National Events - http://events.amardesh.com
২০০৭ আন্তর্জাতিক টেনিসঃ রজার ফেদেরার না, রাজা ফেদেরার?
http://events.amardesh.com/articles/45/1/aaaa-aaaaaaaaaaa-aaaaaa-aaaa-aaaaaaa-aa-aaaa-aaaaaaa/Page1.html
Article Poster
 
By Article Poster
Published on 01/6/2008
 
অনেকেই বলেন ছেলেদের বর্তমান টেনিস ততটা রোমাঞ্চকর নয়। কারণ এটা আসলে এখন ‘ওয়ান ম্যান শো’ অর্থাৎ একজনেরই রাজত্ব হয়ে গেছে। টেনিসের সেই রাজাকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

২০০৭ আন্তর্জাতিক টেনিসঃ রজার ফেদেরার না, রাজা ফেদেরার?

অনেকেই বলেন ছেলেদের বর্তমান টেনিস ততটা রোমাঞ্চকর নয়। কারণ এটা আসলে এখন ‘ওয়ান ম্যান শো’ অর্থাৎ একজনেরই রাজত্ব হয়ে গেছে। টেনিসের সেই রাজাকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। রজার ফেদেরার। টেনিসে ২০০৭ সালটা ঘুরেফিরে ওই রজার ফেদেরারেরই বন্দনা-গীতি। না, এবারও রড লেভার ও ডন বাজের অমলিন রেকর্ডে (একই বছর চারটি গ্র্যান্ড ্লাম জয়) ভাগ বসাতে পারেননি ঠিক, তবে অস্ট্রেলিয়ান ওপেন, উইম্বলডন, ইউএস ওপেন এবং মাস্টার্স কাপ শিরোপা জিতে যথারীতি ফেদেরার-রাজ চালিয়ে গেছেন আগের মতোই।


মেয়েদের টেনিসে হঠাৎ আলোর ঝলকানি দেখিয়ে আগের বছর দুটি গ্র্যান্ড স্লামজয়ী অ্যামেলি মরেসমো হারিয়ে গেলেন ইনজুরির কারণে। তাঁর বদলে দেখা গেল জাস্টিন হেনিনের দ্যুতি। এই বেলজিয়ানের পাশাপাশি আবারও জ্বলে উঠতে দেখা গেছে উইলিয়ামস বোনদের। নিন্দুকদের সমালোচনা আর ইনজুরিকে কটাক্ষ হেনে ফিরে এসেছেন বিশ্ব টেনিসের গতির রানী ভেনাস ও সেরেনা উইলিয়ামস। দুটি গ্র্যান্ড ্লাম উঠেছে তাঁদের ঘরে। তবে বছরটা দুঃস্বপ্নের মতোই কেটেছে মারিয়া শারাপোভার। তৃতীয় রাউন্ডে এসেই লজ্জাজনক এক হারে খোয়াতে হয়েছে আগের বছর জেতা ইউএস ওপেনের শিরোপা। উঠে এসেছেন বেশ কিছু নতুন তারকা, দেখা গেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত সার্বিয়ানদের টেনিস-প্রীতি। গ্র্যান্ড স্লামের ফাইনালগুলো দেখেছে প্রথমবারের মতো আনা ইভানোভিচ, মারিয়ন বারতোলি এবং ইয়েলেনা জাঙ্কোভিচদের টেনিস প্রতিভা। রজার ফেদেরার ও রাফায়েল নাদালকে হারিয়ে রাতারাতি তারকা বনে গেছেন নোভাক জোকোভিচ। ফার্নান্দো গঞ্জালেস আর ডেভিড নালবান্ডিয়ানও ফেদেরার-নাদালকে হারানোর কাজটি করেছেন একাধিকবার।

মুখোমুখি লড়াইয়ে কোর্টে নেমে পড়েছিলেন দুই প্রজ্নের দুই কিংবদন্তি পিট সাম্প্রাস ও রজার ফেদেরার। ফেদেরারের কাছে ১-২ ব্যবধানে প্রদর্শনী সিরিজ হেরেছেন সাম্প্রাস, তবে টেনিস দুনিয়া তাতেই আরও একবার জানল, সাম্প্রাস সত্যিকারের যুগস্রষ্টা।

