মাধবপুর পতনের পর পাকিস্তানিরা আমাদের পেছনে মারাত্মকভাবে তৎপর হয়ে ওঠে। চুনারুঘাট-ইটাখোলা সড়ক উন্মুক্ত করার জন্য দারুণ তোড়জোড় শুরু করে। এ সড়কের ওপর রয়েছে আমার সদর দফতর এবং তা রক্ষা করার জন্য সুরমা চা বাগানের দক্ষিণে আমি অনিয়মিত একটি কোম্পানিকে মোতায়েন করি। মাধবপুর প্রত্যাগত মতিনের কোম্পানি এর সাথে যুক্ত হওয়ার ফলে ওই অনিয়মিত কোম্পানির শক্তি বৃদ্ধি হয়।
আরো দক্ষিণে মনতলায় রেল রাস্তা ধরে নাসিম তার কোম্পানিকে মোতায়েন করে। হরষপুরে অবস্থান নেয় মঈনের কোম্পানি। সিলেট মহাসড়ক এবং শায়েস্তাগঞ্জ-চুনারুঘাট সড়ক পরিবেষ্টিত হওয়ায় এলাকাটি ডিম্বাকৃতি ধারণ করে। এর মধ্যে রয়েছে একগুচ্ছ উন্নত ধরনের চা বাগান। সুরমা, কাপ্তাই এবং লালচাঁদ চা বাগানগুলো উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত হয়ে পুরো এলাকাটি সবুজের সমারোহে ঢেকে দিয়েছে। এখানে বেশ কয়েকটি অভ্যন্তরীণ রাস্তা রয়েছে ভগ্ন এবং অসমান মাটি যা কি না এক কথায় সৈন্যদের অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বর্গ রচনা করেছে।
ডিম্বাকৃতির এ এলাকাটি অবশ্যই আমাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। সেই তৎপরতার প্রাথমিক পর্যায়ে মে মাসের ২ তারিখ, শাহজীবাজার পর্যন্ত গ্রামীণ এলাকার ভেতর দিয়ে মতিন তার কোম্পানি নিয়ে এগিয়ে যান। ক্যাপ্টেন সুবিদ আলী ভূঁইয়া, একজন নবাগত অফিসার ক্যাপ্টেন মতিনের সহযাত্রী হন। ক্যাপ্টেন মতিনের কাজ হলো শত্রুপক্ষের চলাচল পথে অ্যামবুশ বা অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে শাহজীবাজার এলাকায় বিঘ্ন সৃষ্টি করা।
ছয় দিন সাফল্যের সাথে শাহজীবাজার, নোয়াপাড়া এবং শাহপুরে পরপর তিনটি অভিযান চালানো হয়। এখানে আমরা তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই। এখানকার জনসাধারণ আমাদের প্রতি নিদারুণ উদাসীনতা প্রদর্শন করে। আমরা লালচাঁদ চা বাগানের দক্ষিণাংশে গোপন অবস্থানে থাকতে বাধ্য হই। স্থানীয় লোকজন বাইসাইকেলের মাধ্যমে পাকিস্তানি সৈন্যদের সংবাদ আদান-প্রদান করে সহায়তা করে। ওরা শত্রুদের চোখ এবং কান হিসেবে কাজ করছিল। এর ফলে আগেভাগেই পাকিস্তানিরা আমাদের আক্রমণ পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দিতে সক্ষম হয়।
শাহজীবাজার বিদ্যুৎ স্টেশনে প্রথম আক্রমণের পরিকল্পনা নেয়া হয়। কিন্তু আমরা এগিয়ে যাওয়ার আগেই পাকিস্তানিরা এক কোম্পানি সৈন্য সেখানে মোতায়েন করে। এভাবে আমাদের প্রথম আক্রমণ পরিকল্পনাই ব্যর্থ হয়ে যায়।
