National Events - http://events.amardesh.com
পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াশিংটন ও আমার মতামতে ভিন্নতা ছিল
http://events.amardesh.com/articles/29/1/aaaaaaaaa-aaaaaaaa-aaaaaaaa-a-aaaa-aaaaaa-aaaaaaa-aaa/Page1.html
Article Poster
 
By Article Poster
Published on 12/16/2007
 
আর্চার কে ব্লাডের জন্ম ১৯২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে। ১৯৪৭ সালে তিনি মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগে যোগ দেন। তিনি প্রথম ঢাকায় মার্কিন কনসাল জেনারেলের অফিসে যোগ দেন ১৯৬০ সালে, পলিটিক্যাল অফিসার ও ডেপুটি প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে। দুই বছর দায়িত্ব পালনের পর তিনি প্রথমে আফগানিস্তান এবং সেখান থেকে এথেন্সে বদলি হন। তিনি আবার ঢাকায় ফিরে আসেন ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তানে মার্কিন কনসাল জেনারেল হিসেবে। আর্চার ব্লাড ১৯৭১ সালের জুন পর্যন্ত ঢাকায় দায়িত্ব পালন করেন।

পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াশিংটন ও আমার মতামতে ভিন্নতা ছিল

আর্চার কে ব্লাডের জন্ম ১৯২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে। ১৯৪৭ সালে তিনি মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগে যোগ দেন। তিনি প্রথম ঢাকায় মার্কিন কনসাল জেনারেলের অফিসে যোগ দেন ১৯৬০ সালে, পলিটিক্যাল অফিসার ও ডেপুটি প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে। দুই বছর দায়িত্ব পালনের পর তিনি প্রথমে আফগানিস্তান এবং সেখান থেকে এথেন্সে বদলি হন। তিনি আবার ঢাকায় ফিরে আসেন ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তানে মার্কিন কনসাল জেনারেল হিসেবে। আর্চার ব্লাড ১৯৭১ সালের জুন পর্যন্ত ঢাকায় দায়িত্ব পালন করেন। ২৭ মার্চে পাঠানো এক টেলিগ্রামে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর ২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞকে ‘সিলেকটিভ জেনোসাইড’ বলে বর্ণনা করেন। ৬ এপ্রিল আরেক টেলিগ্রামে তিনি লেখেন, ‘আমাদের সরকার গণতন্ত্র দমনের নিন্দা জানাতে ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের সরকার নৃশংসতার নিন্দা জানাতে ব্যর্থ হয়েছে। আর্চার ব্লাড ২০০৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পরলোকগমন করেন। হেনরি প্রেখ্‌ট মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগের একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। যুক্তরাষ্ট্রের দি অ্যাসোসিয়েশন ফর ডিপ্লোম্যাটিক স্টাডিস অ্যান্ড ট্রেইনিং-এর ফরেন অ্যাফেয়ার্স ওরাল হিস্টরি প্রজেক্টের অধীনে হেনরি প্রেখ্‌ট ১৯৮৯ সালের ২৯ জুন আর্চার ব্লাডের এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেন ব্লাডের পেনসিলভানিয়ার বাসভবনে। সে সাক্ষাৎকার থেকে দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অংশের অনুবাদ এখানে ছাপা হলো।

হেনরি প্রেখ্‌টঃ ১৯৭০ সালের মার্চে আপনাকে ঢাকায় বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে সরাসরি বদলি করা হয়। সেখান থেকে শুরু করা যাক।

আর্চার ব্লাডঃ আমাকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল ওয়াশিংটনে পরামর্শক হিসেবে থাকার সুবাদে। সেই প্রথম আর শেষবারের মতো আমি কোনো দায়িত্ব নিতে শপথবাক্য পাঠ করি। বিল ম্যাকমবার তখন ছিলেন আন্ডার সেক্রেটারি অব ম্যানেজমেন্ট। কনসাল জেনারেলদের পদকে আরও মর্যাদা ও কতৃêত্ব দিতে তিনিই এ শপথ পাঠের প্রচলন করেন। অনাড়ম্বর আনুষ্ঠানিকতায় তিনিই আমাকে ঢাকার প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে শপথবাক্য পাঠ করান।

