জরুরি অবস্থা ঘোষণা
শ্যামল সরকার
দীর্ঘ রাজনৈতিক সহিংসতার মুখে গত বছরের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণার সঙ্গে সান্ধ্য আইন বলবৎ করা হয়। অতীতে দেশে একাধিকবার জরুরি অবস্থা জারি করা হলেও এই প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২২ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে দেশে যে অনিশ্চিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল এবং সংঘাত-সহিংসতায় দেশে যে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, সে অবস্থায় দেশবাসীর কাছে স্বস্তি নিয়ে এসেছিল ১১ জানুয়ারির পটপরিবর্তন। ১১ জানুয়ারি বিকেলেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জরুরি অবস্থা জারির প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। সন্ধ্যায় সরকারি প্রেস নোট দিয়ে জরুরি আইন জারি করা হয়। সব বিভাগীয় শহরে রাত ১১টা থেকে পরদিন ভোর ৫ টা পর্যন্ত সান্ধ্য আইন বলবৎ করা হয়।


১০ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে রাষ্ট্রপতি ড· ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের পদত্যাগ ও ঘোষিত ২২ জানুয়ারির নির্বাচন বাতিলের দাবিতে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করে। এর এক দিন আগেই অবশ্য বঙ্গভবন অবরোধ কর্মসূচি শুরু হয়। ১১ জানুয়ারি বিকেল চারটায় উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক ডাকা হয়। জরুরি অবস্থা জারি করে ২২ জানুয়ারির নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতেই এ বৈঠক ডাকা হয়েছিল।


এই অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিন বাহিনীর প্রধানগণ বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠক করেন। অপরাহ্নে সেনাবাহিনীর একটি দল বঙ্গভবনে প্রবেশ করে। তখন উপদেষ্টা পরিষদের সভায় যোগ দেওয়ার জন্য বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা বঙ্গভবনে ছিলেন। বিকেল চারটা নাগাদ রাষ্ট্রপতি ড· ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ ও একই সঙ্গে জরুরি আইন জারির সারসংক্ষেপ অনুমোদন করেন বলে জানা যায়। পর্যায়ক্রমে সব উপদেষ্টার পদত্যাগের মধ্য দিয়ে ড· ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিদায় নেয়। এই পরিবর্তনকে দেশের সর্বস্তরের মানুষ, সুশীল সমাজ এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সমর্থন জানায়। পরবর্তীতে এমনকি বিএনপি-জামায়াতের পক্ষ থেকেও জরুরি আইন জারি ও সরকার পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি স্বীকার করে নেওয়া হয়।


এই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয় নানা বিতর্কিত ঘটনার মধ্য দিয়ে। সাবেক প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধানের দায়িত্ব না দিতে আওয়ামী লীগসহ মহাজোটের আন্দোলনের মুখে বিতর্কিত উপায়ে রাষ্ট্রপতি ড· ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ প্রধান উপদেষ্টা হয়ে যান। গত বছরের ২৮ অক্টোবর বিএনপি-জামায়াত জোট তাঁর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। ২৯ অক্টোবর তিনি প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন এবং ৩১ অক্টোবর পরিষদে ১০ জন উপদেষ্টা শপথ নেন।


শপথ নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ‘রাষ্ট্রপতিশাসিত ধরনের সরকার’ আখ্যা দিয়ে ড· ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ সরকার পরিচালনা করতে থাকেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্ত কার্যকর না করা বা নিজের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অতি আগ্রহ দেখানো নিয়ে উপদেষ্টাদের সঙ্গে বিরোধ দেখা দেয়। এমনই এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ১১ ডিসেম্বর চারজন উপদেষ্টা পদত্যাগ করেন। ১২ ডিসেম্বর নতুন তিনজন এবং ১৩ জানুয়ারি আরও একজন নতুন উপদেষ্টা শপথ নেন।


২২ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠানের একগুঁয়ে মনোভাব নিয়ে এগোতে থাকে ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ৩ জানুয়ারি বিএনপি-জামায়াত ছাড়া সব রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জনের ডাক দেয় এবং মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেয়। এরপর ৯ জানুয়ারি থেকে শুরু হয় বঙ্গভবন অবরোধ। এমন পরিস্থিতিতে ১১ জানুয়ারির পটপরিবর্তনের ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড· ফখরুদ্দীন আহমদ ১২ জানুয়ারি নতুন প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন।


উত্তপ্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
জাহিদ হোসেন

বাংলাদেশের ইতিহাসে বহু গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের খেলার মাঠে কথাকাটাকাটির একটি ঘটনার জের ধরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে। এ বছরের আগস্টে ছাত্রদের সঙ্গে সেনা সদস্যদের বাদানুবাদের ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশে প্রভাব ফেলে। বলতে গেলে বছরের শেষ পর্যায়ে এসেও এখনো ওই ঘটনার রেশ পুরোপুরি কাটেনি।


