আজ ১৬ ডিসেম্বর। বিজয় দিবস। দেশ স্বাধীন হয়েছে ৩৬ বছর হলো। প্রতি বছরই ঘুরে ফিরে স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস আসে। প্রায় প্রতিবারই বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে আমাকে একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। যা আমার জন্য বিব্রতকর। প্রশ্নটি হলো ‘আপনি কেন পদক পাননি?’ গত ২৮ নভেম্বর এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য তোফায়েল আহমেদও কথা প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন ‘এত লোক পদক পেল আপনি কেন পাননি?’ এমনকি বিভিন্ন অনুষ্ঠানের দাওয়াত কার্ডে কেউ কেউ মাঝে মধ্যে ভুল করে আমার নামের শেষে বিবি (বীরবিক্রম) কেউবা বিপি (বীরপ্রতীক) লিখে থাকেন।
পাঠক হয়তো জেনে থাকবেন ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে আমি পাক বাহিনীর হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে সম্মুখ সমরে লড়াই করেছিলাম। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম লড়াই ‘কুমিড়ার লড়াইটি’ আমার নেতৃত্বেই হয়েছিল। তারপর তেলিয়াপাড়া, সাজিবাজার, মনতলা, শায়েস্তাগঞ্জ, বিজয়নগর, মুকুন্দপুর, ধর্মগড়, আশুগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি স্থানে সরাসরি পাক বাহিনীর সাথে লড়াইও আমার নেতৃত্বেই হয়েছিল।
আমার আজকের লেখার শিরোনাম দিয়েছি ‘পদকের পদাবলি এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধ’। শিরোনাম পদাবলি হলেও এতে রয়েছে ক্ষোভ ও অসন্তুষ্টির ইতিবৃত্ত। ১৯৭২ সালে ১৫ ডিসেম্বর সরকার কর্তৃক স্বাধীনতা পদক দেয়া হয়েছিল। পদকগুলো হলো বীরশ্রেষ্ঠ, বীরউত্তম, বীরবিক্রম, বীরপ্রতীক। আমি তখন যশোর সেনানিবাসে মেজর পদে ১২ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার। এটি ছিল ৫৫ ব্রিগেডের অধীনে। যার কমান্ডার ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ মঞ্জুর। পদক দেয়ার পর বিষয়টি নিয়ে সেনানিবাসে মুক্তিযোদ্ধা অফিসাদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তুষ্টি দেখা দিলো। অনেক অফিসার এ বিষয়ে রিপ্রেজেনটেশন দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে আমিও একজন। পদক না পাওয়ার বিষয়টি আমাকে সে সময় খুবই ব্যথিত করেছিল। বিষয়টি নিয়ে সে সময় আমি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠাই। চিঠিটির একটি বাক্য ছিল এ রকম "My contribution in the war of Liberation was of no mean consequences compared to those who are given gallantry awards".
