National Events - http://events.amardesh.com
বিজয় দিবসের ভাবনা ...
http://events.amardesh.com/articles/9/1/aaaa-aaaaaa-aaaaa-/Page1.html
Article Poster
 
By Article Poster
Published on 12/16/2007
 
(অবঃ মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীরপ্রতীক) আজ ১৬ ডিসেম্বর, বাংলাদেশের বিজয় দিবস। ১৯৭১ বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৪টায় ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে হর্ষোৎফুল্ল এক বিশাল জনতার সামনে, আত্মসমর্পণের দলিল স্বাক্ষর করলেন পাকিস্তান সরকার ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান লে. জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি।

বিজয় দিবসের ভাবনা ...

আজ ১৬ ডিসেম্বর, বাংলাদেশের বিজয় দিবস। ১৯৭১ বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৪টায় ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে হর্ষোৎফুল্ল এক বিশাল জনতার সামনে, আত্মসমর্পণের দলিল স্বাক্ষর করলেন পাকিস্তান সরকার ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান লে. জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি। এটা ছিল সেই ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দান, যেখানে বিশাল জনসমুদ্রের মাঝে দাঁড়িয়ে মাত্র ২৮৪ দিন আগে ৭ মার্চ ১৯৭১ সালে দৃঢ়কণ্ঠে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ‘কৌশলী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন’ ঘোষণা দিয়েছিলেন। বিজয়ের মাস এলেই অনিবার্যভাবে ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের দিনগুলোর কথা মনে আসে। ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বহু সহকর্মী ও সতীর্থ দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন। বস্তুত যারাই মুক্তিযুদ্ধে জড়িত ছিলেন, প্রত্যেকেই এই অঙ্গীকার ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে গিয়েছিলেন যে, প্রয়োজনে দেশের জন্য প্রাণ দেব। কেউ দিয়েছিলেন আবার কারো সে সুযোগ আসেনি। ৯ মাস যুদ্ধ চলাকালে যে প্রেরণা সব মুক্তিযোদ্ধাকে উজ্জীবিত করত, তা হচ্ছে­ একটি নতুন দেশ সৃষ্টি করতে হবে, মর্যাদায় ভরপুর একটি নতুন জাতি সৃষ্টি হবে। অন্যায়-অবিচার, শোষণ ও নিপীড়ন যা পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রে অবাধে চলত, সেগুলো বন্ধ হবে। ধর্ম, ভাষা বা অন্য কোনো বৈশিষ্ট্যের কারণে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ থাকবে না। সবকিছু মিলিয়ে সুন্দর পরিবেশ, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, আর্থিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে।