২০ আগস্টের ওই ঘটনা যেন কোন বড় ঘটনায় রূপ নিতে না পারে সে জন্য সরকার ছাত্রদের দাবি অনুযায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয় ও সে অনুযায়ী ক্যাম্প সরিয়ে নেয়। মনে হয়েছিল বিষয়টির বোধ হয় সেখানেই একটি শুভ সম্পাপ্তি হবে, তা হয়নি। কেন হয়নি সে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত আপাতত ইতিহাসের পাঠে বন্দী রাখতে হচ্ছে। তবে ২০ আগস্ট রাতে পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদের সংঘর্ষের জের চলতে থাকে সেনাক্যাম্প সরিয়ে নেওয়ার পরও। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসগুলোতে নির্বিচারে ছাত্রদের ওপর হামলা চালানো হয়। পুলিশের হামলায় হতবিহ্বল ছাত্ররা পরের দিন প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। স্বভাবতই ছাত্রদের ওপর হামলা হওয়ায় তাঁদের পাশে এসে দাঁড়ান শিক্ষকেরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি এবং সিন্ডিকেট সভায় ছাত্রদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে শিক্ষিকেরা মৌন মিছিল ও ছাত্ররা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন।

কিন্তু হঠাৎ করেই ছাত্রদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পরে শহর জুড়ে। ওই দুঃখজনক ঘটনার দিকে ফিরে তাকালে অবাক হয়ে দেখতে হয় খুব দ্রুত ২১ আগস্টেই সারা ঢাকায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের শিখার মতো তা ছড়িয়ে পড়তে থাকে দেশের প্রধান প্রধান শহরে।


খুব দ্রুত আন্দোলন বিক্ষোভে রূপ নেয়। ক্যাম্পাসে জ্বলে ওঠা আগুন সহসাই ছড়িয়ে পড়ে ক্যাম্পাসের বাইরে। তবে এ সময় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নমনীয় থাকায় সংঘর্ষ একমুখী হয়। ফলে বড় ধরনের হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাওয়ায় সান্ধ্য আইন জারি হয় ২২ আগস্ট রাত আটটা থেকে।


অবশ্য ওই ঘটনার জের ধরে আটক করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষককে। গ্রেপ্তার করা শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড· সদরুল আমিন, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক হারুন-অর-রশীদ ও ফলিত পদার্থবিজ্ঞান ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক নিমচন্দ্র ভৌমিক। সহিংস ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আসামি করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের।


বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও ছাত্রদের মুক্তির দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ৯ ও ১০ ডিসেম্বর কালোব্যাজ ধারন ও মৌন মিছিল কর্মসূচির ঘোষণা দিলে সরকারের পক্ষ থেকে তৎকালিন শিক্ষা উপদেষ্টা আইয়ুব কাদরী গ্রহণযোগ্য মীমাংসা করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন। এরপরিপ্রেক্ষিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা মুক্ত হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা মুক্তি পাননি। বরং গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষক ও ১৫ ছাত্রের বিরুদ্ধে আদালত অভিযোগ গঠন করেন।


সরকার কয়েক দফা প্রতিশ্রুতি দিলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রদের এখনো মুক্তি মেলেনি। তবে রাজশাহীতে শিক্ষকদের প্রতিবাদ কর্মসূচির পর মামলায় চার শিক্ষকের সাজা হলেও রাষ্ট্রপতি ১০ ডিসেম্বর তা মওকুফ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষক ও ১৫ ছাত্রকে মুক্তি দেওয়া হয়নি, বরং দুটি মামলায় তাঁদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। সাক্ষ্য গ্রহণও শুরু হয়েছে। তবে সরকার এবং শিক্ষকদের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি উপায়ে শিক্ষক ও ছাত্ররা মুক্তি পাবেন সেটাই সবাই আশা করেন।


ড· ইউনূসের রাজনীতিতে আসা ও ফিরে যাওয়া
শরিফুজ্জামান পিন্টু

‘যাঁদের সঙ্গে পেলে জনগণের সামনে একটি সবল ও উজ্জ্বল বিকল্প রাখা সম্ভব হতো, তাঁদের আমি সঙ্গে পাচ্ছি না।’ এই বাস্তবতা এবং আক্ষেপের সুরে বাংলাদেশের সংকটকবলিত রাজনীতির মাঠ থেকে সরে দাঁড়ালেন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। ওই ঘোষণা দেওয়ার পর রাজনীতিতে তাঁকে ঘিরে যে জল্পনা-কল্পনা, দ্বিধাদ্বন্দ্ব, স্বপ্ন ও সম্ভাবনা সবকিছুরই অবসান ঘটে।


ড· ইউনূস বিদায়ী বছর ২০০৭ এর ১১ ফেব্রুয়ারি রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার লক্ষ্যে নাগরিকদের মতামত চান। এরপর ২২ ফেব্রুয়ারি রাজনৈতিক দল গঠনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে নাগরিকদের খোলা চিঠি দেন। তিন মাস পার হওয়ার আগেই ৩ মে আরেক চিঠিতে তিনি রাজনীতি থেকে সরে আসার ঘোষণা দেন, আর এ জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন নাগরিকদের কাছে। বিদায়ী বছরে বাংলাদেশের অস্থির ও সংকটকবলিত রাজনীতির মধ্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীর রাজনীতিতে আসা এবং ফিরে যাওয়ার ঘটনা ছিল উল্লেখযোগ্য ও আলোচিত ঘটনা।


