বাঙালি উৎসবপ্রিয় জাতি। আর্থিক দিক দিয়ে বাঙালি (বলতে কৃষক) চিরকাল দরিদ্র। দারিদ্র্য সত্ত্বেও তার মুখের হাসি কখনো মিলায় না। সুযোগ পেলেই সে উৎসবে মাতে। বাংলাদেশে বারো মাসে তেরো পার্বণ। তেরোর বাইরেও বাঙালি বহু পার্বণ বা উৎসবের দিন তৈরি করে নিয়েছে। বাংলাদেশে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মিলে বছরে কতটি দিবস যে পালিত হয় তার হিসাব নেই। প্রতিপালিত দিবসগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-ভাষা বা শহীদ দিবস (২১শে ফেব্রুয়ারি), স্বাধীনতা দিবস (২৬ মার্চ), পহেলা বৈশাখ (১৪ এপ্রিল), মে দিবস (১ মে), শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস (১৪ ডিসেম্বর) ও বিজয় দিবস (১৬ ডিসেম্বর)। এসব দিবসের মধ্যে ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে জাতিসংঘ কতৃêক স্বীকৃতি পেয়েছে।
বাঙালি কর্তৃক প্রতিপালিত দিবসগুলোর মধ্যে স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। বাঙালি একটি প্রাচীন জাতি। ছয় হাজার বছর আগে মানবজাতি সভ্যতা গড়ার স্তরে এসে উপনীত হয়। পৃথিবীর কয়েকটি এলাকায় সভ্যতার উদ্ভব ঘটে; যেমন-ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদীর অববাহিকায় মেসোপটেমীয়, নীল নদের তীরে মিসরীয়, সিন্ধু নদের তীরে মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পা এবং ইয়াং সিকিয়াং নদীর তীরে চৈনিক সভ্যতা। বাংলাদেশেও যে ছয় হাজার বছর আগে একটি নগর সভ্যতা গড়ে উঠেছিল তা আবিষ্কৃত হয়েছে মাত্র গত শতকের শেষ পাদে। ১৯৭৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের অজয় নদীর তীরে রামগড় সিজুয়ায় উৎখনন করে পাওয়া গেছে পান্ডুরাজার ঢিবি। মাটি খুঁড়ে সেখানে যে নগরটি বেরিয়েছে তা পরিকল্পিত একটি নকশা বা মাষ্টার প্ল্যান অনুসরণ করে তৈরি। মহেঞ্জোদারোর মানুষের মতো পান্ডুরাজার ঢিবির মানুষও তামার ব্যবহার জানত এবং মাতৃকা দেবীর পুজা করত। বাংলাদেশে তামার খনি ছিল। বাংলাদেশের একটি বন্দরের নাম ছিল তাম্রলিপি। সিন্ধুতে তামার খনি ছিল না। এর থেকে বাঙালি পন্ডিতরা দাবি করেন, তামা যুগের নগর সভ্যতা বাংলাদেশ থেকে সিন্ধুর দিকে গেছে, সিন্ধু থেকে বাংলায় আসেনি। অতএব, উপমহাদেশে বাংলাদেশই সভ্যতার আদিভুমি। আদি সভ্যতা ছাড়াও আদিম মানুষের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া গেছে এ দেশে। পৃথিবীর প্রথম যুগের মানুষের চোয়ালের একটি হাড় পাওয়া গেছে মেদিনীপুরে। পশ্চিমবঙ্গের বহু জায়গাজুড়ে মানুষের ব্যবহার করা জিনিস ও যন্ত্রপাতি পাওয়া গেছে। এর থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশে মানবজাতির বসতি কত প্রাচীন।
