কত স্মৃতি এই বিজয়ের দিনটির সাথে আমার মস্তিষ্কের স্মরণ রেখার মধ্যে আবর্তিত হয়ে চলছে। মনে পড়ছে শরণার্থী হিসেবে কলকাতা মহানগরী ছেড়ে আসার সময় আনন্দবাজারের আর্টিস্ট এবং কবি পূর্ণেন্দু পৌত্রী আমাকে নিয়ে একটি বিদায়ের পরিবেশ তৈরি করে এক লাইটপোস্টের নিচে আরো কয়েকজনের সাথে একটু আনুষ্ঠানিকতা পালন করেছিলেন। এ ব্যাপারে তার একটি প্রবন্ধে ‘সবুজ রুমাল ও রবীন্দ্রনাথ’ বিবরণ লিখে গেছেন। আর শক্তি চট্টোপাধ্যায় তার একটি কবিতায় ‘আল মাহমুদ চলে গেছে’ হৃদয়স্পর্শী বর্ণনা দিয়েছেন। ‘অস্ত্রের গৌরবহীন একা’ শীর্ষক কাব্যগ্রন্থে কবিতাটি আছে। ওই কবিতার একটি লাইন আমার এখনো মনে আছে। সম্পূর্ণ লাইনটা আমি উদ্ধৃত করতে পারব না। তবে বিষয়টি বলতে পারি। শক্তি লিখেছিলেন আল মাহমুদ তোমার মতো আমার ও পৃষ্ঠে মেঘ চোখে জলধারা।

ঢাকায় ফেরার দু-এক দিন আগে আমরা পার্ক সার্কাস এলাকায় যে বাড়িতে ছিলাম সেখানে আমার এক ভাগ্নি, যাদের সাথে আমি শরণার্থী জীবন কাটাচ্ছিলাম। বলেছিল ‘মামা, আমরা বোধহয় আর দেশে যেতে পারব না।’ আমি ওর কথার জবাবে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে উচ্চহাস্য করে বলেছিলাম, ‘নিশ্চয়ই আমরা কয়েক দিনের মধ্যে বিজয়ের বেশে ঢাকায় পৌঁছব।’

আমার ভবিষ্যদ্বাণী দৈবভাবে সফল হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ আমাদের মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানীর একটি লিপ আমার হাতে পৌঁছে। এতে তার নির্দেশ ছিল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঢাকায় চলে যান। যাওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। একটি ভারতীয় সৈন্যবাহী বিমানে আমরা এসে তেজগাঁও বিমানবন্দরে নেমেছিলাম। যারা আমার সঙ্গে ছিলেন তারা সবাই পরিচিত ব্যক্তি। দু’জনের নাম এখন স্মরণে আসছে। একজন সিকান্দার আবু জাফর, অন্য জন কবি আবিদুর রহমান।

আমার স্মৃতিশক্তি অত প্রখর নয়। সব কথা মনে থাকে না। আর থাকলেও এলোমেলো হয়ে থাকে। লিখিত বর্ণনা দিতে গেলে তা আর সম্ভব হয়ে ওঠে না। ঢাকায় এসে সাবেক তেজগাঁও বিমানবন্দরে নেমে মহা কষ্টে আমার সাবেক আবাসস্থল খিলগাঁও বাগিচায় হাজির হয়েছিলাম। এ নিয়ে অনেক কথা আগে লিখেছি। আর পুনরাবৃত্তি করতে চাই না। তবে কলকাতার লেখকদের আন্তরিকতা, নিরাশ্রয়কে আশ্রয় দেয়ার মনোবৃত্তি এবং ভালোবাসার ব্যাপারটা উল্লেখ না করলেই নয়। আমরা তো আর অকৃতজ্ঞ হতে পারি না। তারা ঘরে ঘরে আমাদের টেনে নিয়ে গিয়ে আশ্রয় দিয়েছিলেন। আমরা ভাবতাম এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং যুদ্ধের পর এক স্বাধীন সার্বভৌম বিশাল বাংলাদেশের উদ্ভব ঘটবে। কিন্তু যারা এই যুদ্ধের পরিণাম সম্বন্ধে আন্দাজ করেছিলেন তারা দ্রুত এই যুদ্ধের অবসান কামনা করছিলেন। ফলে সহসাই ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশে প্রবেশ করে হানাদার পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের আয়োজন করে। জেনারেল নিয়াজি ভারতীয় সেনানায়ক জগজিত সিং অরোরার হাতে আত্মসমর্পণ করে তার পিস্তল তুলে দেন। ব্যাপারটা এখানেই মিটে যায়। কিন্তু তখন দেশব্যাপী মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র থেকে বুলেট ছিটকে বেরোচ্ছে। কেউ এত তাড়াতাড়ি যুদ্ধের সমাপ্তি আশা করেনি। আমি ঢাকায় ফিরে আমার পরিবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ি। আমি জানতাম তারা রায়পুরা থানার নারায়ণপুর বাজারের আশপাশে কোথাও আছে। আমি সেখানে পৌঁছে আমার পরিবার-পরিজন নিয়ে বোনের বাড়িতে উঠি। পরে অবশ্য নিজের বাড়ি এবং শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে স্বল্পকালের জন্য আশ্রয় নিয়েছিলাম। কিন্তু ঢাকায় ফিরে আসা জরুরি ছিল বলে এক রকম অসহায় অবস্থায় আমি ঢাকায় ফিরে আসি।

