National Events - http://events.amardesh.com
অর্থনীতিতে পাহাড়সম ঝুঁকি
http://events.amardesh.com/articles/73/1/aaaaaaaaaa-aaaaaaa-aaaaa/Page1.html
Article Poster
 
By Article Poster
Published on 01/1/2008
 
ব্যতিক্রমধর্মী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অর্থনীতি দ্বিতীয় বছরে পদার্পণ করছে। বিগত ১ বছর বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক নিয়ম অনুসরণ করে চলেনি। বড় ধরনের ভাঙচুর বা বিপ্লবোত্তর স্টাইলে ২০০৭ সাল পার হয়েছে বাংলাদেশ-অর্থনীতির।

অর্থনীতিতে পাহাড়সম ঝুঁকি

ব্যতিক্রমধর্মী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অর্থনীতি দ্বিতীয় বছরে পদার্পণ করছে। বিগত ১ বছর বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক নিয়ম অনুসরণ করে চলেনি। বড় ধরনের ভাঙচুর বা বিপ্লবোত্তর স্টাইলে ২০০৭ সাল পার হয়েছে বাংলাদেশ-অর্থনীতির। এ সময়ে সর্বাত্মক দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়েছে। বড় বড় করপোরেট হাউস ও শিল্প গ্রুপের কর্ণধাররা জেল বা বিচারের সম্মুখীন হয়েছেন। দুর্নীতিগ্রস্তের দীর্ঘ তালিকার বিরাট অংশজুড়ে স্থান হয়েছে শিল্পপতি-ব্যবসায়ীদের। এ সময়ে নিয়মবহিভূêত অবৈধ উপার্জনের রাশ টেনে ধরার চেষ্টা হয়েছে। একই সাথে অতীতের অবৈধ আয়কে রাষ্ট্রের অনুকূলে কেড়ে নেয়ার প্রচেষ্টাও পরিচালিত হয়েছে। সবকিছু মিলে একধরনের বৈপ্লবিক কার্যক্রম চলেছে অর্থনৈতিক অঙ্গনে।

২০০৭ সালের অর্থনীতির চেহারাটা আসলে কেমন ছিল? এ প্রশ্নের জবাব সাধারণ মানুষ খোঁজে একভাবে আর অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা এর জবাব খোঁজেন ভিন্নভাবে। সাধারণ মানুষ তার হিসাব-নিকাশটা করেন নিজের জীবনের ভালো-মন্দ দিয়ে। তার উপার্জন বাড়ছে কি না, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কেমন, আইনশৃঙ্খলাসহ সার্বিক পরিবেশ তার জন্য অনুকূল কি না ইত্যাদি। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদরা দেশের স্থূল অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের গতিধারা, বিনিয়োগ, সঞ্চয়, বৈদেশিক বাণিজ্য, লেনদেনের ভারসাম্য, মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আয়, সরকারের ব্যয় প্রভৃতি সূচকগুলোর প্রতি দৃষ্টি দেন।


নীতিনির্ধারকরা অর্থনীতির স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি এ তিন ধরনের মেয়াদে প্রভাব এবং লক্ষ্য অর্জন নিয়ে কাজ করেন। মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়ার আশায় অনেক সময় এমন কিছু সংস্কার ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয় যার প্রভাব স্বল্পমেয়াদে নেতিবাচক হয়। ১১ জানুয়ারির পট পরিবর্তনের পর দুর্নীতি ও মজুদবিরোধী অভিযানে তাৎক্ষণিক নেতিবাচক প্রভাবকে এভাবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু এসব পদক্ষেপের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া স্বল্পমেয়াদ পেরিয়ে মধ্য মেয়াদে চলতে থাকার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। একই সাথে অর্থনীতির যে সূচক থেকে গতিধারা বা প্রবণতা বিশ্লেষণ করা হয় তার ওপরও এর প্রভাব পড়তে থাকে।