এর আগে রাজনৈতিক সংকট যখন তুঙ্গে, তখন ড· ইউনূসকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সিওল শান্তি পুরস্কার নিতে দক্ষিণ কোরিয়া যাওয়ার দিন ১৮ অক্টোবর জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড· ইউনূস বলেছিলেন, বিএনপি-আওয়ামী লীগ চাইলেও তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে চান না। তবে তিনি যোগ্য প্রার্থী আন্দোলন করতে চান। এটা করতে গিয়ে যদি রাজনৈতিক দলও করতে হয়, তা-ও তিনি ভাববেন বলে জানান। ওই ভাবনার ফসল হিসেবেই তিনি রাজনীতির মাঠে এসেছিলেন, ফিরেও গেলেন।


গত ১৩ অক্টোবর নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার পর থেকে ড· ইউনূসকে ঘিরে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের প্রত্যাশা বেড়ে যায়। রাজনীতিতে আসার জন্য প্রথম দিকে তাঁর একদম আগ্রহ না থাকলেও ধীরে ধীরে তিনি অবস্থান পরিবর্তন করেন। কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতা যে ভালো ছিল না তা তার রাজনীতি থেকে সরে আসার ঘোষণায় স্পষ্ট, ‘দল গঠনের ঘোষণা দেওয়ার পর আমার কাছে স্পষ্ট হতে থাকে যাঁরা আমাকে উৎসাহ দিচ্ছেন, তাঁরা নিজেরা রাজনীতিতে আসবেন না-প্রকাশ্য সমর্থনও দেবেন না। এমনকি যাঁরা রাজনৈতিক দলে আছেন, তাঁরাও এ মুহূর্তে দল ছেড়ে আসবেন না।’ অনেকটা হতাশার সুরে তিনি বলেন, সবাই নতুন ধারার রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হোক, এটা চান। কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনে উৎসাহী প্রবক্তাদের তিনি সঙ্গে আনতে পারেননি।


ড· ইউনূসের এই বক্তব্য থেকে বাংলাদেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি অনুভব করা যায়। ড· ইউনূসই কেবল নন, এর আগে আরো অনেকেই রাজনীতির নতুন ধারা তৈরির চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সেভাবে কেউই সফল হতে পারেননি। রাজনৈতিক সংস্কারে বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূমিকা এবং নতুন পরিচয়ে রাজনীতির মাঠে আসা ব্যক্তিরা কতটা এবং কীভাবে সফল হন, সেটি দেখার জন্য একধরনের অপেক্ষা চলছে বলা যায়।


বিএসইসি ভবনে আগুন
আনিস রহমান

গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি। অন্যান্য দিনের মতো সবার মঙ্গল কামনায় একটি শুভ সকালের পথচলা শুরু হয়েছিল। শীতের সকালের কুয়াশার চাদর সরিয়ে নগরবাসী হয়ে উঠছিল কর্মচঞ্চল। এর মধ্যে সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিএসইসি ভবনে দাউদাউ করে আগুন ধরে যায়। মুহূর্তের মধ্যে কালো ধোঁয়া ও আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে ওই ভবনের প্রায় সব কটি ফ্লোরে।


দমকল ও অন্যান্য সংস্থার উদ্ধারকর্মীদের মতে, ্নরণকালে রাজধানীতে এটি ছিল সবচেয়ে বড় আগুনের ঘটনা। এত বড় আগুন নেভানোর অভিজ্ঞতা তাঁদের আগে কখনো ছিল না।


কারওয়ান বাজারে বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের (বিএসইসি) ১১তলা ভবন। ওই দিনের ভয়াবহ আগুনে বিএসইসির দুই কর্মচারীসহ তিনজন মারা যান। প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে জ্বলতে থাকা এ আগুনে ওই দিন শতাধিক মানুষ আহত হন। ঘটনার প্রায় এক বছর পর এখনো ওই ভবনের সিঁড়ি ঘরে ঢুকলে পোড়া গন্ধ নাকে লাগে, বিশেষ করে আটতলায় এখনো অগুনের ক্ষত জ্বল জ্বল করছে। যদিও কিছুদিন আগে বিএসইসি কতৃêপক্ষ ভবনটি নতুন করে রং এবং ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত করেছে।

অগ্নিকাণ্ডে ওই ভবনে অবস্থিত বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেল এনটিভি, আরটিভি, দৈনিক আমার দেশ, ড্যান্ডি ডাইং, যমুনা তেল কোম্পানি, ভারত পেট্রোলিয়াম, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ, এবি ব্যাংক, ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশন, রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স, ইসলামি লাইফ ইন্স্যুরেন্সসহ ৪০টি ছোটবড় প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক ক্ষতি হয়।


দমকল সূত্র জানিয়েছিল, ভবনের দ্বিতীয় তলায় একটি প্রতিষ্ঠানের গ্যাসের চুলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। এরপর বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও প্লাস্টিক ক্যাবলের সাহায্যে তা দ্রুত পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়েছিল।

