National Events - http://events.amardesh.com
স্মৃতিচারণঃ চূড়ান্ত যুদ্ধ ও বিজয়
http://events.amardesh.com/articles/5/1/aaaaaaaaaaa-aaaaaaa-aaaaa-a-aaaa/Page1.html
Article Poster
 
By Article Poster
Published on 12/16/2007
 
(অবঃ মেজর জেনারেল ইমাম-উজ-জামান, বীরবীক্রম) ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহের দিকে প্রতিটি সেক্টরে সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বিরাট এলাকা মুক্তিবাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। মুক্তিবাহিনীর এসব তৎপরতা রোধ করার জন্য পাকিস্তানি বাহিনী দেশের অভ্যন্তরে শক্তি হ্রাস করে সীমান্ত এলাকায় সৈন্যসমাবেশ ঘটাতে শুরু করে।

স্মৃতিচারণঃ চূড়ান্ত যুদ্ধ ও বিজয়

১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহের দিকে প্রতিটি সেক্টরে সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বিরাট এলাকা মুক্তিবাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। মুক্তিবাহিনীর এসব তৎপরতা রোধ করার জন্য পাকিস্তানি বাহিনী দেশের অভ্যন্তরে শক্তি হ্রাস করে সীমান্ত এলাকায় সৈন্যসমাবেশ ঘটাতে শুরু করে। এ সুযোগে দেশের অভ্যন্তরে গেরিলাতৎপরতা এত বৃদ্ধি পায় যে, পাকিস্তানি সেনারা দেশের অভ্যন্তরে ও সীমান্ত এলাকায় নাজুক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে থাকে এবং তাদের মনোবল ক্রমশই দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে। মুক্তিবাহিনীর ১১টি সেক্টর ও নিয়মিত তিনটি ব্রিগেড ২১ নভেম্বর ১৯৭১ সালে দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মিলিত অভিযান চালায়। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে যশোরের চৌগাছায় মুক্তিবাহিনীর সাথে পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর সম্মুখযুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে পাকিস্তান বাহিনীর ১৬টি ট্যাঙ্কের মধ্যে ১১টি ট্যাঙ্কই ধ্বংস হয়। নিহত হয় প্রায় ১০০ পাকিস্তানি সৈন্য। পাকিস্তানি সৈন্যরা পিছু হটে যশোর সেনানিবাসে অবস্থান নেয়। ইতোমধ্যে ১ নম্বর সেক্টর এবং ১০ ইস্ট বেঙ্গল সম্মিলিতভাবে ফেনী বিলোনিয়া এলাকা মুক্ত করে। অনুরূপভাবে উত্তরাঞ্চলে পঞ্চগড়, ঠাঁকুরগাঁও এবং লালমনিরহাটেও কিছু কিছু এলাকা মুক্ত হয়। এই সময়েই বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের যৌথ সিদ্ধান্তে ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী সমন্বয়ে যৌথ বাহিনী গঠিত হয়। যৌথ বাহিনী অতি সহজেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়তে সক্ষম হয়। কারণ দেশবাসী অত্যাচারী পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয়ের জন্য যৌথ বাহিনীকে সব ধরনের সাহায্য করেছে। অবশেষে ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে চূড়ান্ত যুদ্ধ ঘোষিত হয়। ৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় নবগঠিত বাংলাদেশ বিমানবাহিনী নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল এবং চট্টগ্রামের গুপ্তখাল পেট্রল ডিপোতে সফল বোমাবর্ষণ করে। এরপরই ভারতীয় বিমানবাহিনী ৩-৪ ডিসেম্বর ঢাকার কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটির ওপর হামলা শুরু করে। যুদ্ধের প্রথম দিনেই বাংলাদেশের আকাশ যৌথ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। অন্যদিকে ভারতীয় ইস্টার্ন ফ্লিট বিমানবাহী নৌজাহাজসহ দ্রুত যুদ্ধাবস্থান অভিমুখে অগ্রসর হয়। ৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশের প্রতিটি রণাঙ্গনে সর্বশক্তি দিয়ে যৌথ আক্রমণ প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে। যেভাবেই হোক যৌথ বাহিনীকে সীমান্ত এলাকায় বাধা দিয়ে বিলম্ব ঘটানোই ছিল নিয়াজির পরিকল্পনা। সীমান্তে সবক’টি পাকা রাস্তার ওপরে শক্ত প্রতিরক্ষাবূøহ রচনা করে অগ্রসরমান যৌথ বাহিনীকে প্রতিহত করাই ছিল তার উদ্দেশ্য। অন্য দিকে যৌথ বাহিনী এসব পাকিস্তানি প্রতিরক্ষা অবস্থানগুলো এড়িয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে। লক্ষ্য ছিল ক্ষিপ্রতা ও গতি। বিদ্যুৎগতিতে খুব কম সময়ের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করতে হবে। চূড়ান্ত যুদ্ধ ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যৌথ বাহিনী বাংলাদেশকে চারটি যুদ্ধাঞ্চলে বিভক্ত করে প্রতিটি রণাঙ্গনে চূড়ান্ত আক্রমণ শুরু করে। পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, মেঘনা বাংলাদেশের এই বৃহৎ চারটি নদীর গতিপ্রবাহের ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত অভিযানকালে সমগ্র বাংলাদেশকে চারটি সামরিক অঞ্চলে বিভক্ত করে আক্রমণের পরিকল্পনা রচনা করা হয়। এই চারটি অঞ্চল হচ্ছে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল (রাজশাহী বিভাগ) দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল (খুলনা-বরিশাল বিভাগ), মধ্যাঞ্চল (ঢাকা-টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ এলাকা) এবং পূর্বাঞ্চল (চট্টগ্রাম-সিলেট বিভাগ)।

উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ৩ ডিসেম্বর ’৭১ মুক্তিবাহিনীর ৬ এবং ৭ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতায় যৌথ বাহিনীর তিনটি কলাম বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রম করে সাঁড়াশি আক্রমণ পরিচালনা করে। মূল আক্রমণ পরিচালিত হয় হিলি-গোবিন্দগঞ্জ-বগুড়া অক্ষ বরাবর। হিলিতে যৌথ বাহিনী ও পাকবাহিনী এক রক্তক্ষয়ী ট্যাঙ্ক যুদ্ধে লিপ্ত হয়। যৌথ বাহিনীর আরেকটি কলাম পঞ্চগড়-ঠাকুরগাঁও অক্ষ বরাবর অগ্রসর হয়। অন্য একটি কলাম ভুরুঙ্গামারী-লালমনিরহাট হয়ে রংপুরের দিকে ধাবিত হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-রাজশাহী অঞ্চলে মুক্তিবাহিনীর ৭ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা চূড়ান্ত আক্রমণ পরিচালনা করে। ৩ থেকে ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে উত্তর-পশ্চিম সেক্টরের সীমান্তবর্তী ও সীমান্তের ভেতরে পাকিস্তানিদের ছোট ছোট অবস্থানগুলো বিধ্বস্ত করে যৌথ বাহিনী পাকিস্তানিদের শক্তিশালী ডিফেন্স রংপুর, বগুড়া, দিনাজপুর, নাটোর অবরুদ্ধ করে ফেলে। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার পতনের পরও উত্তরাঞ্চলে পাকিস্তানিরা প্রতিরোধযুদ্ধ অব্যাহত রাখে। অবশেষে ১৮ ডিসেম্বর বগুড়া, রংপুর, নাটোর, নওগাঁর পতন ঘটে এবং পাকিস্তানিরা আনুষ্ঠানিকভাবে যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ৮ এবং ৯ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা চূড়ান্ত অভিযানকালে অত্যন্ত সাহসিকতাপূর্ণ অবদান রেখেছিল। এই অঞ্চলে যৌথ বাহিনীকে প্রথমে যশোর, মাগুরা ও পরে ফরিদপুর দখল করার নির্দেশ দেয়া হয়। সেই সাথে যদি সুযোগ পাওয়া যায় তবে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন বহর ব্যবহার করে ঢাকার দিকে অগ্রসর হওয়ার ও নির্দেশনা দেয়া হয়। এই অঞ্চলে মুক্তিবাহিনী ২৯ নভেম্বরের আগেই চুয়াডাঙ্গার একাংশ মুক্ত করেছিল; যার ফলে এখানে পাকিস্তানিরা কোনো বাধার সম্মুখীন না হয়ে যৌথ বাহিনীর দুই ব্রিগেড সৈন্য অগ্রসর হয়। পার্শ্বিক যোগাযোগের পথ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে ওরা ঝিনাইদহ এবং যশোর আক্রমণের জন্য বূøহ রচনা করে। ৬ ডিসেম্বর ঝিনাইদহ এবং ৭ ডিসেম্বর যশোর পতনের পর পাকিস্তান বাহিনীর ব্রিগেড সদর দফতর আরো পূর্ব দিকে মাগুরায় স্থানান্তরিত হয়। অন্য দিকে বিশৃঙ্খল অবস্থায় পাকিস্তানি সৈন্যরা যশোর থেকে খুলনার দিকে ছুটে যায়। পরিশেষে ১৬ ডিসেম্বরের শিরমণিতে চূড়ান্ত যুদ্ধে পাকবাহিনী পরাজিত হয়। কুষ্টিয়ায় পাকিস্তানিরা প্রবল শক্তিতে পাল্টা আক্রমণ চালিয়েও তাদের অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। পরে তারা পদ্মার হার্ডিঞ্জ সেতু পার হয়ে ঈশ্বরদীতে গিয়ে আত্মসমর্পণ করে। ৯ নম্বর সেক্টরের গেরিলারা সাতক্ষীরা-বাগেরহাট-বরিশাল অঞ্চল মুক্ত করে।
এদিকে বৃহত্তর ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল এবং ঢাকা জেলার উত্তর অংশ নিয়ে গঠিত হয় রণাঙ্গনের মধ্যাঞ্চল। ১১ নম্বর সেক্টরের মুক্তিবাহিনী ছাড়াও এই অঞ্চলে কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন গেরিলা বাহিনী, ভালুকার আফসার বাহিনী এবং ২ নম্বর সেক্টরের আওতাধীন মানিকগঞ্জ এলাকার ক্যাপ্টেন আবদুল হালিম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন কয়েক হাজার মুক্তিযোদ্ধা অবস্থান নিয়েছিল। এই রণাঙ্গনে কামালপুর-শেরপুর-জামালপুর-মধুপুর এবং দুর্গাপুর-ময়মনসিংহ-মধুপুর এ দু’টি অক্ষে যৌথ বাহিনী ঢাকা অবরোধের জন্য অগ্রসর হয়। ৪ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনীর নেতৃত্বে মিত্রবাহিনী সীমান্তবর্তী শক্ত অবস্থান কামালপুর, নক্‌শী ও শেরপুর ঘেরাও করে এবং যৌথ বাহিনীর আর একটি দল জামালপুরের দিকে কাঁচা রাস্তা ধরে অগ্রসর হয়। ৫ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনীর সহায়তায় মিত্রবাহিনী শত্রুর শেরপুর অবস্থানের ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ করে। ফলে পাকিস্তানি বাহিনী শেরপুরের প্রতিরক্ষা অবস্থান গুটিয়ে জামালপুর