মিয়ানমারের রক্তাক্ত আগস্ট-সেপ্টেম্বর
ফকরউদ্দীন আহমেদ
‘মিয়ানমার’ আর ‘সামরিক শাসন’- যেন একে অন্যের সমার্থক। সেই ১৯৬২ সালে সেনাবাহিনী দেশটির রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। তার পর থেকে দেশটিতে একটানা চলছে সামরিক শাসন। এই দীর্ঘ সময়ে অধিকার দাবি করতে গিয়ে হত্যা-নির্যাতনের শিকার হয়েছে জনগণ। ১৯৮৮ সালে তারা রক্ত দিয়েছে। ২০০৭ সালে তারই পুনরাবৃত্তি ঘটল। স্বতঃস্কূর্তভাবে জনগণ নেমে এল রাস্তায়। সঙ্গী হলেন সে দেশে জনগণের অতি শ্রদ্ধেয় বৌদ্ধভিক্ষুরা। শান্ত, নির্বিবাদী ভিক্ষুরা প্রতিবাদের স্কুলিঙ্গ ছড়িয়ে দিলেন রাজপথে। জান্তা সরকার অতি নিষ্ঠুর উপায়ে আন্দোলন দমন করলেও তা থেমে যাওয়ার নয়। পাঁচ কোটি মানুষের প্রাণের দাবি, সামরিক সরকারের পতন ঘটিয়ে গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা।


২০০৭ সালের ১৫ আগস্ট সরকার গোপনে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়। প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ তেলের ওপর একরকম ভাসতে থাকা মিয়ানমারের সাধারণ মানুষ ফিলিং স্টেশনে গিয়ে জানতে পারল, জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে। অথচ আগে জ্বালানির কিছুই জানানো হয়নি। পেট্রল ও ডিজেলের দাম দ্বিগুণ, আর কমপ্রেসড গ্যাসের দাম বাড়ল পাঁচ গুণ। জ্বালানি সংশ্লিষ্ট জিনিসপত্রের দামও গেল বেড়ে। জনগণ সরকারের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করল। ১৯ আগস্ট শ চারেক লোকের একটি বিক্ষোভ হলো প্রধান শহর ইয়াঙ্গুনে। পরের দিনগুলোয় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ল আশপাশের ছোটবড় শহরে। ৫ সেপ্টেম্বর পাকোকু শহরে ভিক্ষুরা একটি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নিলেন। ওই বিক্ষোভে হামলা চালাল সেনাবাহিনী। আহত হলেন তিনজন ভিক্ষু। ভিক্ষুরা সরকারকে ক্ষমা চাওয়ার জন্য ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় দিলেন। কিন্তু সামরিক সরকার ক্ষমা চাইল না। সময়সীমা শেষ হওয়ার পর কঠোর অবস্থানে গেলেন ভিক্ষুরা। তাঁরা সেনাবাহিনী ও তাদের পরিবারে ধর্মীয় প্রার্থনা-পূজা থেকে বিরত রইলেন। চলতে থাকল আন্দোলন। ২১ সেপ্টেম্বর ভিক্ষুদের প্রধান সংগঠন অ্যালায়েন্স অব অল বার্মিজ বুড্ডিস্ট মঙ্কস এক বিবৃতিতে সামরিক সরকারকে ‘জনগণের শত্রু’ ঘোষণা করল।
ভিক্ষুদের পাশে ছিল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) নেতা-কর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষ। সেনাবাহিনী যাতে ভিক্ষুদের গায়ে আঘাত করতে না পারে, সে জন্য জনগণ তাদের ঘিরে রাখে। দিনে দিনে বাড়তে থাকে জনগণের অংশগ্রহণ। জাতিসংঘ বিশেষ দূত পাঠায়। সরকারের টনক তবু নড়ে না। ইয়াঙ্গুনসহ বড় শহরগুলোয় সকাল-সন্ধ্যা কারফিউ জারি হয়। দেশের বাইরে খবর প্রচার ঠেকাতে বন্ধ করে দেওয়া হয় ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন সংযোগ। ইয়াঙ্গুনে ২৭ সেপ্টেম্বর লাখো মানুষের বিক্ষোভ মিছিলে গুলি চালায় সেনাবাহিনী। সরকার নয়জন নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করলেও ওই হামলায় হতাহতের প্রকৃত তথ্য জানা যায়নি। গ্রেপ্তার করা হয় হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে। আন্দোলন কিছুটা ‘দমন’ হয়। কিন্তু দেশে-বিদেশে সামরিকা জান্তার অবস্থান মারাত্মকভাবে দূর্বল হয়। জনগণের তরফে এখন আরেকটি জাগরণের অপেক্ষা।


নেপালঃ বছর শেষে আশার আলো
শরিফুল ইসলাম হাসান

২০০৭ সালে হিমালয়ের দেশ নেপালের সার্বিক পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে অনেক শান্ত ছিল। বছরের শেষ দিকে রাজনৈতিক অচলাবস্থা বাড়লেও পুরো বছরের কখনোই দেশটিতে বড় ধরনের কোনো সংঘাত ছিল না। বছর শেষ হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহ আগে (২৩ ডিসেম্বর) নেপালের অন্তর্বর্তী সরকার ও মাওবাদী গেরিলাদের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা দেশটির জনগণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দারুণ আশাবাদী করেছে।


