- Home
- ভাষা দিবসঃ ২১শে ফেব্রুয়ারী
- একুশে ফেব্রুয়ারির প্রতিদ্বন্দ্বী চৌদ্দই ফেব্রুয়ারি
একুশে ফেব্রুয়ারির প্রতিদ্বন্দ্বী চৌদ্দই ফেব্রুয়ারি
- By National Days
- Published 02/24/2008
- ভাষা দিবসঃ ২১শে ফেব্রুয়ারী
-
Rating:




ভাষার অধিকার, শুধু ভাষার অধিকার নয়, মনুষ্যোচিত সকল অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামের প্রতীক একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩ সাল থেকে এ দেশের সব থেকে গৌরবময় দিবস হিসাবে পালিত হয়ে এসেছে। তবে পাকিস্তান আমলে ও তারপর বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই দিবস পালনের ধরনের মধ্যে পার্থক্য ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়েছে। ১৯৭১ সালের পর এই অঞ্চলের জনগণের জীবনের মধ্যে যে পরিবর্তন এসেছে, বিশেষত মধ্য শ্রেণীভুক্ত ছাত্র বুদ্ধিজীবীদের ও শাসকশ্রেণীর বিভিন্ন অংশের চিন্তা-চেতনায় যে পরিবর্তন এসেছে তারই প্রতিফলন ঘটেছে এই পার্থক্যের মধ্যে।
পাকিস্তানি আমলে এ দেশে যে শাসন ব্যবস্হা জনগণের ঘাড়ে চেপেছিল তাতে বিভিন্ন সংগ্রামের মাধ্যমে ভাষা ও সেই সঙ্গে অন্য কিছু অধিকারের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি সত্ত্বেও কোনো অধিকারই জনগণের জীবনে বাস্তবত প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কাজেই তার জন্য সংগ্রাম ১৯৭১ সাল পর্যন্ত জারি ছিল। এই সংগ্রামের অংশ হিসাবে সে যুগে পালিত হতো একুশে ফেব্রুয়ারি। এ অঞ্চলের বাঙালির জাতিগত চেতনার প্রকাশ ঘটত এই দিবস উদযাপনের মধ্যে। তারা মনে করত অবাঙালি শাসকশ্রেণীর অধীনে ভাষাসহ যেসব মৌলিক ও গুরুত্বপুর্ণ অধিকার তারা পায়নি সেটা তারা অনায়াসেই পাবে বাঙালিরা রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে। এই চেতনাই শেষ পর্যন্ত তাদের পরিচালিত করেছিল একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের পথে।
স্বাধীনতার পর ভাষাসহ অনেক অধিকারই এ দেশের জনগণ আনুষ্ঠানিকভাবে পেল, অর্থাৎ বাংলাদেশের সংবিধানের মধ্যে সেগুলো স্বীকৃত হলো। বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র ঘোষিত হলো নতুন রাষ্ট্রব্যবস্হার চার স্তম্ভ হিসাবে। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই দেখা পেল, এই সাংবিধানিক ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব রাষ্ট্র পরিচালনার যেন সম্পর্ক নেই। কাজেই ১৯৭৫ সালের শুরুতেই উপরোক্ত চার স্তম্ভের প্রত্যেকটির পতন হলো। জনগণ নাকের বদলে নরুন পাওয়ায় পাকিস্তানি আমলের থেকেও তাদের অবস্হা বিপর্যস্ত হলো। একদিকে মুক্তিযোদ্ধা নামে পরিচয়দানকারী শাসক দলের লোকজন চুরি দুর্নীতি লুটতরাজের মাধ্যমে ধনসম্পদ অর্জনের নেশায় উন্মত্ত হলো এবং দেশের জনগণের বাকি অংশের জীবনে বঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই থাকল না।