শহরের দিকে পশ্চাৎপসরণ করে। ৭ ডিসেম্বর যৌথ বাহিনী শত্রু বাহিনীর জামালপুর প্রতিরক্ষা অবস্থান চার দিক থেকেই ঘিরে ফেলে। ৮ ডিসেম্বর টাঙ্গাইলের অদূরে মধুপুর অঞ্চলে পুলকি ব্রিজ এলাকায় মিত্রবাহিনীর প্যারা ব্যাটালিয়নের ছত্রীসেনা নামানো হয়। ১১ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা এবং কাদের সিদ্দিকীয় গেরিলা যোদ্ধারা প্যারা ব্যাটালিয়নের অবতরণ এলাকার প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করে। ১০ ডিসেম্বর যৌথ বাহিনী ময়মনসিংহ দখল করে। ১১ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনীর সহায়তায় মিত্রবাহিনী সম্মিলিতভাবে দক্ষিণ দিক দিয়ে ঢাকা অভিমুখে অগ্রসর হয়। ১৩ ডিসেম্বর যৌথ বাহিনী সাভার ও জয়দেবপুর-টঙ্গি হয়ে ঢাকা শহরের উপকণ্ঠে উপস্থিত হয়। ১৬ ডিসেম্বর সকালে মিত্রবাহিনীর প্যারা ব্যাটালিয়নের অগ্রগামী দল মিরপুর ব্রিজে পৌঁছে যায়।

মেঘনার পূর্ব পাশের সিলেট, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা নিয়ে গঠিত হয় রণাঙ্গনের পূর্বাঞ্চল। এই অঞ্চলে মুক্তি বাহিনীর ‘জেড’, ‘কে’, এবং ‘এস’ ফোর্সসহ ১, ২, ৩, ৪ এবং ৫ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা মিত্রবাহিনীর সাথে সম্মিলিত অভিযান চালায়। সিলেট এলাকা মুক্ত করার দায়িত্ব দেয়া হয় ‘জেড’ ফোর্সকে। ‘জেড’ ফোর্সের অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল এবং ৪ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা মিত্রবাহিনীর সহায়তায় প্রথম আঘাত হানে কুলাউড়ায়। ৭ ডিসেম্বর যৌথ বাহিনী মৌলভীবাজার মুক্ত করে এবং সেখান থেকে পাকবাহিনী পলায়ন করে সিলেটে অবস্থান নেয়। এর পর যৌথ বাহিনীর এই কলামটি মৌলভীবাজার-শ্রীমঙ্গল-ফেঞ্চুগঞ্জ অক্ষ ধরে সিলেট শহরের দিকে এগোতে থাকে। ইতোমধ্যে হেলিকপ্টারযোগে মিত্রবাহিনীর কিছু সৈন্য সিলেট শহরের উপকণ্ঠে অবতরণ করানো হয়। এ দিকে ‘জেড’ ফোর্সের তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল এবং ৫ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা গোয়াইনঘাট-ছাতক-লামাকাজি হয়ে সালুটিকর বিমানবন্দর দখল করে নেয়। ১৩ ডিসেম্বর ‘জেড’ ফোর্সের অধিনায়ক লে. কর্নেল জিয়াউর রহমান প্রথম ইস্ট বেঙ্গলকে নিয়ে চুড়খাই-কানাইরঘাট-চিকনাগুল চা বাগান হয়ে সিলেট শহরের এমসি কলেজ এলাকার টিলাগুলোতে অবস্থান নেন। ১৭ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের পূর্বক্ষণ পর্যন্ত দখলদার বাহিনীর দু’টি ব্রিগেডকে মুক্তিবাহিনী সিলেট শহর ঘেরাও করে রাখে। এদিকে মুক্তাঞ্চল বিলোনিয়ায় অবস্থিত ‘কে’ ফোর্স ৫ ডিসেম্বর ফেনী মুক্ত করে। অতঃপর ‘কে’ ফোর্সের ৪ এবং ১০ ইস্ট বেঙ্গল পুরো নোয়াখালী জেলা শত্রুমুক্ত করে ১ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে চট্টগ্রামের দিকে ধাবিত হয়। ১৩ ডিসেম্বর তারা কুমিরা এবং হাটহাজারী পৌঁছায়। ১৬ ডিসেম্বর পাকবাহিনী ভাটিয়ারী-ফৌজদারহাট এলাকায় আত্মসমর্পণ করে। এদিকে কুমিল্লা-লাকসাম-চাঁদপুর মুক্ত করার উদ্দেশ্যে ২ নম্বর সেক্টর এবং মিত্রবাহিনী