বাজিকর, ম্যাচ পাতানো আর ড্রাগের কালো হাত এগিয়ে এসেছে টেনিসের দিকেও। সব মিলিয়ে ঘটনাবহুল এক বছরই পার করলেন টেনিস তারকারা।


এটা সত্য যে, দুরন্ত গতিতে ছুটছে ফেড-এক্সপ্রেস আর ট্রফিতে উপচে পড়ছে তাঁর শোকেস। একে একে নাম তুলছেন রেকর্ডের সব পাতায়। এমনকি ফেদেরারকে টেনিস রেকর্ড বইয়ের ‘চলন্ত সংস্করণ’ বললেও মনে হয় বেশি বলা হবে না। সব সময়ই ‘প্রথম’ কিছু অর্জন করা ফেদেরার এবারও এর ব্যত্যয় ঘটাননি। বিয়ন বোর্গের ২৭ বছর পর প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে জিতলেন টানা পাঁচটি উইম্বলডন। ওপেন যুগের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে টানা চারটি ইউএস শিরোপাও উঠল তাঁরই হাতে। এক বছরে ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রাইজমানি জেতার কৃতিত্বও ফেদেরারের প্রথম। টেনিস কোর্ট থেকে মোট আয়ে এখনো পিট সাম্প্রাসের চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও শিগগিরই সামনে এগিয়ে যাবেন, এটি প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায়। কারণ সাম্প্রাসকে (৪৩ মিলিয়ন ডলার) টপকাতে ফেদেরারের জিততে হবে আর মাত্র পাঁচ মিলিয়ন ডলার। সাম্প্রাসের সবচেয়ে বেশি গ্র্যান্ড স্লাম জয়ের (১৪টি) রেকর্ডও যে হুমকির মুখে, সে তো না বললেও চলছে। এ জন্য ফেদেরারের প্রয়োজন আর তিনটি গ্র্যান্ড স্লাম। অন্য বছরগুলোর তুলনায় এবার তাঁকে কিছুটা ম্লান মনে হয়েছে তিনি শুধু ফেদেরার বলেই। নয়তো তাঁর এ বছরের জয়-পরাজয়ের রেকর্ডও (৬৮-৯) যেকোনো টেনিস খেলোয়াড়ের জন্যই স্বপ্নের মতো। ক্যারিয়ারে মোট ৫৩টি শিরোপা জিতে এ বছরই টপকে গেছেন টেনিস ইতিহাসের বাকি সবাইকে। টানা চতুর্থ বছরের মতো র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থেকে বছর শেষ করলেন তিনি। ২০০ সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থেকে গড়েছেন আরও একটি রেকর্ড। পেরিয়ে গেছেন টানা ১৬০ সপ্তাহ শীর্ষে থাকা জিমি কনোর্সের ৩০ বছরের পুরোনো কীর্তিকে।


ছেলেদের টেনিসে যেমন ফেদেরার, মেয়েদের টেনিসে তেমনি শাসন করেছেন জাস্টিন হেনিন। এ মৌসুমে রেকর্ড ১০টি শিরোপাজয়ী হেনিন বছরও শেষ করেছেন শীর্ষে থেকেই। জিতেছেন টানা তৃতীয় ফ্রেঞ্চ ওপেন। এক মৌসুমে প্রমীলা টেনিস খেলোয়াড়দের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রাইজমানিও (পাঁচ মিলিয়ন ডলারের বেশি) জেতা হয়ে গেল তাঁর। বছর শেষে তাঁর শোকেসে জমা পড়ল দুটি গ্র্যান্ড ্লামসহ (ফ্রেঞ্চ ওপেন ও ইউএস ওপেন) ১০টি শিরোপা। গত দশ বছরের মধ্যে মার্টিনা হিঙ্গিসের পর যে কৃতিত্বের দাবিদার শুধুই হেনিন। এবারের উইম্বলডন হারের পর মৌসুমের শেষ পর্যন্ত টানা ২৫টি ম্যাচ জিতে ১৮ বছর পুরোনো স্টেফি গ্রাফের রেকর্ডের পাশেও নাম লিখিয়েছেন। হেনিনের পর বছরটা নিজেদের করে নিয়েছেন ভেনাস ও সেরেনা উইলিয়ামস। বছরের শুরুতেই অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জেতেন সেরেনা আর উইম্বলডন নেন ভেনাস।


