National Events - http://events.amardesh.com
দুটি অবিশ্বাস্য ঘটনা এবং তৃতীয়টির জন্য প্রতীক্ষা
http://events.amardesh.com/articles/85/1/aaaa-aaaaaaaaaa-aaaa-aaa-aaaaaaaa-aaaa-aaaaaaaaa--/Page1.html
National Days
 
By National Days
Published on 02/24/2008
 

বাংলাদেশে অবিশ্বাস্য ঘটনা তো একটি-দুটি নয়, অসংখ্য, কিন্তু দুটি বিশেষ রকমের এবং পরস্পর সংলগ্ন অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটেছে। যে দুটি অত্যন্ত তাৎপর্যপুর্ণ এবং সত্য উন্মোচক। এরা উভয়েই বাংলা ভাষা সম্পৃক্ত। একটি হচ্ছে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠা এবং অন্যটি হচ্ছে প্রতিষ্ঠার পরপরই এক ধরনের বিসর্জনের সুত্রপাত।


দুটি অবিশ্বাস্য ঘটনা এবং তৃতীয়টির জন্য প্রতীক্ষা

বাংলাদেশে অবিশ্বাস্য ঘটনা তো একটি-দুটি নয়, অসংখ্য, কিন্তু দুটি বিশেষ রকমের এবং পরস্পর সংলগ্ন অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটেছে। যে দুটি অত্যন্ত তাৎপর্যপুর্ণ এবং সত্য উন্মোচক। এরা উভয়েই বাংলা ভাষা সম্পৃক্ত। একটি হচ্ছে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠা এবং অন্যটি হচ্ছে প্রতিষ্ঠার পরপরই এক ধরনের বিসর্জনের সুত্রপাত।

বায়ান্নতে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই এই দাবি উঠেছিল। কিন্তু বলা হয়নি যে বাংলাই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। তখনকার হিসাবে ওই রাষ্ট্রের শতকরা ৫৬ জন মানুষই ছিল বাঙালি; কিন্তু তারা এমন দাবি করেনি যে, তাদের ভাষাই হবে রাষ্ট্রীয় কাজের জন্য ব্যবহার্য একমাত্র সরকারি ভাষা, যদিও তেমন দাবি তোলাটা মোটেই অন্যায় বা অগণতান্ত্রিক হতো না। পাকিস্তানি স্বৈরশাসকরা অতটুকু ছাড় দিতেও প্রস্তুত ছিল না, তারা চেয়েছিল উর্দু এবং কেবলমাত্র উর্দুই হবে রাষ্ট্রের ভাষা।

ওই মর্মে ঘোষণা রাষ্ট্রের জন্ম যখন হলো তখনই দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ঘোষণা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুর্ববঙ্গে যে প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছিল তাতেই তাদের বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে একমাত্র করা যাবে না। যে জন্য ১৯৫৬-এর সংবিধানে তারা উর্দুর পাশাপাশি বাংলার জন্য স্হান করে দিয়েছিল। কিন্তু বাঙালি যে তাতে সন্তুষ্ট হয়েছিল তা নয়।

আসলে দাবিটা তো কেবল বাংলার জন্য স্বীকৃতি আদায়ের ছিল না, দাবিটা ছিল মুক্তি অর্জনের। পাকিস্তানের পক্ষে ’৪৬ সালে বাঙালি মুসলমান যে ভোট দিয়েছিল তার পেছনে অনুপ্রেরণাটা পাঞ্জাবি শাসিত একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা ছিল না, আকাঙ্ক্ষাটা ছিল সার্বিক স্বাধীনতার। তারা শাসক পরিবর্তন চায়নি, চেয়েছিল নিজেদের মুক্তি।