সম্মিলিতভাবে আক্রমণ চালায়। ৩ ও ৪ ডিসেম্বর রাতে চৌদ্দগ্রাম-পরিকোট-লাকসাম অক্ষ বরাবর মূল আক্রমণ পরিচালিত হয়। এই কলামটি ৫ ডিসেম্বর চৌদ্দগ্রাম, ৭ ডিসেম্বর লাকসাম এবং ৯ ডিসেম্বর চাঁদপুর শত্রুমুক্ত করে। এ দিকে কুমিল্লা বিমানঘাঁটি এবং ময়নামতি সেনানিবাস মুক্ত করার উদ্দেশ্যে ‘কে’ ফোর্সের নবম ইস্ট বেঙ্গল এবং মিত্রবাহিনী ৪ ডিসেম্বর মিয়ারবাজার-কাশীনগর অক্ষ এবং ৫ ডিসেম্বর রাজাপুর-জাফরগঞ্জ-বুড়িচং-চান্দিনা অক্ষে সম্মিলিত অভিযান চালায়। ৭ ডিসেম্বর চান্দিনা এবং কুমিল্লা শহর মুক্ত হলেও ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকবাহিনীকে ময়নামতি সেনানিবাস অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। চান্দিনা মুক্ত করার পর ২ নম্বর সেক্টর এবং মিত্রবাহিনীর একটি বহর ইলিয়টগঞ্জ-দাউদকান্দি হয়ে ১৪ ডিসেম্বর বৈদ্যেরবাজার পৌঁছে যায়। এই বাহিনী শীতলক্ষ্যা পার হয়ে ডেমরা ও নারায়ণগঞ্জের মাঝামাঝি পৌঁছায় ১৫ ডিসেম্বর রাতেই। ঢাকা অভিমুখে মূল অভিযান পরিচালিত হয় মুক্তিবাহিনীর ‘এস’ ফোর্সে, ৩ নম্বর সেক্টর এবং মিত্রবাহিনীর আখাউড়া-ব্রাহ্মণবাড়িয়া-ভৈরব অক্ষে অগ্রাভিযানের মাধ্যমে। ৩ থেকে ৫ ডিসেম্বর পরিচালিত এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে আখাউড়া মুক্ত হয়। ৭ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া মুক্ত করার পর ‘এস’ ফোর্সের ১১ ইস্ট বেঙ্গল এবং মিত্রবাহিনী আশুগঞ্জে আক্রমণ চালায়। ১০ ডিসেম্বর আশুগঞ্জ মুক্ত হয় এবং ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত ভৈরবে পাকবাহিনীকে অবরুদ্ধ রাখা হয়। অন্যদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে নরসিংদীর রায়পুরায় যৌথ বাহিনী কিছু সৈন্য হেলিকপ্টারযোগে মেঘনা নদী অতিক্রম করে অবতরণ করায়। ১১-১৩ ডিসেম্বরের মধ্যে যৌথ বাহিনী দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গলসহ ‘এস’ ফোর্স ও ৩ নম্বর সেক্টরের প্রায় সব সৈন্য মেঘনা পার হয়ে আসে। নরসিংদী থেকে যৌথ বাহিনী দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে ঢাকার দিকে অগ্রসর হয়। একটি বহর ঘোড়াশাল-পূবাইল-টঙ্গী রেলপথ ধরে অগ্রসর হয়। অন্যদিকে মিত্রবাহিনীর একটি কলাম নরসিংদী-তারাবো-ডেমরা সড়ক ধরে এবং ‘এস’ ফোর্স ও ৩ নম্বর সেক্টর বাহিনী নরসিংদী-ভোলতা-মোড়াপাড়া রোডে অগ্রসর হয়। ১৪ ডিসেম্বরের সকালেই যৌথ বাহিনী তারাবোতে পৌঁছে। তারাবো পৌঁছেই যৌথ বাহিনী ডেমরার পাকিস্তানি ডিফেন্স থেকে ব্যাপক আক্রমণের সম্মুখীন হয়। ১৪ ডিসেম্বর দিনের বেলা ‘এস’ ফোর্সের দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ৩ নম্বর সেক্টরের সৈন্যরা মুড়াপাড়ায় শীতলক্ষ্যা পেরিয়ে রূপগঞ্জ মুক্ত করে। সেখান থেকে এ বাহিনী বালু নদী পেরিয়ে ঢাকার পূর্বাংশ খিলগাঁও-বাসাবোর দিকে অগ্রসর হয়। এভাবেই মিত্রবাহিনী এবং ‘এস’ ফোর্স ঢাকা নগরীর আশপাশে সমবেত হতে থাকে।