রাজধানীর ব্যস্ততম ভিআইপি সড়কের পাশে বহুতল এ ভবনে আগুন লাগার ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। হাজার হাজার নারী-পুরুষ বিএসইসি ভবনের দিকে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা নিয়ে অপলোক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। আগুন নেভানো ও ভবনে আটকেপড়া লোকদের উদ্ধারে নিরলসভাবে কাজ করেছেন দমকল, সেনা, র‌্যাব, পুলিশ ও বিমান বাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা। উদ্ধারকাজে বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টারও ব্যবহার করা হয়। আগুন নেভাতে গিয়ে দমকলের আট কর্মকর্তা-কর্মচারী আহত হয়েছিলেন।


প্রত্নসামগ্রী বিতর্ক ও সংস্কৃতি উপদেষ্টার পদত্যাগ
মাসুম অপু

বাংলাদেশের জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরিচয়বাহী ১৮৯টি মূল্যবান প্রত্নসম্পদ প্রদর্শনীর জন্য ফ্রান্সে পাঠানো নিয়ে বছরের মাঝামাঝি সময় সংস্কৃতি অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। প্রত্নসামগ্রী দেশের বাইরে পাঠানো নিয়ে দেশে রীতিমতো ঝড় ওঠে। প্রত্নসম্পদ দেশের বাইরে পাঠানোর বিরোধীদের অভিযোগ, নিয়ম উপেক্ষা করে এসব মহার্ঘø প্রত্নসামগ্রী দেশের বাইরে পাঠানো হচ্ছে। এ নিয়ে বাদপ্রতিবাদ থেকে শুরু করে মামলা পর্যন্ত হয়েছে। কিন্তু প্রত্নসম্পদ ফ্রান্সে পাঠানোর সিদ্ধান্তে অটল থাকে সরকার। ৩০ নভেম্বর ফ্রান্সে নেওয়া হয় পুরাকীর্তির প্রথম চালান। সর্বশেষ ঈদের দিন জাদুঘর খোলা রেখে দ্বিতীয় চালান গিমে জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে দেওয়া হয়। পরদিন বিমানবন্দর থেকে চুরি হয় দুটি মূল্যবান বিঞ্চুমূর্তি। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা আইয়ুব কাদরী।


ঢাকার ফরাসি দূতাবাস প্যারিসের বেসরকারি জাদুঘর গিমে মিউজিয়ামে বাংলাদেশের প্রত্ন-নিদর্শন প্রদর্শনীর আয়োজন করে। এ বছরের ৩১ জুলাই সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় ও ফরাসি দূতাবাসের মধ্যে একটি চুক্তিও হয়েছে। প্রদর্শনীর জন্য জাতীয় জাদুঘর, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, বরেন্দ্র জাদুঘরের প্রত্নসম্পদ বাছাই করেছে আয়োজকেরা। চুক্তি অনুযায়ী প্রদর্শনীর চার মাস এবং আনুষঙ্গিক কাজ মিলিয়ে মোট প্রায় আট মাস প্রত্নসম্পদগুলো ফ্রান্সে থাকার কথা।


প্রথমেই এই চুক্তির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে প্রত্নতত্ত্ব গবেষক ও সাবেক সচিব আ ক ম যাকারিয়া, শিল্পী নিসার হোসেন, শিশির ভট্টাচার্যসহ সাতজন হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। ওই আবেদনে বলা হয়, জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত কোনো নিদর্শন বিদেশে পাঠাতে হলে জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ডের অনুমোদন লাগে। কিন্তু বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই এই চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে। আবার বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ১৭ সেপ্টেম্বর প্রত্ন-নিদর্শনগুলো বিদেশে পাঠানোর ওপর এক সপ্তাহের স্থিতাবস্থার আদেশ দেন।


পরে ৩ অক্টোবর প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করেন।


প্রথম চালানে ১০টি বাক্সে করে মোট ৪২টি মূল্যবান পুরাকীর্তি ফ্রান্সে নেওয়া হয়। পরে ২১ ডিসেম্বর (ঈদের দিন) বিকেল তিনটায় ১৩টি বাক্সে ভরা ১৪৫টি পুরাকীর্তি বিমানবন্দরে নেওয়া হয়। ঈদের দিন বিকেল সোয়া পাঁচটায় এসব পুরাকীর্তি বিমানবন্দরে পৌঁছায়। বাক্সে ভরা পুরাকীর্তি জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রপ্তানি কার্গো এলাকা থেকে নিয়ে ফরাসি বিমানে তোলার পর ধরা পড়ে, সেখানে একটি বাক্স কম। এই বাক্সটিতে পোড়ামাটির দুটি বিষ্ণুমূর্তি ছিল। এরপর প্রদর্শনীর জন্য পুরাকীর্তি ফ্রান্সে পাঠানো স্থগিত করা হয়। ঘটনার ১৮ ঘণ্টা পর রোববার রাতে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক সমর চন্দ্র পাল বাদি হয়ে বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা করেন। বিমানবন্দরের পুকুর থেকে মূর্তি দুটির খালি বাক্স উদ্ধার হলেও মূর্তি দুটির খোঁজ পাওয়া যায়নি। অনাকাঙ্ক্ষিত এ ঘটনায় সংস্কৃতি উপদেষ্টার পদত্যাগের পর সরকার ২৭ ডিসেম্বর গিমে জাদুঘরের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে।