শাহজীবাজারের সামান্য দক্ষিণে নোয়াপাড়া গ্রাম। পরের দিন সেখানে আমরা আক্রমণের জন্য ওঁৎপেতে থাকি। অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে অসচেতন শত্রুসেনাদের তিনটি ট্রাকের কনভয়কে ধ্বংস করে দিই। কিছুসংখ্যক শত্রু হতাহত হয়।
শাহপুরে ক্যাপ্টেন মতিন আরেকটি এমবুশের পরিকল্পনা নেন। অপরাহ্নে চারজন সাইকেল আরোহীকে দেখা যায়। ক্যাপ্টেন মতিনের সৈন্যরা গোপন স্থান থেকে গুলি করতে উদ্যত হন। ক্যাপ্টেন মতিন থামিয়ে দেন। মাত্র চার জন দালালকে পেয়ে অ্যামবুশ নষ্ট করতে তিনি আগ্রহী নন। কিছুক্ষণ পর আমাদের বামপাশে একটি জিপ দেখা যায়। নিঃশব্দ এলাকা। সাইকেল আরোহীদের পথ প্রদর্শনে আরেকটি জিপ আসে। শিগগিরই দেখা যায়, দু’পাশে কয়েকজন দালালসহ এক কোম্পানি পদাতিক সৈন্য। শত্রু সমাবেশের ধরন দেখেই বোঝা যায় ওরা আমাদের পরিকল্পনা আগেই টের পেয়ে গেছে। এখন তাই আমাদের লোকজনকে এক চোট দেখে নিতে চায়। দরগার কাছ থেকে শত্রুরা লাইট মেশিনগান (এলএমজি) পোস্ট থেকে গুলিবর্ষণ শুরু করে। ৩ ইঞ্চি মর্টারও ব্যবহার করে। ফলং নাস্তি। জঙ্গলে মর্টারের গোলা তত ফলপ্রসূ ছিল না। লালচাঁদ চা বাগানের এক স্থানে মিলিত হওয়ার জন্য ক্যাপ্টেন মতিন তার সৈন্যদের নির্দেশ দেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্যাপ্টেন ভূঁইয়া এবং ক্যাপ্টেন মতিন যথাক্রমে ডানে এবং বামে পিছু হটতে থাকেন। সন্ধ্যার পরক্ষণে আবার কেউ কিছু বোঝার আগে এক মাইল দক্ষিণে সরে গিয়ে রাত যাপন করেন। আমাদের অবস্থান সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা দেয়ার জন্য ওই ব্যবস্থা নেয়া হয়। আমাদের উপলব্ধি সঠিক ছিল। নতুন অবস্থান থেকে আমাদের সৈন্যরা পুরনো অবস্থানে শত্রুপক্ষের গোলাবর্ষণের শব্দ শুনতে পান।
শাহজীবাজার, নোয়াপাড়া এবং লালচাঁদ চা বাগানে মতিন যখন আক্রমণ চালিয়ে যান তখন যুগপৎভাবে লে. মোরশেদ শত্রুপক্ষের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করার জন্য অন্যত্র অভিযান শুরু করেন। ১৩ মে লে. মোরশেদ ১২ জন সৈনিক নিয়ে বাগসাইর গ্রামে ২১ নম্বর মাইলফলকে সিলেট-ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়কে এমবুশ স্থাপন করেন। এলাকাটি অ্যামবুশের উপযোগী নয়। তবু লে. মোরশেদ সাহসের সাথে তাই করেন। সেতুর কাছে, যা আমরা আগেই বিধ্বস্ত করেছিলাম। পাকিস্তানিরা একটি বিকল্প রাস্তা তৈরি করে। রাস্তাটি অপেক্ষাকৃত উঁচু হয়ে যায়। লে. মোরশেদ দু’টি এন্টিট্যাংক মাইন স্থাপন করেন এবং মাটিতে ঢেকে রাখা মাইন নিয়ে সিলেট থেকে অগ্রসরমান পাকিস্তানি সৈন্যদের অপেক্ষায় ওঁৎপেতে থাকেন।