এই পরিস্হিতির প্রতিফলন সংস্কৃতি ক্ষেত্রে দেখা গেল। সেটাই স্বাভাবিক। কারণ মানুষ যেভাবে জীবিকা ও ধনসম্পদ অর্জন করে তার প্রতিফলন তাদের সংস্কৃতিতে ও সাধারণভাবে জীবনে ঘটে থাকে। বাংলাদেশের অবস্হা এদিক থেকে ব্যতিক্রমী হওয়ার কারণ ছিল না। এ কারণে সরাসরি দুর্নীতি ও লুটতরাজে নিযুক্ত লোকদের তো বটেই, এমনকি তাদের নতুন প্রজন্মের চিন্তাভাবনা ও যাপিত জীবনও এই প্রভাবের অধীনস্হ হলো। এ দেশে এমন এক প্রক্রিয়া শুরু হলো, যাতে অন্যদের কথা বাদ দিলেও এমনকি নতুন প্রজন্মের মধ্যেও দেখা গেল নৈতিক ও রাজনৈতিক শৈথিল্য। যে ছাত্র যুবকরা আগে শোষণ শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকত, আন্দোলন করত, সমাজ পরিবর্তনের জন্য সংগ্রাম করত, তারাই হয়ে দাঁড়াল শোষণ নির্যাতন চলতে থাকা নতুন শাসন ব্যবস্হার সপক্ষ শক্তি। কাজেই শোষণ নির্যাতন, অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে এবং এসব সৃষ্ট সাংস্কৃতিক নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে কোনো প্রকৃত সংগ্রামে তারা এগিয়ে আসা থেকে বিরত থাকল। কাজের নিষ্ক্রিয়তা বিদ্যমান নব্য শাসকশ্রেণীকে ভালোমতই শক্তি জোগান দিল।
এই পরিস্হিতিতে এ দেশের নতুন প্রজন্ম যে সুশিক্ষিত হয়ে না ওঠে, সংস্কৃতি ক্ষেত্রে নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচন না করে, অপসংস্কৃতির নানান ধারায় গা ভাসিয়ে দেবে এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে একবিংশ শতাব্দীতে প্রবেশ করে এখন যে রুপপরিগ্রহ করেছে একে ভয়াবহ ছাড়া অন্য কিছু বলা যায় না। এই পরিস্হিতিতে সমাজের বিভিন্ন স্তরে, বিশেষ করে ছাত্র যুবকদের সংস্কৃতি চর্চার মধ্যেও যে এই পরিবর্তন সুচিত হবে এটাই স্বাভাবিক।
প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাস এলে বিশেষত একুশে ফেব্রুয়ারি, বাংলা ভাষার কথা শুনে অনেক চোখের পানি ফেলা হয়, প্রতিজ্ঞা করা হয় এবং ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের স্মৃতিচারণের বন্যা বয়ে যায়। কিন্তু এই চোখের পানি যে কুম্ভীরাশ্রু, এই প্রতিজ্ঞা যে সম্পুর্ণ ভুয়া এবং এই সব স্মৃতিচারণের বড় অংশই যে মিথ্যা, তা একটু লক্ষ্য করলেই বোঝা যায়। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বাংলাদেশের মধ্য শ্রেণীর প্রায় বৃহৎ অংশেরই আজ এই অবস্হা।
এ কারণে ফেব্রুয়ারি মাসে ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যেসব কথা বলা হয়, যে সব কাজ করা হয়, সেগুলো সবই অন্তঃসারশুন্য এবং পোশাকী। আত্মপ্রচারণাই এসব কথা ও কাজের চালিকাশক্তি। এ কারণে আগে একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপনের মধ্যে যে প্রাণের স্পর্শ, প্রতিরোধের চেতনা থাকত এখন আর তা থাকে না। এখন এ দিবস উদযাপন করতে গিয়ে শিক্ষা, সংস্কৃতি, অন্যান্য অধিকার বিষয়ক কোনো প্রশ্ন কারো অন্তরে তাগিদ সৃষ্টি করে না।