প্রেখ্‌টঃ এর কিছুদিন পরই তো নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষিত হয়।

ব্লাডঃ নির্বাচনের দিনক্ষণ আগেই ঘোষিত হয়েছিল, তবে পরে মূলত বন্যার কারণে তা স্থগিত করা হয়। পরে ডিসেম্বরে অবশ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দুর্যোগ মোকাবিলায় ত্রাণ তৎপরতার ব্যাপারে পাকিস্তান সরকারের মনোভাবে ক্ষুব্ধ বাঙালিদের অবস্থা দেখে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের বিষয়টি আগেই আঁচ করা গিয়েছিল।

প্রেখ্‌টঃ রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? দলটি কি বামপন্থী, ডানপন্থী, নাকি মধ্যপন্থী? নাকি এর ভেতরে নানাপন্থী গোষ্ঠী ছিল।

ব্লাডঃ আওয়ামী ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদী দল। পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের জন্য দলটি লড়েছে। ভারতের সঙ্গে এর ভালো সম্পর্ক ছিল। বাম-ডানের হিসাবে আওয়ামী লীগকে মধ্য বামপন্থী বলা যায়।

প্রেখ্‌টঃ এটিকে সুসংগঠিত দল বলা যায়?

ব্লাডঃ ওই সময়ে দলটি যথেষ্ট সংগঠিত ছিল। তারা প্রতিটি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল। আমার মনে আছে, যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত হেলালি সাহেব দুর্যোগ মোকাবিলায় চালু ত্রাণ কার্যক্রম শেষে কিন্তু নির্বাচনের আগে পূর্ব পাকিস্তান সফরে গিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে আমি ও আমার দূতাবাসের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের একটি বৈঠকও হয়েছিল। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, এ সময়ে কী করে নির্বাচন হবে। আমরা তাঁকে বলেছিলাম, আমাদের ধারণা, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে বিশাল বিজয় পাবে। হেলালি খুব খেপে গিয়েছিলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কি মুসলমান?’ আমি বললাম, ‘না’। এরপর তিনি বললেন, ‘গ্রামাঞ্চলের বাঙালিদের মনের কথা আপনি জানেন?’ আমার জবাব ছিল, ‘না’। তিনি বললেন, ‘আমি আপনাকে বলতে পারি, তারা মোল্লাদের কথামতো ভোট দেবে, আওয়ামী লীগে নয়। আপনার ধারণা মোটেই ঠিক নয়।’ যা-ই হোক, নির্বাচনের আগে আগে আমরা আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, ৩০০ আসনের জাতীয় পরিষদের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত ১৬৯টি আসনের দুটি বাদে সবগুলোতে তাঁরা জয়ী হবেন। ওয়াশিংটনকে আমি তা জানিয়েওছিলাম, যদিও কথাটি আমি নিজে বিশ্বাস করিনি। মনে হয়েছিল কথাটা অতিরঞ্জন। অথচ বাস্তবে তা-ই ঘটেছিল। ১৬৯টি আসনের মধ্যে ঠিকই তারা মাত্র দুটিতে হেরেছিল। এই বিজয় জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দেয়।

প্রেখ্‌টঃ পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা বেশি।

ব্লাডঃ হ্যাঁ, ৫৫ শতাংশ আর ৪৫ শতাংশ।

প্রেখ্‌টঃ ঠিক আছে। সরকারের মাথায় কি এ বিষয়টি ছিল না যে সংখ্যাগরিষ্ঠ এই জনগোষ্ঠী আইনসভার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে প্রকারান্তরে সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে? আওয়ামী লীগের অবস্থান সম্পর্কে কি সরকারের কোনো ধারণা ছিল না?