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমরা কেউ কোনো সুবিচার পাইনি। আমি ব্যক্তিগতভাবে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর দিকের প্রথম কয়েকজনের একজন। যাদের বয়স ৪৫ ঊর্ধ্বে তারা হয়তো স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম দিকে কালুরঘাটের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে একটা ঘোষণা শুনেছেন ‘যার যার অস্ত্র নিয়ে লালদিঘির ময়দানে ক্যাপ্টেন ভূঁইয়ার কাছে রিপোর্ট করুন। পাঠক দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমিই সেই ক্যাপ্টেন ভূঁইয়া।
পাঠকদের আমি ২৬ মার্চ ১৯৭১ সালে কুমিড়ার লড়াইয়ের সংক্ষিপ্ত প্রেক্ষাপট তুলে ধরছি। কুমিড়ার যুদ্ধে শত্রুপক্ষের কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল তা এই যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখলে সহজেই অনুমান করা যায়। সেই যুদ্ধে শত্রুপক্ষের কমান্ডিং অফিসার শাহপুর খান, একজন লেফটেন্যান্টসহ ১৫২ জন পাক সেনা নিহত হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধে কুমিড়ার লড়াইটা ছিল প্রথম মুখোমুখি সংঘর্ষ এবং ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে সবচেয়ে বেশি। পাকিস্তানি মেজর (পরে ব্রিগেডিয়ার এবং বিমান দুর্ঘটনায় নিহত) সিদ্দিক সালিকের ‘উইথনেস টু সারেন্ডার’ বইয়ে কুমিড়ার যুদ্ধ সম্পর্কে লেখা হয়েছে ‘সেই যুদ্ধ ছিল পাকিস্তানের জন্য বিপর্যয়।’ যা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের জন্য ছিল টার্নিং পয়েন্ট। উল্লেখ্য, মেজর সালিক ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় এই অঞ্চলে আইএসপিআর-এ দায়িত্বে ছিলেন। কুমিড়ার লড়াইয়ের এক মাস পর একদিন ভারতীয় সীমান্তে ক্যাপ্টেন (পরে লে. কর্নেল ও মন্ত্রী) জাফর ইমামের কাছে জানলাম ওই দিন আমাদের প্রতিপক্ষ ছিল ২৪ এফ এফ রেজিমেন্ট। জাফর ইমাম ওই রেজিমেন্টে কর্মরত ছিলেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন ওই যুদ্ধে পুরো কোম্পানিই নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। জানা গেছে, আজকাল কুমিড়ার এই যুদ্ধটি মিলিটারি ইনস্টিটিউশনে পড়ানো হয়। এমনকি ঢাকা সেনানিবাসের জাদুঘরে আমার ছবিসহ কুমিড়ার যুদ্ধের বিবরণটি সুন্দরভাবে দেয়ালে সুরক্ষিত আছে।
কুমিড়ার সেই লড়াই দিয়ে যে যুদ্ধ শুরু করেছিলাম তার শেষ করেছি আশুগঞ্জের লড়াই দিয়ে। এই সময়ের মধ্যে বেশ ক’বার মরতে মরতে বেঁচে গেছি। কত দিন না খেয়ে না ঘুমিয়ে মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে, সাপ, জোঁক, পোকামাকড়, কাদামাটি মাড়িয়ে পাক বাহিনীর আস্তানায় হানা দিয়েছি। যা ভাবলে এখনো শিউরে উঠি।
পাঠকদের অবগতির জন্য আমি আরো একটি বিষয় উল্লেখ করছি। মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গনের স্মৃতি নিয়ে ১৯৭২ সালের জুন মাসে ‘মুক্তিযুদ্ধে নয় মাস’ শিরোনামে একটি বই লিখেছিলাম। সেই বইয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, কুমিড়ার যুদ্ধ, তেলিয়াপাড়ার যুদ্ধসহ বিভিন্ন অপারেশনের কথা উঠে এসেছে। আহমদ পাবলিশিং হাউস কর্তৃক প্রকাশিত এই বইটি প্রকাশের জন্য তখন আমাকে অনুমতি নিতে হয়েছিল ডিজিএফআই থেকে।
