- Home
- ভাষা দিবসঃ ২১শে ফেব্রুয়ারী
- ভাষা সংগ্রামের বর্তমান পর্যায়
ভাষা সংগ্রামের বর্তমান পর্যায়
- By National Days
- Published 02/24/2008
- ভাষা দিবসঃ ২১শে ফেব্রুয়ারী
- Unrated
২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস ও ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের মতোই ২১ ফেব্রুয়ারি জাতীয় দিবস হিসেবে মর্যাদা পেয়ে আসছে। এই দিবসটি দুর গ্রামাঞ্চল থেকে ঢাকা শহর পর্যন্ত একইভাবে পালিত হয়, সর্বজনীন উৎসবের মতো। কেন, কী কারণে? ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করেন। তদানীন্তন মুসলিম লীগ সরকার গুলি করে। সালাম বরকত রফিক জব্বারসহ অনেকে শহীদ হন। কেবল আন্দোলনের মাত্রা ও জঙ্গিত্ব যদি দেখি, তাহলে দেখব এর পরেও অনেক বড় বড় গণআন্দোলন হয়েছে। কারফিউ ভেঙে মিছিল করেছে মানুষ। সামরিক শাসনকে অগ্রাহ্য করে মানুষ রাস্তায় বেরিয়েছে। গণঅভ্যুত্থানও আমরা দেখেছি। তবু ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনাটি আমরা বিশেষভাবে স্মরণ করি। কেন? কারণ ’৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় জীবনে এমন এক মাইলফলক, যেখান থেকে জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল। জাতীয় সেন্টিমেন্টের আবেদন বোধহয় সবচেয়ে বেশি। তাই ২১ ফেব্রুয়ারি বিশেষ মর্যাদা নিয়ে আমাদের মাঝে উপস্হিত হয়।
বাংলাভাষা কৃষ্টি ও একক জাতির সাধারণ বৈশিষ্ট্য যথেষ্ট পুরনো হলেও প্রকৃত অর্থে জাতি ও জাতীয়তার জন্ম কিন্তু বেশি পুরনো নয়। বুর্জোয়া বিকাশের সঙ্গেই জাতির উদ্ভব। এটা মার্কসবাদী ব্যাখ্যা। মোগল যুগে অথবা ব্রিটিশ আমলের প্রথম যুগেও বাঙালি জাতীয় চেতনার সৃষ্টি হয়নি। সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদ তো ছিলই না। অন্যথায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ অল্পসংখ্যক সৈন্য নিয়ে দুইশ বছর রাজত্ব করতে পারত না। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়েই জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ও প্রসার ঘটেছিল। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে বাংলার এই অংশের জনগণের বিরাট ভুমিকা ছিল। তবু গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকে জাতীয়তাবাদ দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং বিস্তৃত হয়েছিল। সাময়িকভাবে হলেও জিন্নাহ সাহেবের ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ অর্থাৎ দ্বিজাতি তত্ত্ব এই দেশের মুসলমান জনগণকে আচ্ছন্ন করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু সেটা সাময়িক। তাই ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ চলে গেলেও আমাদের জাতীয় সংগ্রাম অসম্পুর্ণ রয়ে গিয়েছিল। পাকিস্তানি শাসকরা তদানীন্তন পুর্ব পাকিস্তান বা পুর্ববাংলাকে কলোনি রুপেই বিবেচনা করত। তাই পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা রুপে স্বীকৃতি না দিয়ে চাপিয়ে দিয়েছিল উর্দু ভাষা। জাতিগত নিপীড়নের এটি ছিল একটি দিক। তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম আমাদের মাঝে জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটায়। আমরা পরিচয়ের সন্ধান শুরু করি। পঞ্চাশের দশকের ভাষা আন্দোলনের গভীর তাৎপর্য এখানেই নিহিত রয়েছে। আর সেজন্যই ২১ ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় জীবনে এতটা বড়।
একসময় ছিল যখন এই দেশের মুসলমান জনগোষ্ঠীর উপরতলার লোকজন ঘরে উর্দু কথা বলত। ওটা যেন আভিজাত্যের লক্ষণ। অথচ ভাষা হিসেবে বাংলা অনেক বেশি সমৃদ্ধ ছিল। তবু খানদানি মুসলমানের ভাষা উর্দু আর চাষাভুষার ভাষা বাংলা। মুসলমান সমাজে এরকম ধারণা দেয়ার চেষ্টা হয়েছিল। আরো বলার চেষ্টা হয়েছিল, বাংলা হলো হিন্দুর ভাষা। এ কারণে রবীন্দ্রনাথকে নির্বাসন দেয়ার চেষ্টাও করা হয়েছিল পাকিস্তান আমলে। আমরা ইতিহাসের সেই অধ্যায় অতিক্রম করে এসেছি। এর জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে- রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগ্রাম। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকেই সেই সংগ্রাম গতি পেয়েছিল। তাই ২১ ফেব্রুয়ারির তাৎপর্য আমাদের জাতীয় জীবনে এতটাই গভীর।
আমি উর্দুবিদ্বেষী নই। কখনোই না। আমি পৃথিবীর কোনো ভাষাকে ছোট করে দেখি না। কিন্তু যখন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে আমাদের নিজ মাতৃভাষাকে তুচ্ছজ্ঞান করতে এবং অন্য কোনো ভাষাকে অভিজাত ভাষা বলে চালানোর চেষ্টা হয়, তখন অবশ্যই আমি তার বিরুদ্ধে দাঁড়াব। দাঁড়িয়েছিল এদেশের সাধারণ মানুষ, যখন শাসকশ্রেণী আমাদের মাতৃভাষাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে এবং শাসকশ্রেণীর নিজস্ব ভাষা উর্দুকে আমাদের ওপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। সেটাই হলো ভাষা আন্দোলন।
বাংলাভাষা এদেশের সাধারণ মানুষের ভাষা। কিন্তু ’৭১-এর আগে যারা ছিল শাসকশ্রেণী তাদের ভাষা ছিল ভিন্ন। একদা ফার্সি ছিল রাজভাষা, যে ভাষায় মোগল শাসকরা কথা বলতেন। তারও আগে, সেই প্রাচীন ভারতে সংস্কৃত ছিল রাজভাষা। তখন অবশ্য বাংলাভাষার উদ্ভব হয়নি। প্রাকৃত বা অন্য যেসব ভাষায় সাধারণ শ্রমজীবী জনগণ কথা বলত, তা কখনো মর্যাদা পায়নি। সংস্কৃত কখনোই কথ্য ভাষা ছিল না বলেই পন্ডিতরা মনে করেন। তবু দেখি মহাকবি কালিদাস সংস্কৃত ভাষায় সাহিত্য রচনা করেছেন। তবে তার নাটকে ‘নিম্নশ্রেণী’র লোকেরা অবশ্য সংস্কৃত ভাষায় কথা বলছে না। অর্থাৎ সবসময় শোষক ও শোষিত, শাসক ও শাসিতের মধ্যে ভাষার পার্থক্য রাখা হয়েছিল।