২০০৭ সালে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দেখা দেয় দ্রব্যমূল্য। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুর্নীতি ও মজুদবিরোধী অভিযানের তাৎক্ষণিক প্রভাবের সাথে বারবার বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাত পরিস্থিতিকে নাজুক করে তোলে। অবস্থার আরো অবনতি ঘটায় বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। দুর্নীতি ও মজুদবিরোধী অভিযানে ব্যবসায়ীদের ধরপাকড়ের কারণে প্রাথমিকভাবে আমদানি ও সরবরাহ বিঘ্নিত হয়। কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে সরকারের কিছু সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেয়ার কারণে এবং সমান্তরালভাবে বিডিআরকে বাজারে নামানোর কারণে এ সঙ্কট স্থায়ী হয়নি। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অভ্যন্তরীণ যে উৎপাদন ঘাটতি হয়েছে তা দেশের সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত পর্যায়ে জীবনকে যেমন দুর্বিষহ করে তুলছে তেমনি সামষ্টিক পর্যায়ে আমদানির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।


সবচেয়ে সঙ্কট তৈরি হয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বিপত্তির কারণে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক এলাকাজুড়ে কৃষি উৎপাদন ঘাটতি হওয়ার কারণে। বাংলাদেশের দুই প্রধান খাদ্য হলো চাল ও গম। বিশ্ববাজারে চালের সরবরাহ-কেন্দ্র ভারত-পাকিস্তান থাইল্যান্ড ভিয়েতনাম ও মিয়ানমারে এবার চালের উৎপাদন কম হয়েছে। অন্যদিকে গমের দুই প্রধান সরবরাহকারী যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশে গমের উৎপাদনে বিপর্যয় ঘটেছে। এ কারণে বিশ্ববাজারে গমের দাম মাত্র তিন-চার বছরের ব্যবধানে টনপ্রতি ১২০ মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ৪৫০ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। আর চালের দাম টনপ্রতি একই সময়ের ব্যবধানে পৌনে ২০০ ডলার থেকে বেড়ে ৪০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।


বাংলাদেশে খাদ্যসামগ্রীর বেশিরভাগের উৎস চাল ও গম হওয়ার কারণে খাদ্যসংশ্লিষ্ট সবকিছুর দাম বাড়ছে।


মানুষের জীবন ধারণের ব্যয়ের ক্ষেত্রে খাদ্যশস্যের বাইরে জ্বালানি তেল ও ভোজ্য তেলের জন্য বেশি ব্যয় করতে হয়। জ্বালানি তেলের ব্যয়ের প্রত্যক্ষ প্রভাব ছাড়াও পরোক্ষ প্রভাবও ব্যাপক। বেশ কয়েক বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি চলতে থাকায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে বাড়তে ব্যারেল প্রতি মূল্য শত ডলারের কোঠায় উন্নীত হয়। একই সাথে বাড়ছে ভোজ্য তেলের দাম। বিশ্বের দুই প্রধান ভোজ্য তেল সয়াবিন ও পাম তেলের উৎপাদন প্রবৃদ্ধি হ্রাস ও চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি বায়োফুয়েল হিসেবে ব্যবহারের প্রভাব পড়েছে ভোজ্য তেলের দামে। মাত্র দু’বছরের ব্যবধানে উভয় তেলের আন্তর্জাতিক বাজার দাম দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে গেছে। এর পাশাপাশি গুঁড়ো দুধসহ বিভিন্ন শিশুখাদ্যের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে বিশ্ববাজারে।
২০০৭ সালের বিশ্ববাজারের এ বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্যই শুধু বিরূপ প্রভাব এনেছে তা-ই নয়, এ প্রভাব পুরো এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপজুড়ে পড়েছে। ইউরোপে মাথাপিছু আয় অনেক বেশি বলে দুর্ভোগটা ততটা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেনি। কিন্তু এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোর অধিকাংশের অবস্থা সে রকম নয়। এর প্রভাব বেশ কয়েকটি দেশের নির্বাচনে পড়তে শুরু করেছে। থাইল্যান্ডে দুর্নীতির অভিযোগে সিনাওয়াত্রা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর প্রথমবারের নির্বাচনে তার সমর্থকরা বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোট পরাজয় বরণ করছে। পরবর্তী নির্বাচনে মনমোহন সিংয়ের সরকার আর ক্ষমতায় থাকতে পারবে না বলে মনে করা হচ্ছে। পাকিস্তানে পারভেজ মোশাররফ সরকারের জনসমর্থন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। শ্রীলঙ্কার ক্ষমতাসীন সরকারের জনপ্রিয়তাও কমছে। জনসমর্থনে এ ধস নামার পেছনে মুখ্য কারণ হিসেবে কাজ করেছে দ্রব্যমূল্যের বিষয়টি। তবে প্রতিবেশী দেশগুলোতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে সমভাবে বিপর্যয় ঘটেনি। মূল্যবৃদ্ধির হারও সব দেশে একরকম ছিল না। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির সাথে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ঘাটতি যুক্ত হওয়ার ফলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির হার ছিল বেশি।


বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব খানিকটা বেশি পড়ার আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ডলার নির্ভরতা। ইউরো পাউন্ড ইয়েন রুপিসহ অন্য প্রতিযোগী মুদ্রার তুলনায় গত এক বছরে মার্কিন ডলারের দাম অনেক কমে গেছে। অথচ ডলারের বিপরীতে টাকার মান প্রায় অপরিবর্তিত। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের দেশগুলোতে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ডলারে এলসি’র কারণে বিনিময় হারের সমন্বয়ে গিয়ে দাম বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষত ভারত থেকে বিপুল ভোগ্য পণ্য আমদানির কারণে ডলারের বিপরীতে রূপির দাম বৃদ্ধি আর টাকার দাম আপরিবর্তিত থাকার প্রভাব পড়েছে বাজারে।


নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জন্য অধিক উদ্বেগজনক হয়ে পড়ে যদি একই সাথে তার আয় না বাড়ে। বেশ কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতিতে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তবে এ সময় মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি অর্থনীতির উচ্চহারে বিকাশ যেমন ঘটেছে তেমনিভাবে জনগণের উপার্জনও বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৭ সাল ছিল এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম।


অক্টোবর ’০৭ এর শেষ নাগাদ ১২ মাসের আবর্তক গড় মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। খাদ্য খাতে বার্ষিক আবর্তক গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি। মূল্যস্ফীতির শিকার ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই হলেও এর অধিকতর অসহায় শিকারে পরিণত হয় সীমিত আয়ের দরিদ্র ও হতদরিদ্ররা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো দরিদ্র শ্রেণীর ব্যবহৃত পণ্য ও সেবাসামগ্রীর মূল্যস্ফীতি আলাদাভাবে হিসাব করে না। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘সমুন্বয়’ গত নভেম্বরে চালানো এক সমীক্ষায় দেখিয়েছে একেবারে দরিদ্র ও হতদরিদ্র শ্রেণীতে পড়ে এমন কৃষিজীবী, রিকশাচালক, দিনমজুর, হকাররা তাদের জীবনধারণের ব্যয়ের ৮১.৮৬ শতাংশ খরচ করে খাদ্যের জন্য। আর নভেম্বর মাসে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ২০.৪৯ শতাংশ। এতে দেখা যায় জাতীয় পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির আড়াইগুণ ব্যয় বেড়েছে দরিদ্র শ্রেণীর জীবনযাত্রার খরচ।


এ শ্রেণীটির আয় বৃদ্ধির ওপর এক জরিপ চালাতে শুরু করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। সেপ্টেম্বর ’০৭ মাসের হিসাব অনুযায়ী রিকশাচালক ও মজুর শ্রেণীর গড় মাসিক আয় ৩ হাজার টাকার মতো। এ শ্রেণীর জীবনযাত্রার খরচ ১ বছরের ব্যবধানে ২০ শতাংশের বেশি বাড়লেও আয় বেড়েছে ১০ শতাংশের কম। তবে একই সাথে উদ্বেগজনক দিক হলো বন্যা ও সিডরের কারণে এই শ্রেণীর অনানুষ্ঠানিক খাতের দিনমজুরদের বড় অংশ কাজ হারিয়েছে। এর আগে সড়ক-মহাসড়কের দু’পাশের অবৈধ দোকানপাট আর শহরগুলোতে ভ্রাম্যমাণ হকার উচ্ছেদের কারণেও বড় একটি অংশ শ্রমজীবী কাজ হারিয়েছে। এ ছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের হার শ্লথ হয়ে পড়ার কারণেও নির্মাণ খাতের কর্মসংস্থান কমে গেছে। এসব কারণে ২০০৭ সালে শ্রমজীবীদের অর্থনীতি ছিল এক কথায় বিপর্যয়কর।


