১৯৭১ সালের মার্চ মাসে আমি চট্টগ্রামে অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের কোয়ার্টার মাস্টার হিসেবে কর্মরত ছিলাম। একজন তরুণ ক্যাপ্টেন হিসেবে যদিও রাজনীতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলাম না তবু গণতন্ত্রের প্রতি ছিল অগাধ শ্রদ্ধা। কারণ ছোটবেলা থেকে দেখেছি এ দেশের মানুষ ছিল গণতন্ত্রের পূজারী। এ ছাড়াও একজন সামরিক বাহিনীর অফিসার হিসেবে খুব কাছ থেকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মনোভাব প্রত্যক্ষ করেছি। দেখেছি কিভাবে সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বাঙালিদের ওপর অবিচার করা হতো। এ ছাড়াও সশস্ত্র বাহিনী এবং বিভিন্ন সরকারি চাকরিতে ছিল এক বিরাট বৈষম্য। পুরো অ্যাম্বাসি এবং বড় বড় অফিস অবস্থিত ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে। আক্ষরিক অর্থে হয়তো আমরা পাকিস্তানের একটি প্রদেশ ছিলাম। তবে বাস্তবিক অর্থে পূর্ব পাকিস্তান ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের একটি কলোনি। প্রায় সব ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বঞ্চনার শিকার হয়েছিল। এ বিষয়গুলো আমাদের কাছে খুব পীড়াদায়ক ছিল। কোনো অবস্থাতেই তাদের এ ধরনের আচরণ গ্রহণ করতে পারছিলাম না। যার কারণে পঁচিশে মার্চ রাতে সর্বপ্রথম অস্ত্র হাতে নিয়ে অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টকে সাথে নিয়ে সশস্ত্র বিদ্রোহ করি। তৎকালীন মেজর জিয়া ছিলেন আমাদের নেতা। পরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সেনাপ্রধান এবং রাষ্ট্রপতি, যে আদর্শ, উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য নিয়ে অস্ত্র হাতে নিয়েছিলাম আজকে সাঁইত্রিশ বছর পরও তা অর্জিত হয়নি। শতাধিক লুণ্ঠনকারী রাজনীতিবিদের হাতে ছিল জনগণ জিম্মি। সৎ, নিষ্ঠাবান, দক্ষ এবং অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদরা ছিল তাদের হাতে জিম্মি।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করেছেন। তবে কিছু কিছু কর্মকাণ্ডের জন্য মাঝে মাঝে হতাশা নেমে আসে। মনে হয় যেন আমরা অনেক ফ্রন্টে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছি। সব ফ্রন্টে যুদ্ধে জেতা সম্ভব না-ও হতে পারে। তবে শেষ ভালো যার সব ভালো তার। এই আত্মবিশ্বাস নিয়ে বসে আছি। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি আল্লাহ যেন সত্যিকার অর্থে শুধু দুর্নীতিবাজ নয়, বেঈমান, মোনাফেক, মিথ্যাবাদী, সন্ত্রাসী এবং চাঁদাবাজদের হাত থেকে দেশের ৯৫ শতাংশ গরিব জনসাধারণকে মুক্ত করে। এ ছাড়াও আশা করি বর্তমান সরকার খুব বিলম্বিত না করে জনগণকে আশার আলো দেখাবে।
বর্তমান বাংলাদেশের সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় আমাদের খুঁজে বার করতে হবে। তবে উত্তরণের উপায় খুবই সহজ। রক্ষক যদি ভক্ষক না হয় ভয়ের কোনো কারণ থাকে না। আমার কর্মকাণ্ডে যদি আমি সন্তুষ্ট থাকি নিশ্চয় আল্লাহ আমাকে সাহায্য করবেন। দেশকে উন্নতির পথে এগিয়ে নেয়ার জন্য সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই একমাত্র রক্ষাকবচ। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কোনো বিকল্প নেই। তবে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে বিতর্কিত রাজনীতিবিদরা যেন আবার রাজনীতির মঞ্চে ফিরে না আসে। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে যেমন দায়িত্ব পালনের বিষয় রয়েছে, অনুরূপভাবে দেশের জনগণকেও লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে উঠে দলমত বিচার না করে শিক্ষিত, সৎ, দক্ষ, অভিজ্ঞ ও দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদদের নির্বাচিত করার জন্য চিহ্নিত করতে হবে। তবে দুঃখের বিষয় হলো এখনো পর্যন্ত সে লক্ষণ দেখছি না। হয়তো আমার দেখার মধ্যে ভুলও হতে পারে। আশা নিয়ে আমরা বেঁচে আছি। আগামী দিনগুলো সুন্দর হবে। মানুষ ন্যায়বিচার পাবে। গরিব জনসাধারণের অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে বুকভরা এ আশা নিয়ে একজন ক্লান্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বেঁচে আছি। সত্যের জয় অনিবার্য। পবিত্র কুরআন শরিফে আল্লাহ আমাদের এ নিশ্চয়তা দিয়েছেন। আল্লাহই হলেন মহাপরাক্রমশালী। আর আমরা তার ক্রীতদাস। তাই বলি রজনী ধীরে চলো।