বিকাল ৩টায় সামরিক কনভয়টি আসে। অত বড় কনভয় সম্পর্কে লে. মোরশেদ আগে ধারণা করতে পারেননি। কনভয়ের প্রথম গাড়িটি বিকল্প পথে এগোবার সাথে সাথে পেতে রাখা মাইনটির বিস্ফোরণ ঘটে। এর ফলে সৈন্যভর্তি একটি জিপ এবং একটি ট্রাক উড়ে যায়। বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পেয়ে লে. মোরশেদ তার তাবৎ অস্ত্র দিয়ে গুলিবর্ষণ শুরু করে।
৬ মে ক্যাপ্টেন মতিন তেলিয়াপাড়া হটে যান। তার সৈন্যরা ক্লান্ত। বিশ্রাম প্রয়োজন। ক্যাপ্টেন মতিন আমার সাথে দেখা করেন। তিনি নিজেও ৭ দিনের আক্রমণ পরিচালনায় ক্লান্ত। তার যুদ্ধবিষয়ক বিবরণ শুরু করতেই আমাদের প্রতিরক্ষা অবস্থান থেকে রাইফেলসহ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের শব্দ ভেসে আসে। কয়েকটি বুলেট এসে আমার সদর দফতরের শণের তৈরি বেড়ায় আঘাত করে। আমরা বের হয়ে এসে একটি বিষাদময় দৃশ্য দেখতে পাই। পাকিস্তানিরা ভারতীয় বিএসএফ’র ছদ্মবেশে আমাদের প্রতিরক্ষা এলাকায় এসে গুলিবর্ষণের অবস্থানে রয়েছে। তারা একটি অভ্যন্তরীণ বৃত্ত তৈরি করে। তেলিয়াপাড়ায় আমাদের ফিল্ড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হচ্ছে যথেষ্ট দৃঢ় এবং সংহত। যোগাযোগ পরিখাসহ ঊর্ধ্বস্থিত আচ্ছাদন এদিক-ওদিক চলাফেরার জন্য উপযোগী। কিন্তু ক্যাপ্টেন মতিনের লোকজনের সমস্যা ছিল। ওরা প্রতিরক্ষা লাইনে নেই। কারণ, ওরা ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত। সবাই মাটির উপর শুয়ে থাকে। নিদ্রা থেকে জেগেই দেখে শত্রুসৈন্যরা মুখব্যাদান করছে। এ হচ্ছে একই শত্রু যারা লালচাঁদ চা বাগানে মুক্তিযোদ্ধাদের ধরতে পারেনি। ক্যাপ্টেন মতিন ওয়াকিটকির মাধ্যমে নির্দেশ দেন, ওরা যেন প্রতিরক্ষায় জড়িত কোম্পানির সাহায্যে এগিয়ে যায়। ক্যাপ্টেন মতিন তেলিয়াপাড়ার মাঝামাঝি অবস্থানে উঁচু স্থানের দিকে এগিয়ে যান। একটি মেশিনগান চারদিকে অবিরাম গতিতে গুলি করে চলেছে। শত্রুরা তাদের তাবৎ গোলাগুলি ওই একমাত্র মেশিনগানটির ওপরে নিক্ষেপ করে চলেছে। লক্ষ করা হয়, পাকিস্তানিদের বেশ কয়েকটি অবস্থান স্তব্ধ হয়ে গেছে এবং ওরা পরাস্ত হয়ে ফিরে যাচ্ছে।
ক্যাপ্টেন মতিন মেশিনগান পোস্টের দিকে অগ্রসর হন। ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের ল্যান্স নায়েক আবদুর রহমান এটি চালিয়ে যাচ্ছেন। ক্যাপ্টেন মতিনকে দেখে তিনি চিৎকার করে বলছেন ‘স্যার, মাথা নিচু করুন।’ ক্যাপ্টেন মতিন মাথা নিচু করে তার পাশে দাঁড়ান। মেশিনগান ছাড়াও রহমানের কাছে একটি চীনা স্বয়ংক্রিয় রাইফেল রয়েছে। তিনি তার এক সঙ্গীর লাশ দেখিয়ে বলেন ‘এটি হচ্ছে ওর রাইফেল। আমি এটি বিকল্প হিসেবে রেখে দিয়েছি। যদি শত্রুরা কাছাকাছি আসে, তাহলে হাতাহাতি যুদ্ধের জন্য বেয়োনেট তাক করে রেখেছি।’ রহমান জানেন না যে পাকিস্তানিরা পালিয়ে গেছে। তিনি ভাবছেন, ওরা হয়তো আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে দিয়েছে। সঠিক অবস্থা জানিয়ে ক্যাপ্টেন মতিন তাকে শান্ত করেন।