দেশে ফিরে প্রথমে বুঝতে পারিনি যে, বাংলাদেশকে হানাদাররা তাদের ইচ্ছামতো তছনছ করে গেছে। একটা পুলও ছিল না অক্ষত। ভৈরব ব্রিজের একটা অংশ ভেঙে পড়েছিল। সব অবকাঠামো এমনভাবে ভাঙা হয়েছিল যে, এ জাতি যাতে নিজের পায়ের ওপর সিদা হয়ে দাঁড়াতে না পারে। বাইরে থেকে কিছু বোঝা যাচ্ছিল না; কিন্তু কয়েক দিন পরই সচেতন মানুষের কাছে বাংলাদেশ যে একটা ধ্বংসস্তূপ মাত্র তা প্রতীয়মান হতে শুরু করে। আমি গণকণ্ঠ পত্রিকা বের করি। পত্রিকাটি বেরিয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের নানাবিধ বঞ্চনা থেকে রক্ষা করার জন্য। এতে এ দেশের মানুষের যে উপকার হয়েছিল তা এক ঐতিহাসিক ঘটনা। যারা ইতিহাস লিখবেন তারা যদি ব্যক্তিগত ঈর্ষাবশত আমার সে সময়ের ভূমিকা এড়িয়ে যেতে চান তাহলে তা অত্যন্ত গর্হিত অন্যায় হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে কবি ছাড়া আর কিছুই নই। কিন্তু কবি যখন ঐতিহাসিকের দায়িত্ব পালন করেন তখন তা আর স্বপ্ন কল্পনা থাকে না। তা হয়ে ওঠে সত্যেরই সারাৎসার।

আজ যারা বিজয় দিবস পালন করছেন তারা হয়তো ফেলে আসা ইতিহাসের কানা গলিতে ঢুকতে চাইবেন না। কিন্তু আমি নিজে কী করি। কারণ আমি তো এই কানা গলির অন্ধকার অতিক্রম করে আজ জনগণের সামনে সাক্ষ্য দিতে দাঁড়িয়েছি। আমি সাক্ষ্য দেই যে, হাজার বছরের দাসত্বের শৃঙ্খল মোচনের জন্য হাজার হাজার তরুণ যুবক ছাত্র নারী পুরুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে না দাঁড়ালে বাংলাদেশের স্বাধীন সার্বভৌম অস্তিত্ব ও বিজয় পতাকাটি সেদিন উড্ডীন করা সম্ভব হতো না। অনেকের অনেক ক্ষতি হয়েছে। জান-প্রাণ, ধন-দৌলত চিরকালের জন্য নষ্ট হয়ে হাতছাড়া হয়ে বিপর্যস্ত হয়ে শেষ হয়ে গেছে। কে করবে তাদের ক্ষতিপূরণ। না, কেউ করেনি। শুধু এই বিজয় দিবসটি ছাড়া তারা আর কোনো কিছু পায়নি। জান-প্রাণ, মাল-ইজ্জত ধুলায় লুণ্ঠিত হয়েছে, যার ক্ষতিপূরণ আর সম্ভব নয়। তবে কবি হিসেবে এই বিজয় দিবসের জন্য আমার প্রায় সবকিছু আমি উজাড় করে দিয়েছিলাম। এখন সবুজের মধ্যে ওই লাল সূর্যখচিত পতাকাটি দেখলে আমার কেবলই মনে হয় এর মধ্যে লেগে আছে আমার শ্রম, আমার ঘাম, আমার রক্ত এবং আমার কবিত্ব শক্তি।
 

************************
লেখকঃ আল মাহমুদ
দৈনিক নয়াদিগন্ত, ১৬ ডিসেম্বর ২০০৭