অর্থনীতিবিদরা সামষ্টিক পর্যায়ের অর্থনীতির স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের জন্য যেসব সূচকের প্রতি দৃষ্টি দেন এর মধ্যে মূল্যস্ফীতি ও উপার্জন নিয়ে আগেই আলোচনা হয়েছে। বৈদেশিক খাতের তিন প্রধান ক্ষেত্রের মধ্যে রেমিট্যান্স বা প্রবাস আয়ের অবস্থা বেশ ভালো। ২০০৬-২০০৭ অর্থবছরে এ খাতে সাড়ে ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পর জুলাই থেকে অক্টোবর’০৭ পর্যন্ত সময়ে প্রবাস আয় বেড়েছে ২৮.৩৬ শতাংশ। অর্থনীতির দুঃসময়ে এটি গুরুত্বপূর্ণ ত্রাতা হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। অন্যদিকে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির চিত্র আশা-দুরাশার দু’টোই ইঙ্গিত দেয়। ২০০৭-০৮ অর্থবছরের প্রথম দু’মাসে আমদানি ব্যয় ১২.৬৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে আমদানির এলসি বা ঋণপত্র বেড়েছে ২৫.৯৭ শতাংশ। এলসি বৃদ্ধির প্রবণতা অনুযায়ী আগামী দিনগুলোতে প্রকৃত আমদানি ব্যয় আরো বৃদ্ধি পাবে। বিশ্ববাজারে ভোগ্যপণ্য ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমদানি বৃদ্ধির এ হার খুব বেশি নয়। তবে উদ্বেগের দিক হলো আমদানি ভোগ্যপণ্য ও পেট্রলিয়াম খাতেই বেশি বাড়ছে। নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপন না হওয়ার ফলে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বাণিজ্য খাতের আমদানি যেখানে ২৩ কোটি ৪৬ ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে সেখানে শিল্পসংশ্লিষ্ট আমদানি ২ কোটি ডলারের মতো হ্রাস পেয়েছে। শিল্প খাতের মন্দা মানে নতুন কর্মসংস্থানের সঙ্কট, যা সামাজিক অস্থিরতাকে বৃদ্ধি করে।


সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে ২০০৭ সালে রফতানি খাতে সবচেয়ে দুরবস্থা পার হচ্ছে। ২০০৭ সালের জুলাই-আগস্ট দুই মাসে রফতানি ১১.৬৯ শতাংশ কমে গেছে। তৈরি পোশাকের ওভেন ও নিটওয়্যার দুই খাতেই রফতানি কমেছে। আমদানি বৃদ্ধি আর রফতানি হ্রাসের এ প্রবণতার কারণে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের ভারসাম্যে চলতি হিসাবে ৬ কোটি ৮০ লাখ ডলার ঘাটতি দেখা দিয়েছে। অথচ পূর্ববর্তী বছরের ঠিক এ সময়টাতে লেনদেনের চলতি হিসাবে বৈদেশিক মুদ্রা ৩৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত ছিল।


রফতানির গতিধারার উদ্বেগজনক দিক হলো ২০০৮ সালে চীনের ওপর রফতানি নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার আগেই রফতানি কমতে শুরু করেছে। ২০০৬ অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে রফতানি আয় ৩১.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। ২০০৭ সালের একই সময়ে রফতানি ৫.৪ শতাংশ হ্রাস পায়।