দু’কোম্পানি শক্তিসম্পন্ন পাকিস্তান বাহিনী দ্রুত পালিয়ে যায়। শত্রুদের ধাওয়া করার আদেশ দিই। চুনারুঘাট সড়কে দু’টি ট্রাক পেয়ে যাই। একটি রাস্তা থেকে দূরে পড়ে আছে। দ্রুত পালাতে গিয়ে এ অবস্থা। তেলিয়াপাড়া যুদ্ধক্ষেত্রে পাকিস্তানিদের মৃতদেহ ছড়িয়ে থাকে। আমাদের হতাহতের সংখ্যাও কম নয়।
এবার আমি তেলিয়াপাড়ায় স্থাপিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে কিছু বলতে চাই। সুরমা চা বাগানের দক্ষিণে, তেলিয়াপাড়াও সেখানকার অংশবিশেষ, আমার প্রতিরক্ষা লাইন বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। পূর্ব-পশ্চিম দিকের একটি নালা তেলিয়াপাড়া প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভক্ত করেছে। আখাউড়া-সিলেট রেল রাস্তা আমার প্রতিরক্ষা লাইনের মধ্য দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত হয়ে অভ্যন্তরীণ বৃত্তের পশ্চিম সীমারেখা গঠন করে। ইটাখোলা-চুনারুঘাট মহাসড়ক হচ্ছে এর উত্তরাংশের শেষ সীমা। ভেতরে রেল রাস্তার অংশটি চুনারুঘাট মহাসড়কসহ একটি অর্ধচন্দ্রাকার অবস্থা তৈরি করেছে। এখানে চা বাগানের কয়েকটি দালান অবস্থিত। নালার উত্তর দিকে আমার সদর দফতর। আমার চক্রাকার প্রতিরক্ষা অবস্থানের মধ্যে রয়েছে এক বর্গমাইল এলাকা।লালচাঁদ চা বাগান থেকে ফিরে এসে ক্যাপ্টেন মতিন তেলিয়াপাড়া প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নেন। পাকিস্তান বাহিনী পরের দিন আমার বামদিকে জগদীশপুরে ফিল্ডগানের একটি গোলন্দাজ ইউনিট নিয়ে আসে। সারাদিন ধরে থেমে থেমে ওরা আমাদের ওপরে গোলাবর্ষণ করতে থাকে। এভাবে লক্ষ্যবিহীন গোলাগুলি আরো দু’দিন চলে। কিন্তু আমাদের কোনো প্রকার ক্ষতিসাধনে ব্যর্থ হয়।
১০ মে শত্রুরা গোলা নিক্ষেপ শুরু করে। অতঃপর এক কোম্পানি সৈন্য নিয়ে আমাদের ওপর চড়াও হয়। এবারো কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। গোলন্দাজ ছত্রছায়ায় চুনারুঘাট মহাসড়কে কয়েকটি সামরিক কনভয় এগিয়ে যায়। ১১ মে লে. মোরশেদ মাইনের সাহায্যে সড়কটি বিধ্বস্ত করেন। রাস্তার যে মোড়ে মাইন স্থাপন করা হয় সেখানে কয়লাজাত আলকাতরা বিছিয়ে তার ওপর গাড়ির টায়ারের দাগ বসিয়ে মাইনের ছদ্মাবরণ দেয়া হয়। লে. মোরশেদ এমবুশ করার জন্য অবস্থান নেন। পাকিস্তানি কনভয়ের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। কনভয় এলো। একটি