আমরা একটা স্বাধীন দেশ পেয়েছি। এই স্বাধীন দেশে আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে। কারণ আমরা অনেক পিছিয়ে পড়েছি। জানানা গুসমাও, ইস্ট তিমুরের মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতা তিনি স্বাধীনতা পাওয়ার ৯ মাসের মাথায় ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট আব্দুর রহমান ওয়াহিদ (যে ইন্দোনেশিয়ার বিরুদ্ধে তারা যুদ্ধ করেছে), তার রাজপ্রাসাদে ঢুকছিলেন। বিবিসি থেকে তাকে প্রশ্ন করা হলো, তুমি যার বিরুদ্ধে সাত বছর যুদ্ধ করেছো তার অফিসে তুমি ঢুকছো, তোমার অনুভূতি কী? সে বলেছে, আমি যখন যুদ্ধ করেছিলাম তখন আমি ছিলাম ইস্ট তিমুরের একজন গেরিলা ও মুক্তিযোদ্ধা। আজকে আমি একটি দেশের প্রেসিডেন্ট। আমার অনুভূতি, আমার দায়িত্বের মাত্রা পরিবর্তিত হয়ে গেছে। তিনি আমার বৃহত্তম প্রতিবেশী। আমাকে তার সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। এই মানসিকতা প্রয়োজন। আমাদের বিভক্তির আরেকটি কারণ হলো ১৯৭১ সালে যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন এবং বিরোধিতার সীমা পেরিয়ে যুদ্ধাপরাধের মতো অপরাধ করেছিলেন তারা পবিত্র দীন ইসলামের নাম ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু সেটা কোনো মতেই ইসলামের শিক্ষা ছিল না। আবার এরই প্রতিক্রিয়ায় ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পর টেলিভিশনে, সিনেমাতে দাড়িওয়ালা, টুপিওয়ালা মানুষকে ভিলেন হিসেবে দেখা শুরু করল। কিন্তু সেটাও সঠিক নয়। অর্থাৎ এখানেও রিকনসিলিয়েশন বা সমঝোতা প্রয়োজন। আমাদের বিভক্তিটা এমনই পর্যায়ে গেছে যে আমরা বাঙালি না বাংলাদেশী এই মারামারিতেই ২৭ বছর লাগিয়ে দিলাম। অথচ বঙ্গবন্ধুও এটা চালু করে যাননি, জিয়াউর রহমানও চালু করে যাননি। অথচ তাদের নাম দুটো নিয়েই আমরা এ জাতিকে ভাগ করে ফেললাম। আমি বলতে চাই, পৃথিবীতে বিভাজিত জাতি, বিভক্ত জাতি অগ্রগতি করতে পারে না। তবে কোনো অবস্থাতেই মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ বিরোধিতাকারীদের সাথে বা যুদ্ধাপরাধীদের সাথে সমঝোতা অসম্ভব। আমাদের আরেকটু বড় মনের পরিচয় দিতেই হবে। আমাদের মেনে নিতে হবে যে স্বাধীনতার পরও যারা দেশ পরিচালনা করেছেন তাদেরও কিছু কিছু ভুল হয়েছে এবং সেগুলোকেও স্বীকার করে নিতে হবে। যেমন বেশ কিছু দিন আগে পল্টন ময়দানের একটি মিটিংয়ে মঞ্চে দাঁড়িয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বললেন, আমি আমার রাজনৈতিক জীবনে যদি কোনো ভুল করে থাকি তার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। তিনি তো ভুল করেছিলেনই। প্রথম ভুলই ছিল, ১৯৮২ সালের মার্চ মাসের ২৪ তারিখ সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা ব্যবহার করে সংবিধান লঙ্ঘন করে তিনি সামরিক শাসন জারি করেন এবং নিজে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হয়ে যান। ১৯৭২ সালে তৎকালীন সরকার শাসন করা শুরু করে এবং ১৯৭৫ সালের শুরুতে বাকশাল নামক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া কায়েম করে বহুদলীয় গণতন্ত্রকে পদদলিত করেন। এটা ভুল ছিল। সব পত্রপত্রিকাকে বন্ধ করে মোট চারটিকে অনুমোদন দেয়। এটা ভুল ছিল। অনেকে বলে রক্ষীবাহিনী নামক বাহিনী সৃষ্টি করাটাও ভুল ছিল। ১৯৭৫ সালে জাতির জনককে যারা হত্যা করেছে তারা ভুল করেছে। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮১ সালের মে মাসের ৩০ তারিখ পর্যন্ত শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশ শাসন করেছেন। দু’বছর রাজনৈতিক দল ছাড়া, পরে রাজনৈতিক দলসহ এবং মাঝে মধ্যেই তাকে সেনাবিদ্রোহ বা সামরিক বিদ্রোহ মোকাবেলা করতে হয়েছে। এটি করতে গিয়ে অনেক জায়গায় বিচারের পরিবর্তে অবিচারও হয়ে থাকতে পারে। ১৯৮১ সালে যারা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করে তারাও তাদের জঘন্য অপরাধের কথা স্বীকার করতে পারে। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সরকার চলাকালে যেসব সংবিধানবহির্ভূত কর্ম বা অভদ্রজনিত কর্ম হয়েছে সেগুলো স্বীকার করণীয়। ১৯৯১ থেকে ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিন-তিনটি রাজনৈতিক সরকারের আমলে বড় বড় যেসব ভুল হয়েছে সেগুলো স্বীকার করা অবশ্যই উচিত এবং অঙ্গীকার করা উচিত যে, তাদের দ্বারা ভুলের পুনরাবৃত্তি হবে না।