National Events - http://events.amardesh.com
স্মৃতিচারণঃ অগ্নিঝরা মার্চ ১৯৭১ সালের সেই উত্তাল দিনগুলো
http://events.amardesh.com/articles/7/1/aaaaaaaaaaa-aaaaaaaa-aaaaa-aaaa-aaaaa-aaa-aaaaaa-aaaaaaaa/Page1.html
Article Poster
 
By Article Poster
Published on 12/16/2007
 
(আমীন আহম্মদ চৌধুরী, বীরবিক্রম) ১ মার্চ­-৪ মার্চ ১৯৭১ সাল পয়লা মার্চ ১৯৭১ সালে প্রফেসর আর আই চৌধুরীর অনুপ্রেরণায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে (মিলিটারি পারসোন্যাল) এমএ (রাষ্ট্রবিজ্ঞান) পরীক্ষা দিচ্ছিলাম। শেষ প্রশ্নের উত্তর লিখছি। অধ্যাপক অনুপম সেন এসে কানে কানে বললেন, ‘আমীন ভাই আপনি এক্ষুনি চলে যান।’ বললাম, ‘কেন?’ বললেন ইয়াহিয়া খান সংসদ অধিবেশন বন্ধ ঘোষণা করেছে বলে মানুষ ভয়ানকভাবে উত্তেজিত।

স্মৃতিচারণঃ অগ্নিঝরা মার্চ ১৯৭১ সালের সেই উত্তাল দিনগুলো

১ মার্চ­-৪ মার্চ ১৯৭১ সাল
পয়লা মার্চ ১৯৭১ সালে প্রফেসর আর আই চৌধুরীর অনুপ্রেরণায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে (মিলিটারি পারসোন্যাল) এমএ (রাষ্ট্রবিজ্ঞান) পরীক্ষা দিচ্ছিলাম। শেষ প্রশ্নের উত্তর লিখছি। অধ্যাপক অনুপম সেন এসে কানে কানে বললেন, ‘আমীন ভাই আপনি এক্ষুনি চলে যান।’ বললাম, ‘কেন?’ বললেন ইয়াহিয়া খান সংসদ অধিবেশন বন্ধ ঘোষণা করেছে বলে মানুষ ভয়ানকভাবে উত্তেজিত। ছাত্ররা এক্ষুনি মিছিল বের করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আপনি ইউনিফর্মে আছেন এবং সামরিক বাহিনীর জিপ বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। যেকোনো সময় ছাত্ররা হামলা চালাতে পারে­ তাড়াতাড়ি চলে যান।’ ‘উত্তর দেয়া যে এখনো শেষ হয়নি’­ ‘সে পরে দেখা যাবে। কিন্তু তাড়াতাড়ি চলে যান’ তিনি নিজে আমাকে এগিয়ে নিয়ে গেলেন জিপের দিকে।

সেনানিবাসে এসে দেখি কর্নেল ফাতমির নেতৃত্বে ২০ বেলুচ ইতোমধ্যে আইএস (অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা) ডিউটি পালন করার জন্য শহরে চলে গেছেন। ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টার থেকে দুই কোম্পানির সৈনিক নিয়ে ২০ বেলুচকে সাহায্য করার জন্য শহরে তাৎক্ষণিকভাবে যেতে হবে। সৈনিকরা আগেই প্রস্তুত ছিল।

রওনা হওয়ার প্রাক্কালে লে. কর্নেল এম আর চৌধুরী ডেকে বললেন, ‘মিয়া কিসের আইএস ডিউটি? ইয়াহিয়া ইজ অ্যান ইউয়ট­ এ দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে­ এনামকে (কোয়ার্টার মাস্টার) বলো এমজিগুলোর ফুল থ্রু মেরে রাখতে, আর ২০ বেলুচকে শেষ পর্যন্ত বলতে হবে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ তৈরি আছে ভাই আরামছে চলে যাও।’ উনার স্ত্রী বলে উঠলেন, ‘তোমার নাম মুজিবুর রহমান চৌধুরী হলেও তুমি শেখ মুজিব নও। এত কথা বলার কী দরকার।’ রাগতস্বরে কথাগুলো বলে মিসেস চৌধুরী নাস্তার প্লেট এগিয়ে দিলেন। নাস্তা শেষে আমি আমার প্রিয় রেকর্ড প্লেয়ার (টু ইন ওয়ান) ও কিছু রেকর্ড নিয়ে শহরের উদ্দেশে রওনা দেই। ২৫-২৬ মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানিরা আমার অন্যান্য জিনিসপত্রের সাথে রেকর্ড প্লেয়ারটি লুট করে নিয়ে যায়। আর্মি মেডিক্যাল কোরের মেজর সিরাজুল ইসলাম সেটা উদ্ধার করে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে প্রত্যাবর্তন করে উপহার হিসেবে রেকর্ড প্লেয়ারটি আমাকে ফেরত দিয়েছিলেন।

ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের কোম্পানিদ্বয় নিয়াজ স্টেডিয়ামে (বর্তমানে এম এ আজিজ স্টেডিয়াম) অবস্থান নেয়। কিন্তু দায়িত্ব দেয়া হলো শুধু সার্কিট হাউস রক্ষার। বাঙালি বিহারি দাঙ্গা নিরসনকল্পে ব্যক্তিগতভাবে ২০ বেলুচের সাথে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে নাজেহাল হতে থাকলাম। ১ মার্চ ১৯৭১ সালে দুপুর বেলায় পলো গ্রাউন্ডের সামনে প্রথমবারের মতো মিছিলের ওপর থ্রি নট থ্রি রাইফেল (অনুসন্ধান করে জানা গেল) থেকে গুলি করা হলো। পরে জানা যায় যে গুলি করার নেতৃত্বে ছিল পোর্ট ট্রাস্টের অবাঙালি এক ড্রাইভার। এর পরই পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। আমতলা, ঝাউতলা, ফয়েজ লেক এলাকা, ফিরোজশাহ কলোনি, পাহাড়তলি, ওয়্যারলেস কলোনি এলাকা, রেলওয়ে কলোনি এলাকা, বন্দর এলাকা ও অন্যান্য এলাকায় ভয়ানকভাবে বাঙালি-বিহারি দাঙ্গা লেগে যায়। তিন দিনে সম্ভবত ১৮৭ জনকে আহত অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়া হয়। এর ভেতর ৫২ জন বুলেটের আঘাতে আহত ছিলেন। ১৭ জনের মৃতুø ঘটে। বিহারিরা আগেই প্রচুর গুলিসহ থ্রি নট থ্রি রাইফেলের মজুদ গড়ে তুলেছিল। ফলে মিছিলের ওপর প্রায়ই রাইফেলের গুলি নিক্ষিপ্ত হচ্ছিল যত্রতত্র। ঝাউতলা এলাকায় মি ইদ্রিসের বাড়ির আশপাশ এলাকার বিহারিরা তাদের বাড়িগুলো দুর্গ বানিয়ে ফেলেছিল। রীতিমতো রাইফেল নিয়ে একজনের পর একজন পাহারারত থাকত। ৪ মার্চ রাত ১০টার দিকে ঝাউতলা এলাকায় এক বর্ধিষ্ণু বিহারির বাড়ি চেক করতে গেলে লোকজন হকচকিয়ে যায়। মনে হলো কর্নেল ফাতমি তার নিজস্ব সূত্রের মাধ্যমে এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গোপনে বিহারিদের থ্রি নট থ্রি রাইফেল আগেই সরবরাহ করেছিলেন। অন্যদিকে পুরো শহর স্বতঃস্ফূর্ত মিছিলের শহরে পরিণত হয়। কর্নেল ফাতেমি, কর্নেল শিঘ্রি ও অন্যান্য পাকিস্তানির আচার-আচরণ দেখে আমি ক্রমাগত হতাশ ও মর্মাহত হতে থাকি। অথচ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ইয়াহিয়া সরকারের নিরপেক্ষতা এবং সার্বজনীন ভোটাধিকার প্রদানে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। নির্বাচন চলাকালে (ডিসেম্বর ১৯৭০) শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার্থে কর্নেল ফাতমির অনুমতিক্রমে ক্যাপ্টেন আজিজ ফজলুল কাদের চৌধুরীকে তার নির্বাচনী এলাকা রাউজান থেকে তুলে সার্কিট হাউসে নিয়ে আসে। ফজলুল কাদের চৌধুরী মাইক ছাড়াই উচ্চকণ্ঠে বলেছিলেন ‘ক্যাপ্টেন এই ডেডাদের বিশ্বাস করবা না।’ ডেডা মানে হিন্দু তা জানতাম না। আমার চাটগাইয়া সুবেদার বলার পর বুঝতে পারি উনি কি বলেছিলেন। উনি ও উনার ছেলেরা হিন্দু ভোটার ও বিরোধী পার্টির ওপর চড়াও হচ্ছিল যখন তখন যত্রতত্র। হিন্দু ভোটারদের বাড়ি থেকে বের হতে দিচ্ছিল না। হাতাহাতিতে প্রায় ৩৬ জন ছুরিকাঘাতপ্রাপ্ত হন। উনাকে বলা হলো, ‘স্যার কর্নেল ফাতমি ইজ ওয়েটিং ফর ইউ এট দি সার্কিট হাউস।’ তার পরও উনি উনার গুন্ডাদের নিরস্ত্র করছিলেন না। উনার সামনে উনার ছোট ছেলেকে পুলিশ ভ্যানে তুলে ফেলার পর উনি আর্মি জিপে ওঠেন। অবশ্য কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পিন্ডির হুকুমে তাকে রাতেই তার শহরস্থ বাড়িতে পৌঁছাইয়া দিই। কিন্তু তার এলাকায় ফেরত যেতে দেয়া হয়নি এবং পিন্ডি এ বিষয়ে কোনো চাপও সৃষ্টি করেনি। এ ছাড়া প্রলয়ঙ্করী (১২ নভেম্বর ১৯৭০) ঝড়ের পর বঙ্গবন্ধুকে ত্রাণ কর্মকাণ্ড দেখার জন্য সেনা হেলিকপ্টার ব্যবহারেরও অনুমতি দেয়া হয়। অবশ্য ওই সময়ে নির্বাচন চলা অবস্থায় একদিন গভীর রাতে মেজর মেহের কামাল ঘুম থেকে জাগিয়ে আমাকে বললেন, ‘আমীন তুমলে গাতো ইন্ডিপেন্ডেন্ট হু গিয়া’ আমি তো ধড়ফড় করে উঠে বললাম, ‘ক্যায় মজাক কর রাহা’ উনি খুব গম্ভীরভাবে বললেন, তো ‘নেই ভাসানী নে সাফ সাফ বাতা দিয়া ওলাইকুম আসসালাম’­ আমি বললাম, ‘স্যার ইয়ে সব পলিটিক্যাল স্টেটম্যান্ট’ উনি তার পরও ঘাড় নেড়ে আমার কথা মানতে রাজি হলেন না। ১৯৬৮-৬৯ সালে লাহোরে চাকরিরত অবস্থায় আমার পাকিস্তানি বন্ধু খালেদ লতিফ সাদ পিএসসি অফিসার হিসেবে সারদা পুলিশ একাডেমিতে ট্রেনিংয়ে আসার সময় তার মা-বাবা খুব উদ্বিগ্ন ছিলেন। খালেদের মা-বাবা আমাকে তাদের ছেলেসম স্নে করতেন। তারা প্রায় প্রকাশ্যে বলেছিলেন যে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে তাদের ছেলের জীবন প্রচণ্ড রকমের ঝুঁকির মধ্যে থাকবে। কারণ যেকোনো মুহূর্তে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নবাদীরা ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করলে পাক আর্মির সাথে তাদের সরাসরি সংঘাত শুরু হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের এ ধরনের উদ্বিগ্নতা আমাকে খুব আশ্চর্য করেছিল। এ সত্ত্বেও পরে নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন ও সুষ্ঠু ফলাফল আমাকে আরো বেশি করে আশান্বিত করে যে তদানীন্তন পাকিস্তানে একটি সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি হতে যাচ্ছে। রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান একটি শক্ত ভিতের ওপর স্থাপিত হতে চাচ্ছে। তাই জানুয়ারি ১৯৭১ সালে লারকানা ষড়যন্ত্র এবং ২২ ফেব্রুয়ারিতে পিন্ডি ও ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ে রহস্যজনক মিটিং নিয়ে নানান ধরনের গুজবের প্রতি আমি ব্যক্তিগতভাবে তেমন আমল দিইনি। এমনকি জানুয়ারি ১৯৭১ সালে সাহেবজাদা ইয়াকুব প্যারেড পরিদর্শনকালে বাংলায় বক্তৃতাতে বলেছিলেন যে দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে আমাদেরকে অর্থাৎ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকদের সাবধানতার সাথে সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রয়োজনে সাহসের সাথে প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবেলার জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। তার বক্তৃতা আমাদেরকে চিন্তিত করলেও অশান্ত করে তুলেনি। কারণ এ ধরনের একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পর ইয়াহিয়া খান কোনো কারণ ছাড়াই আবার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠতে পারেন এটা অন্তত আমার কাছে অবাস্তব মনে হয়েছে। তাই খোলা মন নিয়েই উ?ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য কর্নেল ফাতমির সাথে নিষ্ঠার সাথে কর্তব্য পালনে সচেষ্ট ছিলাম। অথচ তারা প্রায় সবাই তখন মতবাজ কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ে নানান ধরনের অপকর্ম শুরু করে দেন।