২০০৭ সালের ২২ নভেম্বর নেপালে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা ছিল। নির্বাচন অনুযায়ী একটি সাংবিধানিক পরিষদ গঠিত হতো। বছরের শুরু থেকে সেই নির্বাচনের প্রস্তুতিও ভালোভাবেই চলছিল। কিন্তু রাজতন্ত্র বিলোপ ও নির্বাচনপদ্ধতি পরিবর্তনের দাবিতে সেপ্টেম্বর মাসে মাওবাদীরা অন্তর্বর্তী সরকার থেকে বেরিয়ে যায়। শান্তি প্রক্রিয়ায় তাদের সমান প্রতিনিধিত্ব দেওয়া হচ্ছে না বলেও তারা অভিযোগ করে। তারা অঙ্গীকার করে, রাজতন্ত্রের বিলোপ না হওয়া পর্যন্ত তারা সরকারে ফিরবে না। এ নিয়ে দেশটিতে চরম রাজনৈতিক অচলাবস্থা দেখা দেয়। একপর্যায়ে পার্লামেন্ট নির্বাচনও স্থগিত করা হয়।


এতকিছুর পরও নেপালের প্রধানমন্ত্রী কৈরালা কখনো হাল ছেড়ে দেননি। মাওবাদীদের সঙ্গে তিনি কয়েক দফা আলোচনা করেন। সরকারে আবার যোগ দেওয়ার ব্যাপারে তিনি মাওবাদীদের রাজি করানোর জন্য দফায় দফায় চেষ্টা করেন। কৈরালার নেতৃত্বাধীন দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল নেপালি কংগ্রেস মাওবাদীদের প্রধান দাবি রাজতন্ত্রের বিলোপের প্রতি সমর্থন জানায়। এর পরই মাওবাদীদের সঙ্গে সরকারের তিক্ত সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে।


সবাইকে আশান্বিত করে ২৩ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার ও মাওবাদী গেরিলাদের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী সরকার রাজতন্ত্র বিলোপ করবে এবং মাওবাদী গেরিলারা আবার সরকারে যোগ দেবে। নেপালের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা এ চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, শান্তি প্রক্রিয়া আবার ঠিকভাবে এগিয়ে চলছে বলে মনে হচ্ছে।


নতুন এ চুক্তি অনুযায়ী নেপালকে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হবে। ২০০৮ সালের এপ্রিল মাসে দেশটিতে একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে সাবেক মাওবাদীরা কবে সরকারে যোগ দেবে, চুক্তিতে তা উল্লেখ করা হয়নি।

চুক্তি স্বাক্ষরের পর ছয় দলের ক্ষমতাসীন জোট ও মাওবাদীরা এক বিবৃতিতে জানায়, নেপাল হবে একটি কেন্দ্রীয় গণতান্ত্রিক প্রজাতান্ত্রিক দেশ এবং নতুন পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশনের পর এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে।


সিনিয়র মাওবাদী নেতা দেব গুরুং বলেন, ‘আমরা খুবই খুশি। নেপালের প্রজাতন্ত্র হওয়ার পথ এখন সুরক্ষিত হলো। আমরা কয়েক দিনের মধ্যেই সরকারে যোগ দেব এবং ৬০১ আসনের পার্লামেন্ট নির্বাচন যাতে অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়, যৌথভাবে সে চেষ্টা করব।’ আরেক সিনিয়র মাওবাদী নেতা চন্দ্র প্রকাশ গাজুরেল বলেন, ‘আমরা কখন সরকারে যোগ দেব এবং কারা মন্ত্রিত্ব পাবেন সে ব্যাপারে শিগগিরই দলের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে আলোচনা করা হবে।’ তিনি বলেন, এ চুক্তি নির্বাচনের পথকে সুগম করল। মাওবাদীরা সামনের নির্বাচনে অংশ নেবে।


কেলেঙ্কারিতে ফেঁসে পল উলফোভিৎসের পদত্যাগ
রোকেয়া রহমান

ইরাক যুদ্ধ বাধানোর কারিগর সাবেক মার্কিন উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী পল উলফোভিৎস বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেশ জেঁকে বসেছিলেন। তবে গোল বাধলো অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে বিশ্বব্যাংকে কর্মরত এক বান্ধবীকে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বড় পদে চাকরি বাগিয়ে দিতে গিয়ে। স্বজনপ্রীতির অপরাধে তিনি বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের পদ ছাড়তে বাধ্য হন। গত বছরের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্ট উলফোভিৎসের এ কেলেঙ্কারির কথা ফাঁস করে দিলে হইচই পড়ে যায়। ঐ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৫ সালে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরই উলফোভিৎস তদবির করে তাঁর বান্ধবী রিজাকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ চাকরি পাইয়ে দেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে চাকরি করলেও রিজা বিশ্বব্যাংক থেকেও বেতন নিতেন আবার উলফোভিৎস বিশ্বব্যাংকেও তাঁর বেতন বাড়িয়ে দেন। সব মিলিয়ে মিস রিজার বার্ষিক আয় প্রায় দুই লাখ ডলারে দাঁড়ায়, যা পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিৎসা রাইসের বেতনের চেয়েও অনেক বেশি। ঘটনাটি বিশ্বব্যাংকের অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ করে এবং তাঁরা উলফোভিৎসের পদত্যাগ দাবি করেন।