ইংরেজ আমলে প্রথমে ফার্সি ছিল সরকারি ভাষা। পরে ইংরেজি হলো সরকারি ভাষা। সে সময় কোনো ভারতীয় ভাষার চেয়ে ইংরেজি অনেক সমৃদ্ধ ছিল। সে যা-ই হোক, রাষ্ট্রভাষার ক্ষেত্র সাহিত্য সমৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্বপুর্ণ নয়, গুরুত্বপুর্ণ হচ্ছে জনগণের মুখের ভাষা কোনটি। যদি অন্য কোনো বিদেশি ভাষাকে সরকারি ভাষার স্বীকৃতি দেয়া হয়, তাহলে শোষক শ্রেণীর জন্য তা সুবিধাজনকও বটে। আমি আমার একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি। ষাটের দশকে আমি টঙ্গী শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। মিল কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের বিরুদ্ধে যেসব চার্জশিট দিত তা লেখা হতো ইংরেজিতে। জবাবও দিতে হতো ইংরেজিতে। স্বল্পশিক্ষিত বা অক্ষরজ্ঞানহীন শ্রমিকরা শুধু চার্জশিটের জবাব দেয়ার জন্যই অন্যের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হতো। ভাষার কারণে তারা কতো অসহায় বোধ করত! ইংরেজি ভাষা এখানে শ্রেণী দমনের হাতিয়ার রুপে ব্যবহৃত হয়েছে।
উর্দু ভাষার সামাজিক আধিপত্য বা তথাকথিত আভিজাত্যের বিষয়টি এখন আর নেই। কিন্তু ইংরেজির দাপট আছে। আর ঠিক একইভাবে ইংরেজি ভাষাকে ব্যবহার করা হচ্ছে শোষকশ্রেণীর সামাজিক আধিপত্য বজায় রাখার জন্য। আমি ইংরেজি ভাষা শিক্ষার বিপক্ষে নই। মোটেও না। বরং আমি মনে করি, কোনো একটি আন্তর্জাতিক ভাষা স্কুলের ছেলেমেয়েদের বাধ্যতামুলকভাবে শেখানো উচিত। আর সেক্ষেত্রে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজিটাই আমাদের জন্য সুবিধাজনক। ইংরেজি ভাষা না শিখলে আমরা উচ্চতর জ্ঞান অর্জন করতে পারব না। কিন্তু আমি ইংরেজি ভাষাকে সরকারি কাজে ব্যবহার করার বিরুদ্ধে। ধনী পরিবারের সন্তানরা ইংরেজি মিডিয়ামে পড়ে। তারা যেসব দামি স্কুলে পড়ে, সেসব স্কুলে সত্যিকারের শিক্ষা কতটা লাভ করে, সে সম্পর্কে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তবে তারা চটপট ইংরেজি বলতে শেখে (ইংরেজি সাহিত্যটা ভালোভাবে জানে বলে আমার মনে হয় না)। আর এই ইংরেজি জানাটাই এই সমাজে গুরুত্বপুর্ণ। শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে ধনীর সামাজিক পার্থক্য রচনায় তা গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা রাখে। ভাষা এখানে শোষণের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সমাজ করতে হলে ইংরেজি ভাষার এই সামাজিক আধিপত্য দুর করতে হবে। তা করতে হলে সর্বস্তরে সত্যিকারভাবে মাতৃভাষার প্রচলন করতে হবে। এখনো হাইকোর্টে সবরকম লেখালেখি, বিতর্ক ও রায় ঘোষণা হয় ইংরেজিতে। কেন? বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃত হওয়ার পরও কেন হাইকোর্টের ভাষা হবে ইংরেজি? বেশ কয়েক বছর আগে ভাষাসৈনিক গাজীউল হক হাইকোর্টে কোনো এক মামলায় বাংলাভাষায় আর্জি পেশ করেছিলেন। হাইকোর্ট গ্রহণ করেননি। ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা রুপে স্বীকৃত হয়েছে বলে গর্ববোধ করি, অথচ সর্বোচ্চ আদালতে সেই মাতৃভাষাকেই অপমানিত করি।
