একুশ শতকের এই তথ্য-প্রযুক্তির পৃথিবীতে বিশ্বায়নের ফলে একদিকে যেমন ভৌগোলিক সীমানার বাধা অতিক্রম করে দেশ-জাতিগুলো পরস্পরের কাছে চলে এসেছে, তেমনি মুক্তবাজার আর অবাধ বাণিজ্যের নামে একের পণ্য সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে অন্যের দরজায়। শুধু কি পণ্য? বিশ্বায়নের খোলা হাওয়ার ঝাঁপটায় আমাদের যে দুর্বল জানালাগুলো খুলে গিয়েছিল সেখান দিয়েও এখন অবাধে চলে আসছে অন্য দেশের, অন্য ভাষার, অন্য জাতির সংস্কৃতি।
একুশ শতকের এই তথ্য-প্রযুক্তির পৃথিবীতে বিশ্বায়নের ফলে একদিকে যেমন ভৌগোলিক সীমানার বাধা অতিক্রম করে দেশ-জাতিগুলো পরস্পরের কাছে চলে এসেছে, তেমনি মুক্তবাজার আর অবাধ বাণিজ্যের নামে একের পণ্য সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে অন্যের দরজায়। শুধু কি পণ্য? বিশ্বায়নের খোলা হাওয়ার ঝাঁপটায় আমাদের যে দুর্বল জানালাগুলো খুলে গিয়েছিল সেখান দিয়েও এখন অবাধে চলে আসছে অন্য দেশের, অন্য ভাষার, অন্য জাতির সংস্কৃতি। দরিদ্র দেশ অভাব মেটাতে উন্নত দেশ থেকে যে পণ্য আনে সেখানে শুধু পণ্যই আসে না, তার সঙ্গে আসে সে দেশের সংস্কৃতি ও ভাষার নানা উপাদান। আমরা উন্নত বিশ্ব থেকে মোবাইল প্রযুক্তি এনেছি, একই সঙ্গে এসে গেছে রোমান হরফের এসএমএস আর মোবাইল (মুঠোফোনও হলো না) সংশ্লিষ্ট ডিজ্যুস সংস্কৃতি। আরও উদাহরণ দেয়া যায়-আমরা এফএম ব্যান্ড রেডিও ষ্টেশন ধারণা ও ব্যবসা আমদানি করেছি, এর সঙ্গে চলে এসেছে ইংরেজি ভঙ্গিতে বাংলা উচ্চারণ আর সুপ্রভাতের পরিবর্তে গুডমনিং, গান না শুনিয়ে ‘মিউজিক প্লে’ করা কথায় কথায় সো, থ্যাঙ্কস, লিসেনার জাতীয় এক সময়ের ঔপনিবেশিক এবং একালের বহুজাতিক কোম্পানির বোতলজাত সংস্কৃতি। এই বিশ্বায়ন আর বিদেশি সংস্কৃতির প্রতাপে আজ বাঙালির সংস্কৃতি-ভাষা ভবিষ্যতে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা ভেবে দেখা অবশ্যই জরুরি।
জানালা খোলা থাকলে খোলা হাওয়া ঢুকবে, এটাই স্বাভবিক; কিন্তু খোলা হাওয়ার সঙ্গে যে কিছু দুষিত রোগ-জীবাণু ঢুকতে পারে; যা ঘরের বাসিন্দাদের জন্য ক্ষতিকর সেটা আমরা ভুলে যাই। নিজের সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে হলে যেমন এর চর্চা ও প্রসার প্রয়োজন, তেমনি বাইরের সংস্কৃতির আগ্রাসনও ঠেকানো প্রয়োজন। নিঃশ্বাসের প্রয়োজনে বায়ু আমরা চাই; কিন্তু যে বায়ু ফুসফুসকে সচল রাখার পরিবর্তে ক্ষতি করে তা শনাক্ত করা জরুরি। এ প্রসঙ্গে চীনের দৃষ্টান্ত টানা যেতে পারে। চীন বিশ্বায়ন আর আকাশ-সংস্কৃতির উন্মুক্ত এই বিশ্বে তাদের দেশে সংবাদ আর খেলাধুলা সংশ্লিষ্ট (ইএসপিএন, টেন স্পোর্টস ইত্যাদি) চ্যানেল ছাড়া আর সব ধরনের বিদেশি চ্যানেল নিষিদ্ধ করে রেখেছে। সাংহাইয়ের মতো বিখ্যাত শহরের পাঁচ তারকা হোটেলেও ষ্টার মুভিজ এবং ভারতীয় কোনো চ্যানেল আমি প্রচার হতে দেখেনি। সাংহাই একাডেমি অব সোশ্যাল সাইসের একজন অধ্যাপকের কাছে (ড. জিয়াং ইউয়েজি, অধ্যাপক ইতিহাস বিভাগ) জানতে চেয়েছিলাম চীনের এই সাংস্কৃতিক রক্ষণশীল নীতির কথা। তিনি যা বলেছিলেন তার সারমর্ম হচ্ছে-মানুষ সবসময়ই নতুন কিছুর প্রতি আকৃষ্ট হয়। নতুনকে আঁকড়ে ধরতে চায়-যদিও ভুল বুঝে ফিরে আসে পুরনোতে; কিন্তু ততদিনে নিজেদের সংস্কৃতির অনেক ক্ষতি হয়ে যায়। আমাদের নিজস্ব যে সংৃকতি রয়েছে তার চর্চা না বাড়িয়ে, তাকে নতুন কালের উপযোগী করে উপস্হাপন না করে বাইরেরটা গ্রহণ করা এক ধরনের আত্মহত্যার শামিল। অধ্যাপক জিয়াংয়ের কথা শুনে আমার মনে হলো, আমরা সম্ভবত আমাদের ভাষা-সংস্কৃতিকে আত্মহত্যার পথে নিয়ে যাচ্ছি। খোলা হাওয়ার সঙ্গে যা ঢুকে যাচ্ছে তা যেমন সংস্কৃতির জন্য ক্ষতির, তেমনি অর্থনীতির জন্যও।