শেখ হাসিনাঃ দেশে ফিরতে ও বিদেশ যেতে বাধা
জাহাঙ্গীর আলম
২২ এপ্রিল, লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর। স্থানীয় সময় বেলা ১টায় আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা বিমানবন্দরে এসে উপস্থিত। সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পরদিন ২৩ এপ্রিল পূর্বনির্ধারিত সময়েই দেশে ফিরবেন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর তাঁর দিকে। প্রায় ৭০-৭৫ জন সাংবাদিক, আওয়ামী লীগের লন্ডন শাখার শতাধিক নেতা-কর্মী, এমনকি ব্রিটেনের সরকারি দল লেবার পার্টির এমপি মিসেস এমিলি টনবারিও উপস্থিত ছিলেন সেদিন হিথ্রোয়। ঘণ্টাখানেক ব্যর্থ চেষ্টা করলেন শেখ হাসিনা। কোনোমতেই ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ তাঁকে বহন করতে সম্মত হলো না। বোর্ডিং পাস (বিমানে ওঠার অনুমতিপত্র) না পেয়ে বেলা সোয়া দুইটায় হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে ছোট বোন শেখ রেহানার বাসায় ফিরে যান তিনি।


শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের নিষেধাজ্ঞা থাকায় ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ আওয়ামী লীগের সভানেত্রীকে বহন করতে সম্মত হয়নি। নিষেধাজ্ঞা আরোপের এক সপ্তাহের মধ্যে তা প্রত্যাহার করা হলেও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ ঘটনা তখন তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে।


শেষ পর্যন্ত অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে শেখ হাসিনা সেবার দেশে ফিরতে সক্ষম হলেও গত ১৫ জুন আবার যুক্তরাষ্ট্র চাইলে তাঁর নামে চাঁদাবাজিসহ ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের ঘটনায় হত্যা মামলা দায়ের হওয়ায় সরকার তাঁকে দেশ ত্যাগ করতে দেয়নি।


গত ১১ জানুয়ারি বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হলে আওয়ামী লীগ সরকারকে সমর্থন দেয়। এ সরকার আওয়ামী লীগের আন্দোলনের ফসল বলেও একাধিকবার মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা। এমনকি গত ১৫ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার আগে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা তাঁর দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে সরকারের সব কাজের আইনি অনুমোদন দেবেন বলে ঘোষণা দেন। কিন্তু শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেই নিজস্ব অবস্থান পরিবর্তন করেন। সেখানে প্রবাসীদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দ্রুত নির্বাচন দাবি করাসহ তিনি সরকারের সমালোচনা করতে থাকেন। তাঁর বক্তব্য দেশের জাতীয় পত্রপত্রিকায় বেশ গুরুত্বের সঙ্গেই ছাপা হয়।


গত ৯ এপ্রিল শেখ হাসিনার নামে রাজধানীর তেজগাঁও থানায় তিন কোটি টাকা চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করেন তাজুল ইসলাম ফারুক নামের এক ব্যবসায়ী। বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টমন্ট বাংলাদেশ লিমিটেডের চেয়ারম্যান ব্যবসায়ী ফারুক দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে শেখ হাসিনা তাঁর কাছ থেকে তিন কোটি টাকা চাঁদা নিয়েছেন। মামলা দায়েরের পর শেখ হাসিনা নির্ধারিত সময়ের আগেই দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। তবে ১১ এপ্রিল শেখ হাসিনার সঙ্গে সরকারের একজন উপদেষ্টার টেলিফোনে কথোপকথনের পরিপ্রেক্ষিতে সফর সংক্ষিপ্ত না করে নির্ধারিত ২৩ এপ্রিলই দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ১৭ এপ্রিল শেখ হাসিনার দেশে ফেরার কথা জানিয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু ১৮ এপ্রিল শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার এক প্রেসনোট জারি করে।


দেশে ফিরতে না পেরে লন্ডনে অবস্থান করে শেখ হাসিনা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নিয়মিত সাক্ষাৎকার দিতে থাকেন। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও ব্যক্তিত্ব, রাজনীতিকও তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ ঘটনায় দেশে-বিদেশে সরকারের ব্যাপক সমালোচনা হতে থাকে। আন্তর্জাতিক সহানুভূতি পেয়ে যান শেখ হাসিনা। সরকার অনেকটা ভুল স্বীকার করে ২৫ এপ্রিল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে আরেকটি প্রেস নোট জারি করে । ৭ মে দেশে ফিরে আসার পর শেখ হাসিনা বিভিন্ন বক্তৃতা-বিবৃতিতে সরকারের নানা কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করতে থাকেন। এরপর মেয়ের সন্তান লাভ উপলক্ষে পাশে থাকতে ১৫ জুন যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চাইলেও ব্যর্থ হন তিনি। এরই ফাঁকে দলের তিন জ্যেষ্ঠ নেতা আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ ও সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র ও নেতৃত্ব পর্যায়ে সংস্কার দাবি করে সংস্কার প্রস্তাব পেশ করেন। অবশ্য গত ১৬ জুলাই থেকে শেখ হাসিনা কারাবন্দী রয়েছেন।


