- Home
- সালতামামী ২০০৭
- আন্তর্জাতিকঃ ২০০৭
আন্তর্জাতিকঃ ২০০৭
- By Article Poster
- Published 01/1/2008
- সালতামামী ২০০৭
- Unrated
নতুন বছরের আনন্দ উচ্ছ্বাসের মধ্যেও একটা শঙ্কা কাঁটার মত বিঁধে রইবে বিশ্ববাসীর মনে। এই শঙ্কা শুধু আগামী বছরের জন্য নয়। দশকের পর দশক ধরে যত দিন যাচ্ছে, ততই তা বেড়ে চলেছে। সেটা হল, বিশ্বে জলবায়ুর পরিবর্তন। মানুষ এযাবৎকাল যত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে, এটা তার মধ্যে সবচেয়ে কঠিন বলে ধারণা করছেন পরিবেশবিদরা। মানব সৃষ্ট এই পরিস্থিতির পরিবর্তন না ঘটাতে পারলে মানুষ তথা বিশ্বের প্রাণবৈচিত্র্য মারাত্মক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। এ কথাটি মাথায় রেখে সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়ার বালিতে হয়ে গেল জলবায়ুর পরিবর্তন সংক্রান্ত জাতিসংঘ শীর্য় সম্মেলন। তবে সেখানে এমন কিছু ঘটেনি যাতে মানুষ বড়রকম কিছু আশা করতে পারে। ২০০৭ সাল ছিল পাকিস্তানের জন্য অত্যন্ত ঘটনাবহুল। ইরাকের মাটি বারবার রক্তে ভিজেছে। এটা আর কোন নতুন খবর নয় বিশ্ববাসীর জন্য। আফগান পরিস্থিতিও মোটামুটি একই। ইরানের পরমাণু কর্মসূচির বিরুদ্ধে আরো বেশি সোচ্চার হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো। এমনকি ইরানের ওপর হামলার আশঙ্কাও দেখা দেয় কয়েক বার। বছরের শেষ দিকে হঠাৎ করেই সংবাদ শিরোনামে চলে আসে মিয়ানমার। গণতন্ত্রের দাবিতে নতুন করে সোচ্চার হয় সাধারণ মানুষ। রাস্তায় নামেন বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও।
২০০৭ সালটা এশিয়াবাসীর কাছে হাজির হয়েছিল একটা দীর্ঘশ্বাসের মত হয়ে। বছর শুরুর মাত্র দু’দিন আগে ৩০শে ডিসেম্বর রাতে ফাঁসি হয়ে যায় ইরাকের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের। শাসক হিসাবে সাদ্দাম হোসেনের সুনাম দুর্নাম দুইই ছিল। তবে একজন নির্বাচিত সাবেক প্রেসিডেন্টকে যেভাবে, যে প্রক্রিয়ায় ফাঁসিতে ঝোলানো হয়, তা এশিয়াবাসীর কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। যে কারণে তার ফাঁসির মাত্র ৫ দিনের মাথায় সাদ্দাম হোসেনের এই মামলার প্রথম প্রধান বিচারপতি নিজেই ঘোষণা করেন, সাদ্দামকে যেভাবে ফাঁসি দেয়া হয়েছে, তা বেআইনী। ৭ জানুয়ারি মালয়েশিয়ার অবিসংবিদিত নেতা মাহাথির মোহম্মদ বলেন, সাদ্দাম হোসেনের হাতে যত রক্ত তার চেয়ে অনেক বেশি রক্ত বুশ-ব্লেয়ারের হাতে। সাদ্দামের ফাঁসিকে ঘিরে এই অসন্তোষ নিয়েই ২০০৭ সালের সূচনা হয় এশিয়ায়। সাদ্দামের ফাঁসি ইরাকে শান্তি বয়ে আনতে পারেনি। রক্ত ঝরছে প্রতিদিনই। বছরের প্রথম দিনেই জাতিসংঘ মহাসচিব হিসাবে কফি আনানের মেয়াদ শেষ হয় এবং অষ্টম মহাসচিব হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন দক্ষিণ কোরিয়ার বান কি মুন।
ছয় বছর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের ঘোষিত সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ গত বছরও অব্যাহত ছিল। ২০০৭ সালে তাই মাঝে মাঝেই এ বিষয়টি বড় হয়ে হাজির হয়েছে বিশ্ববাসীর সামনে। ৯ জানুয়ারি মুসলিম জঙ্গি দমনে মার্কিন বিমান হামলা চালায় সোমালিয়ায়। প্রাণ হারায় বহু মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রের এই জঙ্গি দমন অভিযানের পাশাপাশি যুক্ত হয় ইরান ও উত্তর কোরিয়ার পরমাণু কর্মসূচি। ইরানের বিরুদ্ধে কয়েক দফায় বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এমনকি ইরানের পরমাণু স্থাপনার ওপর বিমান হামলার আশঙ্কাও দেখা দেয়। ৭ জানুয়ারি লন্ডন থেকে প্রকাশিত সানডে টাইমস পত্রিকায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয় যে, ‘বুশ প্রশাসনের সহায়তায় ইসরাইল কি ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে যাচ্ছে, ইসরাইল সরকার এধরনের পরিকল্পনার কথা অস্বীকার করলেও পত্রিকাটি