বিশ্বব্যাংকের ২৪ জন বোর্ড সদস্যের মধ্যে সাতজনকে নিয়ে গঠিত একটি বিশেষ প্যানেল উলফোভিৎসের বান্ধবীর পদোন্নতি ও বেতন বাড়ানোর ঘটনার তদন্ত করে। তদন্তের পর প্যানেলটি জানায়, পল উলফোভিৎস তাঁর বান্ধবীকে পদোন্নতি এবং বেতন বাড়িয়ে দিয়ে নিয়ম ভঙ্গ করেছেন। এরপর উলফোভিৎসের ওপর পদত্যাগের চাপ আসতে থাকে।


উলফোভিৎস (৬৩) বিশেষ প্যানেলের এ প্রতিবেদনকে ‘অশোভন ও অন্যায্য’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, তিনি সরল বিশ্বাসে তাঁর বান্ধবী শাহা রিজার বেতন বাড়িয়েছিলেন। তিনি তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর জন্য তাঁর সমালোচকদের অভিযুক্ত করেন।


এমন প্রেক্ষাপটে উলফোভিৎসের একজন শীর্ষস্থানীয় উপদেষ্টা কেভিন কেলেমস পদত্যাগ করেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানের প্রেসিডেন্টকে ঘিরে বর্তমানে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তাতে প্রতিষ্ঠানটির কাজকর্ম চালানো খুবই কঠিন।’


উলফোভিৎসের কর্মকাণ্ডের প্রতি প্রথমে বুশ প্রশাসনের সমর্থন থাকলেও বিশেষ প্যানেলের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর তারা আগের অবস্থান থেকে সরে আসে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টনি স্মো মে মাসে বলেন, ‘এ ঘটনা নিশ্চিতভাবেই বিশ্বব্যাংকের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করেছে। কাজেই উলফোভিৎসের ব্যাপারে ভালোভাবে চিন্তাভাবনা ও আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’ মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টম ক্যাসি জানান, যেকোনো ব্যক্তির চেয়ে বিশ্বব্যাংক অনেক বড়। অতীত, বর্তমান, এমনকি ভবিষ্যতেও অবস্থাটা একই থাকবে।


ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশও বলে, বিশ্বব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য উলফোভিৎসের পদত্যাগ করা উচিত। দেশগুলোর মতে, উলফোভিৎসের কর্মকাণ্ড ব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকখানি কমিয়ে দিয়েছে।


ব্যাপক চাপের মুখে অবশেষে গত ১৮ মে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের পদ ছাড়তে বাধ্য হলেন পল উলফোভিৎস। তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর পেছনে বুশ প্রশাসন নেই এবং ব্যাংকের নির্বাহী বোর্ডও তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। অন্যদিকে সুযোগ বুঝে এ ইস্যুতে ইউরোপীয় দেশগুলোও তাদের অপছন্দের পাত্রকে বিশ্বব্যাংক থেকে হটায়। উপায়হীন উলফোভিৎস অবশেষে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। ৩০ জুন থেকে তাঁর পদত্যাগ কার্যকর হয়।


নতুন সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান দেশে দেশে
হাফিজুর রশীদ

ভারতের ইতিহাসে প্রথম নারী রাষ্ট্রপতিঃ নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন প্রতিভা পাতিল, আর তাঁর এ জয়ে উদ্দীপ্ত ও অনুপ্রাণিত হয়েছেন কয়েক কোটি নারী। ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে ২০০৭ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭২ বছর বয়সী প্রতিভার বিজয় উল্লেখযোগ্য ঘটনা। স্বাধীনতার ৬০ বছরে তিনিই দেশের প্রথম নারী রাষ্ট্রপতি। এ বিজয়কে তিনি অভিহিত করেছেন জনতার জয় হিসেবে। এর আগে তিনি ছিলেন উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য রাজস্থানের গভর্নর।

ভারতে রাষ্ট্রপতির পদ অনেকটা আনুষ্ঠানিক। তবে প্রতিভার সমর্থকদের দাবি, তাঁর জয় ভারতে বৈষম্যের শিকার নারীদের এগিয়ে যাওয়ায় প্রেরণা জোগাবে। অথচ নির্বাচনে তাঁর প্রার্থী হওয়া নিশ্চিত হয়েছে শেষ মুহূর্তে। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী উপরাষ্ট্রপতি ভৈরো সিং শেখাওয়াত প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমাতে পারেননি। প্রায় ৭২ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রতিভা স্থলাভিষিক্ত হন জনপ্রিয় ক্ষেপণাস্ত্র বিজ্ঞানী এ পি জে আবদুল কালামের।


নারী প্রেসিডেন্টের মিছিলে আর্জেন্টিনাওঃ ভারতে রাষ্ট্রপতির পদ আনুষ্ঠানিক হলেও আর্জেন্টিনায় এটিই প্রধান নির্বাহী পদ। সেখানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রায় ৪৫ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন এক নারী, ক্রিস্টিনা ফার্নান্দেজ দ্য কিরচনার। গত ১০ ডিসেম্বর তিনি স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন স্বামী নেস্তর কিরচনারের। তবে স্ত্রীর প্রশাসনে স্বামীর কোনো ভূমিকা থাকবে কি না তা এখনো স্পষ্ট নয়। তিনি যে স্বামীর মতো মধ্য-বামনীতি অনুসরণ করবেন তা নিশ্চিত করেছেন। তাঁকে আর্জেন্টিনার সাবেক কিংবদন্তীর ফার্স্ট লেডি ইভা পেরন ও যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ফার্স্ট লেডি সিনেটর হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে তুলনা করা হয়। তুলনাটি তাঁর পছন্দ নয়। তাই বলেছেন, ‘নিজের মতো হওয়াই সর্বোত্তম।’