আসলে পদক বা খেতাব পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে আমি যুদ্ধ করিনি। কিংবা যারা পদক পেয়েছেন তাদের বিব্রতকর অবস্থায় ফেলাও আমার এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। পাঠক আমায় ভুল বুঝবেন না। আমার এই লেখার উদ্দেশ্য একটি অযাচিত প্রশ্ন যা নিয়ে আমাকে প্রায়ই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় তা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার জন্য। কারণ হায়াত মউত আল্লাহর হাতে। বীরত্বের স্বীকৃতি তো পেলাম না, এমন তো হতে পারে মৃত্যুর পর মুক্তিযুদ্ধ করেছি কি না সেই প্রশ্নও উঠতে পারে। ইতিহাসের সত্য রক্ষার খাতিরে এর আগে আমি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এবং আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে আর্টিকেল লিখেছিলাম। আমার এই লেখার উদ্দেশ্যও সত্যের পক্ষে ইতিহাসকে নিয়ে যাওয়া।
সেদিন পদক নিয়ে নানা ক্ষোভের কথা শুনেছি অনেকের মুখে। আবার পদক পেয়েছেন এমন অনেককে বলতে শুনেছি আমি তো ফ্রন্টেই ছিলাম না। শুধু পদক না পেয়েই ক্ষুব্ধ ছিলেন না, পদক পেয়েও অনেকে ক্ষুব্ধ ছিলেন। আমার এক বন্ধু মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানের তুলনায় পদকটা পেয়েছিলেন নিচুমানের। তাই তিনি নামের শেষে পদকটা ব্যবহার করতেন না। তবে মহাখালীর নিউ ডিওএইচএস’র প্লট পেতে (পয়েন্টের কারণে) ১৯৭৮ সালে এই পদকটি তাকে সাহায্য করেছিল। যেহেতু আমি পদক পাইনি তাই আমাকে প্লটের জন্য ১৯৮২ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
আমি কয়েক বছর আগে একটি জাতীয় দৈনিক ‘কুমিড়ার লড়াই ও পদক নিয়ে বানরের পিঠা ভাগাভাগি’ শিরোনামে একটি আর্টিকেল লিখেছিলাম। সেখানে পদকের পদাবলি নিয়ে কিছু কথা উল্লেখ করেছিলাম। প্রকৃত অর্থেই সে সময় পদক নিয়ে বানরের পিঠা ভাগাভাগির মতোই ঘটনা ঘটেছিল। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা এখানে উল্লেখ করতে চাই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে আশুগঞ্জে যখন মিত্র বাহিনী ও পাক বাহিনীর মধ্যে তুমুল লড়াই চলছিল তখন আমার কোম্পানির একজন হাবিলদার পজিশন ছেড়ে দুই বগলে দু’টি আর্টিলারি শেল নিয়ে আশুগঞ্জ থেকে পূর্ব দিকে সোহাগপুরে নিরাপদ স্থানে দ্রুতগতিতে পালিয়ে যায়। তাকে খুঁজে বের করতে আমার তিন দিন সময় লেগেছিল। আমার এ কথা বলার উদ্দেশ্য সেও পদক পেয়েছিল।
আরেকজনের কথা মনে পড়ে। সে ছিল আমার রানার। কুমিড়ার যুদ্ধে সে আমার সাথে ছিল। সেও পদক পেয়েছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাদের পদক পরা অবস্থায় দেখলে ওই স্মৃতির কথাই মনে পড়ে যায়। আসলে গেলেন্টারি অ্যাওয়ার্ড দেয়ার কথা গেলেন্টারি অ্যাকশনের ওপর ভিত্তি করে কিন্তু এ ক্ষেত্রে দেখা গেছে অনেকে ফ্রন্টেই যায়নি বা ছিলেন না তারাও পদক পেয়েছে।
পদক পাওয়া না পাওয়ার মূল্যায়ন নিয়ে অনেক লেখা যায় তবে আজ আমি দু’জন বীরের কথা উল্লেখ করতে চাই। তাদের একজনকে পদক দেয়া হয়নি। অন্যজনকে পদক দেয়ার ক্ষেত্রে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। তারা দু’জনই আমার অধীনে যুদ্ধ করেছিল। তাদের বীরত্বের কাহিনী আমাদের ইতিহাস কিভাবে মূল্যায়ন করবে তা জানি না, তবে তারা কেন যথাযথ রাষ্ট্রীয় সম্মান থেকে বঞ্চিত হলো তার বিচার পাঠকের কাছে ছেড়ে দিলাম। এদের একজন দুলা মিয়া অন্যজন লে. বদিউজ্জামান।