অথচ এই ফেব্রুয়ারি মাসেই গত কয়েক বছর ধরে এখন অন্য এক দিবস ছাত্র-ছাত্রী যুবক-যুবতীদের দ্বারা পালিত হচ্ছে, যা সবার মধ্যে সৃষ্টি করছে এক উন্মাদনা। চৌদ্দই ফেব্রুয়ারি ‘ভালোবাসা দিবস’ যেভাবে এখন উদযাপিত হচ্ছে সেদিকে তাকিয়ে মনে হয় বাংলাদেশের এই নতুন প্রজন্মের জন্য এই দিবসটি হলো সব থেকে বড় জাতীয় দিবস। এ দিবসে এদের মধ্যে যে ‘প্রাণের স্পর্শ’ দেখা যায় এটা অন্য কোনো দিবস উদযাপনের সময় দেখা যায় না। একে কেন্দ্র করে মোবাইল ফোন, সংবাদপত্র, টেলিভিশন ইত্যাদিতে জমজমাট প্রচারণা হয়। যার ব্যবসায়িক দিক অগ্রাহ্য করার মতো নয়।
সাম্রাজ্যবাদের পদলেহী কোনো এক দুষ্টচক্রের দ্বারা কয়েক বছর আগে এর শুরু হলেও দ্রুত এর নিকৃষ্ট চরিত্র ছাত্র-ছাত্রী, যুবক-যুবতীদের মনে এখন এক মায়াবি প্রভাব বিস্তার করে। এর ফলে এই দিবস উদযাপনের সময় তাদের মধ্যে যে ‘প্রাণের সঞ্চার’ হয় এই ফেব্রুয়ারি মাসে একুশে ফেব্রুয়ারিতে তার তুলনায় কিছুই হয় না। এই দিবসটি ইউরোপ আমেরিকার কোনো জায়গায় এভাবে পালিত না হলেও আমদানি করা এই দিবসটি বাংলাদেশে ভালোবাসা চর্চাকারী বর্তমান প্রজন্মের ছাত্র-ছাত্রী, যুবক-যুবতীদের অন্তর অধিকার করে চৌদ্দই ফেব্রুয়ারি তাদের মধ্যে এক প্রচন্ড আবেগ উন্মাদনা সৃষ্টি করে। এই উন্মাদনা যে বাংলাদেশের নব্য উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চরিত্রের সঙ্গে পুরোপুরি সঙ্গতিপুর্ণ তাতে সন্দেহ নেই।
চৌদ্দই ফেব্রুয়ারি এ বছরও সারাদিন জুড়ে এবং সন্ধ্যা-রাত্রি পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় ও রাস্তায় ছাত্র-ছাত্রী, যুবক-যুবতীর ঢল সৃষ্টি করে এক প্রচন্ড যানজট। ভালোবাসার নামে এই সাংস্কৃতিক বিস্তৃতি বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীর কাছে এক স্বীকৃত ব্যাপার। চৌদ্দই ফেব্রুয়ারি এবং একুশে ফেব্রুয়ারি গত কয়েক বছর ধরে যেভাবে উদযাপিত হচ্ছে তাতে দেখা যায় চৌদ্দ ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারির এক প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে আবির্ভুত হয়েছে। নতুন প্রজন্মের যুবক-যুবতী, ছাত্র-ছাত্রীরা যে ফেব্রুয়ারির চেতনা মেনে চৌদ্দই ফেব্রুয়ারির তাড়নার দ্বারা এখন অধিকতর প্রভাবিত ও মোহাচ্ছন্ন হচ্ছে তাতে সন্দেহ নেই। এই পরিস্হিতির থেকে সুবিধাজনক পরিস্হিতি দেশীয় শাসকশ্রেণী ও সাম্রাজ্যবাদের জন্য আর কী হতে পারে?
**************************
বদরুদ্দীন উমর
দৈনিক আমারদেশ, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০০৮