মাতৃভাষা বাংলাকে সর্বস্তরে চালু করতে হলে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। তা এক ধরনের শ্রেণীসংগ্রামও বটে। শ্রমজীবী মানুষ ইংরেজি জানে না। উচ্চবিত্তের সন্তানরা ইংরেজি শেখার সুযোগ পায়। তারা ইংরেজি জানাকে ব্যবহার করে শ্রেণী আধিপত্য বজায় রাখার স্বার্থে। গরিব শ্রমজীবী মানুষ কিছুটা হীনমন্যতায় ভোগে ও অসহায় বোধ করে। এর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রামের পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনও গড়ে তোলা দরকার। জাতীয় মানসিক গড়নের পরিবর্তনের জন্য বড় রকম আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। বর্তমান পর্যায়ে এটাই হবে ভাষার সংগ্রাম। তা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশও বটে।
ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা। একথা একশ’বার মানি। ইংরেজি শিক্ষাকে প্রয়োজনীয় মনে করেও আমি উচ্চশিক্ষায় মাতৃভাষার ওপরও গুরুত্ব আরোপ করতে চাই। আজ থেকে ৯০ বছর আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মাতৃভাষায় সবরকম বিদ্যাচর্চার পক্ষে জোর মত দিয়েছিলেন। ‘শিক্ষার বাহন’ শীর্ষক নিবন্ধে তিনি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও বাংলা মাধ্যমের পক্ষে যুক্তি উপস্হিত করেছিলেন। সেখান থেকে কয়েকটি বাক্য উদ্ধৃত করা যাকঃ
‘আমাদের ভরসা এতোই কম যে, ইস্কুল-কলেজের বাহিরে আমরা যেসব লোকশিক্ষার আয়োজন করিয়াছি, সেখানেও বাংলাভাষার প্রবেশ নিষেধ। বলা বাহুল্য, ইংরেজি আমাদের শেখা চাই-ই-শুধু পেটের জন্য নয়। কেবল ইংরেজি কেন? ফরাসি, জার্মান শিখিলে আরো ভালো। সেইসঙ্গে একথা বলাও বাহুল্য যে, অধিকাংশ বাঙালি ইংরেজি শিখিবে না। সেই লক্ষ লক্ষ বাংলাভাষীর জন্য বিদ্যার অনশন কিংবা অধ্যাসনই ব্যবস্হা, একথা কোন মুখে বলা যায়।’
‘এখন কথাটা এই, এই যেসব বাঙালির ছেলে স্বাভাবিক বা আকস্মিক কারণে ইংরেজি ভাষা দখল করিতে পারিল না, তারা কি এমন কিছু মারাত্মক অপরাধ করিয়াছে যেজন্য তারা বিদ্যামন্দির হইতে যাবজ্জীবন আন্দামানে চালান হইবার যোগ্য?’
উদ্ধৃতি আর বাড়াবো না। প্রায় শতবর্ষ আগে মনীষী রবীন্দ্রনাথ যা ভেবেছিলেন তা আজো প্রাসঙ্গিক। আরো অনেক মনীষী ও চিন্তাবিদ একইভাবে উচ্চশিক্ষা, বিচারালয়সহ সকল সরকারি প্রতিষ্ঠানে এবং সমাজের সর্বক্ষেত্রে মাতৃভাষার প্রচলনের পক্ষে কথা বলেছেন। কিছু ইংরেজি জানা সুবিধাভোগী লোক নিজেদের মেকি আভিজাত্য ও আসল আধিপত্য টিকিয়ে রাখার স্বার্থে নানা কায়দায় এটা হতে দিচ্ছে না।
তাই মাতৃভাষাকে সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম আমাদের সামনে রয়েছে। ভাষার সংগ্রামে আমরা এক পর্বে বিজয়ী হয়েছি। আজকের পর্বেও আমাদের বিজয়ী হতে হবে। তবে এই পর্বের সংগ্রামটি বোধহয় আগের চেয়েও কঠিন হবে বলে মনে হয়। কিন্তু যত কঠিনই হোক, জয়ী আমরা হবই। কারণ আমার বিশ্বাস ও আস্হা আছে জনগণের ওপর।
**************************
হায়দার আকবর খান রনো
দৈনিক আমারদেশ, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০০৮