ইসরাইলের ঊর্ধ্বতন সামরিক বেসামরিক কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং ইরানের প্রতি মার্কিন মনোভাবের উল্লেখ করে জানায়, তাদের এ আশঙ্কা মোটেই অমূলক নয়। পত্রিকাটি আরো জানায়, ইরানের ওপর এধরনের হামলা হলে দক্ষিণ এশিয়া ও পারমাণবিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে। সারা বছর জুড়ে এমন একটি আশঙ্কা এশিয়াবাসীদের মনে ছিলই যে, ইরানের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে না তো? অন্যদিকে যে কোন হামলার দাঁতভাঙ্গা জবাব দেয়ারও দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে ইরান। ২১ জানুয়ারি ক্ষেপনাস্ত্র যুদ্ধের মহড়াও শুরু করে তারা।
গত বছরের শুরুর দিকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন কিউবার নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো। ভাইয়ের হাতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে ১৬ জানুয়ারি তিনি ভর্তি হন হাসপাতালে। এর পর থেকে মাঝে মাঝেই তার সুস্থতা-অসুস্থতার খবর এসেছে প্রচারমাধ্যমে। বছরের শেষদিকে তিনি খানিকটা সুস্থ হয়ে উঠলেও দেশ পরিচালনার ভার নিজের হাতে নেয়ার মত অবস্থায় ফিরে আসেননি।
ইরাকের রাজধানী বাগদাদে ২২ জানুয়ারি এক ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয় শতাধিক মানুষ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ বুঝতে পারেন, এত কিছুর পরও ইরাক পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং সেখানে মার্কিন সৈন্যদের প্রাণহানিতে বিরূপ মনোভার সৃষ্টি হচ্ছে তার দেশেও। তাই তিনি ২৪ জানুয়ারি স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে দেশবাসীর উদ্দেশে বলেন, ইরাকে ব্যর্থ হলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। তাই তিনি আরেকবার সুযোগ চান। তবে এর চার দিন পর ২৮ জানুয়ারি যুদ্ধ বিরোধী লাখলাখ মানুষের পদভারে কেঁপে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন। ইরাক থেকে অনতিবিলম্বে মার্কিন সৈন্য ফিরিয়ে নেয়ার দাবি জানায় তারা। ২৯ জানুয়ারি মার্কিন বাহিনী ব্যাপক অভিযান চালায় ইরাকে। নিহত হয় ৩শ’ লোক। নিহতরা সবাই জঙ্গি বাহিনীর সদস্য বলে দাবি করে মার্কিন বাহিনী।
ফেব্রুয়ারি মাসের ২ তারিখে বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শতাব্দীর শেষ নাগাদ বিশ্বের তাপমাত্রা আরো কয়েক ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাবে। এতে গলে যাবে লাখ লাখ বছর ধরে জমাট বাঁধা বরফ। বেড়ে যাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। ডুবে যাবে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহুদেশের উপকূলীয় এলাকা। এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য প্রতিবেদনে মানুষকে মানুষের কর্মকাণ্ডকে দায়ী করা হয়। জলবায়ুর উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বিশ্বে প্রাকৃতিক দুর্যোগও বেড়ে গেছে আগের তুলনায় অনেক বেশি। ফেব্রুয়ারি মাসের ১৭ তারিখে পাকিস্তানের কোয়েটার এক আদালতে আত্মঘাতী হামলায় নিহত হন বিচারকসহ প্রায় ২০ জন। একই দিন নিউ স্টেটসম্যান পত্রিকায় প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়, ইরানে হামলার যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ। ১৯ তারিখে ভারত থেকে পাকিস্তান গামী ট্রেনে বোমা হামলায় নিহত হয় ৬৭ জন। এর দুই দিন পর ২১ ফেব্রুয়ারি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পরমাণু যুদ্ধবিরোধী ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