প্রথম দিন ইপিআরের বাঙালি সৈনিকদের বিনা অস্ত্রে এদিক ওদিক ডিউটিতে পাঠানো হচ্ছিল। ইপিআরের সৈনিকরা প্রতিবাদী হয়ে উঠলে তাদেরকে আর বিনা অস্ত্রে পাঠানো হয়নি। ইপিআর হেড কোয়ার্টারে অ্যাডজুটেন্ট হিসেবে বাঙালি অফিসার ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম কর্তব্যরত ছিলেন। ক্যাপ্টেন রফিক অত্যন্ত দক্ষ ও দূরদর্শিতার সাথে তার সৈনিকদের বেশ ভালোভাবে ব্রিফ করে পাঠাচ্ছিলেন। ইপিআরের টু আইসি মেজর ইকবাল প্রায় ক্ষোভের সাথে বলেছিলেন, ‘ইয়ারা আমিন ইয়ে কেয়া হু রাহা হায়?’ তিনি বললেন যে তিনি তার ইপিআরের টুÛপসদের (বাঙালি) অস্ত্র রেখে আগুন নেভাতে বললে তারা তাদের অস্ত্র প্রায় তার দিকেই তাক করে বসে। বাঙালি সৈনিকরা তাদের অস্ত্র সাথে নিয়ে (শিকল দিয়ে বেঁধে) ঘুমাতে যেতে শুরু করে। আমরা বাঙালি সৈনিকদের এই বলে সাবধান করে দিই যে পাকিস্তানিরা বিনা অস্ত্রে বাঙালি সৈনিকদের ডিউটিতে পাঠাতে চেষ্টা করলে বুঝতে হবে যে তারা আমাদেরকে আক্রমণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কোনো অবস্থায়ই অস্ত্র ও গোলাবারুদ পাকিস্তানিদের কাছে জমা করা যাবে না।