সারকোজির নতুন ফ্রান্সঃ ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সোশ্যালিস্ট নারী প্রার্থী সেগোলিন রয়েলের স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে জয়ী হয়েছেন নিকোলা সারকোজি। সারকোজি ফরাসিদের নতুন ফ্রান্স গড়ার কথা শুনিয়ে উত্তরসূরি হয়েছেন এক যুগের প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাকের। ৫২ বছর বয়সী সারকোজি এক সময় শিরাকের প্রিয়ভাজন হলেও পরে পরিণত হন শত্রুতে। মার্কিনপন্থী বলে পরিচিত সারকোজি প্রথমে ইউএমপি দলের প্রধান হিসেবে শিরাকের স্থলাভিষিক্ত হন, সর্বশেষে হলেন প্রেসিডেন্ট। তাঁর সমর্থকদের দাবি, একমাত্র সারকোজিই পারেন ফ্রান্সের অর্থনীতি ও সামাজিক জীবন রক্ষা করতে। নিশ্চিত যে, সারকোজির নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক পদক্ষেপের কঠোর সমালোচক ফ্রান্স এবার ওয়াশিংটনের দিকে ঝুঁকবে। সারকোজি নিজেও যুক্তরাষ্ট্র, বেলজিয়াম, জার্মানি, আফ্রিকার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ার কথা বলেছেন। তবে তার এ তালিকায় ব্রিটেনের নাম ছিল না।


ব্লেয়ার যুগের অবসানঃ ২০০৭ সালে ক্ষমতার বদল হয়েছে যুক্তরাজ্যেও। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের মিত্র টনি ব্লেয়ারের প্রধানমন্ত্রিত্বের অবসান হয়েছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন একই দলের (লেবার পার্টি) গর্ডন ব্রাউন। ৫৬ বছরের ব্রাউন পরিবর্তনের কথাই বলেছেন। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের শাসনামলে ১১তম প্রধানমন্ত্রী ব্রাউন সরাসরি নির্বাচন করে এ পদে আসীন হননি। তাই রক্ষণশীল দলের নেতা ডেভিড ক্যামেরন তাঁকে অভিনন্দন জানালেও অবিলম্বে সাধারণ নির্বাচনও দাবি করেছেন। পরিবর্তনের অঙ্গীকার করা নতুন প্রধানমন্ত্রী পূর্বসূরি ব্লেয়ারের মতো মার্কিনপ্রীতি অব্যাহত রাখেন কি না তাই দেখার বিষয়।

অস্ট্রেলিয়ায়ও নতুন প্রধানমন্ত্রীঃ সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আরেক মিত্র অস্ট্রেলিয়ায়ও ২০০৭ সালে নতুন প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে। নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে জিতে লেবার পার্টির কেভিন রুড স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন জন হাওয়ার্ডের। কৃষকের ছেলে কেভিন প্রথম জীবনে কূটনীতিকের চাকরি করলেও পরে যোগ দেন রাজনীতিতে। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে ইরাক থেকে অস্ট্রেলীয় সেনা প্রত্যাহার ও কিয়োটো জলবায়ু চুক্তিতে স্বাক্ষর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।


শেষ চমক থাইল্যান্ডের নির্বাচনঃ ২০০৭ সালের শেষ বড় চমক থাইল্যান্ডের সাধারণ নির্বাচনের ফল। সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ও নির্বাসিত প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার সমর্থক পিপলস পাওয়ার পার্টি (পিপিপি) ২৩ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ৪৮০ আসনের মধ্যে ২৩২টি আসন পেয়েছে। থাকসিনের দল থাই রাক পার্টির নেতারা পিপিপি গঠন করেন। ক্ষমতাসীনেরা থাকসিনের রাজনীতি নিষিদ্ধ করলেও তাঁর সমর্থকেরাই আবার ক্ষমতায় যাচ্ছে জোট গড়ে। যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন থাকসিনও।


চীনা কমিউনিস্ট পার্টিতে নতুনের জোয়ার
কাজী আলিম-উজ-জামান

বিশাল চীনে একটিই রাজনৈতিক দল-কমিউনিস্ট পার্টি অব চায়না। সেই ১৯৪৯ সাল থেকে চীনের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন দলটি। প্রতি পাঁচ বছর পরপর দলটির জাতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। বিদায়ী বছরের অক্টোবরে বেইজিংয়ের গ্রেট হলে বসেছিল দলটির ১৭তম ন্যাশনাল কংগ্রেসের অধিবেশন। দলের পরবর্তী সাধারণ সম্পাদক কে হবেন, (দলের সাধারণ সম্পাদকই প্রেসিডেন্ট হন), কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য কে বা কারা হবেন, দেশের অর্থনৈতিক ও সামরিক নীতিতে কোনো পরিবর্তন হবে কি না, সবই ঠিক হয় এই কংগ্রেসে। বলা যায়, এটাই কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ রাজনৈতিক সভা। চীন বিশ্বের নবীন শক্তি, তাই সারা বিশ্বের দৃষ্টি থাকে কমিউনিস্ট পার্টির জাতীয় কংগ্রেসের দিকে। সাধারণত সাত দিন ধরে কংগ্রেসের অধিবেশন চলে। এবারের কংগ্রেসে মোট তিন হাজার নির্বাচিত অতিথি যোগ দিয়েছিলেন, যার ৩০ শতাংশ ছিল ‘তৃণমূল পর্যায়ের’।