মার্চ মাসের ২ তারিখে এক ভয়াবহ টর্নেডোতে লণ্ড ভণ্ড হয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গরাজ্য। একই মাসের ৬ তারিখে ইন্দোনেশিয়ায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে প্রাণ হারায় শতাধিক মানুষ। একই দিন কারবালার পথে পূন্যার্থীদের ওপর আত্মঘাতী হামলায় নিহত হয় ৯০ জন। মার্চ মাসের ৯ তারিখটি পাকিস্তানের রাজনীতিতে একটি মোড় ঘোরানোর দিন। এদিন প্রধান বিচারপতি ইফতিখার মোহাম্মদ চৌধুরীকে বরখস্ত করেন প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশাররফ। বলাচলে এটা ছিল তার এ যাবৎকালের শাসনামলে সবচেয়ে বড় ভুল। এরপর দেশের আইনজীবী ও রাজনীতিবিদগণ এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মোশাররফের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। জেনারেল মোশাররফ প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে অসদাচারণ ও ক্ষমতা অপব্যবহারের অভিযোগ এনেছিলেন এবং তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
মার্চ মাসের ১৪ তারিখে পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার নন্দীগ্রামে শিল্প কারখানার জন্য জমি অধিগ্রহণের প্রতিবাদে আয়োজিত এক সমাবেশে পুলিশ গুলি চালালে ১৩ জন কৃষক নিহত এবং ৫০ জন আহত হন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের এই রাজ্যে ক্ষমতাসীন বামফ্রন্ট সরকারের প্রধান শরিক দল সিপিএম বেকায়দায় পড়ে যায়। সারা রাজ্যে প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যায়। যার রেশ এখনো কাটেনি।
১৬ তারিখে পাকিস্তানের আইনজীবীরা প্রধান বিচারপতিকে বরখাস্ত করার প্রতিবাদে ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ২১ মার্চ পাকিস্তানের ওয়াজিরিস্তানে উজবেক জঙ্গি আর স্থানীয় উপজাতীয়দের লড়াইয়ে কমপক্ষে ১৬০ জন প্রাণ হারায়। ২৪ মার্চ তারিখে পরবর্তী ১৮ মাসের মধ্যে ইরাক থেকে সমুদয় মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট বুশের প্রতি নির্দেশ সম্বলিত একটি ঐতিহাসিক বিল পাশ হয় মার্কিন কংগ্রেসে। ক্ষুব্ধ হন প্রেসিডেন্ট বুশ। ভোটাভুটির শুরুতে বুশ প্রস্তাবের ওপর ভেটো প্রয়োগের হুমকি দিয়ে ভাষণ দেন। তবে শেষ পর্যন্ত ২১৮-২১২ ভোটের ব্যবধানে পাশ হয়ে যায় বিলটি। এর একদিন পর ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ইস্যুতে তেহরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। ২৫ মার্চ ইয়েমেন উপকূলে একটি জাহাজ থেকে বহু শরণার্থীকে সাগরে নিক্ষেপ করে পাচারকারীরা। এতে মারা যায় শতাধিক। মৃতদের অধিকাংশই ইথিওপীয় শরণার্থী। ৩০ মার্চ ইরাকের কয়েকটি মার্কেট ও যানবাহনে আত্মঘাতী হামলায় কম করে হলেও ১১৭ জন প্রাণ হারায়।
এপ্রিল মাসের ৪ তারিখে পাকিস্তানের আফগান সীমান্তবর্তী এলাকার জঙ্গিরা আল-কায়েদা উচ্ছেদের ফতোয়া জারি করে। আল-কায়েদার সঙ্গে তাদের সংঘর্ষে নিহত হয় ৪৪ জন। বাংলার বিশিষ্ট শিশু সাহিত্যিক লীলা মজুমদার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ৬ এপ্রিল। প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক উপেন্দ্র কিশোর রায়চৌধুরীর কন্যা ও সত্যজিৎ রায়ের ফুফু এই শিশু সাহিত্যিকের বয়স হয়েছিল ৯৯ বছর। এ মাসের শুরুর দিকে তুরস্কের সমস্ত বিরোধীদল ও সেনাবাহিনী এক যোগে ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে অবস্থান নিলে দেশটিতে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়। ১৫ এপ্রিল ধর্মনিরপেক্ষতার সমর্থনে তিন লক্ষাধিক লোকের বিক্ষোভ সমাবেশ হয় রাজধানী আঙ্কারায়। ১৬ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার ব্ল্যাকসবার্গ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এক উন্মত্ত বন্দুকধারীর গুলিতে ৩৩ জন নিহত হয়। আহত হয় ২১ জন। এ ঘটনায় প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যায় গোটা আমেরিকায়। ২৪ বছর বয়স্ক এক চীনা বংশোভূত যুবক এ কাণ্ড ঘটায় বলে এফবিআই কর্মকর্তারা জানান। ১৮ তারিখে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে সুপ্রিম কোর্ট ভবনের সামনে