- Home
- সালতামামী ২০০৭
- এসো হে নতুন (ক্যালেন্ডার কথকতা)
এসো হে নতুন (ক্যালেন্ডার কথকতা)
- By Article Poster
- Published 01/1/2008
- সালতামামী ২০০৭
- Unrated
ইংরেজি নববর্ষ ২০০৮ জাগ্রত দ্বারে। আমাদের দেশে তিনটি ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকার প্রচলন রয়েছে। এই তিনটি ক্যালেন্ডারের মধ্যে এখানে হিজরী সনের আবির্ভাব ঘটে ৬৪০ খ্রিস্টাব্দ মুতাবিক ১৮ হিজরী সনে, আর এই সনটি রাষ্ট্রীয় সন হিসেবে ব্যবহ্নত হয় ৫৯৮ হিজরী মুতাবিক ১২০১ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ারুদ্দীন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী যখন এখানে বিজয় পতাকা উড্ডীন করলেন সেই তখন থেকে। তিনটি ক্যালেন্ডারের মধ্যে দ্বিতীয়টি হচ্ছে বাংলা সন। এটার প্রবর্তক হচ্ছেন মুগল সম্রাট আকবর। হিজরী সন হচ্ছে চান্দ্র সন। এই সনের মাসগুলো কোনো নির্দিষ্ট ঋতুতে স্থির থাকে না। যে কারণে রাজস্ব বা খাজনা আদায়ে দারুণ অসুবিধের সম্মুখীন হতে হতো বিধায় সম্রাট আকবরের নির্দেশে জ্যোতিষ শাস্ত্রে প্রভূত পান্ডিত্যের অধিকারী ফতেহ্উল্লাহ্ সিরাজী ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে হিজরী সনকে সৌর হিসেবে এনে একটি নতুন সনের উদ্ভাবন করেন। তিনি এই সনের হিসেব শুরু করেন সম্রাট আকবরের মসনদে অধিষ্ঠিত হওয়ার বছর ৯৬৩ হিজরী মুতাবিক ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে। ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দে এই নতুন সন সুবা বাঙ্গালায় আসে। এ সনের বাংলা দেশে এসে নামকরণ হয়ে যায় বাঙ্গালা সন বা বাংলা সন, কোথাও কোথাও এর নামকরণ হয় ইলাহী সন বা ফসলী সন। শুধুমাত্র খাজনা আদায়ের ক্ষেত্রে এই সন এখানে ব্যবহ্নত হতে থাকে। এতে শকাব্দের দ্বিতীয় মাস বৈশাখকে প্রথম মাস হিসেবে যুক্ত করা হয়। আর তৃতীয় ক্যালেন্ডারটি হচ্ছে ঔপনিবেশিক বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর আনা ক্যালেন্ডার যা এদেশে এসে সাধারণত ইংরেজী ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত হয়।
ব্রিটিশ বা ইংরেজরা ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন মুতাবিক ১১৭১ হিজরীর ৪ শওয়াল পলাশীর আম্রকাননে রাজবল্লভ, জগৎ শেঠ, উমিচাঁদ, মীরজাফর প্রমুখ বাংলার স্বাধীনতার শত্রম্ন বিশ্বাসঘাতকদের সহযোগিতায় বাংলার স্বাধীনতা-সূর্য রীতিমতো ডাকাতি করে নেয় এবং বাংলার মানুষের উপর পরাধীনতার জগদ্দল পাথর চাপিয়ে দেয়। এদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির উপরও তারা হামলা করে। এদেশে তাদের আনা ক্যালেন্ডারটিও চাপিয়ে দেয়।
এই ক্যালেন্ডাটির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এর সূচনাকাল থেকে ১৫৮২ অব্দ পর্যন্ত এর নাম ছিলো জুলিয়ান ক্যালেন্ডার। সম্রাট জুলিয়াস সীজারের নামে এর এই নামকরণ হয়েছিলো, এমন কি এর ৭ম মাসের নামকরণ জুলাই করা হয় জুলিয়াস সীজারের নামেই। এর পরের মাস আগস্ট সম্রাট অগাস্টাসের নামে। এই ক্যালেন্ডারের প্রথম মাস জানুয়ারীর নামকরণ হয়েছে প্রাচীন কল্পিত রোমান দ্বাররক্ষী দেবতা জানুসের নামে, রণদেবতা মারস্-এর নামে নামকরণ হয়েছে মার্চ মাসের নাম, কল্পিত দেবরাজ জুপিটারের পত্নী জুনোর নামে জুন মাসের নাম হয়েছে।
জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ৫৩২ অব্দে খীশু খৃস্টের জন্ম বছর থেকে হিসেবে করে এই ক্যালেন্ডারের ডেট বা তারিখ লিখে এডি লেখার প্রবর্তন করেন একনিগুয়াস নামক এক পাদ্রী বা খৃস্টান পুরোহিত। এডি হচ্ছে ইভভম ঊমবধভধ-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। লাতীন এই শব্দদ্বয়ের অর্থ হচ্ছে আমাদের প্রভুর বছর। একে আবার ক্রিসিটিয়ান এরা বা খৃস্টাব্দও বলা হয়।
১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের অক্টোবর মাসের ৫ তারিখকে ১৫ তারিখ হিসেবে গণ্য করে রোমের পোপ এয়োদশ সেন্ট গ্রেগরী এই ক্যালেন্ডারটির সংস্কার সাধন করেন, তখন থেকে এর নতুন নাম হয় গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। যাদের মাধ্যমে এই ক্যালেন্ডার আমাদের দেশে এলো সেই গ্রেট ব্রিটেনে এই ক্যালেন্ডার প্রচলিত হয় ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে, তারই এক বছর পর ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে আমাদের দেশে এটি এলো। ব্রিটিশ যেখানেই গেছে সেখানেই এটি নিয়ে গেছে। পৃথিবীর বেশ কিছু দেশ আছে যেসব দেশে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের চল আভ্যন্তরীণভাবে নেই, শুধুমাত্র বৈদেশিক ক্ষেত্রে এই ক্যালেন্ডারের তারিখ ব্যবহার করা হয়। আমাদের দেশে শহুরে জীবনে এই ক্যালেন্ডারের ব্যবহার থাকলেও বৃহত্তর গ্রামীণ জীবনে এর ব্যবহার একেবারে নেই বললেই চলে, আবার বাংলা সনের ব্যবহার গ্রামীণ জীবনে ব্যাপকভাবে রয়েছে। অথচ শহুরে জীবনে একেবারে অনুপস্থিত যদিও ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে সরকারী ও দাপ্তরিক চিঠিপত্রে ইংরেজি-বাংলা উভয় তারিখ লেখার নির্দেশ তদাণীন্তন সরকার দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন ব্যাপক হারে নেই। ব্যতিক্রম হিজরী সন যার ব্যবহার সারা বাংলাদেশে সমানভাবে রয়েছে, এজন্য চাঁদ দেখা কমিটিও রয়েছে।
ইংরেজি নববর্ষ আসে ডিসেম্বরের থার্টি ফাস্ট নাইটে, এর আবির্ভাব ঘটে মধ্য পৌষের মধ্য রাতে প্রচণ্ড শীতের মধ্য দিয়ে। আমাদের দেশে বাংলা নববর্ষ যে আনন্দ বৈভব মেখে গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-বন্দরে পালিত হয় ইংরেজি নববর্ষ কিন্তু শহুরে জীবনের অতি মুষ্টিমেয় বিশেষ মহলে ছাড়া অন্য কোথাও আলোড়ন সৃষ্টি করে না। তবুও ইংরেজি নববর্ষ আসে গোলামীর জোয়ালের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে।
ইংরেজি ক্যালেন্ডার যেহেতু আমাদের নিত্যদিনের তারিখ নির্ধারণে ব্যবহ্নত হয়ে আসছে, তাই এতে যতোই ঔপনিবেশিক গন্ধ থাকুক না কেনো, আমরা এর থেকে মুক্ত হতে পারছি না। আমরা স্বকীয় সত্তা সজাগ হওয়ার কথা বললেও, নিজস্ব সংস্কৃতি সমুন্নত করার কথা বললেও, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বললেও তা যেনো বাত্কা বাত্ বা কথার কথা হয়ে থাকছে। ইংরেজি ক্যালেন্ডার আমাদের স্কন্ধে সিন্দাবাদের সেই দৈত্যটির মতো, সেই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতো এমনভাবে চেপে বসে আছে যে, আমরা একে ছেড়ে দিতে পারছিনে। তাই তো আমরা বলতে বাধ্য হই, হ্যাপী নিউ ইয়ার। শুভ হোক ইংরেজি নববর্ষ ২০০৮।
**************************
লেখকঃ অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম
দৈনিক ইত্তেফাক, ০১ জানুয়ারী ২০০৮