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও যদি আমাদের কোনো পরিবর্তনই না হবে তা হলে দেশ স্বাধীন করার স্বপ্ন দেখেছিলাম কেন? আমাদের দেশ স্বাধীন হওয়া কিন্তু অনেক দিন হয়ে গেল। কিন্তু স্বাধীনতার আগের ২৪ বছরের সম্মিলিত পাকিস্তান ও পরবর্তী ৩৬ বছরের স্বাধীন বাংলাদেশ এবং বর্তমান পাকিস্তানের মধ্যে একটি তুলনামূলক চিত্র আঁকলে তা কেমন হবে? সামগ্রিকভাবে সৎ না থাকতে পারার কারণে, দুর্বল দেশপ্রেমের কারণে, সুশাসন কায়েমে সৃষ্টিকর্তার অনুশাসন মেনে চলার ব্যর্থতার কারণে, জনগণের প্রতি শাসকদের ক্রমশ অকৃতজ্ঞ হয়ে ওঠার কারণে আমাদের আজ যে অবস্থানে উঠে যাওয়ার কথা ছিল আমরা তার ধারেকাছেও যেতে পারিনি। বরং পাকিস্তান আমলে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর নেতাদের মধ্যে যে দোষ ও দুর্বলতা ছিল, স্বাধীনতার পর কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা আরো পরিসরে বৃদ্ধি পেয়েছে। কথাগুলো শুনতে খারাপ লাগলেও বাস্তবতা এটাই। কেউ কেউ বলতে পারেন গত ৩৬ বছরে আমরা উন্নতিও কম করিনি। স্বাস্থ্য, কৃষি, সেবা, যোগাযোগ, শিক্ষা, চিকিৎসা, শিল্প-বাণিজ্য প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমরা কিছু না কিছু এগিয়েছি। একই সাথে অস্বীকার না করেই বলা যায়, আমরা বহু ক্ষেত্রেই ধারাবাহিকতা ঠিক রাখতে পারিনি। পাকিস্তান আমলের পাট শিল্প এখন ধ্বংসের মুখে। আমাদের সোনালি আঁশের বাণিজ্যটা পায়ে হেঁটে ভারতে চলে গেছে। এ দেশের ভারী শিল্পগুলো ক্রমশ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নতুন শিল্প-কারখানা সে তুলনায় গড়ে ওঠেনি। যে হারে দারিদ্র্য হ্রাস হওয়ার কথা ছিল সে হারে মোটেও হয়নি। পনেরো কোটি মানুষের দেশটাতে আজ বেশিরভাগ লোক গরিব হয়ে বেঁচে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। এ পরিস্থিতির অবসান হওয়া এখন খুব বেশি প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। বর্তমান তরুণদের উদ্দেশে আমার বক্তব্য হলো, আমাদেরকে অবশ্যই এখন ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করতে হবে যে, একটি প্রজন্ম বা জেনারেশন থেকেও কিঞ্চিত দীর্ঘতর সময় অতিক্রম করার পর মুক্তিযোদ্ধারা এই জাতিকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে কতটুকু করতে পেরেছে এবং বাকি কতটুকু পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অবশিষ্ট রেখেছে। গত ৩৬ বছরে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি, উন্নয়ন ও পরিপক্বতা না আসার পেছনে যত কিছুই দায়ী সেটা নিয়ে বিবাদ করা যায় কিন্তু এসব থেকে বড় হলো, যেই প্রজন্ম নষ্ট হয়নি সেই প্রজন্মকে নষ্ট হতে না দেয়া। বড় কর্তব্য হলো, সেই প্রজন্মকে দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করা। ওয়ান-ইলেভেনের পর অনুপ্রাণিত হওয়ার পরিবেশ আমরা পেয়েছি। তাই অতীতে আমরা কী পেয়েছি বা পাইনি সেটা থেকে বড় কথা­ ভবিষ্যতে আমরা কী পেতে পারি সে বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া। বর্তমান প্রজন্ম যারা ত্রিশ-নিু, তারা কী পেতে পারে বা কী পাওয়া উচিত­ সেটার ওপর গুরুত্বারোপ করা। আমরা যদি সচেতন না হই তাহলে আমরা মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হয়েও পদ্ধতি ও রিপুর কাছে পরাজিত থেকে যাব। দেশকে সঠিক পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য একজন বীর আমাদের প্রয়োজন। আমি চূড়ান্ত হতাশার শীর্ষে থেকেও স্বপ্ন দেখতে চাই, জাতীয় বীর আসবেন। তবে তারা কোনো এক দিন সকালে আকাশ থেকে পড়বেন না। জাতীয় বীর এ দেশে আগেও ছিলেন, এখনো আছেন। যিনি শুধু বড় বড় কথা নয়, কাজ দিয়ে মানুষের মন জয় করবেন, মানুষ তাকে বরণ করে নেবে। তাকে এগিয়ে আসতে হবে দেশের স্বার্থে। তরুণ প্রজন্মও যেন বিষয়টি উপলব্ধি করে এটাই বিজয় দিবসের প্রার্থনা।

************************
লেখকঃ অবঃ মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীরপ্রতীক
১৯৭১ সালে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং ৩ নম্বর সেক্টরের একজন মুক্তিযোদ্ধা
দৈনিক নয়াদিগন্ত, ১৬ ডিসেম্বর ২০০৭