আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট বলল, ২২ জানুয়ারির নির্বাচন হবে না। ঘেরাও, টানা হরতাল-অবরোধের ঘোষণা দিয়ে নির্বাচন প্রতিহতের ডাক এল এ জোটের পক্ষ থেকে। অন্যদিকে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট বলল, নির্বাচন হবে। বাধা এলে প্রতিহত করা হবে। কেমন যেন একটা ‘যুদ্ধের গন্ধ’। প্রধান উপদেষ্টা ড· ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ সব কিছু দেখেশুনেও নির্বিকার। তাঁর মুখ ফুটে বেরোল একটিমাত্র শব্দ, ‘দেখছি’।
এক বছর আগে ২০০৭ সালের ১০ জানুয়ারি একই দিনে চারদলীয় জোট ও মহাজোট দেশে বড় ধরনের জনসভা করে। মহাজোটের জনসভা অনুষ্ঠিত হয় রাজধানীর পল্টন ময়দানে, চারদলীয় জোট সমাবেশ করে কুমিল্লায়।
মহাজোট নেত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচন প্রতিরোধের ডাক দিয়ে ১৪ থেকে ২২ জানুয়ারি টানা বঙ্গভবন ঘেরাও, ১৪ ও ১৫ এবং ১৭ ও ১৮ জানুয়ারি এবং ২১ ও ২২ জানুয়ারি সারা দেশে হরতাল কর্মসূচির ডাক দেন। জনসভায় তিনি বলেন, ‘২২ জানুয়ারি একপেশে নির্বাচন হবে না। যেকোনো মূল্যে এ নির্বাচন প্রতিহত করা হবে। কোনো ভোটার ভোটকেন্দ্রে যাবেন না। প্রহসনের নির্বাচনে অংশ নেবেন না। যদি কেউ যান তবে গণদুশমনে পরিণত হবেন।’
চারদলীয় জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বললেন, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও উন্নয়নের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার স্বার্থে এ নির্বাচন থেকে পিছু হটার সুযোগ নেই। দলের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে তাঁর আহ্বান-‘এ নির্বাচনে যারা বাধা দিতে আসবে, তাদের এমনভাবে প্রতিহত করতে হবে, যেন ভবিষ্যতে আর ভোট চাওয়ার সাহসই তারা না পায়।’
এই পরস্পরবিরোধী অবস্থান শুধু দুই নেত্রীর নয়, দুই জোটের সমর্থকদের। এই পরস্পরবিরোধিতার যাঁতাকলে কয় দিন ধরেই পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ। দু-এক দিন বাদ দিয়ে টানা অবরোধ চলছে কয়েক দিন ধরে। নেই ব্যবসা-বাণিজ্য। খেটে খাওয়া মানুষের হাতে টাকা নেই। চোখে তারা যেন সরষে ফুল দেখছে।
এ অবস্থায় দেশবাসীর উদ্বেগ বাড়তে থাকে। শুধু কি দেশ, উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে বিদেশেও। ২২ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে সম্ভাব্য সহিংসতা নিয়ে এদিন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেন এ দিন।
সহিংসতার দায় কার, এ নিয়ে নির্বাচন কমিশন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মধ্যে ‘চোর-পুলিশ’ খেলা চলছে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি মাহফুজুর রহমান আগের দিন বলেছিলেন, ‘২২ জানুয়ারির নির্বাচনে সংঘাত বা হানাহানি হলে এর দায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে নিতে হবে।’ এ বক্তব্যের বিপরীতে উপদেষ্টা সফিকুল হক চৌধুরী এদিন বলেন, ‘বিচারপতি মাহফুজ ভুয়া কথা বলেছেন।···আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত যেকোনো পরিস্থিতির দায়দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর।’
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপির সঙ্গে বৈঠক শেষে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী এদিনও বলেন, একতরফা নির্বাচন আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।
কিন্তু সব শুনেও টনক নড়ছিল না প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনকারী রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড· ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের। সরকারের পাঁচ উপদেষ্টা এদিন রাষ্ট্রপতিকে দুই জোটের সর্বশেষ রাজনৈতিক মনোভাব সম্পর্কে অবহিত করেন। প্রথমে রাষ্ট্রপতি ভিন্নমত পোষণ করে পরে অমোঘ উচ্চারণে বললেন, ‘আচ্ছা’। এর মাধ্যমে তিনি যে কী বোঝাতে চাইলেন, তা পরদিন পর্যন্ত বোঝা যায়নি। কারণ সমস্যা সমাধানে কোনো উদ্যোগ তিনি নেননি। সরকারের বাকি উপদেষ্টাদের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে হতাশা। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কায় কেটে যায় আরও একটি দিন।
**************************
দৈনিক প্রথম আলো, ১০ জানুয়ারী ২০০৮