেছিল। যখন মার্কসবাদের মতাদর্শ চাপিয়ে দেয়ার খেয়াল পাঠক্রম নির্মাতাদের ঘাড়ে চেপে বসেছিল, তখনই শিশুরা অমার্কসবাদী হয়ে উঠল। পরিণতিতে সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙে গেল। শ্রীলঙ্কা একটি বহুজাতিক ও বহু ধর্মের দেশ। সেখানে বৌদ্ধধর্ম প্রধান ধর্ম, তারপর হিন্দুধর্ম, শেষে ইসলাম ধর্ম। সববেশে খ্রিষ্টান ধর্ম। তারা জাতি হিসেবে তামিল ও সিনহালা এই দুই বড় গোষ্ঠীতে বিভাজিত। বৌদ্ধ ধর্মকে অন্য ধর্মের ওপর প্রাধান্য দিতে গিয়ে, সিনহালা ভাষাকে অন্য ভাষা থেকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে, তারা তাদের পাঠক্রমে ‘অহিংস মানবতাবাদে’র পরিবর্তে ‘সহিংস বৌদ্ধ দর্শন’কে প্রাধান্য দিতে গিয়ে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে যে যুদ্ধের শুরু হয়েছিল এখনও তার জের চলছে। আর আফগানিস্তানের তালেবানি যুগে যে পাঠক্রম অনুসরণ করা হলো তাতে একটি অপরাজিত জাতি পরাজয়ের কলঙ্ক মাথায় নিল। সেই দুঃখের ইতিহাস আপনারা প্রতিদিন প্রতিমুহুর্তে জানতে পারছেন। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’-একথা পৃথিবীর এই অঞ্চলেই প্রথম উচ্চারিত হয়েছিল। এই দর্শনের চেয়ে বড় কোনো জাতীয় দর্শন আমাদের হতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করতে পারি না। গত প্রায় তিন হাজার বছর ধরে এ অঞ্চলে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী একসঙ্গে বাস করেছে। এখনো বাস করছে। আমাদের জনপদের মানুষরা একাধিক ধর্মে, একাধিক প্রথায়, একাধিক মতাদর্শে বিশ্বাস করে। সব শিশুই আমাদের শিশু, বাংলাদেশের শিশু, বাংলাদেশের ভবিষ্যতের মানব-সম্পদ।
আমাদের প্রধান বিবেচ্য বিষয় ছিল ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ সেই কথাটি। সব শিশুই আমাদের শিশু, তাদের আমরা জন্মের ভিত্তিতে, বর্ণের ভিত্তিতে, ধর্মের ভিত্তিতে, অর্থের ভিত্তিতে বিভাজিত করে দেখতে চাই না। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ মানব-সম্পদ হিসেবে, পৃথিবীর গৌরবোজ্জ্বল একটি দেশের গর্বিত নাগরিক হিসেবে দেখতে চাই।
**************************
মনসুর মুসা
দৈনিক আমারদেশ, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০০৮