- Home
- সালতামামী ২০০৭
- বিদায় ২০০৭
বিদায় ২০০৭
- By Article Poster
- Published 12/31/2007
- সালতামামী ২০০৭
- Unrated
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন, ‘পথে পথে ঝরা কুসুম ঝরায়ে/রিক্তশাখায় কিশলয় জড়ায়ে/গৈরিক উত্তরী গগনে উড়ায়ে/রুদ্ধ ভানের দুয়ার ঠেলে।’ বিদায় ২০০৭।
গত বছর বিশ্ব কী পেয়েছে কী হারিয়েছে তার চেয়ে বেশি হিসাব আমরা কী পেয়েছি। সময়ের সাথে বদলে গেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন বিষয়। জানুয়ারি পর্যন্ত রাজনীতি ছিল এক অনিশ্চয়তার মধ্যে। অধ্যাপক ড.
ক্ষমতা নেয়ার পর চলমান সরকার সংস্কার ইস্যু নিয়ে মাঠ গরম করে তোলে। দুই নেত্রীকে বাদ দেয়ার বিষয়ে সরকারের কোনো কোনো উপদেষ্টার স্পষ্ট বক্তব্য ছিল। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের কঠিনতম সময় পার করেছে এ বছর। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ফখরুদ্দীন সরকার ক্ষমতা নেয়ার পর তাদের সব ধরনের কার্যক্রমের বৈধতা দেয়ার কথা দিয়ে বিদেশ গেছেন। কিন্তু তার ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে সরকার তাকে ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে উল্লেখ করে দেশে না ফেরার পরামর্শ দেয়। পরে তিনি গ্রেফতার হন ঢাকায় আসার পর। একইভাবে গ্রেফতার করা হয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে। এর আগে বিএনপি’র বেশ কিছু শক্তিমান নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান দু’জনেই গ্রেফতার হন। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয় শেখ রেহানার বিরুদ্ধে। জিয়া ও মুজিব পরিবার কঠিন দুঃসময়ে পড়ে গত বছরে। এ সময় দল দু’টো বিপন্ন হয়ে পড়ে। বিএনপি দৃশ্যত দু’ভাগ হয়ে যায়। সংস্কারপন্থী বলে পরিচিত সাইফুর রহমান ও হাফিজ নয়া কমিটির চেয়ারে বসেন। খোন্দকার দেলোয়ার খালেদা জিয়া মনোনীত মহাসচিব হিসেবে সারাদেশের বিএনপি কর্মীদের কাছে জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে সমর্থ হন। জনপ্রিয়তা পায় গ্রেফতারের আগে বেগম জিয়ার টেলিকনফারেন্স। মান্নান ভূঁইয়া বহিষ্কার হয়েছেন এ বছর। বিএনপি অফিসে মূল ধারার নেতাদের ঢুকতে বাধা দেয় পুলিশ। সংস্কারপন্থীরা পুলিশ পাহারায় সেখানে যান। এখনো পুলিশের দখলে বিএনপি অফিস।
রাজনীতিতে নানা রকমের চড়াই-উতরাই চলছে। নেতৃত্বশূন্যতায় গেছে বাংলাদেশের গত বছর।
দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে সাবেকদের বিদায় করে দেয়া হয়।্ নতুন করে কমিশন ঢেলে সাজানো হয়েছে। সাজানো হয় সরকারের কর্মকমিশন। দুর্নীতির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। গ্রেফতারও করা হয় অনেককে। ছাড়া হয়েছে বেশ ক’জনকে।
গত বছর দেশের মূল্যস্ফীতি ভয়াবহ রকমের বেড়ে গেছে। এ সঙ্কট কাটাতে সরকার নানামুখী উদ্যোগ নেয়। এর মধ্যে বিডিআর’র মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যের বাজার বসায় সরকার। কিন্তু তাতে তেমন একটা উন্নতি হয়নি অবস্থার।
মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে প্রতিদিন। বছর শেষে সয়াবিন তেলের কেজিপ্রতি দাম ১০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। মোটা চালের কেজি ছাড়িয়ে গেছে ২৮ টাকার সীমানা। অথচ বছরের শুরুতে নাজিরশাইল চালের কেজি ছিল ২৫ থেকে ২৭ টাকা। এখন এটি ৪২ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। আটার কেজি এখন বিডিআর বিক্রি করছে ৩৯ টাকা।
পেঁয়াজের কেজি মাসখানেক আাগেও ছিল ৬০ টাকা। গ্রামের মানুষ তা কিনেছেন ৮০ টাকায়। দুধের কেজি এখন গ্রামেই ৪০ থেকে ৪৮ টাকা।
গত বছর ঘটে গেছে র্যাংগস ভবন ট্রাজেডি। কার্নিশ ধসে ১২ জন শ্রমিক মারা গেছেন। তাদের উদ্ধারে বেশ দেরি হয়েছে। এ নিয়ে ছিল সমালোচনা। ঘূর্ণিঝড় সিডরের তাণ্ডবে নিঃস্ব হয়েছে লাখ লাখ মানুষ। বন্যার কবলে পড়ে বিপর্যস্ত হয়েছে উত্তরবঙ্গের মানুষ। খাবারের দাম বৃদ্ধি, উৎপাদন হ্রাস আর প্রাকৃতিক দুর্যোগে নাস্তানাবুদ ছিল বাংলাদেশের মানুষ।
ক্যাম্পাস থেকে সেনাক্যাম্প তুলে নেয়ার দাবিতে আন্দোলন করে সরকারকে বিপাকে ফেলে দিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা । পরে এ সময় সরকার কারফিউ জারি করে তা কাটিয়ে ওঠে । এ সময় পুলিশের পিটুনি আর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। গ্রেফতার হয়েছেন অনেকে। এখন পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষক নেতা জেলহাজতে আছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দণ্ড দেয়ার পর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকারি আদেশে বন্ধ ছিল দেড় মাসের মতো।