২০০৫ সালের ইউএস ওপেনজয়ী কিম ক্লাইস্টার্স অবসর নিয়ে বিয়ের পিঁড়িতেও বসেছেন। ক্যারিয়ারে দ্বিতীয়বারের মতো টেনিসকে বিদায় জানিয়েছেন মার্টিনা হিঙ্গিস। তবে যাওয়ার আগে কলঙ্কের কালি লাগিয়েছেন গায়ে। গত উইম্বলডনে তাঁর বিরুদ্ধে ড্রাগ নেওয়ার অভিযোগ ওঠার পরপরই তড়িঘড়ি করে অবসরের ঘোষণা দিয়ে বসেন সবচেয়ে কম বয়সে উইম্বলডন জেতা সুইস তারকা। এই বিদায়ের মাঝে নতুন করে আগমনী গান শুনিয়েছেন সাবেক নাম্বার ওয়ান লিন্ডসে ডেভেনপোর্ট। বালি ও কুইবেকে টুর্নামেন্ট জিতে প্রমাণ করেছেন ফুরিয়ে যাননি তিনি। পুরোনোদের ভিড়ে নতুন মুখ জাঙ্কোভিচ বাজিমাত করেছেন র‌্যাঙ্কিংয়ে আশাতীত উন্নতি করে। যদিও কোনো গ্র্যান্ড স্লাম জেতেননি এখনো, তবে আগামী বছর অনেকের জন্যই হুমকি হতে পারেন এই সার্ব। ২০০৬ সালের ইউএস ওপেন সেমিফাইনালিস্ট নিজেকে এ বছর আবিষ্কার করলেন সেরা খেলোয়াড়দের তালিকায়। আগেরবার ১২ নম্বরে বছর শেষ করা জাঙ্কোভিচ এবার নিজেকে তুলে এনেছেন তিনে।


কম যাননি ‘বন্ড গার্ল’ খ্যাত মারিয়ন বারতোলিও। উইম্বলডন সেমিফাইনালে হেনিনকে হারিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন এবার। যদিও বছর শেষের টুর্নামেন্টে মাদ্রিদে আসল হেনিনকে চিনেছেন হাড়ে হাড়ে। বারতোলিকে উড়িয়ে দিয়ে উইম্বলডন হারের প্রতিশোধ তো নিয়েছেনই, ফাইনালে উঠে হেনিন জিতেছেন বছরের দশম শিরোপা। টেনিসের বর্ষসেরা ম্যাচের স্বীকৃতি দেওয়া যায় ওই টুর্নামেন্টের ফাইনালকে। যাতে শারাপোভা হারলেও বুঝিয়ে দিয়েছেন খারাপ বছর কাটিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন সুন্দর আগামীর। জাস্টিন হেনিনের বিপক্ষে ঘাম ঝরিয়ে লড়েও হেরে গেছেন তিনি, তবে ইতিহাসে ঢুকে গেছে ম্যাচটি। ৩ ঘণ্টা ২৪ মিনিটের ওই ফাইনাল ছিল মেয়েদের টেনিসের দীর্ঘতম ফাইনালগুলোর একটি।