খালেদা-হাসিনা গ্রেপ্তার
আরিফুর রহমান

৭ মার্চ গভীর রাতে বিএনপির জেষ্ঠ্য যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান গ্রেপ্তার হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নাকি ঘনিষ্ঠ মহলে বলেছিলেন, সরকার সত্যিই ভালো কাজ করছে। আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানিয়েছিল, তখন শেখ হাসিনা এও বলেছিলেন, ‘আমরা ক্ষমতায় এলে তো মোসাদ্দেক আলী ফালুকেও ধরতে পারতাম না।’

কিন্তু এর কয়েক মাস পর ১৬ জুলাই শেখ হাসিনা নিজেই গ্রেপ্তার হয়ে যান। যদিও এর আলামত কিছুকাল ধরেই পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু তার পরও শেখ হাসিনা গ্রেপ্তার হয়েছেন-দেশের দীর্ঘকালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটা ছিল রীতিমতো অবিশ্বাস্য এক ঘটনা। চাঁদাবাজি মামলায় শেখ হাসিনার গ্রেপ্তারের পর বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কবে গ্রেপ্তার হচ্ছেন এই দিন গণনাও চলতে থাকে।


গ্যাটকো কোম্পানিকে অবৈধভাবে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগে তেজগাঁও থানায় করা মামলায় ৩ সেপ্টেম্বর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বেগম জিয়াকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ৬ শহীদ মইনুল রোডের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে। একই সঙ্গে গ্রেপ্তার হন তাঁর ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো।


এভাবেই নানা ঘটনার মধ্যে ২০০৭ সালের আলোচিত অন্যতম ঘটনা হিসেবেই চিহ্নিত থাকবে খালেদা-হাসিনাসহ উভয় দলের একাধিক প্রভাবশালী নেতার গ্রেপ্তার। তালিকায় কে নেই? তারেক রহমানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুন গ্রেপ্তার হন বছরের শুরুর দিকেই। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মন্ত্রী ড· খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, তরিকুল ইসলাম, মির্জা আব্বাস, এয়ার ভাইস মার্শাল (অব·) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, লুৎফুজ্জামান বাবর, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, মীর মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন, আমানউল্লাহ আমান, মেয়র মিজানুর রহমান মিনু, শেখ তৈয়েবুর রহমান, হুইপ আশরাফ হোসেন, জেএমবির অন্যতম পৃষ্ঠপোষক খ্যাত রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু কিংবা হাওয়া ভবনের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী সাংসদ খ্যাত এম এ এইচ সেলিম, আলী আসগার লবীর মতো একসময়ের প্রভাবশালীরা একে একে গ্রেপ্তার হয়েছেন বা স্বেচ্ছায় ধরা দিয়েছেন। গডফাদার খ্যাত সাবেক সাংসদ নাসিরউদ্দিন পিন্টু, সালাউদ্দিন, গিয়াসউদ্দিনেরাও পালাতে না পেরে আত্মসমর্পণ করেছেন।


আবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, কাজী জাফরুল্লাহ, ড· মহিউদ্দিন খান আলমগীরও নানা অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন গত বছরের বিভিন্ন সময়ে। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়দুল কাদের, সালমান এফ রহমান, সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, সাবেক সাংসদ লোটাস কামাল, রফিকুল আনোয়ার, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা পঙ্কজ দেবনাথও গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। জামায়াতে ইসলামী নেতা ডা· আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, গাজী নজরুল ইসলাম, শাজাহান চৌধুরী, মিজানুর রহমান চৌধুরীকেও সরকারের সংশ্লিষ্ট বাহিনী আটক করে বিভিন্ন দফায়।


এই নেতাদের কারও কারও বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার বিচারকাজ শেষ হয়েছে। আনেকেই সাজা পেয়েছেন, অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, বিচার চলছে।


বছরজুড়ে র‌্যাংগস ভবন
নজরুল ইসলাম

শেষ পর্যন্ত এক বেদনাদায়ক ঘটনা নিয়ে বছরের শেষ দিকে আবার আলোচনায় এলো র‌্যাংগস ভবন । অপরিকল্পিতভাবে ভবন ভাঙতে গিয়ে ধসে পড়ল ভবনের একটি বড় অংশ। আর ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে প্রাণ হারালেন হতদরিদ্র ১১ শ্রমিক। ১১ দিন উদ্ধার কাজ চালিয়ে ধ্বংসস্তূপ থেকে ১১ শ্রমিকের পচাগলা লাশ বের করে আনা হয়। যে উচ্ছ্বাস নিয়ে অবৈধ এ ভবন ভাঙার কাজ শুরু হয়েছিল, দায়িত্বহীনতার কারণে শেষ পর্যন্ত তা আর রইলো না।


