- Home
- ভাষা দিবসঃ ২১শে ফেব্রুয়ারী
- বাঙলা বানান নিয়ে অনেক প্রশ্ন এখনো
বাঙলা বানান নিয়ে অনেক প্রশ্ন এখনো
- By National Days
- Published 02/24/2008
- ভাষা দিবসঃ ২১শে ফেব্রুয়ারী
-
Rating:




বাঙলা আমাদের মাতৃভাষা। আমাদের আন্তর্জাতিক পরিচিতির ভাষা। আমাদের চিন্তা ও কর্মের ভাষা। সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, শিক্ষণ-প্রশিক্ষণের ভাষা। যুদ্ধ, শান্তি, প্রেম, বিরহ, প্রশংসা অসুয়ার ভাষা। রাজনীতি, অর্থনীতি ও দুর্নীতির ভাষা। এক কথায় বাঙলা আমাদের জীবনের সর্বস্তরের ভাষা। সকাল থেকে শুরু করে রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এই ভাষাতে আমরা কথা বলি। এই ভাষার চর্চা করি। তবে কবি-সাহিত্যিকদের চর্চায় বাঙলা ভাষার শ্রী বাড়ে। শব্দাবলী পায় ব্যবহারিক উৎকর্ষ। কখনো তারা সৃষ্টি করেন নতুন নতুন যৌগিক শব্দ। কখনো বা অতি সাধারণ শব্দ তাদের লালনে হয়ে ওঠে অতি অসাধারণ কুলীন শব্দমানিক্য। অন্যদিকে ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং প্রিন্ট মিডিয়ায় যে শত শত কর্মী বাঙলা ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে কাজ করছেন, দৈনিক লাখ লাখ শব্দ দেখে বেছে গেঁথে তুলছেন, পড়ছেন, শুনছেন, লিখছেন, শোনাচ্ছেন ও পড়াচ্ছেন বাঙলা ভাষা চর্চায় তাদের অবদানও বিপুল। আর যারা মিডিয়ার মাধ্যমে কথা বলছেন এবং লিখছেন, তাদের ভাষা চর্চাও বিশেষ মাত্রার দাবিদার। আজ বানানের প্রসঙ্গেই যখন প্রশ্ন তুলতে যাচ্ছি, তখন প্রিন্ট মিডিয়ার জগতটাকেই সামনে রাখতে চাই। এ ক্ষেত্রে প্রকাশনা শিল্পের শত-সহস্র বই-পুস্তক এবং টেক্সট বুক বোর্ডের বইয়ে লিখিত বানান নিয়েও কথা আসতে পারে।
প্রথমেই বুঝতে হবে আমাদের বাঙলা বানানের সমস্যা কোথায়? কেউ দায়ী করছেন বর্ণ বাহুল্যকে, কেউ বা বাঙলা ভাষার প্রাচীন বানান স্বাধীনতাকে। বর্ণ বাহুল্যের সমস্যাটা বোঝা সহজ। যেমন দুই জ, দুই ন, দুই ব, তিন শ-এর নালিশ নিয়ে বাচ্চারা মুখিয়ে থাকে। তাদের মতে, একটা জ দিয়েই কাজ চলতে পারে। আমিও তাই মনে করি। নইলে আরবি-ফারসি শব্দ লেখার জন্য অন্তস্হ-য-এর বিধান দেয়ার পরও বর্গীয় জ-এর সঙ্গে আপস বদলের উদারতা টিকে থাকে কী করে? অর্থাৎ এখন নামাজ বা নামায কোনোটাই ভুল নয়। তাহলে বাচ্চারা শিখবে কোনটা?