লোকসানের কারণে খুলনার পাটকলগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বছরের শেষ দিকে এসে পুরাকীর্তি নিয়ে লেজে-গোবরে অবস্থা করে ফেলে সরকার। সরকারের শিক্ষা ও সংস্কৃতি উপদেষ্টা আইয়ুব কাদরী পদত্যাগ করেন। দু’টো বিষ্ণুমূর্তি খোয়া যাওয়া নিয়ে এখানো চলছে তোলপাড়।
এর মধ্যে সাফল্যের দুয়ার খুলেছে আমাদের টেলিকম শিল্প। এ বছর মোবাইলফোনের বিল উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। বছরের শেষ নাগাদ অননেটে সর্বনিু কলরেট মিনিটপ্রতি ২৫ পয়সা। বিটিটিবি’র বিল কমেছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সেবার প্রতি মনোযোগ দিয়েছে। হরতাল ও অবরোধমুক্ত ছিল নগর। দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে পেরেছে সরকার। আমাদের বিজ্ঞানী হুসসাম পেয়েছেন আন্তর্জাতিক পুরস্কার। গ্রামীণ শক্তিও পেয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকিৃত। নোবেলজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বছর জুড়েই ছিলেন বিশ্বে নন্দিত।
দেশে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করছে সরকার। ভালো সিনেমার নির্মাণ বেড়েছে্। বেড়েছে দর্শকও।
বাংলাদেশের সিনেমা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রদর্শিত হয়েছে। ‘স্বপ্নডানা’ আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতেছে। বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণে এসেছে বড় রকমের পরিবর্তন। গত বছর বাংলাদেশে এসেছিলেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত আমেরিকান জুনিয়র মিস নোরা আলি, পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, কবি জয় গোস্বামীসহ অনেক সংস্কৃতিজন। দেশে প্রথমবারের মতো হয়েছে অনাবাসী বাংলাদেশী সম্মেলন। এতে যোগ দিতে এসেছেন ২০০ জনের মতো অনাবাসী বাংলাদেশী।
বিশ্বরাজনীতিতে এ বছর ঘটেছে নানা রকমের ঘটনা। ইরানের পারমাণবিক বিষয়ে আমেরিকা তাদের পুরনো অবস্থানে থাকতে পারেনি। এখন তারা বলছে, ইরান পরামাণু অস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ রেখেছে।
ভারতের সাথে সম্পর্ক অব্যাহতভাবে ভালো ছিল আমেরিকার। চীন অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে এগিয়ে গেছে। ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরিতে সফল ছিল ইসরাইল। ফাতাহ ও হামাসের বিরোধ এখন প্রকাশ্য। শান্তি আলোচনা হয়েছে মধ্যখানে। সেটি ভেস্তে গেলে তারা নিজেরাই বিবাদে জড়িয়ে পড়ে।
ইসরাইল এখন ফাতাহকে সমর্থন করছে। আমেরিকাও কিন্তু হামাস ইন্তিফাদা থেকে সরে আসেনি। মুক্তির মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে।
আমেরিকার প্রকাশ্য সমালোচনায় বিশ্বে গত বছর মুখর ছিলেন আহমাদিনেজাদ। ইরানের এ প্রেসিডেন্টের সাথে একমত ছিলেন অনেকে। ফিডেল ক্যাস্ট্রো অসুস্থ হয়ে হসপিটালে ছিলেন অনেক দিন। এখনো সুস্থ নন তিনি। আমেরিকা তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ আনেন তিনি।
বড় রকমের সঙ্কটে পড়েছে এশীয় দেশ পাকিস্তান। সেখানে সর্বশেষ বেনজির হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এতে দেশটির অখণ্ডতা ও গণতন্ত্র যে হুমকির মুখে পড়েছে এ বিষয়ে সন্দেহ থাকছে না। মাস দুয়েক আগে বেনজির ও নওয়াজ দেশে ফিরেছিলেন। নওয়াজ এর আগে একবার দেশে ফেরার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
গত বছর ভারত রাজনৈতিক টানাপড়েনে পড়েছে কম। তবে অভ্যন্তীরণভাবে কংগ্রেস এখন বেশ চাপের মুখে আছে। সেখানের রাজ্য সরকারগুলোতে একের পর এক বিজেপি জিতে যাওয়ার কারণে এ চাপ। নন্দি গ্রামে সঙ্কট সহিংসতা সারাবিশ্বে আলোচনায় ছিল। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব বলেছেন, তারা সেখানে ভুল করেছেন। তসলিমা নাসরীনকে আশ্রয় দেয়া নিয়ে সে দেশে ব্যাপক বিতর্ক চলছে।
ভারতে কয়েক দফা আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। এতে মুসলিমরা হয়রানির শিকার হয়েছিলেন। কারণ এ সব হামলার পেছনে তাদের হাত থাকতে পারে বলে তদন্তের আগেই শঙ্কা প্রকাশ করে সেখানকার নিরাপত্তাকর্মীরা। নেপালে গণতন্ত্র ফিরছে। আফগানিস্তানে সঙ্কটে নতুন কোনো উত্তরণের খবর নেই। ইরানের মানুষের রক্ত চুষে নিচ্ছে বুশ।
এভাবেই ভালো-মন্দে ঘটনাবহুলতায় কেটে গেছে ২০০৭, যা আজ মহাকালের গর্ভে জন্য হারিয়ে যাবে। বিদায় ২০০৭, বিদায়!
**************************
লেখকঃ তারেক মোরতাজা
দৈনিক নয়াদিগন্ত, ৩১ ডিসেম্বর ২০০৭