ব্লাডঃ আমার ধারণা, হেলালিও গতানুগতিক ধারণা পোষণ করতেন। তাঁরা আশা করেছিলেন মুসলিম লীগের মতো অধিক রক্ষণশীল দলগুলো অতীতের চেয়ে এবারের নির্বাচনে আরও ভালো করবে। আওয়ামী লীগ যে এত বড় বিজয় পাবে, এটা তাঁরা ভাবতে পারেননি। পশ্চিম পাকিস্তানে ভুট্টোর বিপুল জনপ্রিয়তার বিষয়টিও তাঁরা ধারণা করতে পারেনি। যথেষ্ট স্বচ্ছ নির্বাচন হলো। আর এর ফলাফল তাঁদের বি্নিত করেছে বলেই আমার ধারণা।

প্রেখ্‌টঃ যথাস্থানে টাকা ছড়িয়ে কতৃêপক্ষ কি নির্বাচনী ফলাফল পাল্টানোর চেষ্টা করেনি?

ব্লাডঃ আমার তা জানা নেই। হয়তো কিছুটা করে থাকতে পারে, কিন্তু···। বাঙালিদের অনুভূতির জায়গাটা ছিল পরিষ্কার। সেখানে থাকলে আপনিও সেখানকার আবেগ খুব সহজে বুঝতে পারতেন।

প্রেখ্‌টঃ আপনারা প্রত্যেকেই ভেবেছিলেন সিআইএ এবং ইউএসআইএ···
ব্লাডঃ হঁ্যা, আওয়ামী লীগ যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে, এটা আমরা সবাই ভেবেছি। কারও অনুমান হয়তো কম-বেশি হতে পারে। কারও ধারণা ৭৫ শতাংশ, কারও ধারণা ৯৫ শতাংশ।

প্রেখ্‌টঃ যেখানে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে বিশাল বিজয় লাভ করতে যাচ্ছে এবং প্রকারান্তরে পশ্চিম পাকিস্তানেও সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিতে যাচ্ছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই সরকারের সম্পর্ক কেমন হবে বলে আপনারা ভেবেছিলেন?

ব্লাডঃ মুশকিল হলো, আওয়ামী লীগের ছয় দফা কর্মসূচি এমন মাত্রায় স্বায়ত্তশাসন দাবি করল যে সেটা বাস্তবায়িত হলে অবিভক্ত পাকিস্তানের কল্পনাটুকু পর্যন্ত টিকে থাকা সম্ভব ছিল না। আমার মনে হয়েছিল, আওয়ামী লীগের এই কর্মসূচি পাকিস্তান বিভক্তির একটি প্রক্রিয়া। তবে এটি সম্ভবত পাকিস্তানের বিভক্তির একটি শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়া।

প্রেখ্‌টঃ দ্বিখণ্ডিত পাকিস্তানের কারণে উপমহাদেশে মার্কিন স্বার্থে কী প্রভাব পড়বে বলে আপনাদের ধারণা ছিল?

ব্লাডঃ ভালো প্রশ্ন। এ নিয়ে আমাদের মধ্যে বিতর্ক ছিল। যত দূর মনে পড়ে, ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে আমাদের দূতাবাসে পেশোয়ার, লাহোর, করাচি ও ঢাকার সকল সংসদীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি বৈঠক হয়। পাকিস্তান দুই ভাগ হয়ে গেলে কী হবে-বৈঠকে তা নিয়ে আলোচনার তুমুল ঝড় বয়ে যায়।

প্রেখ্‌টঃ এটা কি···?
ব্লাডঃ হ্যাঁ, নির্বাচনের পরই এ বৈঠকটি হয়। সরকারি সেনাবাহিনী তখনো হামলা শুরু করেনি। শান্তিপূর্ণ সমাধানের সম্ভাবনা তখনো ছিল।