শত শত আইনজীবী প্রধান বিচারপতি ইফতিখার মোহম্মদ চৌধুরীকে অপসারণের প্রতিবাদে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। তারা ‘মোশাররফ বিদায় হও বলে স্লোগান দেয়। এদিন আড়াইশ’ বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ইরাকে প্রতিদিন নিরীহ মানুষের মৃত্যুতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন। ২৩ এপ্রিল ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত হয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এ নির্বাচনে বামপন্থী মহিলা প্রার্থী সেগোলেন রয়্যালকে হারিয়ে কট্টর ডানপন্থী নিকোলাই সারকোজি জয় লাভ করেন। সারকোজি পান ৩০ শতাংশ ভোট আর সেগোলেন রয়্যাল পান ২৬ শতাংশ। এদিন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার(হু) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সড়ক দুর্ঘটনায় ১২ লাখ মানুষ মারা যায় প্রতিবছর এবং এর বেশিরভাগ ঘটনা ঘটে এশিয় ও আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলোতে।
মে মাসের ৩ তারিখে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন আফগানিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আবদুল সবুর ফরিদ(৫০)। তাকে কেন হত্যা করা হয় তার কারণ সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জোনারেল পারভেজ মোশাররফ সাবেক প্রধান বিচারপতি ইফতিখার মোহম্মদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ সম্পর্কে যে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন মে সুপ্রিম কোর্ট তা স্থগিত করে দেয়। মে মাসের ৭ আর ৮ তারিখে ফ্রান্সে ব্যাপক দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থীর সমর্থকরা এদিন শতশত গাড়ি ভাংচুর করে। পুলিশের সাথে সংঘর্ষ হয় দফায় দফায়। পরাজিত প্রার্থী সেগোলেন রয়্যাল অবশ্য তার সমর্থকদের প্রতি সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানান। ১১ মে গর্ডন ব্রাউনকে নিজের উত্তরসুরী হিসাবে সমর্থন দেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। ১২ তারিখে পাকিস্তানের করাচি নগরীতে সাবেক প্রধান বিচারপতি ইফতিখার মোহম্মদ চৌধুরীর আগমন উপলক্ষ্যে আইনজীবী ও বিরোধী দলীয় কর্মীরা সমাবেশের আয়োজন করলে সরকার সমর্থকরা তাদের ওপর হামলা চালায়। সরকার সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষে নিহত হয় ৩০ জন, আহত হয় শতাধিক। এদিন গ্রেপ্তার হয় ৮শ’ জন। এর প্রতিবাদে পরদিন বিক্ষোভে ফেটে পড়ে করাচি। আগের দিনের সংঘর্ষে নিহতদের লাশ নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় মিছিল করে বিরোধী দলীয় সমর্থকরা। সমস্ত বিরোধী দল এক যোগে ধর্মঘট আহ্বান করে সারা দেশে। ১৩ মে আফগানিস্তানে শীর্ষস্থানীয় তালেবান কমান্ডার মোল্লা দুদুল্লাহ নিরাপত্তা বাহিনীর এক অভিযানে নিহত হন। ১৪ তারিখে ধর্মঘটে অচল হয়ে পড়ে গোটা পাকিস্তান। করাচিতে বিক্ষোভ দমন করলে দেখামাত্র গুলির নির্দেশ জারি করা হয়। ১৫ তারিখে পেশোয়ারের এক হোটেলে আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হয় ২৫জন। নিহতদের অধিকাংশই ছিল আফগান। ১৬ মে ইরাকে ক্লোরিন বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয় ৩২জন। বাগদাদের সবচেয়ে সুরক্ষিত গ্রিন জোনেও এদিন প্রচণ্ড বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ১৮ তারিখে ভারতের হায়দারাবাদ শহরের ঐতিহাসিক মক্কা মসজিদে জুমা নামাজ আদায়কালে এক শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণে ৯ জন নিহত ও ৩৫জন আহত হয়। এর প্রতিবাদে আহুত বিক্ষোভে যোগদানকারীদের ওপর পুলিশ গুলিবর্ষণ করলে নিহত হয় আরো ৪জন।