এবারের জাতীয় কংগ্রেসে কেন্দ্রীয় কমিটির ২০৪ জন এবং ১৬৭ জন বিকল্প সদস্য নির্বাচিত হন। তবে দলে সবচেয়ে ক্ষমতা ধরেন কেন্দ্রীয় কমিটির পলিটব্যুরোর স্ট্যান্ডিং কমিটির নয় সদস্য। বর্তমান প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও দলের সাধারণ সম্পাদক ও এই কমিটির সবচেয়ে প্রভাবশালী সদস্য। প্রতি পাঁচ বছর পর অনুষ্ঠিত জাতীয় কংগ্রেসে এই স্ট্যান্ডিং কমিটির প্রায় অর্ধেক বাদ পড়েন। তাঁদের জায়গা নেন নতুনেরা। এই নতুনদের মধ্যে থেকে দলের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা।


বিদায়ী বছরের জাতীয় কংগ্রেস ছিল প্রেসিডেন্ট হু জিনতাওয়ের জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি এসময়ই দলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হন এবং এই কংগ্রেসই তাঁকে দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট ও সেনাপ্রধানের দায়িত্ব দেয়।


স্ট্যান্ডিং কমিটির নতুন দুজন সদস্য খুবই আলোচিত হচ্ছেন। দলের পঞ্চম প্রজ্নের প্রতিনিধি এই নেতারা হলেন জি জিনপিং এবং লি কিকিয়াং। প্রথমজন সাংহাইয়ে দলের প্রধান এবং দ্বিতীয়জন লিওনিং প্রদেশে দলের প্রধান। পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, এ দুজনের মধ্যেই একজন ২০১২ সালে হু জিনতাওয়ের উত্তরসূরি হতে পারেন। তবে দুজনের মধ্যে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে আছেন জিনপিং। তবে প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও কখনো ইঙ্গিত দেননি, এ দুজনের মধ্যে কাকে তাঁর বেশি পছন্দ। দুজনই তাঁর কাছে ‘তরুণ কমরেড’।


চীনের কমিউনিস্ট পার্টিতে নতুনদের নিয়োগ ও পুরোনোদের বাদ পড়া ভোটাভুটির মাধ্যমে হয় না। সিদ্ধান্ত হয় দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার পর।


চীনে কোনো বিরোধী দল নেই। তবে আমরা দেখেছি, বিদায়ী বছরের জাতীয় কংগ্রেসে নেতৃত্বে পরিবর্তনের ব্যাপারে, বিশেষ করে তরুণদের আরও বড় পদ ছেড়ে দেওয়ার চাপ ছিল। তারই ফল হলো জিনপিং এবং কিকিয়াংয়ের মতো তরুণদের স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্যপদ পাওয়া। এই তরুণ নেতাদের স্বপ্ন, এক· সামাজিক সম্প্রীতিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, দুই· বৈজ্ঞানিক উন্নয়ন এবং একটি কল্যাণমূলক সমাজ গড়ে তোলা।


তবে চীনে যেভাবে জ্বালানি চাহিদা বাড়ছে, সেভাবে জোগান আসছে না। অন্যদিকে নানান কারণে আন্তর্জাতিকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে ‘মেড ইন চায়না’র ভাবমূর্তি। দেখা যাক, নতুন নেতারা নতুন বছরে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেন।


ভার্জিনিয়া টেকের গণহত্যা
আবুল হাসনাত

গেল বছর যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাঙ্গনে গণহত্যার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘটনাটি ঘটে গেছে। বছরের প্রথমার্ধে ভার্জিনিয়া টেক বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্দুকধারী এক ছাত্রের গুলিতে ৩৩ জন নিহত হওয়ার ঘটনা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়ে যায়।


ভার্জিনিয়ার ছোট শহর ব্ল্যাকসবার্গ। ওয়াশিংটন থেকে সড়কপথে শহরটি মাত্র চার ঘণ্টার পথ। শান্ত নিঝুম হিসেবেই ব্ল্যাকসবার্গ শহরকে চিনত সবাই। এমন পরিবেশে রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটবে, ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি কেউ।

দিনটি ছিল ১৬ এপ্রিল, সোমবার। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েস্ট অ্যাম্বলার জনস্টোন ডরমেটরিতে চো সেউং-হুই (২৩) নামের ওই ছাত্র সকাল সাতটার পর প্রথম গুলি চালান। এতে দুজন নিহত হন। এর দুই ঘণ্টা পর কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নরিস হলে আবারও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। চো যখন নরিস হলে ঢোকেন, তখন সকাল পৌনে ১০টা। ঝোড়ো বেগে কক্ষে ঢুকে তিনি দেড় মিনিটের মতো এলোপাতাড়ি গুলি চালান। একের পর এক ছাত্র-শিক্ষক মাটিতে লুটিয়ে পড়তে থাকেন। অবিরাম গুলির শব্দ এবং জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়া ছাত্রদের দেখে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। তার আগেই বন্দুকধারী নিজের মাথায় গুলি চালান। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, নরিস হলে গুলিতে ৩০ জন ছাত্র-শিক্ষক প্রাণ হারান।