২ মার্চ কর্নেল শিঘ্রি সেনানিবাসের সব অফিসারকে ডেকে একটি কনফারেন্স করলেন। মিটিংয়ে যাওয়ার সময় মেজর মেহের কামাল বলে উঠলো ‘ইয়ে আওয়ামী লীগ এক গাদার পার্টি হ্যায় অ্যান্ড শেখ মুজিব হিমসেলফ বেসিকেলি এ ট্রেইটর।’ সাথে সাথে শান্তশিষ্ট ডাক্তার মেজর সিরাজুল ইসলাম মেজর মেহের কামালের প্রায় কলার ধরতে যান। কোনো মতে উনাকে শান্ত করা হলো। মেহের কামাল বললেন, ‘ডক্টর সাব কেয়া হু গিয়ো?’ ডাক্তার উত্তর দিলেন ‘সেভেনটি ফাইব মিলিয়ন পিপল ভোটেড ফর শেখ মুজিব ডু ইউ মিন উই অল আর ট্রেইটরস? শেখ মুজিব রিপ্রেজেন্ট অল অব আস। হু আর ইউ টু কল হিম ট্রেইটর?’ ‘আই অ্যাম সরি’­ উত্তর দিল মেহের কামাল। এদিকে ক্যাপ্টেন এনাম কোয়ার্টার গার্ডে গিয়ে এটেনশান না বলে জয় বাংলা বলে সৈনিকদের এটেনশান করাল­ সে কী উত্তেজনা! এক সময় এনাম রাগতস্বরে বলে উঠল ‘ইট ইজ নট শেখ মুজিব বাট জিন্নাহ ইজ এ ট্রেইটর।’ কর্নেল শিঘ্রি তার বিরুদ্ধে কোর্ট অব ইনকোয়ারি (তদন্ত) প্রায় শুরু করে দিয়েছিলেন।