যৌথ বাহিনী যখন পাকিস্তানি বাহিনীকে ঢাকার চারদিকে ঘিরে ফেলে, ঠিক সে মুহূর্তে ভারতের সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এস এইচ এফ জে মানেকশ অল ইন্ডিয়া রেডিও’র মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনীর উদ্দেশে এক ঘোষণা জারি করেন। এ ঘোষণায় তিনি পাকিস্তানি বাহিনীকে কালবিলম্ব না করে অস্ত্রসমর্পণের আহ্বান জানান। এ ঘোষণা সম্বলিত লিফলেট বিমানযোগে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর ওপর ফেলা হয়। এর পাশাপাশি তিনি পাকিস্তানিদের প্রতিবন্ধকতা উড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে তাদের প্রতিরক্ষাব্যূহের ওপর বিমান হামলা আরো জোরদার করার এবং এ হামলা ঢাকা শহরের ২০ মাইল সীমানা পর্যন্ত চালানোর নির্দেশ প্রদান করেন। এ পরিস্থিতিতে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ডা. এ এম মালেক এ অঞ্চলে শান্তিপূর্ণ উপায়ে একটি সমাধান বের করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। গভর্নরের সম্মতিক্রমে জেনারেল রাও ফরমান আলি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার মাধ্যমে জাতিসঙ্ঘ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অতিসত্বর যুদ্ধ বন্ধ করতে এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রস্তাব পাঠান। তিনি শান্তিপূর্ণ উপায়ে এবং সম্মানের সাথে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী এবং বেসামরিক নাগরিকদের উদ্ধার করার জন্য আহ্বান জানান। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানপূর্বক যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য নিয়াজিকে আদেশ জারি করেন এবং তিনি পূর্ব পাকিস্তানে বিদ্রোহ দমনে মার্কিন ও চীনের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের বিষয়টি কামনা করেন। জেনারেল নিয়াজি আবারো রাওয়ালপিন্ডি বরাবর ঢাকার সর্বশেষ করুণ অবস্থা জানিয়ে যুদ্ধবিরতির জন্য অনুমতি প্রার্থনা করেন। কিন্তু প্রতুøত্তরে তাকে জানানো হয়, নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশন চলছে এবং যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত বিষয়ের নিষ্পত্তি লক্ষ্যে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জাতিসঙ্ঘ প্রতিনিধি পূর্ব পাকিস্তান গিয়ে পৌঁছবে। উল্লেখ্য, রাশিয়ার ভেটো প্রয়োগের ফলে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশনে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব গৃহীত হয়নি। সময়ের সাথে সাথে ঘটনার দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে যেটা পাকিস্তান সরকার সঠিক সময়ে উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়। ঢাকা ও তার চারপাশে অনবরত গোলাবর্ষণ পাকিস্তানি বাহিনীকে পঙ্গু করে ফেলে এবং এ সময় যুদ্ধক্ষেত্রে পাকিস্তানি সৈন্যদের উদ্দেশে কোনো নির্দেশ পাঠানোর সুযোগটুকুও বন্ধ হয়ে যায়। ১৪ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভবনে (বর্তমানে বঙ্গভবন) গভর্নর ডা. এ এম মালেকের সাথে লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজি, মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি এ