কিন্তু নতুন রাষ্ট্র তাদের মুক্তি দেবে এমন কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। অভাব ও বঞ্চনা দুটোই রয়ে গেল, আগে যেমনটা ছিল। আর উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা এই অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত ও নিষ্ঠুর ঘোষণা তাদের জানিয়ে দিল ওই রাষ্ট্রে তারা মুক্তি তো দুরের কথা, স্বাধীনতাও পাবে না। বোঝা গেল যে, ব্রিটিশের উপনিবেশ থেকে কোনোমতে বেরিয়ে এসে পুর্ববঙ্গ নতুন এক উপনিবেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ছিল মানুষের ক্ষোভ এবং ক্রমবর্ধমান হতাশার বহিঃপ্রকাশ। এ আন্দোলনে কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ যে যোগ দিয়েছে সেটা চাকরি-বাকরির সুবিধার জন্য নয়, অর্থনৈতিক মুক্তির জন্যই। শুরুতে পুর্ববঙ্গের দাবিটা ছিল স্বায়ত্তশাসনের। যে স্বায়ত্তশাসন স্বৈরশাসকরা দিতে চায়নি। অন্যতম রাষ্ট্রভাষার দাবিটাও স্বায়ত্তশাসন লাভের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গেই যুক্ত ছিল বৈকি। স্বাধীনতার কথা তখন মোটেই ভাবা হয়নি। কেউ কেউ হয়তো ভেবেছেন, কিন্তু প্রকাশ্যে বলবেন এমন সুযোগ ছিল না। কমিউনিষ্ট পার্টি ঘোষণা করেছিল ইয়ে আজাদি ঝুটা হায়, লাখো ইনসান ভুখা হায়, অর্থাৎ এই স্বাধীনতা ভুয়া, কারণ লাখ লাখ মানুষ অনাহারে রয়েছে। কথাটা মিথ্যা ছিল না। অসংখ্য মানুষ অভুক্ত ছিল, আর মানুষ যদি খেতেই না পেলো তাহলে কিসের স্বাধীনতা, কোথায় মুক্তিই কিন্তু স্বাধীনতা পাওয়া গেছে এই রকমের এমন একটা উন্মাদনা রাষ্ট্রীয় তৎপরতায়, বিশেষ করে প্রচারের ফলে তৈরি হয়েছিল যে মিথ্যাটা তাদের কাছে পরিষ্কার হয়নি। কিন্তু সেটা যে চিরকালই অপরিষ্কার রয়ে যাবে এমনটা তো সম্ভব নয়। নিজেদের অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়েই লোকে বুঝে নিয়েছে যে, তারা নব্যপরাধীনতার জালে আটকা পড়েছে। তারা তাই কেবল স্বায়ত্তশাসনই নয় স্বাধীনতার জন্যও উন্মুখ হয়ে উঠেছে। আওয়ামী লীগের ছয়দফায় পুর্ণ স্বাধীনতার দাবি ছিল না, পুর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিই ছিল। কিন্তু ঊনসত্তরের জনঅভ্যুত্থানের পরে মানুষ আর আপোসে আস্হা রাখেনি; তারা স্বাধীনতাই চেয়েছে। সত্তরের নির্বাচনে রায়টা কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে ছিল না। যদিও আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবেই ছিল সামনে; জনগণের রায়টা ছয়দফাকে অতিক্রম করে গিয়ে পরিণত হয়েছিল একদফাতে- অর্থাৎ স্বাধীনতার দাবিতে। সত্তর সালের ওই রায়ের পরে একাত্তর সালে যে মুক্তিযুদ্ধ ঘটবে এটা ছিল একেবারেই অনিবার্য এবং সেটাই ঘটেছে। যুদ্ধ হয়েছে এবং তার মধ্য দিয়ে পুর্ববঙ্গ স্বাধীন হয়েছে। এবং বাংলা ভাষা সেই রাষ্ট্রের অন্যতম নয়, একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবেই প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে।

