২০০৭ সালকে চিহ্নিত করা যায় সিনেমার সফল ১ বছর হিসেবে। ঘটনাবহুল এই বছরে যে ঘটনাটি সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে তা হলো সিনেমার চলমান অশ্লীলতা রোধে টাস্কফোর্স গঠন এবং র‌্যাবের অভিযানে বছর শেষে অশ্লীলতামুক্ত চলচ্চিত্র শিল্প উপহার। প্রায় ৭/৮ বছর ধরে সিনেমা শিল্পের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল উদ্ভট ও অশ্লীল সিনেমা। ঢালিউড তার ঐতিহ্য প্রায় হারিয়ে ফেলেছিল। বছর দুয়েক আগে পরিচালক সমিতির তৎকালীন সভাপতি বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক শহীদুল ইসলাম খোকন এবং তৎকালীন এফডিসির ব্যবস্হাপনা পরিচালক মুসা প্রথমবারের মতো অশ্লীল ছবির বিরুদ্ধে ঝান্ডা তুলেছিলেন। আন্দোলন, মহাসমাবেশ করেও তখন তারা সুফল পাননি। কথিত আছে, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকার ফলে অশ্লীল নির্মাতাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্হা নিতে পারেননি কেউই। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার কিছুদিন পর এফডিসির এমডি হিসেবে যোগ দেন আ ন ম বদরুল আমিন। র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল গুলজার উদ্দিন আহমেদ এবং বদরুল আমিনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় র‌্যাবের মেজর হামিদ আবদুল ওয়াদুদ এবং ক্যাপ্টেন আশেক ইবনে আনোয়ারের নেতৃত্বে শুরু হয় সিনেমার শুদ্ধি অভিযান। ৭/৮ বছর ধরে যে কাজ কেউ করতে পারেননি মাত্র তিন মাসের মধ্যে টাস্কফোর্স তাই করে সর্বমহলে আলোচিত হয়। বছর শেষে সিনেমাকে ঘোষণা করা যায় অশ্লীলতামুক্ত সিনেমা শিল্প হিসেবে।


২০০৭ সালে মোট ছবি মুক্তি পেয়েছে ৯৮টি। এর আগের বছর মুক্তি পেয়েছিল ৯৭টি ছবি। তবে ২০০৬ সালে ছবি মুক্তির তালিকায় অশ্লীল আর উদ্ভট ছবির নামই ছিল বেশি। গত বছরের গোড়ার দিকে একই ধারার ছবি মুক্তির সংখ্যা বেশি থাকলেও বছর শেষে এসে সুস্হধারার বিনোদন ছবি মুক্তির সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। আশার কথা হলো, এ সময় সুস্হধারার বিনোদন ছবিগুলোর ব্যবসা প্রত্যাশিত হওয়ায় এই ধারার ছবি নির্মাণও বেড়ে যায়। আর এর সবই টাস্কফোর্সের সফল অভিযানের ফসল বলে চলচ্চিত্র বোদ্ধারা উল্লেখ করেছেন। ২০০৭ সাল শেষ হয় ঈদুল আজহার ছবি মুক্তির মধ্য দিয়ে। দীর্ঘদিন পর সম্পুর্ণ অশ্লীলতামুক্ত একটি ঈদ উপহার দিয়েছে টাস্কফোর্স। আর তথাকথিত বাণিজ্যিক ছবি ছাড়াও এবারের ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিগুলো ভালোই ব্যবসা করছে। যে কারণে সিনেমার চিহ্নিত কয়েকজন প্রযোজক-পরিচালক এক সময় তর্জনী তুলে যে বক্তব্য দিতেন-‘অতি বাণিজ্যিকতা ছাড়া ছবি চলে না’ তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বরং সুস্হধারার বিনোদন ছবি নির্মাণ করলে তার দর্শক যে এখনো আছে তার প্রমাণ পাওয়া গেছে।