১ মার্চ থেকে ৪ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রাম শহরে নারকীয় সব হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হতে থাকে। বাঙালি-বিহারি উভয়ই একে অন্যকে নৃশংসভাবে হত্যা করছিল। জীবন্ত মানুষকে হাত-পা বেঁধে জ্বলন্ত বয়লারে নিক্ষেপ করে তাকে জীবন্ত দগ্ধ হতে দেখে রীতিমতো পৈশাচিক হাসি হাসছিল। বাঙালি-বিহারি দাঙ্গার প্রথম প্রহরে (প্রথম দিন) সেনাবাহিনীর প্রচ্ছন্ন মদদে বিহারিরা মিছিলের ওপর হামলা চালিয়ে দাঙ্গা শুরু করলেও দু’দিন পর দাঙ্গা সম্পূর্ণভাবে হাতের বাইরে চলে যায়। ৩ মার্চ রাত ১০টায় রেলওয়ে কলোনি থেকে ডিএস মকবুল আহম্মেদের টেলিফোন পেয়ে ফোর্স নিয়ে গিয়ে মশাল হাতে কয়েকশ’ উন্মত্ত জনতার মাঝখানে অবস্থান নিই। উন্মত্ত জনতা তখন রীতিমতো দুই ভাগে বিভক্ত অবস্থায় একে অপরের মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে একে অন্যকে নিধন করার পাঁয়তারা করছে। ওই দুই জঙ্গি দলকে ঘণ্টা খানেক কসরৎ করে নিরস্ত্র করে তিনটি ফৌজি ট্রাকে করে প্রায় শ’ খানেক মহিলাকে তাদের বাড়ি থেকে সার্কিট হাউসে রাতভর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে রাখতে হয়। ৪ মার্চ ব্রিগেডিয়ার এম আর মজুমদার, পিএসসি, টেলিফোনে জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুবের মৌখিক অনুমতি নিয়ে নিজ দায়িত্বে চট্টগ্রাম অঞ্চলের সামরিক প্রশাসকের দায়িত্বভার স্বহস্তে গ্রহণ করেন। আমাকে আমার সৈনিকদের (বাঙালি) নিয়ে শহরে আইনশৃঙ্খলা পুনঃস্থাপনের দায়িত্ব দেয়া হলো। সার্কিট হাউসে আঞ্চলিক সামরিক প্রশাসকের অফিস স্থাপন করে সার্বক্ষণিক অফিস পরিচালনা করার জন্য ক্যাপ্টেন মহসীন (পরে ব্রিগেডিয়ার ও ৮১ সালের ব্যর্থ কুøতে সম্পৃক্ততার কারণে ফাঁসি হয়) এর সাথে আমাকে দায়িত্ব দেয়া হলো। পাঞ্জাবি-অবাঙালি ট্রুপসকে বলা হলো তারা যেন তাদের লাইনে অবস্থান নেয়। ২০ বেলচুকে সার্কিট হাউস পাহারা দিতে বলা হলো। সাথে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট তাদের নিজস্ব লোকবল ও অধীনস্থ বাঙালি ইপিআর এবং পুলিশসহ সিভিল প্রশাসনের (আওয়ামী লীগসহ) সহযোগিতায় দাঙ্গাপীড়িত সমগ্র শহরের নাজুক অঞ্চলগুলোর ওপরে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করে দুই দিনের ভেতর পরিবেশ শান্ত করতে সক্ষম হয়। দিনরাত কড়া পেট্রোলিং করার ফলে হতাহতের সংখ্যা রাতারাতি শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। এমনকি গ্রিভস ক্রোমটন কোম্পানির বিহারি ইঞ্জিনিয়ার মতিন (বর্তমানে তিনি করাচিতে আছেন) ৫ মার্চ ঝাউতলা এলাকায় দৌড়ে রানিং অবস্থায় আমার জিপে উঠে নিজের জান বাঁচাতে সক্ষম হয়।