জিপ পাশ কেটে চয়ে যায়। আরেকটি ট্রাকও অক্ষত অবস্থায় এগোয়। তৃতীয়টি একটি মালবোঝাই ৭ টনি ট্রাক। এর চাপে মাইনটির বিস্ফোরণ ঘটে। পারস্পরিক প্রতিক্রিয়ায় অন্যান্য মাইনও বিস্ফোরিত হয়। লে. মোরশেদের সৈন্যরা শত্রুদের ওপর গুলি করে আটকে রাখে। প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে পাকিস্তানিরা আমাদের অবস্থানে ভয়াবহ আক্রমণ শুরু করে। কিন্তু সে আক্রমণও আমরা সাফল্যের সাথে প্রতিহত করি। এখানে আমরা শত্রুদের একটি বাস অক্ষত অবস্থায় দখল করতে সক্ষম হই।
এভাবে তেমন কোনো পরিবর্তন ছাড়া আরো কয়েক দিন যায়। শত্রুদের চাপ ক্রমেই বেড়ে চলে। আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অটুট রাখি। পাকিস্তানিরা এতটুকু ক্ষতি করতে পারেনি। কখনো সরাসরি, আবার কখনো অতর্কিত, আক্রমণ চলতে থাকে।
গত কয়েক দিনের যুদ্ধে ক্যাপ্টেন মতিনের কোম্পানি মারাত্মক ধরনের ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। তেলিয়াপাড়া মুক্ত রাখতে গিয়ে তার সৈন্যদের ৫০ জন এযাবৎ জীবন দিয়েছে। এখন ওদের বিশ্রাম প্রয়োজন।
১৯ মে লে. মোরশেদের সৈন্যরা ক্যাপ্টেন মতিনের কোম্পানির দায়িত্ব গ্রহণ করে। মোরশেদের দুর্ভাগ্য যে সে দিনই পাকিস্তান বাহিনী এক ব্যাটালিয়নের অতিরিক্ত সৈন্য নিয়ে তেলিয়াপাড়া আক্রমণ করে। এর আগে গোলন্দাজ বাহিনী গোলাবর্ষণ করে। অনিয়মিত সৈনিকদের নিয়ে লে. মোরশেদের বাহিনী গঠিত। তার অবস্থান সুসংহত করার আগেই পাকিস্তানিদের অভিযান শুরু হয়। শত্রুদের কাবু করার জন্য আমি মর্টার ব্যবহার করি। পর্যায়ক্রমিক আগ্নেয়াস্ত্রের সহযোগিতা দেয়া হয় লে. মোরশেদকে। কিন্তু শত্রুরা বেষ্টনী ভেঙে ফেলার কাজে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। ঠিক এ সময় আন্তর্জাতিক সীমান্তের ওপারে হটে যেতে বাধ্য হই। সন্ধ্যার আগে লে. মোরশেদও আমাকে অনুসরণ করেন।
এ হচ্ছে আমাদের সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দেয়ার মরণ আঘাত। এর ফলে আমরা যে কেবল অস্ত্রশস্ত্রের দিক থেকে ক্ষতি স্বীকার করতে বাধ্য হই তা নয়, আমরা মানসিকভাবেও দুর্বল হয়ে পড়ি। তেলিয়াপাড়া হাতছাড়া হওয়ার বিষয়টি হজম করা আমাদের সৈন্যদের জন্য বড় কঠিন হয়ে যায়। ওরা কিছুতেই তা মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। কোম্পানিটি নিজেদের অবস্থান রক্ষা করার ২০ দিনব্যাপী সংগ্রামে কয়েকজন অসম সাহসিক সৈনিককে হারিয়েছে। ওরা তেলিয়াপাড়া পুনর্দখলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। কিন্তু সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আসার ফলে পাল্টা আক্রমণের সম্ভাবনা হ্রাস পেয়ে যায়। পরের দিন সকালে, ১৯ মে ক্যাপ্টেন মতিন এবং মোরশেদ আক্রমণ শুরু করেন। কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ আমাদের অনুকূলে নেই। শত্রুরা আমাদের আক্রমণ প্রতিহত করে। ক্যাপ্টেন মতিন এবং লে. মোরশেদ ভারতীয় এলাকার সীমানায় সরে যেতে বাধ্য হন।