কেউ কেউ বলেছেন, ‘বানান বিভ্রাট বাঙলা ভাষার মজ্জাগত স্বভাব’। কোনো কোনো চিন্তাশীল ব্যক্তি কথাটাকে সমর্থনও জানিয়েছেন। কেউ কেউ বাঙলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণবিদ ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেডের বক্তব্যকে সারসত্য মনে করেছেন। হ্যালহেড বলেছেন যে, বাঙলা ভাষার বর্ণ বাহুল্যই বানানের জটিলতার কারণ। হ্যালহেড আরো বলেছেন, বাঙলা ভাষা ব্যবহারকারীদের অবহেলা এবং অজ্ঞতাও বানান বিভ্রাটের জন্য দায়ী। এই বক্তব্যের একটু ব্যাখ্যা দেয়া যাক। যেমন-
ক. বাঙলা ভাষায় বর্ণ বাহুল্য আছে। তো সে আর নতুন কথা কি? তবু এখন পর্যন্ত স্বরবর্ণের তালিকা থেকে ঋ-কে আমরা বাদ দিচ্ছি না। ৯ বা ‘লি’ কখন, কীভাবে বাদ পড়েছে, তা আমরা জানি না। স্বরবর্ণের তালিকা থেকে যোগিক বা ডবল ঋ এবং যৌগিক লি-কে বাদ দিয়েছিলেন বিদ্যাসাগর। গৌড়ীয় প্রাকৃত থেকে ১৬টি হল বর্ণ (অ আ ই ঈ উ ঊ ঋ ঋৃ ৯ ৯৯ এ ঐ ও ঔ অং অঃ) বেছে তুলেছিলেন রামমোহন। সেখান থেকে বিদ্যাসাগর বাদ দিলেন মোট চারটি (ঋৃ ৯৯ অং অঃ)। এরপর ওই তালিকায় আর কেউ হাত দেয়নি। অনাদরে নিজে নিজেই গেছে লি (৯)। রয়ে গেছে ঋ। এখন টেক্সট বুক বোর্ডের নবম-দশম শ্রেণীর বাঙলা ব্যাকরণে ধ্বনি প্রকরণের পাঠে লেখা হচ্ছে, ঋ-কে এখন আর স্বরবর্ণ হিসেবে গণ্য করা যায় না। কিন্তু সেখানে বলা হয়নি যে, ফুসফুসের বাতাস মুখের ভেতর কোথাও বাধা পেলেই তা আর স্বরবর্ণ থাকে না। ঋ-এর ক্ষেত্রে যেটা হয়। বলতে হয় ‘রি’। পরের প্রশ্ন হলো ঋ-কে একেবারে বাদ দেয়া হবে, না ব্যঞ্জনবর্ণের তালিকায় বর্গীয় বর্ণগুলোর পরে কোথাও রেখে দেয়া হবে? এতদুর আমরা কেউ ভাবিনি। তাই ঋ-এর পরিচিতি হয়েছে না ঘরকা, না ঘাটকা?
ব্যঞ্জন বর্ণেও বাহুল্য আছে। অনেক বিশদ আলোচনায় না গিয়েও যেটুকু বলা যায়, তা হলোঃ দুই জ, দুই ন, তিন শ, দুই ব, বিসর্গ এবং কারো কারো মতে ঞ বাঙলা উচ্চারণে দুই জ একই রকম। দুই ন একই রকম। তিন শ দুই রকম। দুই ব দেখতে এক কিন্তু উচ্চারণের পার্থক্য পাওয়া যায় যুক্তবর্ণে ব্যবহারের সময়। বিসর্গ আর ব্যবহৃত হয় না বাঙলা শব্দের অন্তে। ঞ বেচারা যুক্তবর্ণে স্পষ্ট ন হয়ে যায়। তাই কোনো কোনো বাচ্চাকে চঞ্চল এবং ঝঞ্ঝা লিখতে দেখেছি ‘চনচল আর ঝনঝা’। ওরাই আসলে সাহসী বৈজ্ঞানিক। সত্য বুঝতে সময় লাগে না। সত্য প্রকাশে সংস্কারের ধার-ধারে না। মুক্ত বুদ্ধি নিয়ে আনন্দে থাকে।