বৈদেশিক খাতের এ দুরবস্থার মধ্যে সরকারের রাজস্ব আয়ের চিত্র বেশ ইতিবাচক। ২০০৭ সালের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সার্বিক রাজস্ব আদায় ২১.৮৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ রাজস্ব আদায়ে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের একটি প্রভাব রয়েছে। এ সময়ে আয়কর খাতে ৪৪.৭৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের ৭.৮৫ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধির তুলনায় এ চিত্র বেশ স্বস্তিকর। রাজস্ব আদায়ের এ ধারা সামনে অব্যাহত থাকলে বাজেটের অর্থ সঙ্কুলানের একটি সঙ্কটের সুরাহা হবে। তবে আয়কর রিটার্ন দেয়ার জন্য সময়সীমার কারণে অর্থবছরের প্রথম চার মাসে যে ধারা ছিল তা সামনে অব্যাহত নাও থাকতে পারে।


২০০৭ সালের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ক্ষত ছিল বিনিয়োগ। শিল্প খাতের রুটিন বিনিয়োগের বাইরে দেশী-বিদেশী কোনো বিনিয়োগ বলতে গেলে হয়নি। বেশ কিছু বিনিয়োগ দেশ থেকে বিদেশে স্থানান্তর হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।


২০০৮ সালের সম্ভাবনা ও ঝুঁকি
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ২০০৭ সালের নানা ভাঙচুরের প্রভাব ২০০৮ সালে আরো স্পষ্টতর হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অতি সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে ছয়টি ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঝুঁকির ওপর আলোচনাও করা হয়েছে সতর্কভাবে। এসব ঝুঁকির শীর্ষে রয়েছে মূল্যস্ফীতিজনিত ঝুঁকি। ২০০৮ সাল আসার আগেই প্রতি মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। আটার দাম বাজারে আগেই ৪০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এখন মোটা চালের দামও ৪০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক জ্বালানি তেলের দাম আরেকদফা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। এ সুপারিশ বাস্তবায়নের সাথে সাথে জিনিসপত্রের দাম আবার বৃদ্ধি পাওয়া শুরু হবে।
২০০৭ সালে বিশ্ববাজারে ভোগ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির কথা উল্লেখ আগেই করা হয়েছে। ২০০৮ সালে এ দাম আরো বাড়তে পারে। সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, এ সময়ে জাতিসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি বিভাগের প্রধান জ্যাকস ডিউফ বিশ্বব্যাপী আকালের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘আমরা মারাত্মক এক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছি। এটি হলো আগামী বছরগুলোতে খুবই অল্পসংখ্যক লোক খাদ্যের ব্যবস্থা করতে পারবে। কারণ হলো খাদ্যশস্য উৎপাদনের জমি অন্য খাতে অপ্রত্যাশিতভাবে স্থানান্তর হচ্ছে। খাদ্যশস্যও খাদ্যবহিভূêত খাতে স্থানান্তর হচ্ছে। বিশ্বখাদ্য সরবরাহে দ্রুত অবনতি এবং খাদ্যপণ্যের দাম ইতিহাসের সব রেকর্ড ভেঙে চলেছে। বিশ্বব্যাপী যে হারে খাদ্যশস্য প্রতিদিন ভোগ করা হচ্ছে তার হিসাব অনুযায়ী জরুরি অবস্থা মোকাবেলার জন্য তাদের কাছে মাত্র ১২ সপ্তাহের গম কেনার টাকা এবং আট প্রকারের খাদ্যশস্য সংগ্রহে রয়েছে। এর কারণ হলো, খাদ্যশস্যের চেয়ে এখন অন্য ফসল ফলানো লাভজনক। খাদ্যশস্য জ্বালানি ও পশুখাদ্যেও ব্যবহার হচ্ছে।’ জাতিসঙ্ঘের বিশ্বখাদ্য কর্মসূচির প্রধান জোসেটি শিরানের মন্তব্যটি আরো স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘আমরা আশঙ্কা করছি, প্রকৃত দুর্ভিক্ষের ঝড়ের মুখোমুখি আমরা দাঁড়িয়ে আছি।’