সাতচল্লিশ সালে কে ভেবেছিল যে বাংলাভাষা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে? না, কেউ সেটা ভাবেনি। সম্ভব ছিল না ভাবা। তখন আমরা একমাত্র নয়, অন্যতমের কথাই ভেবেছি। কিন্তু সেই অবিশ্বাস্য ঘটনাই তো ঘটলো। কেন ঘটলো? না, কোনো অলৌকিক কারণে ঘটেনি, কারো করুণার দরুন ভাষার এই প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি। আপাত অবিশ্বাস্য ব্যাপারটা সম্ভব হয়েছে জনগণের সংগ্রামের কারণে। মুক্তির লড়াইটা নতুন নয়, এই উপমহাদেশে তার সুত্রপাত ১৮৫৭-এর অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে, যার অগ্রসরমানতার ধারাবাহিকতাতেই আমাদের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। ঊনসত্তরের জনঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। জনজণ এবং কেবল জনগণই পারে এমন ঘটনা ঘটাতে। দেশে দেশে কালে কালে তারা এমন কাজ করেছে, করলো বাংলাদেশেও। কিন্তু তারপর? তারপর তো আমাদের সহ্য করতে হলো এবং হচ্ছে আরেকটি অবিশ্বাস্য ঘটনা। সেটা হলো স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলাভাষার অমর্যাদা। বাংলা রাষ্ট্রের ভাষা হয়েছে ঠিকই কিন্তু রাষ্ট্রের ভাষা বলতে যা বোঝায় তা তো হয়নি। উচ্চ আদালতে বাংলা এখনো অপ্রচলিত, আগে যেমনটা ছিল। উচ্চশিক্ষাতেও বাংলা ব্যবহৃত হচ্ছে না। মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা দুরবর্তী স্বপ্ন বৈ নয়। আমলাতন্ত্রের উঁচু মহলে বাংলার ব্যবহারকে উৎসাহিত করা হয় না। উচ্চবিত্তদের মুখের ভাষায় ইংরেজি শব্দ, বাক্যাংশ এমনকি আস্ত আস্ত বাক্য বাংলা শব্দকে বিড়ম্বিত, এমনকি পর্যুদস্ত করতে থাকে। বিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ গবেষকরা বাংলায় না লিখে ইংরেজিতে বই লিখা পছন্দ করেন, বাজারের আশায়।

এই যে পেয়েও না-পাওয়া এটাকেও তো বিশ্বাস করা সহজ নয়। কিন্তু করতে তো হচ্ছে। আর যতই অবিশ্বাস্য বলি না কেন, এটা তো ঘটেছে এবং ঘটবার কারণও রয়েছে। সেই কারণটা কিন্তু জনগণ নয়, কারণটা হচ্ছে শাসন শ্রেণী। বাংলা কখনোই শাসক শ্রেণীর ভাষা ছিল না, ভাষা ছিল সে খেটে খাওয়া মানুষের। শাসকরা সংস্কৃত, ফার্সি, ইংরেজি- এসব ভাষা ব্যবহার করেছে, আর খেটে খাওয়া মানুষ ব্যবহার করেছে যেটা তাদের মাতৃভাষা সেই বাংলাকে। একাত্তরে স্বাধীনতার পরেও আমরা দেখছি একই রকমের ঘটনা, বাংলা শাসক শ্রেণীর কাছে সেই মর্যাদা পাচ্ছে না যেটি প্রত্যাশিত ছিল, যদিও জাতিগত পরিচয়ে এই নতুন শাসকরা আগের কালের শাসকদের মতো অবাঙালি নয়, বাঙালিই বটে। আসলে জন্মসুত্রে বাঙালি হলেই বাঙালি হওয়া যায় না, বাঙালি হতে হলে বাংলাভাষা ব্যবহার করতে হয় এবং সেই সঙ্গে সব বাঙালির সুখ-দুঃখের অংশীদার হওয়া চাই। নইলে নয়। আমাদের শাসক শ্রেণী বাংলা ব্যবহারে উৎসাহী নয় এবং আরো বড় ব্যাপার যেটা সেটা হলো সাধারণ মানুষের ভালো-মন্দে আগ্রহ-উৎসাহ একেবারেই যৎসামান্য।

আগের শাসকরা বিদেশি ছিল, এখনকার শাসকরা দেশী হয়েও স্বদেশী নয়, তাদের আচরণও আগেকার শাসকদের মতোই। সাতচল্লিশের স্বাধীনতার পর পাঞ্জাবি শাসক শ্রেণী বাঙালির প্রতি যে আচরণ করেছে, একাত্তরের স্বাধীনতার পরে বাঙালি শাসক শ্রেণীর আচরণ যে তা থেকে একেবারেই ভিন্ন, তা মোটেই নয়। শাসক ও শাসিতের ভেতর শ্রেণী দুরত্বটা ঠিকই রয়ে গেছে এবং সেই বিদ্যমানতার বহু নিদর্শনের মধ্যে একটি হলো নতুন শাসকদের হাতে বাংলা ভাষার অমর্যাদা। একে অপ্রত্যাশিত বলা যাবে, কেননা এই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা তো এমনি এমনি ঘটেনি, ঘটেছে জনগণের অসামান্য কষ্ট ও আত্মত্যাগের ভেতর দিয়ে। সাতচল্লিশে লোকে ভোট দিয়েছে এবং দাঙ্গা ও দেশভাগের কারণে নানাভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে; একাত্তরেও ভোট দিয়েছে, কিন্তু এবার দাঙ্গা সহ্য করা নয়, যেতে হয়েছে সশস্ত্র যুদ্ধে। তবে পরিণামটা যে একই তার ব্যাখ্যাটা কি? ব্যাখ্যা সহজ। সেটা হলো রাষ্ট্র স্বাধীন হয়েছে ঠিকই কিন্তু জনগণের হয়নি এবং দেশে এমন কোনো সামাজিক বিপ্লব ঘটেনি যার ভেতর দিয়ে শাসক ও শাসিতের ভেতরকার শ্রেণী দুরত্বটা নিশ্চিন্ত হয়ে যাবে।

বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী যে জনসুত্রে বাঙালি হয়েও বাংলাভাষার ব্যাপারে আগ্রহী নয় তার ব্যাখ্যাও পাওয়া যাবে তাদের শ্রেণীচরিত্রের ভেতরেই। তারা এমনকি যদি বাংলাভাষাও ব্যবহার করতো তাহলেও সে ভাষা জনগণের জন্য সহজবোধ্য হতো না। সহজবোধ্য না হওয়ার পেছনে থাকতো তারা যে স্বতন্ত্র ও বিশিষ্ট সেটা বিজ্ঞাপিত করার অভিপ্রায়। তারা যে বাংলার পরিবর্তে ইংরেজির ব্যাপারেই অধিকতর আগ্রহী সেটার পেছনে নিজেদের শ্রেণীগত আভিজাত্য প্রদর্শনের অভিপ্রায়টি অবশ্যই কাজ করে। কেবল আভিজাত্য প্রদর্শনই বা কেন বলবো, এখানে তো মমতা দেখানোর ব্যাপারটাও রয়েছে। ইংরেজি ভাষা ক্ষমতারও প্রতীক বৈকি। কিন্তু এটিই একমাত্র চালিকাশক্তি নয় এই আগ্রহের। টান আছে পুঁজিবাদেরও।

কথাটা এখানে পরিষ্কার করে নেয়া দরকার। বায়ান্নতে পুর্ববঙ্গের মধ্যবিত্ত, যারা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করেছে তারা, অবশ্যই উর্দুবিরোধী ছিল। সেটা নিয়ে তো কোনো সন্দেহই নেই, কিন্তু ছিল কি তারা ইংরেজিবিরোধী? এই জিজ্ঞাসাটার উত্তরে আমরা যে প্রবল বেগে না বলবো সেটা সম্ভব নয়। মধ্যবিত্ত বাঙালি ইংরেজিকে অপছন্দ করতো না।

প্রথমত, ততদিনে তারা ইংরেজি খানিকটা রপ্ত করে ফেলেছে, আরো করতে যে তাদের অত্যন্ত অধিক আপত্তি ছিল তা নয়। দ্বিতীয়ত, তাদের মনের ভেতর ওই ধরনের একটা ধারণাও ক্রিয়াশীল ছিল ইংরেজি জানলে চৌকস, চটপটে, দক্ষ এবং সর্বোপরি আন্তর্জাতিক হওয়া সম্ভব। এসব তারা হতে চাইছিল বৈকি। ঘটনাক্রমে পুঁজিবাদের প্রধান ভাষা হচ্ছে ইংরেজি এবং বাঙালি মধ্যবিত্তের সামনে উন্নতির জন্য অন্য কোনো পথ কখনোই দেখা দেয়নি যেটা পুঁজিবাদী নয়। পাকিস্তানের জন্ম হওয়ার আগে মুসলমান মধ্যবিত্তের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল হিন্দু মধ্যবিত্ত, ইংরেজি শিক্ষার ক্ষেত্রে যারা অন্তত পঞ্চাশ বছর এগিয়ে ছিল। সেই প্রতিদ্বন্দ্বীটি অপসারিত হলে মুসলমান মধ্যবিত্তের সুবিধা হবে এটাই ছিল আশা, কিন্তু উর্দুওয়ালারা তাদের ভাষার জোরে সুবিধা লাভের ওই আশাটাকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে এমন আশঙ্কা যখন দেখা দিল তখন তারা স্বভাবতই যেমন হতাশ তেমনি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল। সেখান থেকেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সুত্রপাত, যদিও এ আন্দালনের তাৎপর্য, গভীরতা ও ফলশ্রুতি নতুন করে স্বাধীনতা লাভ করা পর্যন্ত প্রসারিত হয়ে গেছে।