মাত্র এক মাস আগে বিচার বিভাগ স্বাধীন হয়েছে। সুতরাং এখনো সময় আসেনি এ ব্যাপারে মন্তব্য করার। তবে কয়েক দিন আগে দেখেছি আইন উপদেষ্টা বলেছেন, বিতর্কিত বিচারকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। দেখা যাক কী হয়। তবে বিচার প্রক্রিয়ায় অনেক গতি সঞ্চারিত হয়েছে। একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ এবং মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আশা করব বিচারকরা ফরিয়াদকারীদের দুনিয়ার শেষ ভরসার স্থল কলঙ্কিত করবেন না। সরকারের উচিত হবে প্রধান বিচারপতির সাথে বসে সবার জবাবদিহিতা কিভাবে নিশ্চিত করা যায় সে ব্যবস্থা করা। অনেক সময় আমরা দেখেছি ১০-১৫ বছর পরও মামলার নিষ্পত্তি হচ্ছে না। অথচ কোনো সভ্য দেশে ৬ মাসের বেশি কোর্টে মামলা থাকে না। মামলার নিষ্পত্তি করা হয়। সুষ্ঠু পদক্ষেপ এবং নিয়ম-পদ্ধতিগুলো ঠিক রাখলে পদস্খলনের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে যায়।
শুধু রাজনীতিবিদ নন, সামগ্রিকভাবে যেন দেশের জনগণ আশা করে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ এবং সাথে সাথে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা হলে বিভিন্ন স্তরের নিয়োজিত বিচারকরা আরো মুক্ত এবং স্বাধীনভাবে ন্যায়বিচার করতে পারবেন। দুর্নীতিবাজরাও ভয়ে থাকবেন। অন্যদিকে রাজনীতিবিদ বা সাধারণ জনগণও হয়রানির শিকার হবেন না। বর্তমান নির্বাচন কমিশন এবং অস্থায়ী সরকার অনেক সুন্দর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এ বিষয়গুলোর আরো অধিকতর বিস্তৃতি না ঘটিয়ে পরিসমাপ্তির দিকে অগ্রসর হওয়া উচিত। কারণ জনসমর্থন ও জনগণের মনোভাব সরকারকে সঠিকভাবে বুঝতে হবে। মূল্যায়ন করতে হবে। রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন নির্ভর করবে আগামী দিনে দেশের প্রধানমন্ত্রী কে হচ্ছেন তার ওপর এবং তার সহকর্মীদের ওপর। এ ব্যাপারে বর্তমান সরকারও কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু কিছু ভূমিকা রাখতে পারে। এ দেশে জোর করে জনগণকে দিয়ে সাফল্য অর্জন করা যায়নি। গত সাঁইত্রিশ বছরে এটিই আমার অভিজ্ঞতা।
নেতৃত্বের দুর্বলতা এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ওপর আস্থাহীনতার কারণে আমরা অনেক সময় বিদেশীদের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে যাচ্ছি। পৃথিবীর অনেক দেশে রাষ্ট্রদূত তো দূরের কথা এমনকি তাদের নিজের দেশের মন্ত্রীদের নামও জানেন না। আর আমাদের দেশে কথায় কথায় সবাই নাক গলাতে চান। এ ব্যাপারে শুধু সরকারগুলোকে দোষারোপ করলে হবে না। দেশের শিক্ষিত সমাজকেও দালালির মনোভাব পরিহার করতে হবে। এ ক্ষেত্রে গরিবদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে প্রার্থনা করি তিনি যেন এ দেশের লাখ কোটি মুক্তিযোদ্ধার এবং গরিব জনসাধারণের ফরিয়াদ কবুল করেন। তিনিই অন্তর্যামী। আমি বিশ্বাস করি হয়তো কিছু দুঃখদুর্দশার পর আগামী দিনগুলো খুবই সুন্দর হবে। এবার বিজয় দিবসের প্রাক্কালে দেশের মধ্যে অনেক প্রশ্নের অবতারণা হয়েছে এবং বহু বছর পর জরুরি অবস্থার মধ্যে বিজয় দিবস পালিত হবে। রাজনীতি বন্ধ থাকার কারণে জনগণের মনের আনন্দের বহিঃপ্রকাশ কতদূর ঘটবে জানি না। তবে দেশের মানুষ খুব বেশি আনন্দে নেই। অনেকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। কারণ দ্রব্যমূল্য। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা না আসা পর্যন্ত জনগণের এবং ব্যবসায়ীদের হতাশা কত দূর দূর হবে আমি জানি না।
************************
লেখকঃ ড. কর্নেল অলি আহমদ বীরবিক্রম অবঃ
দৈনিক নয়াদিগন্ত, ১৬ ডিসেম্বর ২০০৭