১/১১-এর পর গোটা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে তা থেকে বাদ যায়নি সিনেমা শিল্পও। আগে একটি ছবি সুপার হিট হলে কোটি টাকা ব্যবসা হতো। আর বাম্পার হিট হলে তো কথাই নেই। কিন্তু এখন একটি ছবিকে সুপার হিট বলা হলে বোঝা যায়, কোনো মতে পুঁজি ফেরত পেয়ে কিছু লাভ হবে। আর হিট মানে পুঁজি ফেরতের গ্যারান্টি। সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাওয়া, দর্শক সিনেমাহল বিমুখ হওয়া এবং দ্রব্যমুল্যের ঊর্ধ্বগতির ফলে মফস্বলের সিনেমা হলে দর্শক অনেক কমে গেছে বলে বোদ্ধাদের ধারণা। যে কারণে প্রত্যাশিত রেন্টাল দিয়ে ছবি নিতে চান না সিনেমা হল মালিকরা। সিনেমা হল থেকে অর্থ উপার্জন কমলেও নির্মাণ খরচ বেড়েছে পাল্লা দিয়ে। ফলে প্রযোজকরা পড়েছেন বিপাকে। এখন একটি ভালো ছবি নির্মাণ করতে চাইলে এক কোটি টাকার বেশি গুনতে হয় প্রযোজককে। অথচ এক কোটি টাকার মার্কেট এখন আমাদের নেই। গত বছর শিল্পী সংকটও নির্মাতাদের দারুণ ভুগিয়েছে। শাকিব খান আর অপু বিশ্বাস ছাড়া কারোরই উত্থান হয়নি। বরং সিনিয়র তারকাদের বাজার দর আরো কমেছে। মৌসুমী এবং পুর্ণিমার সিনেমা ছাড়ার ঘোষণা এবং পপি ও শাবনুরের বাজার দর পড়ে যাওয়ায় এককভাবে অপুর ওপর বেশি চাপ পড়ে। অপুও সব ধরনের ছবিতে মানানসই নন, এমন অবস্হায় দারুণভাবে শিল্পী সংকটে পড়েছে ঢালিউড। নায়কদের মধ্যে রিয়াজ, ফেরদৌস, আমিন খান, রুবেলের বাজার দর ছিল পড়তির দিকে। সিনিয়রদের মধ্যে একমাত্র মান্নাই তার অবস্হান ধরে রেখেছেন। আর অপ্রত্যাশিত উত্থান হয়েছে শাকিব খানের। সময়ের এক নম্বর এই নায়ক দেশীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এখন সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত তারকা। নায়ক সংকটের কারণে শাকিব খান ১০/১২ লাখ টাকা করে পারিশ্রমিক পাচ্ছেন। অন্যদিকে মান্না পাচ্ছেন ৬/৭ লাখ টাকা। আর ঢালিউডের বেশির ভাগ ছবিই এখন এই দুই নায়কের হাতে ঘুরপাক খাচ্ছে। নায়িকা সংকটের কারণে নিপুণ, জনাদের উত্থান হলেও এখনো নির্মাতারা তাদের ওপর পুর্ণ আস্হা পাচ্ছেন না। যে কারণে বছর শেষে অনেক প্রযোজক-পরিচালককেই নতুন নায়ক নায়িকা খুঁজতে দেখা গেছে।


২০০৭ সালের সিনেমা শিল্পের মুল প্রবণতা ছিল তারকাবহুল ছবি নির্মাণের প্রতি নির্মাতাদের ঝোঁক এবং সাফল্য। অনেক প্রযোজকই রিস্ক নিয়ে বছরের শুরুর দিকে তারকাবহুল ছবি নির্মাণ শুরু করেন। বছর শেষে এসব ছবি মুক্তি পেলে কাঙ্ক্ষিত সাফল্যও অর্জন করে। একই ছবিতে রাজ্জাক, সোহেল রানা, আলমগীর, ফারুক, ববিতা, সুচরিতাদের মধ্য থেকে ২/৩ জনের পাশাপাশি বাজার কাটতি শিল্পী হিসেবে মান্না, শাকিব খান, শাবনুর, মৌসুমী, পুর্ণিমা, অপুদের নিয়ে ডজন ডজন ছবি নির্মিত হয়েছে গত বছর। সিনেমার নতুন এই প্রবণতাকে শুভ ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন সিনেমা বোদ্ধারা। তবে বছর শেষে সিনিয়র শিল্পীদের আক্ষেপ দেখা গেছে পারিশ্রমিক নিয়ে। হালের তারকারা ৮/১০ লাখ টাকা পেলে তারা কেন দুই লাখ টাকায় ছবি করবেন এমন প্রশ্ন তুলেছেন সিনিয়ররা। তবে টাকার মান, সময় এবং পরিবর্তিত পরিস্হিতির কথা বলে অনেকেই তাদের বোঝাচ্ছেন। সিনেমায় সুস্হ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য তাদের নিয়মিত হওয়া যে জরুরি এটা বোঝাতে পারলেই হয়তো সম্মানীর বিষয়ে আর কোনো প্রশ্ন করবেন না বরেণ্য তারকারা।


বছর শেষে আরেকটি সুখবর হলো বরেণ্যদের ফিরে আসা। দীর্ঘদিন পর রাজ্জাক আবারো ছবি নির্মাণে ফিরেছেন। ছবি নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে প্রাথমিক কাজ শুরু করেছেন আরো অনেক বরেণ্য প্রযোজক-পরিচালক। আর এ কারণেই ধারণা করা হচ্ছে, নতুন বছর হবে সিনেমা শিল্পের জন্য ঐতিহ্য ফিরে আসার বছর। এখন কেবল অপেক্ষা, প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির সীমারেখা একবিন্দুতে মিলিত হওয়ার।

 
**************************
দৈনিক আমারদেশ, ৩০ ডিসেম্বর ২০০৭