প্রথমে আসছি দুলা মিয়া প্রসঙ্গে। বৃহত্তর কুমিল্লার কসবার উপজেলার সালদা নদী এলাকার ২৬ বছর বয়সী এই তরুণ আমার এবং বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অবঃ মেজর জেনারেল এম এ মতিনের সাথে যুদ্ধ করেছিল। তার মতো সাহসী যোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধের সময়ে খুব একটা চোখে পড়েনি। ১৯৭১ সালের ২১ জুনের ঘটনা। তখন দুলা মিয়া লে. কর্নেল মুর্শেদের কোম্পানিতে। সেদিন মুর্শেদের দল যখন শত্রুপক্ষের আক্রমণে কলকলিয়া থেকে সরে আসতে বাধ্য হয় তখনই সেই লড়াইয়ের বীরত্ব দেখায় সে। একটি হালকা মেশিনগান দিয়ে সে সারারাত পাক সেনাদের অগ্রগতিকে রুখে দিয়ে এক কোম্পানি মুক্তিযোদ্ধার প্রাণ বাঁচিয়ে ছিল। এক সময় শত্রুপক্ষের বুলেটের আঘাতে দুলল মিয়ার পেটে এবং ডান পায়ে কয়েকটি গুলি লাগে। পরদিন তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় আমরা উদ্ধার করি। তবে সে বাকশক্তি হারায়নি। সে বাম হাত দিয়ে গুলিবিদ্ধ পেট ধরে রেখেছে। তার সমস্ত শরীর রক্তাক্ত। সে আমাকে বলল, স্যার আমি আর বাঁচব না, এক্ষুনি মারা যাব। আমার আফসোস রয়েই গেল, স্বাধীন বাংলার মাটিতে মরতে পারলাম না। স্বাধীন বাংলা দেখা আমার ভাগ্যে হলো না। স্যার কথা দিন, যেভাবেই হোক স্বাধীন বাংলার মাটিতে আমাকে কবর দেবেন। আজ হোক কাল হোক বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই। তাই আমার কবর বাংলাদেশের মাটিতেই দেবেন।
আরো বলল, স্যার আমার পেটের নাড়িভুঁড়ি সব বের হয়ে গেছে। আমার বাঁচার কোনোই আশা নেই। মুমূর্ষু দুলার করুণ কণ্ঠ সবাইকে ভীষণ বিচলিত করে। বিষাদে বুক ফেটে যায়। আমরা তাকে যতই সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করি না কেন তবু সে শান্ত হয় না। মরে যাওয়ার আগে তার আকাঙ্ক্ষার কথা বলে যেতে চায়। বলে স্যার, পাঞ্জাবিরা যখন আমাদের হত্যা শুরু করে তখন আমার আট বছরের মেয়েটি কী বলেছিল জানেন! বলেছিল, আব্বা তুমিও মুক্তি ফৌজে যোগ দাও, পাঞ্জাবিদের মারো, দেশ স্বাধীন করো। পরে আমাদের সেক্টর কমান্ডার লে. কর্নেল সফিউল্লাহ তার নিজ জিপে করে আগরতলা জি বি হাসপাতালে ভর্তি করেন। প্রায় দেড় মাস চিকিৎসার পর সে সুস্থ হয়ে যায়। সুস্থ হয়ে সে আবারো মোর্শেদের কোম্পানিতে যোগ দেয় এবং কয়েকটি অপারেশনে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়াই করে।
দেশ স্বাধীনের পর অনেক কিছুর পরিবর্তন হলেও দুলা মিয়াদের কোনো পরিবর্তন হয়নি। খুব অর্থকষ্টে দিন কাটাতে হয়েছে তার। আমার সাথে সে মাঝে মধ্যে দেখা করত। প্রথম দু-একবার ব্যক্তিগতভাবে সহায়তা করেছি। আমি এখন পিএসও তখন তার অর্থকষ্টের কথা ভেবে দু’বার ১০ হাজার টাকা করে প্রধানমন্ত্রীর ওয়েলফেয়ার ফান্ড থেকে সহায়তার ব্যবস্থা করেছি। শেষবার যখন সে আমার সাথে দেখা করল তখন তার একটি প্রশ্ন আমার বেদনার সাথে সম্পৃক্ত হলো। প্রশ্নটি হলো
স্যার আপনাগো লগে যুদ্ধে করলাম, দেশ স্বাধীন অইলো, এখন আমার অবস্থাটা দেখেন! একটা পদকও দিলেন না।
আমি চুপ করে থাকি। দুলা মিয়ার গলাটা বড় বিষণ্ন আর করুণ শোনায়। সান্ত্বনার কোনো ভাষা খুঁজে পাই না, তবু বলি পদক কি সবাই পায়!