জাতিসঙ্ঘের উপর্যুক্ত দুই কর্মকর্তার অতিসাম্প্রতিক এ বক্তব্যে বিশ্বখাদ্য সরবরাহ পরিস্থিতি কতটা সঙ্কটজনক হতে পারে তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিকভাবে খাদ্য সরবরাহের এ সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে আমাদের দেশের অবস্থা আরো ভঙ্গুর। সিপিডি-ব্র্যাকের হিসাব অনুযায়ী গত দুই দফা বন্যায় ১০ লাখ ৬৭ হাজার টন ধান উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিবিএস এ ক্ষতির পরিমাণ সাড়ে ৮ লাখ টনের কাছাকাছি বলে হিসাব করেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী সিডরে ক্ষতি হয়েছে ১২ লাখ ৯৫ হাজার মেট্রিক টনের খাদ্য উৎপাদন। এই দুই দুর্যোগ মিলে ২৩ লাখ মেট্রিক টনের বেশি খাদ্য উৎপাদন কম হবে। এ অবস্থায় বিশ্বখাদ্য সরবরাহ নাজুক হলে খাদ্যশস্যের দাম ও প্রাপ্যতার অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা ভাবলে শঙ্কিত হতে হয়।


২০০৮ সালে খাদ্যশস্যের দাম বর্তমান স্তর থেকে কমার পরিবর্তে আরো বাড়তে পারে। এ সময়ে দেশে বড় আকারের কর্মসংস্থান হবে এমন কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। দেশের ঐতিহ্যবাহী করপোরেট ও শিল্প গ্রুপের মধ্যে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিবর্তে গুটিয়ে নেয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সরকার অনাবাসী বাংলাদেশী সম্মেলন করে বিকল্প বিনিয়োগের সন্ধান করছিলেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদে কোনো ফল আসার সম্ভাবনা নেই। ফলে ২০০৮ সালে ব্যাপক কর্মসংস্থান বা জনগণের আয়-উপার্জন বৃদ্ধির সম্ভাবনা কম। এ অবস্থায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরো বাড়লে দরিদ্র ও হতদরিদ্রদের অবস্থা বড় রকমের নাজুক পর্যায়ে পৌঁছতে পারে।


কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরেকটি অর্থনৈতিক ঝুঁকি উল্লেখ করার মতো। ২০০৭ সালের পুরোটাজুড়ে রফতানি খাতে মন্দন চলে আসছিল। শেষের প্রায় প্রতিটি মাসে রফতানি আয় কমতে শুরু করে। ২০০৮ সালে চীনের পোশাক রফতানির নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার ফলে বাংলাদেশের পোশাক বড় রকমের প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়বে। মাল্টি ফাইবার চুক্তির অবস্থানের পর সত্যিকার ঝুঁকি সৃষ্টি হবে ২০০৮ সালে চীনের ওপর নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর। এতে দেশের পোশাক খাত রুগ্‌ণ হতে শুরু করলে এ খাতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক নারী শ্রমিক কাজ হারাতে পারে। এতে দেখা দিতে পারে বড় রকমের সামাজিক অস্থিরতা।


২০০৮ সালের আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে। যেকোনো রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব অর্থনীতিতে বড়ভাবে পড়তে শুরু করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানও ২০০৮ সালের নির্বাচন এবং এর পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি অর্থনীতির জন্য উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে বলে উল্লেখ করেছে। ২০০৮ সাল নির্বাচনের জন্য নির্ধারিত সময়। এ সময়ে নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে স্বাভাবিক ক্ষমতা হস্তান্তর হলে নির্বাচনের জন্য বাড়তি ব্যয়টিই শুধু অর্থনীতির ওপর চাপবে। আর নির্বাচন নিয়ে কোনো উদ্বেগ বা হানাহানি হলে অর্থনীতিতে চাপ আরো বাড়তে পারে। সবকিছু মিলিয়ে ২০০৮ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি ও চাপ তৈরি হতে পারে। এ ঝুঁকি মোকাবেলায় সাফল্য সরকারের নীতি নির্ধারকদের পরিণামদর্শী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে অনেকাংশে।


**************************
লেখকঃ  মাসুমুর রহমান খলিলী, সাংবাদিক
দৈনিক নয়াদিগন্ত, ০১ জানুয়ারী ২০০৭