চো সেউং-হুইয়ের বাড়ি দক্ষিণ কোরিয়ায়। ভার্জিনিয়া টেক বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ইংরেজিতে পড়তেন। ধারণা করা হয়, বান্ধবীর সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি প্রতিহিংসার বশে এ ঘটনা ঘটান। দৃশ্যত তাঁর প্রথম শিকার ছিলেন ওই বান্ধবী। গুলিবর্ষণের পর ক্লাস বাতিল ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়।


বেদনাদায়ক এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। গোটা দেশে বয়ে যায় আলোচনা-সমালোচনার ঝড়। ঘটনার এক দিন পর হতাহতদের আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের মধ্যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম গুলিবর্ষণের ঘটনার পর কতৃêপক্ষ কেন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিল না, তাঁরা এর ব্যাখ্যা দাবি করেন। ঘটনার দিন বিকেলে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘গুলিবর্ষণের ঘটনাটি গোটা দেশকে নাড়া দিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিরাপত্তা ও শিক্ষার অভয়াশ্রম হওয়া উচিত।’
এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও নিন্দা জানায়। নিউইয়র্ক পোস্ট পত্রিকা সংবাদের শিরোনাম লেখে ‘রক্তগঙ্গা’। ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছিল, আমেরিকার ইতিহাসে এটি বেসামরিক মানুষের ওপর প্রাণঘাতী ভয়াবহ গুলিবর্ষণের ঘটনা। নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকা ঘটনার মর্মস্পর্শী বর্ণনা ছাপে।


বিশ্ববিদ্যালয় কতৃêপক্ষ নিহত ছাত্রদের প্রত্যেকের পরিবারকে এককালীন এক লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার করে ক্ষতিপূরণ দেয়। এ ছাড়া গুলিবর্ষণের ঘটনার সময় নরিস হলের পাঁচটি শ্রেণীকক্ষে যেসব ছাত্র ছিলেন, তাঁদেরও বাকি সময়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার ক্ষেত্রে বেতন দিতে হবে না। ভার্জিনিয়া প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংখ্যা ২৬ হাজার এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ১০ হাজার। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপুলসংখ্যক এশীয় বংশোদ্ভূত ছাত্রছাত্রী আছেন।


আমেরিকার ইতিহাসে নয় বছর আগে কলরাডো অঙ্গরাজ্যের কলম্বাইন হাইস্কুলে ঘটেছিল এ ধরনের হত্যাকাণ্ড। তখন স্কুলের দুই খ্যাপা ছাত্র ১৩ জনকে হত্যা করে নিজেরা আত্মহত্যা করে।

 

অগ্নিগর্ভ নন্দীগ্রাম
লুৎফর রহমান হিমেল

পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নন্দীগ্রাম ছিল বছর জুড়ে আন্তর্জাতিক বিশ্বে অন্যতম এক সংবাদের উৎস। কলকাতা থেকে মাত্র দেড় শ কিলোমিটার দূরে নন্দীগ্রাম। রাজ্যের শাসকগোষ্ঠী ও বিরোধী দলগুলোর নেতা-কর্মীরা মুখোমুখি অবস্থানে উত্তাল হয়ে ওঠে নন্দীগ্রাম। দুই পক্ষের লোকজনের পাল্টাপাল্টি হামলায় পুড়ে গেছে গ্রামের পর গ্রাম। চলেছে লুটপাট ও ভাঙচুর। প্রতিদিন ফুটেছে বোমা-গুলি, পড়েছে লাশ। বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যায় হাজার হাজার মানুষ।


সহিংসতা শুধু নন্দীগ্রামেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, ছড়িয়ে পড়ে পুরো পশ্চিমবঙ্গে। অনেকে এটিকে দ্বিতীয় গুজরাট দাঙ্গা হিসেবেও আখ্যা দেন। মাইন বিস্কোরণের মতো ঘটনাও ঘটে। শতাধিক মানুষ নিহত হওয়ার খবর মিলেছে। হাসপাতালে মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করেছে আহতদের অনেকে। হামলা হয়েছে গণমাধ্যমের কর্মীদের ওপরও।


’৬০ দশকের নকশালবাড়ী আন্দোলনের মতো এখানেও সংঘাতের কেন্দ্রে ছিল জমি। ইন্দোনেশিয়ার কোম্পানি সালিম গ্রুপ সেখানে বিশাল একটি রসায়ন শিল্পাঞ্চল গড়ার জন্য রাজ্য সরকারের কাছে জমি চায়। রাজ্যে শিল্পায়নের স্বার্থে সরকারও ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে সালিম গ্রুপকে ৩৮ হাজার একর জমি দিতে সায় দেয়। কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণ করতে গিয়ে কৃষকদের কথা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। নিয়ম মোতাবেক জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে ভূমি অধিগ্রহণের নোটিশ দেওয়ার বদলে নোটিশ দেওয়া হয় হলদিয়া ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (এডিএ) মাধ্যমে। এর মধ্যেই খবর ছড়ায়, কৃষকদের আবাদি জমি, বসতভিটে, এমনকি মসজিদ-মন্দিরের জায়গাও নাকি অধিগ্রহণ করা হবে।


এ অবস্থায় কৃষকেরা প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। তারা ‘ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি’ নামের সংগঠন গড়ে তোলে। কৃষকদের পক্ষে যোগ দেয় রাজ্যের বিরোধী দলগুলোও।