বহুল আলোচিত র‌্যাংগস ভবন নির্মাণের শুরু থেকেই বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এর জমি নিয়েও ছিল বিরোধ। ভবনটি নির্মাণের ফলে বিজয় সরণি থেকে তেজগাঁও শিল্প এলাকা পর্যন্ত প্রস্তাবিত সড়ক সম্প্রসারণের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ছয়তলা ভবনের অনুমোদন নিয়ে আরও ১৬ তলা নির্মাণ শুরু করা হলে রাজউক নোটিশ পাঠায়। কিন্তু নোটিশটি যথাযথভাবে দেওয়া হয়নি বলে দাবি করে র‌্যাংগস কর্তৃপক্ষ ভবন নির্মাণ চালাতে থাকে। র‌্যাংগস ভবন কর্তৃপক্ষ ১৯৮৯ ও ’৯৩ সালে নির্মাণকাজ চলাকালে দুই দফায় যথাক্রমে ১০ ও ২২ তলা ভবন নির্মাণের অনুমতি চেয়ে নকশা অনুমোদনের জন্য রাজউকে জমা দেয়। কিন্তু রাজউক তা অনুমোদন দেয়নি। ২১ এপ্রিল প্রধান উপদেষ্টা ড· ফখরুদ্দীন আহমদের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের সভায় র‌্যাংগস ভবন ভেঙে ফেলার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে আইনগত জটিলতার কারণে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি।


চলতি বছরের ২ আগস্ট সুপ্রিম কোর্ট ২২ তলা র‌্যাংগস ভবনের ছয়তলা রেখে বাকি ১৬ তলা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশের পরপর রাজউক কর্মকর্তারা ভবনের ভাড়াটেদের মালামাল সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। বিকেলের ঘোষণার পর থেকে ভবনটির সাত থেকে ওপরের তলাগুলোয় ভাড়া নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা মিলে মালামাল সরাতে শুরু করেন। শেষ বিকেলে সব অফিসের লোকজন একসঙ্গে তড়িঘড়ি করে মালামাল নামাতে গেলে একপর্যায়ে সিঁড়িতে জট লেগে যায়। শেষ পর্যন্ত লোকজন নিজ দায়িত্বে দুই আগস্ট রাত ১২টার মধ্যে মালামাল সরিয়ে নেয়। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ৩ আগস্ট সকাল সাতটা থেকে ভাঙার কাজ শুরু হয়। অগণিত উৎসুক লোকজন ভবন ঘিরে ভিড় করে। অবৈধ এই ভবন ভাঙাকে সে সময় অনেকেই সাধুবাদ জানায়।

রাজউক কিছুদিন ভাঙার কাজ করার পর দরপত্র আহ্বান করে। ভবনের ছয়তলার ওপরের তলাগুলোর অবকাঠামো ভাঙা ও অপসারণের কাজ পায় চট্টগ্রামের জাহাজ কাটা ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সিক্সস্টার করপোরেশন। আড়াই মাসের মধ্যে ভাঙার কাজ শেষ করার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। বাস্তবে ভবন ভাঙায় তাঁদের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সিক্সস্টার ভাঙার কাজ শুরু করে। ৮ ডিসেম্বর রাতে ভবনের মাঝ বরাবর মেঝের ১০৫০ বর্গফুট এলাকা ১৮ তলা থেকে শুরু করে ধসতে ধসতে ছয়তলায় গিয়ে থামে। এতে কমপক্ষে ৫০ জন শ্রমিক আহত হন। পরে আবার ছয়তলায় জমে থাকা ধ্বংসস্তূপের চাপে ভবনের অংশবিশেষ ভাঙতে ভাঙতে দ্বিতীয় তলায় এসে ঠেকে।


জেএমবির শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি
টিপু সুলতান

সারা দেশে একযোগে ৫০০ বোমা বিস্কোরণ ঘটিয়ে বিভীষিকা সৃষ্টি করেছিল জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট থেকে দেশজুড়ে একের পর এক ধ্বংসাত্মক ও দেশবিরোধী কার্যকলাপ চালিয়েছে নিষিদ্ধঘোষিত এ জঙ্গি সংগঠনটি। মাত্র দেড় বছরের মাথায় এ জঙ্গি সংগঠনের ছয় শীর্ষস্থানীয় নেতার ফাঁসি হয়। জেএমবির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ফাঁসির ঘটনাটি গত বছরের অন্যতম আলোচিত ঘটনা।

ধর্মের নামে নাশকতামূলক তৎপরতার মাধ্যমে অল্পদিনের ভয়ঙ্কর শক্তি হিসেবে আবিভূêত জেএমবির সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে খুব বেশি সময় লাগেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সবাইকে গ্রেপ্তার এবং ঝালকাঠিতে বোমা মেরে দুই বিচারক হত্যা মামলায় তাঁদের ফাঁসির রায় ঘোষণা হয়েছিল ২০০৬ সালে। কিন্তু এই রায় কবে কার্যকর হবে, জোট সরকারের আমলে আদৌ জঙ্গিদের ফাঁসি হবে কি না, তা নিয়ে একটা সংশয়, সংশ্লিষ্ট মহলে নানা আলোচনা ছিল।