প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু হেনিন-শারাপোভার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ফেদেরার-নাদালের চিরায়ত বৈরিতার পাশে উঠে আসতে দেখা গেছে সার্ব তরুণ নোভাক জোকোভিচকে। র‌্যাঙ্কিংয়ে দুইয়ে থাকা নাদাল তাঁর বছর শেষ করেছেন ইন্ডিয়ান ওয়েলস, মন্টে কার্লো এবং রোমের মাস্টার্স সিরিজসহ ছয়টি শিরোপা জিতে। তবে ফেদেরারের বিপক্ষে লড়াইয়ে এবারের পরিসংখ্যান একটু ম্লান বৈকি। পাঁচবার মুখোমুখি হয়ে মাত্র দুবার জিতেছেন। তবে মোট পরিসংখ্যানে এখনো এগিয়ে (৮-৬) এই স্প্যানিয়ার্ড। টেনিস কোর্টে নানা রকম অঙ্গভঙ্গিতে দর্শকদের বিনোদন দেওয়ার চেষ্টা করে নতুন খেতাব ‘জোক ওভিচ’ জুটিয়েছেন নোভাক জোকোভিচ। এ বছর তাঁর জয়-পরাজয়ের রেকর্ড ৬৮-১৯। সাফল্যও ঈর্ষণীয়ঃ ক্যারিয়ারের সাত শিরোপার পাঁচটিই এসেছে এবার। অনেক টেনিস-বোদ্ধা তো এখনই বলতে শুরু করেছেন, ফেদেরার-নাদালের পথের কাঁটা হয়তো জোকোভিচই হতে পারেন আগামী বছর। এটা অসম্ভব নয়। কেননা এ বছরই যে কানাডিয়ান মাস্টার্স কাপে একে একে হারিয়ে দিয়েছেন র‌্যাঙ্কিংয়ের সেরা তিন খেলোয়াড় ফেদেরার, নাদাল ও অ্যান্ডি রডিককে। ১৯৯০ সালে বরিস বেকার স্টকহোমে যেটি করেছিলেন এ বছর তা নতুন করে মনে করিয়ে দিলেন ১৯ বছর বয়সী এই সার্ব। ক্যারিয়ারের প্রথম গ্র্যান্ড স্লাম ফাইনালে (ইউএস ওপেনের ফাইনালে) উঠে ফেদেরারকে প্রথম সেটে হারিয়ে রীতিমতো ভড়কে দিয়েছিলেন দর্শকদের। শেষ পর্যন্ত হারলেও চিনিয়ে দিয়েছেন নিজের জাত। চার নম্বরে থাকা রুশ নিকোলাই ডেভিডেঙ্কোকে খেলার চেয়ে উদ্বিগ্ন থাকতে হয়েছে ম্যাচ পাতানো কেলেঙ্কারির অভিযোগ মাথায় নিয়ে। গত আগস্টে পোল্যান্ডে একটি ম্যাচ ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগের তদন্ত চলছে এখনো তাঁর বিরুদ্ধে।


ভারতীয় তারকা সানিয়া মির্জা ইউএস ওপেন শুরুর আগে কয়েকটি টুর্নামেন্ট ভালো খেললেও গ্র্যান্ড স্লামে সেই পুরোনো চেহারায় দেখা গেছে তাঁকে। তবে হায়দরাবাদের এক মসজিদে শুটিং করা নিয়ে বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতিতেই পড়তে হয়েছে বছরের শেষ দিকে। টেনিসে ততটা নাম করতে না পারলেও সাবেক বিশ্ব সুন্দরী নাতালি গ্লেবোভাকে বিয়ে করে বছরের শেষ চমকটা উপহার দিয়েছেন থাইল্যান্ডের তারকা পারাদর্ন শ্রীচাপান।


২০০৭- গ্র্যান্ড স্লাম বিজয়ীরা
অস্ট্রেলিয়ান ওপেনঃ রজার ফেদেরার, সেরেনা উইলিয়ামস
ফ্রেঞ্চ ওপেনঃ রাফায়েল নাদাল, জাস্টিন হেনিন
উইম্বলডনঃ রজার ফেদেরার, ভেনাস উইলিয়ামস
ইউএস ওপেনঃ রজার ফেদেরার, জাস্টিন হেনিন


**************************
লেখকঃ বদিউজ্জামান মিলন
দৈনিক প্রথম আলো, ৩০শে ডিসেম্বর ২০০৭