জনাব হ্যালহেড কতটুকু জানতেন বাঙলা ভাষার? তবু ভেবেছেন সমস্যার কথা। কিছু সমস্যা চিহ্নিত করা আর ভাষার অন্তর্গত আচার-ঐতিহ্য উচ্চারণ মনস্কতা জানা এক কথা নয়। তবে বাংলাদেশের লোক যে আয়েশি এবং গা ঢেলে ভাত, মাছ, দুধ, দই ও ঘি খেয়ে বাঁচতে ভালোবাসে, সে আর নতুন কথা কি? তাই তো ভারতচন্দ্র চেয়েছেন, ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে’। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘স্তন্যপায়ী বাঙালি’। এক সময় দুধ-ভাত জোগাড় হয়ে যেত সহজে। এখন জনসংখ্যা আর খাদ্য উৎপাদনের অনুপাত মোটেই মেলে না। তাই খাবার জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হয় মানুষকে। ব্যতিক্রমের কথা স্বীকার করেই বলছি, কঠোর পরিশ্রমের ঐতিহ্য নেই আমাদের। তাই সব কিছুকে সহজলভ্য করার জন্য দুর্নীতিকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছি আমরাই। অনেক টাকা, অনেক সম্পদ, অনেক আরাম-আয়েশ, খাওয়া-পরার ব্যবস্হা করেছি সৎ পরিশ্রম না দিয়েই। এই মন-মনন নিয়ে বানান বিভ্রাটের কথা কেউ ভাবতে পারে না। ভাবেও না। তাই যার যেমন ইচ্ছা তেমন করে বানান লিখছে। বানান যে একটা শৃঙ্খলা এবং এই শৃঙ্খলাকে ঢেলে সাজানোতেও যে শৃঙ্খলা প্রয়োজন, সে দায় কেউ নিতে চায় না। তবু যুগের পরিবর্তন অপ্রতিরোধ্য। তাই আমাদের আজকালকার পরিবর্তিত জীবনাচার, মানে খাওয়া, পোশাক, চাল-চলন, কথাবার্তায় যে নতুনত্ব দেখা যাচ্ছে, তার বাহন তো হচ্ছে অনিবার্যভাবেই ভাষা। সুতরাং আসবেই পরিবর্তন। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। হয়তো বা প্রতিরোধেরও সাধ্য নেই।
হ্যালহেড কখনো ভাবতে পারেননি যে, ঐতিহ্য সুত্রে পাওয়া বাঙলা যুক্তাক্ষরগুলো এক সময় বাঙলা ভাষীদের দ্বারাই ভেঙে যাবে। কখনো কম্পিউটারে লেখার দোহাই দিয়ে, কখনো সরলীকরণের ধুয়া তুলে। যেমন-সিন্ডিকেট, ইন্ডিয়া শব্দের বানান এখন ‘সিনডিকেট এবং ইনডিয়া’ হয়ে যাচ্ছে। পত্র-পত্রিকাতে তো দেখছিই, দেখছি স্কুলের বাচ্চাদের খাতায়। আবার ‘সঞ্চয়, সুরঞ্জনা’ লিখছে ‘সনচয়, সুরনজনা’। কার দোষ দেয়া যাবে? কার হাত চেপে ধরা যাবে? তাই চিন্তাবিদ এবং ভাষাসচেতন ব্যক্তিদের আশু তাগাদার ভিত্তিতে নজর দিতে হবে এসব দিকে। কী করবেন আর কী বলবেন তারা, সেটা নিয়ে ভাবতে এবং কাজ করতে হবে। হ্যালহেডের অভিযোগ অনুযায়ী বাঙলা ভাষার প্রতি অবহেলা এবং অজ্ঞতার দায় নিয়ে আর চলবে না কিংবা তার কথা উদ্ধৃত করে আমাদের দীনতা কর্মবিমুখতা এবং গবেষণাবিমুখতার বন্দনাও করতে চাই না।
খ.