জুন মাসের প্রথম দিনেই এক ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্ট। এই রায়ে বলা হয়, জেনারেল পারভেজ মোশাররফ জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে কোন ব্যক্তি নন। পাকিস্তানের ইতিহাসে সুপ্রিম কোর্ট এই প্রথমবারের মত বলে, আদালত যে কোন বিষয়ে মোশাররফের কাছে কৈফিয়ত তলব করতে পারে। ২ তারিখে পারভেজ মোশাররফ ঘোষণা করেন সামরিক উর্দি পরেই তিনি আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেবেন। ৮ জুন মার্কিন সিটেনে অ্যামনেস্টি বিলটি পাশ না হলে সে দেশে অবস্থানরত সোয়া কোটি অবৈধ অভিবাসী ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ১৪ তারিখে নেপালে রাজতন্ত্র বিলোপের ক্ষমতা পায় পার্লামেন্ট। দুই তৃতীয়াংশ পার্লামেন্ট সদস্য রাজতন্ত্র বিলোপের পক্ষে ভোট দিলে দেশটির রাজতন্ত্র বিলোপ হয়ে যাবে। ১৯ জুন বাগদাদের ঐতিহাসিক আল-খিলানি মসজিদে ট্রাক বোমা হামলায় নিহত হয় ৭৫জন। বিস্ফোরণে মসজিদটির প্রধান কক্ষ সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। এর একদিন পর ইরাকের পুলিশ সদরদপ্তর ও বাগদাদের মেয়র অফিসে বোমা হামলায় নিহত হয় ১৬জন। এই দিন ও তার আগের দিনে ইরাকের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে নিহত হয় ১৪ মার্কিন সৈন্য। ২৪ তারিখে কেমিক্যাল আলিসহ সাদ্দাম হোসেনের আরো ৩ সহযোগী মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়। ব্রিটেনে টনি বেস্নয়ার যুগের অবসান হয় ২৭ তারিখে। তিনি পদত্যাগ করার পর দেশের ৫২তম প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন গর্ডন ব্রাউন। এর আগে তিনি টনি বেস্নয়ার সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। ২৯ তারিখে মার্কিন সিনেটে অভিবাসন আইন সংস্কার প্রস্তাবটিও বাতিল হয়ে যায়। ফলে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে সে দেশের অবৈধ অভিবাসীরা।
জুলাই মাসের ৩ তারিখে ইসলামাবাদের লাল মসজিদ ও মাদ্রাসায় অবস্থানরত জঙ্গি ও ছাত্রদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে নিহত হয় ১১জন। তবে এর মধ্য দিয়ে এই মসজিদ এবং সরকারের মধ্যে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। নিরাপত্তা বাহিনী এই মসজিদ কমপ্লেক্সে অবস্থানরত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও জঙ্গিদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানালেও তারা তা উপেক্ষা করে। ৬ তারিখে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফের বিমান লক্ষ্যকরে রাওয়ালপিন্ডির একটি ভবনের ছাদের ওপর থেকে বিমান বিধ্বংসী কামানের সাহায্যে গুলি চালানো হয়। এতে মোশাররফের বিমান অক্ষত থাকে। তবে এসময় তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ৩২ রাউন্ড গোলা ছোড়া হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমের খবরে বলা হয়। ৮ তারিখে লাল মসজিদ কমপ্লেক্সে অবস্থানরতদের আত্মসমর্পণের জন্য চূড়ান্ত নির্দেশ দেন জেনারেল মোশাররফ। ১১ জুলাই শেষ রাত থেকে টানা ১৫ ঘন্টা লড়াইয়ের পর লাল মসজিদ নাটকের অবসান ঘটে। এতে ১২ সৈন্যসহ নিহত হয় শতাধিক। ৫০ জঙ্গিকে আটক করা হয়। মুক্ত করা হয় ৫৪ জন মহিলা ও শিশুকে। এদের জিম্মি হিসাবে কমপ্লেক্সে আটক রাখা হয়েছিল। সংঘর্ষে মসজিদের ইমাম আব্দুর রশিদ গাজি প্রাণ হারান। এ মাসের ১৯ তারিখে পাকিস্তানের সীমান্ত প্রদেশে এক আত্মঘাতী হামলায় নিহত হয় ৫৭ জন। এদের অধিকাংশই পুলিশ।
বিশে জুলাই তারিখে এক যুগান্তকারী রায় দেয় পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতি খলিলুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত ১৩ বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ ইফতিখার মোহম্মদ চৌধুরিকে প্রধান বিচারপতি পদে পুনর্বহাল করে। তাকে বরখাস্ত করে দেয়া প্রেসিডেন্টের আদেশকে অবৈধ ঘোষণা করে এই বেঞ্চ। সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশের ফলে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যান প্রেসিডেন্ট জেনারেল মোশারফ। ২৫ জুলাই তারিখে ভারতের প্রথম মহিলা রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন প্রতিভা পাতিল(৭২)। তিনি রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালামের স্থলাভিষিক্ত হন। আফগানিস্তানের সাবেক বাদশাহ জহির শাহ(৯২) ইন্তেকাল করেন ২৪ জুলাই।