নন্দীগ্রামের ওই সহিংস পরিস্থিতিকে বিরোধীরা অভিহিত করে ‘রাষ্ট্রের মদদে সন্ত্রাস’ হিসেবে। সরকার ওই এলাকার মানুষের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে-ওই অভিযোগ তুলে রাজ্যের বিরোধী নেত্রী মমতা ব্যানার্জি সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দেন। মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন আরএসপি নেতা ক্ষিতি গোস্বামী। মওকা বুঝে এক হাত দেখে নেয় সরকারের শরিক দল ফরোয়ার্ড ব্লকও। সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে শরিক হন বিশিষ্ট সমাজকর্মী ও নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের নেত্রী মেধা পাটেকর ও সাহিত্যিক-আদিবাসি সংগঠক মহাশ্বেতা দেবী। মেধা কলকাতার ধর্মতলায় ৪৮ ঘণ্টার অনশনও পালন করেন।


নন্দীগ্রামে সহিংসতার প্রতিবাদে বিরোধী দলগুলোর ডাকা হরতালে রাজ্য বেশ কয়েকবার অচল হয়ে পড়ে। রাজ্যের সব স্কুল, কলেজ ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ছিল বন্ধ। বিভিন্ন স্থানে যাত্রীবাহী বাস ও ট্রেনে এবং সরকারি অফিস ও রেলস্টেশনেও হামলা হয়েছে।


বিরোধীদের আপত্তি উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তে নন্দীগ্রামে মোতায়েন করা হয় বহুল আলোচিত আধাসামরিক বাহিনী সিআরপিএফ। নন্দীগ্রামে শান্তি ফেরাতে বিরোধী দলের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব। ওই আহ্বানে বিরোধীরা কদ্দুর সাড়া দেন-সেটাই দেখা যাবে নতুন বছরে।


ইরানের জন্য শঙ্কার এক বছর
কাজী আলিম-উজ-জামান

অদ্ভুত একটা বছর পার করল ইরান। তাদের পরমাণু কর্মসূচির কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের হুমকি দিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু ইরান তাতেও নতি স্বীকার করেনি। বছরজুড়েই বলে এসেছে, বুশায়ের এলাকায় তাদের পরমাণু চুল্লিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি কেবলই বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রর দাবি, ইরানিরা পশ্চিমাদের ধোঁকা দিয়ে চায়। পরমাণু বোমা তৈরিই তাদের আসল উদ্দেশ্য।


এ অবস্থায় একদিকে জাতিসংঘের উদ্যোগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরানের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেয়, অন্যদিকে ইরানের পরমাণু চুল্লিতে ইসরায়েলের বোমা হামলার আশঙ্কাও জেগে ওঠে-যেভাবে তারা আশির দশকে ইরাকের পরমাণু চুল্লিতে বিমান হামলা করেছিল।


একদিকে অবরোধ অন্যদিকে ইরানের ওপর হামলা চালানোর ছক ও নকশা প্রস্তুত। কিন্তু ডিসেম্বরের শুরুতে নতুন মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদন যুদ্ধের আশায় পানি ঢালল! ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান ২০০৩ সালেই তার পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করে দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট বুশ ও প্রশাসনের লোকজনের তো লজ্জায় মাথা হেঁট হওয়ার জোগাড়। তার পরও তিনি গড়গড় করে বললেন, ইরানের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির অপরিবর্তনীয়। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদও কম যান না। প্রতিবেদন প্রকাশের পর এটাকে তিনি ইরানের ‘এক ধরনের বিজয়’ হিসেবে উল্লেখ করলেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে এ নিয়ে রসিকতাও করলেন ঢের।


তার পরও প্রতিবেদনটির সত্যতা ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের নর্থ আমেরিকান স্টাডিজের প্রধান সাইয়িদ মোহাম্মদ মারান্ডি। তাঁর কথা-‘যখন আপনার দেশের বিরুদ্ধে দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা হাজারো অভিযোগ করা হচ্ছে; তারপর একদিন সকালে উঠে আপনি জানলেন, সব অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।’ সাইয়িদের প্রশ্ন, ‘এটা কি স্বাভাবিক হতে পারে!’


পরমাণু কর্মসূচির বাইরে ব্যক্তিগতভাবেও বছরজুড়ে আলোচনায় ছিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। উপসাগরের ইরাক-ইরান জলসীমান্তের মাঝামাঝি এলাকা থেকে ১৫ জন ব্রিটিশ মেরিন সেনা ও নাবিককে আটক করে ইরানি বাহিনী। এ নিয়ে পশ্চিমাদের সঙ্গে ইরানের তুমুল উত্তেজনাও সৃষ্টি হয়। পরে ইরান সসম্মানে এবং প্রচুর উপহারসামগ্রীসমেত সেনাদের মুক্তি দিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।


২০০৭ সালে মার্কিনবিরোধী শিবিরের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ও সম্পর্ক ছিল উল্লেখ করার মতো।


নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় ভাষণ দিতে গিয়ে ঐতিহ্যবাহী কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রণ পান ইরানের প্রেসিডেন্ট। সেখানে তার বক্তৃতা আন্তর্জাতিক শিরোনাম হয়। অবরোধের শিকার হয়ে বছরজুড়ে ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল শোচনীয়। বিদায়ী বছরে মূল্যস্কীতি বাড়ে অনেক।