বাঙলা ভাষাকে ভালোবাসার জন্যই বানান ও ব্যাকরণ নিয়ে আন্দোলন গড়ে ওঠে ওই শতকেই। রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী, রবীন্দ্রনাথ এবং হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর কাতারে উইলিয়াম কেরীর নামও করতে হয়। কেরী সাহেব খুব ভালো বাঙলা জানতেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশতেন তিনি ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে। বাঙলাটা তখনই রপ্ত করেন। তারই ভিত্তিতে বানানের ওপর ছড়ি ঘুরিয়েছেন তিনিও।
প্রমিত ভাষা গড়ে ওঠার পর সমস্যা এলো উচ্চারণানুগ বানান লেখার তাগাদা থেকে। যেটা এখনো থেকে গেছে। তাই তৎসম শব্দের বানান রীতির চেয়ে এখন অনেক বেশি ভাবিয়ে তুলছে প্রমিত বাঙলার বানান। এ ক্ষেত্রে ভাষার অবহেলা বা অজ্ঞতাকে দায়ী করা যায় না। হ্যালহেড সাহেব যাই বলুন, প্রমিত বাঙলার স্রোত এবং গতি সম্বন্ধে তার কোনো ধারণাই ছিল না; বরং বলতে পারি, স্রোতস্বিনীকে বেঁধে নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে যেমন পাড় ভেঙে এবং বন্যায় দু’কুল বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, ভাষার বহতাগুণও তেমনি। উপচে পড়ছে ভাষার তরঙ্গ। হায় হায়, কি ভুল, কি যন্ত্রণা ইত্যাদি বললে সমাধান আসবে না। তবে আমরা পানিনির মতো ভাষা প্রকৌশলী চাই না, যাতে ভাষা দম বন্ধ হয়ে মরেই যাবে। আমরা চাই একটা সৌজন্যমুলক শৃঙ্খলা। যার মধ্যে সৌষ্ঠব থাকবে। সর্বজনবোধতা থাকবে। পারিপাট্য তো বটেই। বাড়াবাড়ি বা মারামারি নয়। পারস্পরিক দোষারোপ বা নিন্দাও নয়। এখন যেটা প্রয়োজন, তা হলো কাজ কাজ আর কাজ। সমঝোতার মাধ্যমে গঠনমুলক কাজ।
প্রশ্ন হতে পারে, বানানের শৃঙ্খলা আনার ব্যাপারে কাজটা শুরু করব কোথা থেকে? ধরা যাক, পত্র-পত্রিকার ভাষা থেকেই নেয়া হলো শব্দ। শুরু তো হোক। পত্র-পত্রিকা এবং প্রকাশনার জগতে খুব পরিচিত কিছু শব্দের বানানে ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। যেমন-
১. হলো/হোল/ হোলো/ হল
২. নেয়া, দেয়া/নেওয়া, দেওয়া
৩. মতন/মতোন
৪. কোনো/ কেনো, কোনো
৫. বললো/বলল
৬. গেল/ গ্যালো/গেলো
৭. কত, নত/কতো, নতো
৮. আপস/আপোস
৯. কলকাতা/কোলকাতা
১০. মনযোগ/মনোযোগ
১১. সহযোগিতা/সহযোগীতা
১২. শ্রদ্ধাঞ্জলি/শ্রদ্ধাঞ্জলী
১৩. হয়েছিলো/হয়েছিল
১৪. করব, ধরব/কোরবো, ধোরবো/করবো, ধরবো
এমনি আরো অনেক শব্দের বানানে আমরা নিজেদের ইচ্ছে এবং ঐতিহ্যের চিহ্ন রাখছি। নিশ্চয় এ ধরনের বানান আসছে উচ্চারণের উৎস থেকে। তবু একটু চিন্তা করলে ভাষাসচেতন ব্যক্তিরা ওর মধ্যে একটা শৃঙ্খলা বিধান করতে পারেন। খুব সহজ একটা উপায় হতে পারে, শব্দগুলোকে আন্তর্জাতিক ধ্বনিমুলক বর্ণমালায় লিখে বিচার করা। যেমন-