ভারত মার্কিন পরমাণু সহযোগিতা চুক্তি চূড়ান্ত হয় আগস্ট মাসের ৪ তারিখে। ৬ আগস্ট সৌরজগতের বাইরে বৃহষ্পতির ১ দশমিক ৭ গুণ বড় গ্রহের সন্ধান মেলে। এর আগে এত বড় গ্রহের সন্ধান পাননি জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। ১৫ আগস্ট ইরাকের উত্তরাঞ্চল জুড়ে ধারাবাহিক আত্মঘাতী বোমা হামলায় আড়াই শ’ লোক নিহত ও তিন শতাধিক আহত হয়। ইয়াজিদি নামের এক ছোট্ট শহরে এই ভয়াবহ বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। ১৭ তারিখে পেরুতে এক প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পে প্রাণ হারায় ৫শতাধিক মানুষ। তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে সরকার। রিখটার স্কেলে এ ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৮। পাকিস্তানের নির্বাসিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দেশে ফিরতে বাধা নেই বলে ২৩ আগস্ট রায় দেয় সুপ্রিম কোর্ট।
সেপ্টেম্বরের ৪ তারিখে রাওয়ালপিন্ডিতে জোড়া বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয় ২৯জন। বিশ্বনন্দিত অপেরা গায়ক লুচিয়ানো পাভারোত্তির(৭২) জীবনাবসান ৫ তারিখে। ইতালির মোদেনা শহরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। ১০ তারিখে পাকিস্তানের নির্বাসিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ দেশে জেদ্দা থেকে বিমানযোগে দেশে ফিরলেও তাকে বিমান থেকে নামতে দেয়া হয়নি। তাকে ফের জেদ্দা পাঠিয়ে দেয়া হয়। মিয়ানমারে গণতন্ত্রের দাবিতে সামরিক জান্তা বিরোধী বিক্ষোভ শুরু করে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা। ২৬ সেপ্টেম্বর নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ৫ বৌদ্ধ ভিক্ষু প্রাণ হারান। গণতন্ত্রকামী মানুষের ওপর ব্যাপক দমন নির্যাতন শুরু করে সামরিক জান্তা। প্রতিবাদের ঝড় ওঠে সারা বিশ্বে। ২৭ তারিখে ইসলামাবাদের লাল মসজিদ ফের খুলে দেয়া হলে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা সেখানে ঢুকেই আবার তা দখল করে নেয়ার চেষ্টা চালায়। এক ছাত্রের আত্মঘাতী বোমা হামলায় মসজিদ চত্ত্বরে নিহত হয় ১২ জন।
অক্টোবর মাসের ১৬ তারিখে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়া হয় সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোরকে। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন রোধ সংক্রান্ত একটি প্যানেল এবং তাকে যৌথভাবে এই পুরস্কার দেয়া হয়। দীর্ঘ ৮ বছর স্বেচ্ছা নির্বাসনে কাটানোর পর ১৮ অক্টোবর স্বদেশের মাটিতে পা রাখেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো। তাকে স্বাগত জানাতে করাচি বিমানবন্দরে মানুষের ঢল নামে। বেনজিরের গাড়ি বহর বিশাল মিছিল নিয়ে করাচি শহর প্রদক্ষিণের সময় তাকে লক্ষ্য করে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানো হয়। এতে বেনজির রক্ষা পেলেও নিহত হয় দেড় শতাধিক। আহত হয় ৫শ জনেরও বেশি মানুষ। মোশাররফ সরকার সেই রাতেই ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দেন। প্রাথমিকভাবে এটা জঙ্গিদের কাজ বলে ধারণা করা হয়। বিশ্ব নেতৃবৃন্দ এ হামলার নিন্দা জানান। অক্টোবরের শেষ দিকে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্টের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের দক্ষিণাঞ্চলে। লাখ লাখ লোককে সরিয়ে নেয়া হয় নিরাপদ স্থানে। ২৫ তারিখে পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় সোয়াত শহরে সামরিক কনভয়ের ওপর জঙ্গি হামলায় ১৭ সৈন্য নিহত ও ২৫ জন আহত হয়। যুক্তরাষ্ট্রে ইরাক যুদ্ধ বিরোধী বিশাল বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয় ২৮ অক্টোবর। নিউইয়র্ক, লস এঞ্জেলেস, বোস্টন, শিকাগো, সানফ্রান্সিসকোসহ গুরুত্বপূর্ণ বহু শহরে একযোগে এই বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। হাজার হাজার লোক এদিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের ইম্পিচমেন্ট দাবি করে।