স্বাধীনতার পরে এই শ্রেণীরই ধনী হয়ে ওঠা অংশ শাসক শ্রেণীতে পরিণত হয়েছে এবং নিজেদের উন্নতির জন্য পুঁজিবাদী পথ ধরেছে। পুঁজিবাদের টানটাই তাদের মাতৃভাষার প্রতি বিমুখ করে তুলেছে। তারা একদিকে জনগণ থেকে দুরবর্তী এবং অন্যদিকে পুঁজিবাদের নিকটবর্তী হতে চায় যে জন্য ইংরেজি ভাষা তাদের আকর্ষণ করে। হাজার হোক, বাংলাভাষা তো স্হানীয় ভাষা বটে এবং তাদের দৃষ্টিতে এ ভাষা গ্রাম্যও বৈকি। শাসক শ্রেণী যা করে সেটাই তো আদর্শ, সেই আদর্শটাই সমাজের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে বাংলাভাষার অমর্যাদা ঘটেছে এবং ঘটছে।

আজ আমরা তৃতীয় একটি ঘটনার জন্য প্রতীক্ষায় আছি। সেটি হচ্ছে বাংলাভাষার সর্বজনগ্রাহ্যতা। বাংলা সব বাঙালির ভাষা হবে, এই ভাষার ব্যবহার ও চর্চার মধ্য দিয়ে সারাবিশ্বে এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রে বসবাসকারী ২৩-২৪ কোটি বাঙালি নিজেদের মধ্যে আত্মীয়তা গড়ে তুলবে, মর্যাদাবান হবে, সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে জ্ঞানে বিজ্ঞানে- স্বপ্ন এটাই। এ কোনো অলীক স্বপ্ন নয়, কেননা এর বাস্তবায়ন খুবই সম্ভবপর।

এই স্বপ্নের বাস্তবায়নের দায়িত্বটা নিতে হবে বাংলাদেশের বাঙালিকেই। বাংলাদেশই হচ্ছে বাংলাভাষার প্রধান ঘাঁটি। এখানে ভালো যা ঘটবে তার সুফল পাওয়া যাবে অন্যত্র এবং সর্বত্র। এক কথায় বলতে গেলে বাংলাদেশের সর্বক্ষেত্রে এবং ক্রমবর্ধমান হারে আমরা বাংলাভাষার প্রচলন চাই। কিন্তু সেটা তো সম্ভব হবে না আমাদের বর্তমান শাসক শ্রেণীকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রেখে এবং এই শ্রেণী রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে কিছুতেই স্খলিত হবে না যদি না রাষ্ট্রের চরিত্রে অর্থাৎ তার অভ্যন্তরে শ্রেণীর সঙ্গে শ্রেণীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন আনা যায়। আর সেই পরিবর্তন তো ঘটবে না যদি সমাজের কাঠামোতে বৈপ্লবিক রুপান্তর ঘটানো না যায়, ঘটিয়ে তেমন একটা সমাজ গড়ে তোলা না যায়, যেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা বৈরিতার হবে না, হবে মৈত্রীর এবং সমাজে বৈষম্য কমে গিয়ে প্রতিষ্ঠা পাবে অধিকার ও সুযোগের সাম্য। মুক্তির পথ সেটাই। ওই মুক্তির জন্যই আমাদের সংগ্রাম, যা এখনো সফল হয়নি, এবং সফল হয়নি বলেই বাংলাভাষা তার প্রাপ্য মর্যাদা পাচ্ছে না। এর জন্যই আমাদের প্রতীক্ষা।

কিন্তু কেবল প্রতীক্ষায় তো কুলাবে না। দরকার হবে আন্দোলনের। মুক্তির আন্দোলনকে আরো বেগবান ও অগ্রসরমান করে তোলা চাই। চাই শ্রেণীচ্যুত মধ্যবিত্তের সঙ্গে মেহনতি মানুষের সংগ্রামী ঐক্য, যেমনটা দেখেছি এবং পেয়েছি আমরা বায়ান্নতে, ঊনসত্তরে এবং একাত্তরে।
 
**************************
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
দৈনিক আমারদেশ, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০০৮