* গেল- মীষড়
* কেন - শীহড়
* খাব - শযধনযড়
* করব - শড়ৎনড়
পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে শব্দগুলোর শেষে ও আছে। আর শুরুতে যে এ্যা, সেটা এ-র সহধ্বনি এ্যা। এটাই ভাষা বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা। আমরা বিজ্ঞানের বিষয় জানতে গিয়ে অনেক কঠিন কঠিন নাম পড়ি। চেষ্টা করে সেই টার্মগুলোর উচ্চারণ শিখি। কিন্তু বাঙলার কিছু জানতে এবং শিখতে চাই না। ভাবখানা এই, বাঙলা তো মাতৃভাষা। জন্মের পর থেকে এই ভাষা শুনছি, বলছি, পড়ছি ও লিখছি। এখানে আবার শেখার কী আছে? এই ধারণাটাই সর্বাংশে ভ্রান্ত। আমরা প্রাণটা নিয়ে জন্মাই। তারপর সেই জীবসত্তাকে বিকশিত করতে কতই যত্ম ও চেষ্টার দরকার হয়। তেমনি মায়ের মুখ থেকে ভাষা পেলেও তার বিকাশে চাই দীর্ঘদিনের অনেক পরিচর্যা। তার ওপর লেখার ভাষা আরো যত্ম দাবি করে। কারণ হলো বাক্য কাঠামো আর অজস্র বানানে পরিপুর্ণ লেখার জগৎ।
ধরা যাক, করব আর করবো-কে একইভাবে উচ্চারণ করলাম। কিন্তু বিদেশিরা তা পারবে না। মানবেও না। শেখানোও হয় কঠিন। তাদের বলতেই হবে, ভবিষ্যৎকালে প্রথম ব্যক্তির ক্রিয়ারুপের প্রত্যয় হলো ‘বো’। মানে কর+বো। একদা কোনোকালে ‘করব’ লেখা হলেই যে তার বানানে বিজ্ঞানসম্মত পরিবর্তন আসবে না, তা ঠিক নয়। হয়তো সে কালে ক্রিয়া প্রত্যয় ‘বো’-কে আলাদারুপে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়নি। কারণ ভাষা বিজ্ঞান বিষয়টার বিকাশ বেশ নতুন। ওপার বাঙলায় ভাষা বিজ্ঞান বিষয় পড়ানো শুরু হয় আশির দশকে। ঢাকায় শুরু হয় নব্বইর দশকে। তুলনামুলক ভাষাতত্ত্ব বা ফিলোলজি বিষয়টা পুরোপুরি ভাষা বিজ্ঞান নয়। তাই ড. এস. কে. চ্যাটার্জির ওডিবিএল-এর অনেক তথ্যই আধুনিক ভাষা বিজ্ঞান বিষয় যাচাই করে নেয়। এটাই বাস্তব। বানানের নিয়ম-কানুন নিয়ে এখন যতটা মাথা ঘামাচ্ছি আমরা, সেকালে তা করেনি কেউ। কারণ প্রয়োজনও হয়নি কিংবা বলা যায়, বর্তমানের মতো এত অনুপুঙ্খ অনুসন্ধিৎসাও ছিল না। কিন্তু যতই বাঙলা ভাষার চর্চা বাড়ছে, ততই বাড়ছে প্রশ্ন। সন্ধিৎসু লোকজনদের মাথা ঘামাতেই হচ্ছে।
একটা কথা ঠিক জানতে হবে যে, বাঙলা শব্দের বানান নিয়ে কোনো ঝামেলা নেই আমাদের। যত ঝামেলা ওই বাইরের শব্দগুলোই বাধায়। মুখের উচ্চারণে এক রকম কাজ চলে যায়। লিখতে গেলেই প্রতিবর্ণীকরণে মুল শব্দের উচ্চারণ শুদ্ধতার ব্যাপারটা আসে। এ ব্যাপারে ভারতের ড. পট্টনায়ক, ভাষা বিজ্ঞানের এক দিকপালের কাছে প্রশ্ন রেখেছিলাম। তিনি জানালেন, বিদেশি ভাষার শব্দকে গ্রহণ করার জন্য সাহস দরকার।