তেলিয়াপাড়ার যুদ্ধে বহু নিহত সৈনিকের তালিকায় রয়েছেন নায়েক নিজামুদ্দিন, ল্যান্স নায়েক আসলাম মিয়া, সিপাহি মোবারক আলী, রঙ্গু মিয়া, গফার মিয়া, আলী আজম ভুঁইয়া, জামালুদ্দিন, আবু মিয়া, মোজাহিদ, গিয়াসুদ্দিন এবং আলকাস মিয়া।
তেলিয়াপাড়া পতনের পর শুধু মনতলা এবং সিঙ্গারবিলের এক টুকরো ভূখণ্ড আমার হাতে থাকে।
ঠিক এ সময় প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের নির্দেশক্রমে কর্নেল ওসমানী বাংলাদেশকে যুদ্ধ পরিকল্পনার ভিত্তিতে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করেন। আমাকে তিন নম্বর সেক্টরের কমান্ড পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে উত্তরে শ্রীমঙ্গলের চোরামনকাঠি থেকে দক্ষিণে আখাউড়া-সিঙ্গারবিল পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল। তদুপরি রয়েছে দেশের অভ্যন্তরে এক বিশাল এলাকা।
আমার সামরিক অভিযানের অন্তর্ভুক্ত এলাকা হচ্ছে মৌলভীবাজার মহকুমা, হবিগঞ্জ মহকুমা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমা (নবীনগর থানার কিছু অংশ বাদে), নারায়ণগঞ্জ মহকুমা (আড়াইহাজার এবং বৈদ্যেরবাজার থানা ছাড়া), ঢাকা নর্থ (ঢাকা নগরীবহিভূêত), কিশোরগঞ্জ মহকুমা, জামালপুর মহকুমার গফরগাঁও এবং ভালুকা থানা।
আমার এলাকায় আমি বেশ কয়েকটি গেরিলা ঘাঁটি স্থাপন করি। এসব ঘাঁটিতে কর্মরত গেরিলাদের সংখ্যা নভেম্বরে ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজারের মধ্যে বৃদ্ধি পায়। এ সংখ্যা এলাকায় অবস্থিত পাকিস্তান বাহিনীর চেয়ে অনেক বেশি।
আমার ঘাঁটিগুলোর কয়েকটি শত্রুদের সার্বক্ষণিক ভীতি প্রদর্শন এবং চাপের মধ্যে থাকে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সেসব ঘাঁটি কখনো আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। যেসব এলাকা আমাদের পুরো নিয়ন্ত্রণে রয়েছে সেসব হচ্ছে শিবপুর, মনোহরদি, কাপাসিয়া, বাজিতপুর, কুলিয়ারচর, ভালুকা ও গফরগাঁও। তা ছাড়া ওই এলাকাগুলোয় প্রশাসনিক নেটওয়ার্ক আমরা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছি।
************************
লেখকঃ মেজর জেনারেল কে এম সফিউল্লাহ বীরউত্তম
দৈনিক নয়াদিগন্ত, ১৬ ডিসেম্বর ২০০৭