এ কালে আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়ে পাঠাতে স্বাচ্ছন্দবোধ করি-অর্থাৎ ইংরেজি সংস্কৃতির আবহে তাদের মানুষ করার চেষ্টা করছি; কিন্তু ভেবে দেখছি না-এর ফলে এখানে যেমন তেমনি বিশ্বের দরবারেও তাদের স্হান সঙ্কুচিত হয়ে যাচ্ছে। আমাদের সন্তানদের আমরা ভালো বাংলা শেখাব, শেখাব ভালো ইংরেজি-ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির ভুত যেন তাদের পেয়ে না বসে, সেদিকে লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন। ২১ ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এই দিবসের তাৎপর্য হচ্ছে সব মাতৃভাষার মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা। আমরা আজ ডিজ্যুসীয় বাংলার দিকে যেভাবে ঝুঁকে পড়ছি, তাতে করে নিজেদের মাতৃভাষার মর্যাদা যেমন রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছি, তেমনি এদের অন্যান্য মাতৃ-ভাষাভাষী জনগণের ভাষা ও সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা করতে, ভালোবাসতে ভুলে যাচ্ছি। এই হচ্ছে আমাদের গৌরবময় একুশের চেতনা।
এভাবে চলতে থাকলে বাংলা ভাষা ও বাঙালির সংস্কৃতি একুশ শতকের শেষে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা নিয়ে ভাষাবিজ্ঞানী-নৃবিজ্ঞানীরা যথেষ্ট সন্দিহান। নিজের ভাষা-মাতৃভাষাকে ভালো না বাসলে, শুদ্ধ ব্যবহার না শিখলে অন্য ভাষাও যে শুদ্ধ করে শেখা যায় না-সে তো অনেক আগেই রবীন্দ্রনাথ বলে গিয়েছেন।
বিশ্বায়নের কারণে ইংরেজি ভাষাতেও পরিবর্তন ঘটছে। ভাষা বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এই শতকের শেষে চালু হবে গ্লেবিশ ইংলিশ-যা তৈরি হবে সীমিত সংখ্যক ইংরেজি শব্দ দিয়ে, যা সবাই সহজে ব্যবহার করতে পারবে। যেহেতু সারা পৃথিবীতে এখন নিয়ন্ত্রণ চলছে ইংরেজির, কাজেই ইংরেজির দাপট ও আধিপত্য থাকবে-এটাই স্বাভাবিক। এর সঙ্গে আমাদের ভাষার প্রতি ভালোবাসা-সম্মান জাগিয়ে রাখতে না পারলে ক্রমে বিপন্ন হয়ে পড়বে।
আমরা প্রয়োজনে সব ভাষা শিখব, বিশেষ করে ইংরেজি; কিন্তু নিজের ভাষাকে খাটো করে নয়। আমরা অন্য সংস্কৃতি উপভোগ করব; কিন্তু চর্চা করব নিজেদের সংস্কৃতি-তবেই টিকে থাকবে আমাদের সংস্কৃতি-ভাষা। নিজের বিকৃত উচ্চারণ করে কিংবা ইংরেজি মিশ্রিত করে উচ্চারণের মধ্যে যে অহঙ্কার প্রকাশ পায় তা আসলে অহঙ্কার নয়, বিকৃত মানসিকতার পরিচায়ক। আমরা এই মানসিকতা থেকে মুক্ত হব। একুশের প্রত্যয়ে নতুন করে ভালোবাসতে শিখব নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি; তবেই ভবিষ্যতে টিকে থাকবে বাঙালির সংস্কৃতি, বাঙালির ভাষা-বাংলা ভাষা।
**************************
সৌরভ সিকদার
দৈনিক আমারদেশ, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০০৮