বাঙালি সুপ্রাচীন জাতি ও প্রথম সভ্য জাতিগুলোর একটি হলেও বাঙালি একটি পৃথক স্বাধীন জাতি হিসেবে কখনো গড়ে ওঠেনি। বাংলাদেশ মহাভারতের কাল (খ্রি. পুর্ব ১৫০০-৫০০) থেকে একের পর এক যেসব রাজ্য/সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল সেগুলো হলো-১. শিবি ও চেত (খ্রি. পুর্ব ৫০০-৩০০), ২. আলেকাজান্ডারের ভারত আক্রমণকালে গঙ্গাহৃদয় বা গঙ্গারিদি ও প্রাচী (গ্রিক উচ্চারণে গংগারিদায়ে ও প্রাসাই) (খ্রি. পুর্ব ৩২৫), ৩. মৌর্য (খ্রি. পুর্ব ৩০০-২০০), ৪. গুপ্ত (৪র্থ খ্রিষ্টাব্দ) এ যুগে আর্যধর্ম ও সংস্কৃতি বাংলাদেশে বিস্তার লাভ করে। রাজশক্তির প্রয়োজনে ব্রাহ্মণদের বাংলায় আনা হয়, ৫. বাঙালির নিজস্ব রাজতন্ত্র (ষষ্ঠ শতকের প্রথমার্ধ), ৬. সাধারণতন্ত্র (৭৩৫-৭৫০ খ্রি. বাঙালি নেতা ভবাস্ব-র নেতৃত্বে), ৭. অরাজকতা বা মাৎস্যান্যায় (১০০ বছর, দশম শতাব্দী), ৮. পাল বংশ (১১ শতক। এ যুগে বাংলা লিপি ও বাংলা সাহিত্যের আদিরুপঃ অবহট্ট, চর্যাপদ ও পুর্ব ভারতীয় শিলনকশার উদ্ভব দ্বারা ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতি গঠনের প্রাথমিক কাজ শেষ হয়), ৯. কৈবর্ত্য বিদ্রোহ (১০৭০-১০৭৫), ১০. সেন বংশ (দ্বাদশ শতাব্দী। সেনরা কর্ণাটক থেকে আসেন। তারা বেদজ্ঞ ও যাজ্ঞিক ব্রাহ্মণ আমদানি করেন। ব্রাহ্মণের সঙ্গে ভৃত্য ও অনুচর হিসেবে আসে বৈদ্য ও কায়স্হ। এদের জমি দেয়া হয়। এদের নিয়ে একটি অভিজাত সমাজ সৃষ্টি করে কৌলিন্য প্রথা চালু করা হয়। ব্রাহ্মণ ছাড়া সবাইকে শুদ্র ও সংকর বলা হতে থাকে। বাংলার বর্ণ হিন্দুরা সেন যুগকে তাদের ইতিহাসের আরম্ভকাল বলে ধরেন); ১১. সুলতানি আমল (১৩ ও ১৪ শতক। এ যুগের শ্রেষ্ঠ শাসক হলেন হুসেন শাহ (১৪৯৩-১৫১৯)। তিনি বাংলাদেশকে প্রথম বাংলাদেশ করেন এবং বাংলা ভাষাকে করেন বাংলাদেশের। তিনি রামায়ণ, মহাভারত, রৌরব নরকে যাওয়ার ভয় দেখানোসহ ব্রাহ্মণদের প্রবল প্রতিরোধ সত্ত্বেও, বাংলায় অনুবাদ করান। বাঙালি জাতি গঠনে তার অবদান সব থেকে বেশি), ১২. পাঠান আমল (১৫৩৯-১৫৭৬ খ্রি.), ১৩. মোগল আমল (১৫৭৬-১৭৫৭ খ্রি.), ১৪. ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল (১৭৫৭-১৯৪৭)। ব্রিটিশ হলো ইউরোপীয় একটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। ব্রিটিশরা হিন্দুস্হান বা ভারতে এসে মোগল সাম্রাজ্য দখল করে নেয়। সাম্রাজ্য ও সাম্রাজ্যবাদ কথাটা শুনতে কাছাকাছি হলেও দুটোর মধ্যে ফারাক বিস্তর। সাম্রাজ্য হলো সামন্ত সমাজ গঠনের একটি রুপ, বলা চলে সর্বোচ্চ রুপ। অনেক সামন্তকে শক্তিবলে বশীভুত করে তাদের পুরো এলাকার কর্তৃত্ব যিনি নিতে পারেন তিনি হলেন সম্রাট। তার অধীনস্হ সব রাজ্য হলো তার সাম্রাজ্য। অন্যপক্ষে, সাম্রাজ্যবাদ হলো পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ বিকশিত রুপ। পুঁজি যখন বেড়ে লগ্নিপুঁজিতে পর্যবসিত হয় তখন পরদেশ গ্রাস করা ছাড়া তার আর উপায় থাকে না। গ্রাস করা দেশগুলো হয় পুঁজির বন্দি বাজার বা উপনিবেশ। উপনিবেশ থেকে পানির দরে কাঁচামাল সংগ্রহ ও তৈরি করা মাল উপনিবেশে একশ’ থেকে হাজার গুণ বেশি দরে বিক্রি করে দু’দিক থেকে মুনাফা অর্জন এবং উপনিবেশে বাড়তি পুঁজি (বর্তমানে মাইক্রো ক্রেডিট আকারে) চড়া সুদে লগ্নি করে বিনা শ্রমে সুদসহ আসল উসুল, এই অবস্হা যখন দাঁড়ায় তখন তাকে বলা হয় সাম্রাজ্যবাদ যা পুঁজিবাদের বা বাজার অর্থনীতির সর্বোচ্চ বিকশিত রুপ। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কবলে পড়ে বাংলাদেশের কৃষি ও শিল্প, যা ব্রিটেনের চেয়ে অগ্রসর ও উন্নত ছিল, সম্পুর্ণ ধ্বংস হয়। ব্রিটিশ শাসনের একমাত্র ইতিবাচক দিক হলো বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিপুল বিকাশ এবং বাংলা সাহিত্যের মান আন্তর্জাতিক স্তরে (রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে) উঠে যাওয়া। ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক শিক্ষা পেয়ে বাঙালির ক্ষুদ্র একটি অংশ পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানভিত্তিক নানা বিদ্যালাভের সুযোগ পায়। পায় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ধারণা, যার জন্য তারা ব্রিটিশবিরোধী ও পরবর্তীকালে পাকিস্তানি অপশাসন ও শোষণবিরোধী সংগ্রামের সুচনা করতে পারে। ১৫. পাকিস্তান আমল (১৯৪৭-১৯৭১ খ্রি.)। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ এবং পেশা বিচারে এবং সম্পদ সৃষ্টির দিক থেকে কৃষক হলো বাংলাদেশের গরিষ্ঠ সম্প্রদায়। কিন্তু এই কৃষক মহাভারতের কাল থেকে ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত তার উৎপাদিত সম্পদ ভোগ করতে পারেনি। বর্ণ প্রথায় কৃষক ছিল বর্ণ-বহির্ভুত অতি নিচু স্তরের মানুষ। উচ্চ বর্ণের লোকেরা তাদের মনে করত মানবেতর, অচ্ছুৎ। তাদের উৎপাদন আত্মসাৎ করা ছাড়া (অর্থাৎ শোষণ করা ছাড়া) তাদের কাছে কৃষকের অন্য কোনো মুল্য ছিল না। পাকিস্তানের ডাক যখন এলো তখন বঙ্গ দেশের কৃষক তাতে শোষণ মুক্তির ও আত্মোন্নয়নের আভাস দেখতে পেয়ে পাকিস্তানের পক্ষে রায় দিয়ে বসল। এটা ছিল তাদের জন্য একটি প্রতিবাদী কিন্তু প্রচন্ড ক্ষোভ প্রসুত সিদ্ধান্ত; যেহেতু বাঙালি কৃষকের মধ্য থেকে তখন পর্যন্ত (১৯৪৭) একজন বিপুল প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, উচ্চপদের আমলা, সামরিক বাহিনীতে তাদের সদস্যত্ব ও উচ্চ পেশাজীবী বলতে কেউ ছিলেন না। ফলে, পাকিস্তান হলে, বাঙালি গরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান রাষ্ট্রের কোথাও স্হান পেল না। নিম্নবর্ণের কৃষিজীবী বলে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ও (পশ্চিম পাকিস্তান তথা পাঞ্জাবের) লোকেরা তাদের প্রচন্ড ঘৃণা করত, রেখে-ঢেকে নয়-প্রকাশ্যে। তাই পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাঙালি গরিষ্ঠ হয়েও রাষ্ট্রযন্ত্রের কোথাও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীর ভুমিকা পেল না। তাতে যা হওয়ার তাই হলো। পুর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশের অর্থে গড়ে উঠতে থাকল পাকিস্তানের প্রথম রাজধানী করাচি, দ্বিতীয় রাজধানী পিন্ডি ও শেষে চুড়ান্ত রাজধানী ইসলামাবাদ। রাজধানী ছাড়াও বাংলাদেশের অর্থে গড়ে উঠল লাহোর, মুলতান, গুজরানওয়ালা ও ছোট-বড় অনেক শিল্প শহর। পুর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বাংলাদেশ টিকে থাকল তাদের বন্দি বাজার বা উপনিবেশ হয়ে। পাকিস্তানের উন্নয়নের জন্য হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রেরিত অর্থনীতিবিদদের পরামর্শে রবার ব্যারন বা ডাকু অভিজাত বলে যে অধিকোটিপতিদের গোষ্ঠী গড়ে তোলা হয় সেই ২২ পরিবারের এক পরিবারও বাঙালি ছিল না। এই হিমালয়প্রমাণ বৈষম্য ও অন্যায্যতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষিত পেটি বিত্তবানরা সোচ্চার হতে থাকে। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে তারা, বিশেষত কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ, দীর্ঘ ২৩ বছর লাগাতার সংগ্রাম করে। বাংলা ভাষাকে রক্ষার জন্যও তাদের প্রাণ দিতে হয় (একুশে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২)। ভাষা রক্ষার লড়াই দিয়ে শুরু হয় তাদের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম। রক্তাক্ত দীর্ঘ সংগ্রামের (শেষের নয় মাস ছিল মাত্রাতিরিক্ত রক্তক্ষয়ী) পর পাকিস্তানি অপশাসনের হয় অবসান (ডিসেম্বর ১৬, ১৯৭১)। ঘাড়ে চেপে থাকা হানাদারমুক্ত হলেও বাংলাদেশে ওইদিন থেকে শুরু হয়ে যায় ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও স-৭ (জি সেভেন)-এর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা।
ইতিহাসের দিকে নির্মোহভাবে তাকালে দেখা যায়, জাতি হিসেবে বাঙালি কখনো স্বতন্ত্রভাবে স্বাধীন ছিল না। ভারতবর্ষে জাতি-উপজাতির শেষ নেই। শেষ নেই অসংখ্য রাজ্য ও জনপদের। কিন্তু সবটা মিলেই মহাভারত বা ভারতবর্ষ। এই মহাভারতের একটি রাজ্য ও জনপদও স্বতন্ত্রভাবে স্বাধীন ছিল না। আজ মহাভারত প্রধানত তিনটি স্বাধীন রাষ্ট্রে বিভক্ত। এই বিভক্তির কারণ ব্রিটিশের বিভেদের কুটনীতি ও উপমহাদেশের অধিপতিগোষ্ঠীর ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, মুল দ্বন্দ্ব ধনী-গরিবের দ্বন্দ্বটিকে আড়াল করে তাকে নিষ্ক্রিয় করে রাখতে। ১৪-১৫ আগষ্টের মতো উপমহাদেশের অধিপতিগোষ্ঠীর দ্বন্দ্বেরই একটি পরিণাম হলো ষোলই ডিসেম্বর। তাদের দ্বন্দ্বের ফলেই সহজে অর্থাৎ মাত্র নয় মাসে বাংলাদেশের একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ হয়। এর মধ্যে তৎকালীন দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রকাশ্য দ্বন্দ্বও ক্রিয়াশীল ছিল। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল আপত্তি ছিল। এই আপত্তির মুখে ভারতের পুর্ব পাকিস্তান দখল করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব ছিল না। এজন্য ইন্দিরা গান্ধী প্রথমে সম্মতি আদায় করতে ওয়াশিংটন গিয়েছিলেন। নিক্সন ইন্দিরার প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দেন। কিসিঞ্জার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখেছেন-ইন্দিরা নিক্সনের কক্ষ থেকে নিষ্ক্রান্ত হওয়ার পর ইন্দিরাকে উদ্দেশ করে নিক্সন এমন সব উক্তি করতে লাগলেন যা ছাপার অক্ষরে প্রকাশ করা যায় না।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে রুঢ় প্রত্যাখ্যান পেয়ে ইন্দিরা গান্ধী গেলেন মস্কো। ব্রেজনেভ তাকে আশ্বস্ত করলেন; যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় বাধা দিলে সোভিয়েত ইউনিয়ন সেটা সামলাবে। মস্কো থেকে ফিরে ইন্দিরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী ও মুক্তিসেনারা ভারতীয় বাহিনীকে সহায়তা না দিলে যুদ্ধ এত সংক্ষিপ্ত হতো না। ভারতীয় বাহিনীকে ঢাকা পর্যন্ত এগিয়ে আনে বাঙালি মুক্তিযোদ্ধারা। যৌথ কমান্ডের কথা বলা হলেও, পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখিয়ে, ভারতীয়রা বাঙালিদের বাদ দিয়ে, নিয়াজির আত্মসমর্পণ দলিলে কেবল নিজেরা স্বাক্ষর করে। নিচু জাতের বাঙালির কাছে আত্মসমর্পণে পাকিস্তানিদের ঘোর আপত্তি ছিল; এক পাঞ্জাবির অন্য পাঞ্জাবির হাতে ধরা দিতে লজ্জা ছিল না। এরপর ইন্দিরা গান্ধী ‘মুক্ত’ দেশে ‘সোনার বাংলা তৈরির জন্য’ কলকাতার মুজিবনগর সরকারকে দিনকয়েক পর বিমানযোগে ঢাকা এনে গদিতে বসিয়ে দেন।
ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ভারতীয়দের কাছে পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের সংবাদ শুনে সারা বাংলাদেশ, নয় মাস যুদ্ধের অনেক বেদনাদায়ক ঘটনার শিকার হওয়া সত্ত্বেও, উল্লাসে ফেটে পড়ে। তাদের এ উল্লাস দেখে পলায়নপর পাকিস্তানি সৈন্যরা তাদের প্রতি গুলি ছুড়লে অনেকে নিহত ও বহু লোক হয় আহত। তার দু’দিন আগে ১৪ ডিসেম্বর আলবদররা (জামায়াতে ইসলামীর বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ঘাতক দল) রাতের অন্ধকারে ও দিনদুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামজাদা শিক্ষকসহ বহু বুদ্ধিজীবীকে ধরে নিয়ে গিয়ে অত্যন্ত নির্মম পদ্ধতিতে খুন করে। রায়েরবাজারের নিম্নভুমিতে জলকাদার মধ্যে তাদের হাত-পা-চোখ বাঁধা লাশ পড়ে থাকতে দেখে মানুষের বিজয় উল্লাস থেমে গিয়ে কান্নায় পরিণত হয়।
মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (তিনি নিজেকে ফার্সি উচ্চারণে মজিবর রহমান বলতেন, যেমন খালিদ নামধারীরা নিজেদের খালেদ, কাদির নামধারীরা নিজেদের কাদের বলে ডেকে থাকেন) পাকিস্তানের কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে লন্ডন ও দিল্লি হয়ে ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২ ঢাকায় ফেরেন। ঢাকায় ফিরে তিনি বাংলাদেশের সব জায়গা থেকে ভারতীয়দের সম্পদ অপসারণের সংবাদ পান। তিনি বুঝতে পারেন, বাঙালি পেটি বুর্জোয়ার স্বাধীনতা অর্জন আসলে পাকিস্তানের ফুটন্ত কড়াই থেকে ভারতের প্রজ্বলিত অগ্নিকুন্ডে ঝাঁপিয়ে পড়ার সমান হয়েছে। তিনি এ অবস্হা মেরামতের জন্য তৎক্ষণাৎ উদোগী হন। এর প্রথম ধাপ হিসেবে তিনি ফেব্রুয়ারিতে লাহোরে অনুষ্ঠিত ওআইসি সম্মেলনে যোগ দেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ, জোটনিরপেক্ষ সম্মেলন ও কমনওয়েলথ সম্মেলনে যোগ দিয়ে তিনি বাংলাদেশের পরিস্হিতি ব্যাখ্যা করেন। এরপর তিনি ইন্দিরা গান্ধীকে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্য ফেরত নিয়ে যেতে অনুরোধ করেন। ইন্দিরা গান্ধীও খবর পান, বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় বাহিনীর নির্বিচারে সম্পদ অপসারণের কারণে মুক্তিযোদ্ধারাও অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। কাশ্মীর নিয়ে ভারত সরকার ও ভারতীয় বাহিনী ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে ঘোর বিপদের মধ্যে থাকায় তারা বাংলাদেশে সৈন্য রেখে আরেকটি বিপদের মধ্যে নিপতিত হওয়া এড়াতে বাংলাদেশ থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চের আগে ২৪ মার্চ তারা শেখ সাহেবকে স্যালুট দিয়ে বাংলাদেশ ত্যাগ করে চলে যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে সংহত করতে এরপর শেখ মুজিব ইন্দিরার সঙ্গে গঙ্গার পানি ও সীমান্ত নিয়ে যেসব বিরোধ ছিল তার সুরাহা করে একটি চুক্তি করলেন; যাতে বাজে অজুহাত দেখিয়ে ভারত বাংলাদেশের ওপর হস্তক্ষেপ করতে না পারে। শেখ সাহেব চুক্তি করে গেলে কী হবে, বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে ভারত চুক্তি মেনে চলছে না।
বাংলাদেশবিরোধী পরাশক্তি বাংলাদেশ আন্দোলন করার জন্য শেখ সাহেবের ওপর নাখোশ ছিল। এ কারণে শেখ সাহেবকে সপরিবারে ও সআত্মীয় নিহত হতে হলো। শেখের রঙ্গমঞ্চ থেকে বিদায় নেয়ার পর বাংলাদেশ ফের বাজার অর্থনীতির উপনিবেশে পরিণত হয়েছে। ভারতও ইতোমধ্যে তার অবস্হান ঠিক করে নিয়েছে; বাংলাদেশ হয়ে গেছে ভারতের প্রায় একচেটিয়া বাজার। অসম বাণিজ্যে ভারত থেকে কেবল মাল আসছে। বাংলাদেশ থেকে, ভারতের প্রয়োজন না থাকায়, ভারতে পণ্য যাচ্ছে না বললেই চলে। এটাই হলো আপাতত ঘুরপাকে পড়া বিজয়ের চৌহদ্দি। বাংলাদেশে শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষা যা আত্মরক্ষার রক্ষাকবচ, ইদানীং তছনছ হয়ে যাওয়ায় কৃষকের অর্থাৎ বাঙালি জাতির মুক্তির স্বপ্ন স্বপ্ন হয়েই থাকল। ষোলই ডিসেম্বরের আনন্দ এখন আনুষ্ঠানিকতার বেশি নয়।
**************************
লেখকঃ আবদুল মতিন খান
দৈনিক আমারদেশ, ১৬ ডিসেম্বর ২০০৭