বছর শেষে আবার আলোচনায় পরমাণু প্রসঙ্গ। বিতর্কিত বুশায়ের পরমাণু স্থাপনা নির্মাণ ও উন্নয়নের ব্যাপারে ইরান ও রাশিয়া চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ বাড়িয়ে রাশিয়া সেখানে জ্বালানি পাঠানোও শুরু করেছে। তেহরানও বলেছে, আরেকটি অবরোধের হুমকি সত্ত্বেও ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি অব্যাহত রাখবে।


নতুন বছরে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ইরানের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের উত্তেজনা কমার লক্ষণ নেই। রাশিয়া ইরানের সঙ্গে থাকায় উত্তেজনায় নতুন গতি যোগ হলো কেবল।


পাকিস্তানের উথালপাথাল রাজনীতির শিকার হলেন বেনজির
শরিফুল ইসলাম ভুঁইয়া

রাজনৈতিক অঙ্গনে বারবার নাটকীয় পরিবর্তন ও অস্থিতিশীলতা, জঙ্গি তৎপরতা, দফায় দফায় আত্মঘাতী বোমা হামলা, লাল মসজিদে সেনা অভিযান-এসব কারণে পাকিস্তান প্রায়ই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর শিরোনাম হয়েছে। সর্বশেষ ২৭ ডিসেম্বর এক আত্মঘাতী হামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভূট্টো নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে তা চরম রূপ নেয়। বেনজিরের হত্যাকান্ডকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। বেনজির নিহত হওয়ার পর পর নেওয়াজ শরিফ নির্বাচন বর্জনের ঘোষনা দেওয়ায় আগামী ৮ জানুয়ারী অনুষ্ঠেয় পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।


আফগান সীমান্ত-সংলগ্ন উপজাতীয় এলাকায় জঙ্গি তৎপরতা মোশাররফ সরকারকে প্রায় সারা বছরই ব্যাতিব্যস্ত রাখে। সেখানে বারবার সেনা মোতায়েন করেও কোনো লাভ হয়নি। গত বছর ওই এলাকায় সহিংস ঘটনা এবং সেনা ও জঙ্গিদের সংঘর্ষে কমপক্ষে ৭৫০ জন নিহত হয়েছে।

আরেক মেয়াদে প্রেসিডেন্ট থাকা নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ইফতিখার মোহাম্মদ চৌধুরীকে বরখাস্ত করেন মোশাররফ। সেটা ছিল মৌচাকে ঢিল। প্রতিবাদে আইনজীবীরা আন্দোলনে নামেন। এর সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন বিরোধী দলগুলোর নেতা-কর্মী ও সুশীল সমাজের ব্যক্তিরা। যুগপত আন্দোলনের চাপ এবং আইনি প্রক্রিয়ায় এক পর্যায়ে তিনি পদ ফিরে পান। তবে ৩ নভেম্বর জরুরি অবস্থা জারির পর মোশাররফ তাঁকে আবার বরখাস্ত করেন।


গত বছরে জুলাই ছিল পাকিস্তানের জন্য ঘটনাবহুল মাস। ৬ জুলাই রাওয়ালপিন্ডিতে একটি সামরিক বিমান ঘাঁটি থেকে মোশাররফকে বহনকারী বিমান লক্ষ করে রকেট হামলা চালানো হয়। হামলা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। কয়েক দিন পরই ইসলামাবাদে ঐতিহ্যবাহী লাল মসজিদে কমোন্ডো অভিযান চালানো হয়। এতে কয়েকজন সেনাসদস্যসহ শতাধিক লোক নিহত হয়। গ্রেপ্তার করা হয় লাল মসজিদের ভেতর আশ্রয় নেওয়া প্রায় ৭০ জন জঙ্গিকে। ১৭ জুলাই আইনজীবীদের এক সমাবেশে আত্মঘাতী বোমা হামলায় ১২ জন নিহত ও ৪০ জন আহত হয়।


বছরজুড়েই গুঞ্জন ছিল যে, প্রেসিডেন্ট মোশাররফ পরবর্তী মেয়াদে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করছেন। এ ব্যাপারে ২৭ জুলাই দুবাইয়ে বেনজির ও মোশাররফের মধ্যে গোপন বৈঠকও হয়। শেষ পর্যন্ত আপসরফা হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মোশাররফ দুই সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ও নওয়াজ শরিফের প্রতি নমনীয় হন। ২ অক্টোবর মোশাররফ সেনাপ্রধানের পদ ত্যাগ ও বেনজিরকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে তিনি উত্তরসূরি হিসেবে লে· জেনারেল আশরাফ পারভেজ কায়ানির নাম ঘোষণা করেন।


বেনজির দেশে ফেরেন ১৮ অক্টোবর। ওই দিনই তাঁর শোভাযাত্রায় ভয়াবহ আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানো হয়। এতে ১৩৯ জন নিহত ও ৫৫০ জন আহত হয়। ৩ নভেম্বর জারি হয় জরুরি অবস্থা। তবে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ১৫ ডিসেম্বর তা তুলে নেন তিনি। গত ২৮ নভেম্বর তিনি সেনাপ্রধানের পদ ছেড়ে দেন এবং পরে দ্বিতীয় মেয়াদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন।

বেনজির নিহত হওয়ার আগে বড় ধরনের সহিংস ঘটনা ঘটে ঈদুল আজহার দিন। ওই দিন উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে একটি মসজিদে ঈদের জামাতে আত্মঘাতী বোমা হামলায় ৫৬ জন নিহত হয়।



**************************
দৈনিক প্রথম আলো, ৩১ ডিসেম্বর ২০০৭