বলে ফেলুন, শব্দটা আমার ঘরে এসে আর বিদেশি নেই। তার পরিচয় বাঙলা, হিন্দি বা উড়িয়া যে কোনোটাই হতে পারে। তারপর প্রতিবর্ণীকরণের বানান নির্মাণ করুন। বিদেশি ভাষা বিজ্ঞানী ড. ক্লিনটনও হায়দ্রাবাদে এই কথাই বলেছিলেন। তার মানে, তৎসম শব্দের আদি বানান নিয়ে মাথা খারাপ করার দরকার নেই। আমরা তো সংস্কৃতে লিখছি না শব্দটা। বাঙলায় যেমন করে উচ্চারণ করি, তাই লিখি না কেন? যেমন হরিণ-কে হরিন, ব্যাকরণ-কে ব্যাকরন, ক্ষমা-কে খমা, উষ্ণ-কে উশ্ন উচ্চারণ করি। মুর্ধন্য ন-কে আমরা উচ্চারণই করতে পারি না। তো বাঙলা বানানে ‘ণ’ না লিখলে কি হয়? এই প্রশ্ন যদি কেউ তোলেই এবং তোলেও তাকে তো কিছু বলতে হবে? রবীন্দ্রনাথও কিন্তু ণ-এর পক্ষে ছিলেন না। বলেছেন, বাঙলা ভাষীরা ওটা উচ্চারণ করতে পারে না। তবে তিনি সাহস দেখিয়ে তা বর্জনও করেননি। আমরা তো মরে আছি এইখানে। মুখে বলি চাই না। কাজে তারই প্রতিষ্ঠা দিয়ে যাই। বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে তাহলে কে? কথায় ও কাজের আত্মীয়তা নির্মাণ করবে কে? এক এক সময় মনে হয়, সমস্যার গলা ধরে বাস করতে আমরা ভালোবাসি।
আচ্ছা, বানানের সমতা আনার জন্য আমরা কি পরিবর্তনের কথা ভাবব, নাকি সংস্কারের কথা? বাহুল্য বর্ণ হঠাৎ বাদ দিলে তা হবে চেঞ্জ বা পরিবর্তন। এটা করতে গেলে শক্তিমন্ত বিপ্লব দরকার। যেটা কামাল আতাতুর্ক করেছেন, সেটা দুর্দান্ত বিপ্লব। অসাধারণ দৃষ্টান্ত। আর সেই বিপ্লব না ঘটালে তুর্কিদের সংস্কার ভাঙা যেত না। আমাদের দেশেও উধপপধ-র বদলে উযধশধ লেখার হুকুম এসেছিল রাজার তরফ থেকে। সেটা মেনে নিয়েছি আমরা। বাঙলায় তো ‘ঢাকা’-ই বলতাম। তখন থেকে ইংরেজি বানানেও ‘ঢাকা হলো’। কিন্তু বাঙলা বানানের ক্ষেত্রে তেমন বিপ্লব আমরা চাই না। কারণ তাতে ঐতিহ্যের সঙ্গে সংঘাত হতে পারে। ড. কেলকার, ভাষা বিজ্ঞানের আর এক দিকপাল, সে কথা বললেন। তাহলে সংস্কারের পথেই হাঁটতে হবে। কাজটা আরো জটিল, নাজুক। মন রাখা-রাখির ব্যাপার এসে যাবে। রাজনৈতিক সংস্কারের প্রক্রিয়া তার জ্বলন্ত প্রমাণ। তারপরও ও-কার দেয়া বা না দেয়া, ই-কার দিয়েই ই ও ঈ কারযুক্ত বানান লেখার সাহস দেখাচ্ছে শিশুরা এবং কিছু মানুষ। বাকিরা সংস্কার জুজুর ভয়ে মুখ লুকিয়ে রাখছে। সুতরাং যত প্রশ্নই তুলি, যত কথাই বলি, আর যত আকুপাকুই করি, হঠাৎ করে কিছু হবে না। অনেক সময় লাগবে। তবে চুপচাপ বসে থাকাও শুভ হবে না। লিখিত ভাষার অচলায়তন সহজে নড়ে না। আর যখন তা নড়ে ওঠে, তখন নাড়িয়ে দেয় জীবন সংস্কার ও সংস্কৃতিকে। এর ইতিবাচক দিকটা প্রথমে বুঝে নিতে হবে। সেটাও বড় কাজ।
**************************
বেগম জাহান আরা
দৈনিক আমারদেশ, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০০৮