এ সংক্রান্ত সব আলোচনার যবনিকা ঘটে গত বছরের ২৯ মার্চ। এ দিন গভীর রাতে কাঠোর গোপনীয় দেশের চার কারাগারে একযোগে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইসহ জেএমবির শীর্ষস্থানীয় ছয় জঙ্গির। তবে ফাঁসির রায় কার্যকরের পুরো বিষয়টি এত কঠোর গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে করা হয় যে ফাঁসির আগ পর্যন্ত গণমাধ্যমের লোকজন তা টেরও পায়নি। পরদিন ৩০ মার্চ সকালে যখন সবাই বিষয়টি জানতে পারে, ততক্ষণে জঙ্গিদের লাশ পৌঁছে গেছে যার যার গ্রামের বাড়িতে। নিরাপত্তার কারণে অর্থাৎ শীর্ষস্থানীয় জঙ্গিদের অনুসারীদের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া বা কোনো ধরনের নাশকতা এড়ানোর কৌশল হিসেবে এমন কঠোর গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়।


২৯ মার্চ রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে জেএমবির প্রধান শায়খ আবদুর রহমানের এবং ময়মনসিংহ কারাগারে অন্যতম দুই শীর্ষস্থানীয় জঙ্গি নেতা সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই এবং আবদুল আউয়ালের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। আরেক জঙ্গি নেতা খালেদ সাইফুল্ল্লাহকে রাত ১২টা এক মিনিটে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। শায়খ আবদুর রহমানের ভাই আতাউর রহমান সানি ও ইফতেখার হাসান আল মামুনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে।


জেএমবির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ফাঁসির মধ্য দিয়ে অন্ধকার একটি অধ্যায়ের আপাতত অবসান হলো। যদিও জঙ্গি হামলার আশঙ্কা থেকে দেশ এখনো পুরোপুরি মুক্ত হয়নি।


দেশে ফিরতে হলো খুনি মহিউদ্দিনকে
কামরুল হাসান

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মেজর (অব·) এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদের এখন দিন কাটছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কনডেম সেলে। দীর্ঘদিন বিদেশে পলাতক থাকার পর যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ তাঁকে ঢাকায় এনে অভিবাসন (ইমিগ্রেশন) পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। এরপর তাঁকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।


মেজর (অব·) মহিউদ্দিন (৬০) গত ১৩ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রে গ্রেপ্তার হন। যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) ফিউজিটিভ অপারেশনস ডিপার্টমেন্টের (পলাতকদের নিয়ে কার্যক্রম বিভাগ) সদস্যরা তাঁকে লস অ্যাঞ্জেলেসের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে। এর আগে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করতে বলেছিলেন সে দেশের আদালত। তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকায় আদালত এ নির্দেশ দেন। ২০০২ সালে অভিবাসন আদালতের এ নির্দেশের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করেন। গত মার্চ মাসে সানফ্রান্সিসকোর আপিল আদালত (যুক্তরাষ্ট্রের নবম সার্কিট কোর্ট অব আপিলস) তাঁর মামলা পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ করে বহিষ্কারাদেশ বহাল রাখেন। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার যখন শুরু হয় (১৯৯৬ সালে) তখন তাঁকে পলাতক ঘোষণা করা হয়েছিল। ওই সময় ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়।


এর আগে সাবেক এ সেনা কর্মকর্তাকে বাংলাদেশে না পাঠিয়ে অন্য কোনো দেশে পাঠাতে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালতে একটি রিট আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু সেখানকার আদালতে সে আবেদন নাকচ হয়ে যায়। এরপর তাঁকে দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি ওই দেশের সরকার চূড়ান্ত করে।

পলাতক মহিউদ্দিনকে ঢাকায় আনা হয় গত ১৮ জুন বেলা সোয়া ১২টায় থাই এয়ারের টিজি-৩২১ বিমানে করে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ব্যাংকক পর্যন্ত তিনি অন্য একটি এয়ারলাইন্সে আসেন। ব্যাংককে এসে থাই এয়ারে ওঠেন। তবে ঢাকায় আসার আগে যাত্রীরা তাঁকে সাধারণ যাত্রীই মনে করেছিলেন। বিমানবন্দরে নেমে র‌্যাব-পুলিশের ব্যস্ততা দেখে সহযাত্রীরা তাঁর সম্পর্কে জানতে পারেন। পুলিশ মহিউদ্দিনকে বিমানবন্দরের ভেতরেই বুলেটপ্রুফ পোশাক ও হেলমেট পরিয়ে দেয়, হাতকড়াও পরানো হয়। এরপর প্রিজন ভ্যানে তুলে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে।


বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১২ জন আসামির মধ্যে এ নিয়ে পাঁচজন দেশের কারাগারে বন্দী রয়েছেন। ছয়জন এখনো পলাতক। আর একজন ২০০২ সালে জিম্বাবুয়েতে মারা যান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মহিউদ্দিন দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে যান। ভেবেছিলেন বিদেশে পালিয়ে বাঁচতে পারবেন। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো না।



**************************
দৈনিক প্রথম আলো, ৩১ ডিসেম্বর ২০০৭