স্যার, আমাগো সাথের অনেকরেই তো ফ্রন্টে দেখি নাই তাও হেরা পদক পাইছে, তয় আমি তো জান দিয়া ফালাইছিলাম।
তোমার মতো যুদ্ধ করে অনেকেই পদক পায়নি। দেখ দুলা, পদক পাওয়ার জন্য তো আমরা যুদ্ধ করিনি, যুদ্ধ করেছি স্বাধীনতার জন্য। দেশ স্বাধীন হয়েছে, এর চেয়ে বড় পাওয়ার আর কী আছে!
ও তবু চোখ মোছে।
দুলা মিয়ার অভিমানটুকু আমাকে খুব পীড়া দেয়। ওকে একটা পদক দিলে একজন বীরকে সত্যিকারেরই সম্মান দেখানো হতো।
দুলা মিয়ার মতো দুর্ধর্ষ এক মুক্তিযোদ্ধার বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ পদক না পাওয়া বিস্ময়ের ব্যাপার। আমাদের সেক্টরে তার চেয়ে বেশি সাহসী যোদ্ধা ছিল বলে আমার জানা নেই। ৩ নম্বর সেক্টরে যদি একজন মুক্তিযোদ্ধাকে পদক দেয়ার কথা থাকত তাহলে সেটা দুলা মিয়ারই প্রাপ্য ছিল।
আমি এবার আরেকজন সাহসী যোদ্ধা বদিউজ্জামানের কথা বলছি। গোপালগঞ্জের নাট গ্রামের ছেলে বদিউজ্জামান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূগোল অনার্স করার সময় ১৯৬৯-এ পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়। সাঁজোয়া বাহিনীতে কমিশন পেয়ে রংপুর ১৯ ক্যাভালরিতে বদলি হয়। তারপর ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বন্দিশালা থেকে পালিয়ে ১৫ আগস্ট আমার সাথে মনতলায় যোগ দেয়। আমি ১১ ইস্ট বেঙ্গলে যোগ দেয়ার আগ পর্যন্ত সে আমার প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে অপারেশন করে। সাঁজোয়া বাহিনীর সদস্য হয়েও সে গেরিলা যুদ্ধে কারো চেয়ে কম পারদর্শী ছিল না। ২১ বছরের এই তরুণকে কখনো নিরামিশ ছাড়া আর কিছু খেতে দেখিনি। ভাতের সাথে পোড়া মরিচ ছিল তার প্রিয়। সে প্রায়ই আমাকে একটা মেয়ের কথা বলত। আর ফাঁক পেলেই মেয়েটির ছবি বের করে দেখাত। মেয়েটিকে সে ভীষণ ভালোবাসত। মেয়েটিকে সে কথা দিয়েছিল দেশ স্বাধীনের পর তাকে বিয়ে করবে।
৩ ডিসেম্বর ১৯৭১। আখাউড়ায় আমাদের মিত্র বাহিনীর সাথে পাক বাহিনীর তুমুল লড়াই হয়। সেখানে দু’পক্ষই প্রচুরসংখ্যক কামানের গোলা ব্যবহার করে। এর আগে শত্রুর বিরুদ্ধে আমরা এত কামান ব্যবহার করিনি। শত্রুপক্ষও আমাদের আখাউড়া থেকে উচ্ছেদ করার জন্য অবিরাম কামান ফায়ার করে। শত্রুর এই বেপরোয়া শেলিংয়ের মধ্যে আমাদের অন্যান্য বাংকারের কী অবস্থা তা পর্যবেক্ষণ করার জন্য লেফটেন্যান্ট বদিউজ্জামান বাংকার ছেড়ে বের হতেই