৩ এবং ৪ মার্চ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের সিআই লে. কর্নেল এম আর চৌধুরী অষ্টম বেঙ্গলের ক্যাপ্টেন অলি আহমদের (পরে কর্নেল ও বর্তমানে এলডিপি নেতা) সাথে যোগাযোগ করে ওই ব্যাটেলিয়নের টু আইসি মেজর জিয়াউর রহমান, পিএসসি, (পরে লে. জেনারেল ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি) এর মনোভাব সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হন। মেজর জিয়া উচ্চাভিলাষী প্রফেশনাল সৈনিক হওয়ায় আমরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলাম যে তিনি বাঙালির মরণপণ যুদ্ধে আমাদের সাথে যোগ নাও দিতে পারেন। ক্যাপ্টেন অলির মাধ্যমে কর্নেল চৌধুরী আমাদের সেই ভুল ধারণা ভেঙে দেন। অষ্টম ইস্ট বেঙ্গলের বিহারি অফিসার ক্যাপ্টেন সাঈদের পরিবারকে নিরাপত্তাজনিত কারণে মেজর জিয়ার পরিবারের সাথে বসবাস করতে বলা হলো। ইতোমধ্যে ইপিআরের ক্যাপ্টেন রফিক ইবিআরসি, অষ্টম বেঙ্গল ও আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে যোগাযোগ অক্ষুণ্ন রাখেন। তিনি ডা. জাফর, মি. কাইসার, প্রফেসর খালেদ এবং অন্যদের সাথে যোগাযোগ করে নিজ উদ্যোগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথেও যোগাযোগ স্থাপন করেন। সার্কিট হাউসে যোগাযোগ করে সর্বশেষ মিলিটারি বিল্ট আপের খবরাখবর ঢাকায় আওয়ামী লীগ হাইকমান্ডকে জানাতে উদ্যোগী হন। নিরাপত্তাজনিত কারণে বিশেষ করে কর্নেল শিঘ্রি সার্বক্ষণিক খবরদারির কারণে সরাসরি সিভিলিয়নদের সাথে খোলামেলা আলোচনায় আমি তেমন উৎসাহ দেখায়নি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ও ইউওটিসির লে. এনাম (পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছিলেন) সার্কিট হাউসে এসে যোগাযোগ স্থাপন করে তার ইউনিটের একাত্মতা নির্দ্বিধায় ঘোষণা করে গেলেন এবং সব সময় যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন। বন্ধুবর ইঞ্জিনিয়ার ফজলুল্লাহ ও ফিরোজ এবং রহিম শুধু খবর আদান প্রদান করছিলেন না রীতিমতো আড্ডা মেরে বিনোদনের বন্দোবস্ত করছিলেন। সার্কিট হাউসের পাশে রেলওয়ে কলোনিতে অবস্থিত মিসেস মুকবুল সময় অসময়ে চা-নাশতা খাইয়ে দেহটাকে চাঙ্গা রাখতে ভীষণভাবে সহায়তা প্রদান করছিলেন। ঢাকা থেকে ক্যাপ্টেন ইকরামুল মজিদ সাইগল হেলিকপ্টার নিয়ে এলেন। ইশারাতে বললেন যে অবস্থা আরো খারাপের দিকে যাবে। একদিন পর সাহেবজাদা ইয়াকুব পদত্যাগ করলেন। গভর্নর অ্যাডমিরাল আহসানকে অপসরণ করা হলো। দুই প্রজ্ঞাবান সামরিক অফিসারের অপসারণে পরিস্থিতি ক্রমান্বয় ঘোলাটে হতে থাকে। সামরিক প্রশাসক ও গভর্নর হিসেবে এলেন লে. জেনারেল টিক্কা খান। ১৯৬৮-৭০ সালে লাহোরে চাকরি করার সময় জেনারেল টিক্কা খান আমাদের কোর কমান্ডার ছিলেন। জেনারেল বাহাদুর শের ছিলেন আমাদের জিওসি (১১ ডিভিশন) আর জেনারেল নিয়াজি ছিলেন পার্শ্ববর্তী ১০ ডিভিশনের জিওসি।