নভেম্বরের ৩ তারিখে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশাররফ দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। স্থগিত করেন সংবিধান। সাম্প্রতিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি উর্দি পরেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হন। তবে তার এ প্রার্থীতা বৈধ কিনা সে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন ছিল। সুপ্রিম কোর্ট এ ব্যাপারে রায় ঘোষণার আগেই মোশাররফ এ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সারা দেশে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়। প্রথম দুই দিনেই বিরোধী দলীয় রাজনীতিক ও আইনজীবীসহ দেড় সহস্রাধিক লোক আটক করা হয়। প্রধান বিচারপতি ইফতিখার মোহম্মদ চৌধুরী এবং অপর ৮ বিচারক মোশাররফের জারি করা অস্থায়ী সাংবিধানিক আদেশ মানতে অস্বীকার করলে ইফতিখার মোহাম্মদকে বলে দেয়া হয়, তার ‘সার্ভিসের’ আর কোন প্রয়োজন নেই। সুপ্রিম কোর্টে প্রবেশ ও বের হওয়ার সমস্ত পথ সিল করে দেয় সরকার। ফলে প্রধান বিচারপতিসহ আরো অনেক বিচারপতি আটকা পড়েন সুপ্রিম কোর্ট ভবনে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির মোশাররফের এই পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করেন। জরুরি অবস্থা জারি সত্ত্বেও আইনজীবীরা সারা দেশে ধর্মঘট পালন করেন ৫ তারিখে। বিক্ষোভও প্রদর্শন করেন তারা। বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক লাঠিচার্জ ও ধরপাকড় করে। ৬ তারিখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এ ঘটনার উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং মোশাররফের প্রতি উর্দি ছাড়ার এবং জরুরি অবস্থা তুলে নিয়ে নির্বাচন দেয়ার আহ্বান জানান।
মিয়ানমারে সামরিক জান্তা আভ্যন্তরীন ও আন্তর্জাতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে গৃহবন্দি বিরোধী দলীয় নেত্রী অং সান সূচির সঙ্গে বৈঠকে বসে এ মাসে। এছাড়া জাতিসংঘ দূত কয়েক দফা মিয়ানমারে আসেন গণতন্ত্রকামীদের ওপর দমন নির্যাতনের বিষয় নিয়ে সামরিক জান্তার সঙ্গে আলোচনার জন্য। নভেম্বর মাসের ১৪ তারিখে পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেট তারকা ও রাজনীতিক ইমরান খানকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিতর্কিত লেখক তসলিমা নাসরিনের মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে কট্টরপন্থীদের সমাবেশ হয় ১৯ নভেম্বর কলকাতায়। এরপর তিনি কলকাতা ছেড়ে দিল্লীতে আশ্রয় নেন। ২৩ নভেম্বর ভারতের বারানসি, লক্ষ্বৌ ও আদালত প্রাঙ্গণে সিরিজ বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। এতে নিহত হয় ১৩ জন। আহত হয় অর্ধশতাধিক। প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ তার বেঁধে দেয়া সময়সীমার মধ্যে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার ও উর্দি না ছাড়ায় কমনওয়েলথ পাকিস্তানের সদস্যপদ স্থগিত করে ২৩ নভেম্বর। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার জঙ্গলে আবারো দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। দশ হাজারেরও বেশি মানুষকে সরিয়ে নেয়া হয় নিরাপদ স্থানে। পাকিস্তানের নির্বাসিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ দেশে ফেরেন ২৫ তারিখে। সৌদি সরকারের দেয়া একটি জেট বিমানযোগে তিনি লাহোর বিমানবন্দরে পৌঁছালে হাজার হাজার উল্লসিত সমর্থক তাকে স্বাগত জানায়। ২৭ নভেম্বর সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে মিয়ানমারে শত শত বৌদ্ধ ভিক্ষু বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ২৮ তারিখে পারভেজ মোশাররফ সেনা প্রধানের পদ ত্যাগ করেন এবং ২৯ নভেম্বর পরবর্তী ৫ বছরের জন্য পাকিস্তানের বেসামরিক প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন। একই দিন ফিলিপাইনে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। ৩০ তারিখে তুরস্কে একটি বিমান বিধ্বস্ত হলে এর ৫৬ আরোহীর সবাই নিহত হয়।
ডিসেম্বরের ৩ তারিখে রাশিয়ায় পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ভস্নাদিমির পুটিনের রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড রাশিয়া বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয়লাভ করে। প্রধান বিরোধী দল নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তোলে। একই দিনে পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করে। তবে এর একদিন পর বেনজিরের সঙ্গে নির্বাচনী জোট গড়েন তিনি। তাদের দাবি-দাওয়া না মানলে নির্বাচন বর্জনের হুমকি দেন তারা। ইন্দোনেশিয়ার বালিতে শুরু হয় জলবায়ুর পরিবর্তন সংক্রান্ত জাতিসংঘের শীর্ষ সম্মেলন। জলবায়ুর উষ্ণতা বৃদ্ধি রোধের গুরুত্ব সবাই স্বীকার করলেও তা রোধে উন্নতদেশগুলোকে বাধ্য করতে পারে এমন কোন পদক্ষেপ এ সম্মেলনে নেয় হয়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও উন্নয়নশীল দেশগুলো এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পক্ষে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র বিপক্ষে অবস্থান নেয়। শেষপর্যন্ত আপস ফরমুলা হিসাবে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের কথা এই শীর্ষ সম্মেলনে বলা হয়েছে। ১৯শে ডিসেম্বর পাকিস্তানে এক ভয়াবহ ট্রেন দুঘটনায় ৫৮ জন নিহত ও শতাধিক আহত হয়। হজ পালনকালে পবিত্র মক্কা ও মদীনার ধর্মীয় গুরুত্তপূর্ণ স্থানগুলোতে সন্ত্রাসী হামলার একটি ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেয় সৌদি কর্তৃপক্ষ। বছরটির মধুর সমাপ্তি ঘটে থাইল্যান্ডে। ২৪ ডিসেম্বর ক্ষমতাচুত প্রধানমন্ত্রী থাকসিন শিনওয়াত্রার দল সাধারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। একে বেনজির ভুট্টো সামরিক শাসনের ওপর জনগণের বিজয় হিসাবে দেখা হচ্ছে।
বছরের একেবারে শেষ পর্যায়ে ২৭ ডিসেম্বর এক আত্মঘাতি বোমা হামলায় নিহত হন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো। ২৭ ডিসেম্বর বিকেলে গ্যারিসন শহর রাওয়ালপিণ্ডিতে লিয়াকতবাগ জাতীয় পার্কে পিপিপি আয়োজিত নির্বাচনপূর্ব এক সমাবেশে ভাষণ দিয়ে পার্কের গেটের বাইরে অপেক্ষমাণ বুলেটপ্রুফ গাড়িতে আরোহণ করা মাত্র মোটর সাইকেল আরোহী এক যুবক তাকে লক্ষ্য করে একে-৪৭ রাইফেল থেকে পর পর দু’টি গুলি ছুঁড়ে এবং পরে সে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটায়। বেনজিরের গাড়ি থেকে ৫০ গজ দূরে আত্মঘাতী বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। আততায়ীর হামলায় আরো ২০ জন নিহত হয়। অজ্ঞান অবস্থায় বেনজিরকে রাওয়ালপিণ্ডি জেনারেল হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে তার জরুরি অস্ত্রোপচার করা হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের সকল চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে বিকেল ৬ টা ১৬ মিনিটে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। বেনজির নিহত হবার পর গোটা পাকিস্তান আরো উতপ্ত হয়ে উঠে। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ঘটতে থাকে সহিংস ঘটনা। ০
**************************
লেখকঃ মলয় পাঁড়ে
দৈনিক ইত্তেফাক, ০১ জানুয়ারী ২০০৮