শত্রুপক্ষের একটি শেল তাকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলে। সেদিন পাক বাহিনীর শেলের আঘাতে শুধু একজন বদিউজ্জামানই ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়নি, সেই সাথে তার অন্তরের লালিত স্বপ্নও শেষ হয়ে যায়। দেশ স্বাধীনের পর ভালোবাসার মেয়েটিকে দেয়া তার সেই প্রতিশ্রুতিরও যবনিকা ঘটে। পাঠকের কাছে এই বিচার রাখলাম দেশ স্বাধীন করতে গিয়ে একজন বীরযোদ্ধা জীবন দিলো আর তার অবদানের মূল্যায়ন করা হলো এক নিুমানের (বীরপ্রতীক) পদক দিয়ে। পদক দেয়া নেয়ার মধ্যে যে বৈষম্য ও অনিয়ম হয়েছে তার আরো উদাহরণ আমি দিতে পারি কিন্তু এই লেখার কলেবর বেড়ে যাবে বিধায় মাত্র দু’টি উদাহরণ দিয়েই বিষয়টি বুঝাতে চেষ্টা করেছি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্যাপক সাহসিকতার পরও দুলা মিয়া পদক পায়নি। আর নিজের জীবন আত্মদানের যে প্রকৃত মূল্যায়ন সেটাও বদিউজ্জামানের ভাগ্যে জোটেনি।
আসলে মানুষের জীবনে কখনো কখনো এমন সব ঘটনা ঘটে যার হিসাব কোনোভাবেই মেলানো যায় না। পদক না পাওয়ার ব্যাপারে আমার বেলায়ও তা-ই ঘটেছে। পাঠক আমি পদক পাইনি কিন্তু ১৯৯২ সালে ১৫ ডিসেম্বর পদক প্রদান অনুষ্ঠান আমাকে আয়োজন করতে হয়েছিল। সেদিনের প্রধানমন্ত্রী যাদের পদক পরিয়ে দিলেন তাদের পদকগুলো আমিই রেওয়াজ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর হাতে এক এক করে তুলে দিয়েছিলাম। তখন পদকপ্রাপ্তদের অনেককে দেখেছি যাদের মুক্তিযুদ্ধে অবদান প্রশ্নবিদ্ধ। আমি আগেও উল্লেখ করেছি রণাঙ্গন থেকে আমার কোম্পানির এক পালিয়ে যাওয়া হাবিলদারও সেদিন পদকপ্রাপ্তদের তালিকায় ছিল। ১৯৭২ সালে পদক দেয়ার ব্যাপারে গেলেন্টারি অ্যাকশনের চেয়ে স্বজনপ্রীতি, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, পক্ষপাতিত্বই বেশি কাজ করেছিল। পাঠক যুদ্ধ ক্ষেত্রে আমার সব অ্যাকশনই যে সফল ছিল তা নয়, তবে পদক পাওয়ার জন্য আমার একটি অ্যাকশনই অর্থাৎ কুমিড়ার লড়াইটিই যথেষ্ট ছিল। আসলে আমি এমন একটি যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছি যেখানে শত্রুপক্ষের একজন কমান্ডিং অফিসারসহ পুরো কোম্পানিই নিহত হয়েছে। এত বড় একটি সাফল্যের পরও আমাকে যখন পদক দেয়া হয়নি সেখানে আর কে পদক পেতে পারে তার বিচার পাঠকরাই করবেন।
শুনতে খারাপ লাগলেও বলছি, আমি এবং আমার মতো অনেকে পদক না পেলেও