প্রেখ্‌টঃ বৈঠকের বিতর্ক নিয়ে কিছু বলুন।

ব্লাডঃ যত দূর মনে পড়ে, আমরা সিদ্ধান্তে এসেছিলাম যে পাকিস্তান অবিভক্ত থাকলেই আমেরিকার জন্য ভালো। কারণ পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হলে দেশটির অনেক কিছু দরকার হবে। প্রচুর অর্থনৈতিক সাহায্য লাগবে। অর্থনৈতিক সাহায্যের জন্য আগের চেয়ে বেশি করে আমেরিকার প্রতি আহ্বান জানানো হবে। দেশটি দুই ভাগ হয়ে গেলে মার্কিন স্বার্থের মারাত্মক ক্ষতি হবে-এমন আর কোনো কারণ আমার মনে পড়ে না। যা হোক, আমরা শান্তিপূর্ণ বিভক্তি নিয়ে কথা বলছিলাম; মানে যেখানে ভারতের হস্তক্ষেপ বা যুদ্ধবিগ্রহ থাকবে না।

প্রেখ্‌টঃ কিন্তু উপমহাদেশে ভারতের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে আরও দুর্বল পাকিস্তান তো আরও পিছিয়ে পড়বে। এ বিষয়টি কি আপনাদের মাথায় ছিল-এই বিভক্তির নিরাপত্তার পরিপ্রেক্ষিতটি?

ব্লাডঃ আমার মনে হয় না এ নিয়ে আমাদের খুব উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু ছিল। আপনি এ প্রশ্নও তুলতে পারেন যে পশ্চিম পাকিস্তানের কাছে পূর্ব পাকিস্তান একটা বোঝার মতোই ছিল। ভারতের কারণে এ বোঝা তারা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। কারণ পূর্ব পাকিস্তান কার্যত ভারত-বেষ্টিত। তা ছাড়া পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এর দূরত্ব হাজার মাইল। ঘটনা পরিক্রমায় ভারতের বিপক্ষে এর টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। অর্থনৈতিকভাবে পাকিস্তানের বরং ক্ষতিই হচ্ছিল। খণ্ডিত পাকিস্তান তাই অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অখণ্ড পাকিস্তানের চেয়ে আরও বেশি বাস্তবসম্মত।

প্রেখ্‌টঃ এ ব্যাপারে ভারতের মনোভাব কী ছিল···আমার জানা নেই এটাকে সংকটময় মুহূর্ত বলা যায় কি না···এটা কি বোঝা গিয়েছিল যে ভারত কোনো না কোনোভাবে হস্তক্ষেপ করতে যাচ্ছে? অথবা ভারতের স্বার্থ তখন কীভাবে রক্ষা করা হচ্ছিল বলে আপনারা ভেবেছিলেন?

ব্লাডঃ আমার মনে হয় না আমরা এ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলাম। পাকিস্তানে আমরা এ নিয়ে বেশি কিছু ভাবিনি। আমাদের ধারণা ছিল, পাকিস্তানের বিভক্তিকে ভারত উৎসাহ জোগাবে, পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলবে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের খুবই চমৎকার সম্পর্ক ছিল।

প্রেখ্‌টঃ পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের ব্যাপারে কী বলবেন? পাকিস্তানের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তাদেরও ভূমিকা থাকতে পারে, এমন হিসাব কি আপনাদের ছিল?

ব্লাডঃ বঙ্গোপসাগরের সুবিধা পেতে পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাপারে চীনের প্রবল আগ্রহ আছে, এ রকম একটি ধারণা রাষ্ট্রদূতের কাছ থেকেই আমরা প্রথম পাই। ব্যাপারটি আমরা কেউ বিশ্বাস করিনি। অথচ পাকিস্তান সরকারের প্রতি চীনের জোর সমর্থন ছিল। চীন ছিল পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে যেকোনো আন্দোলনের ঘোর বিরোধী। সোভিয়েত তা ছিল না। অবশ্য ১৯৭১ সালের আগস্টে সোভিয়েত-ভারত শান্তিচুক্তির আগেই সব ঘটে যায়। যা হোক, আমরা মার্কিন স্বার্থই দেখছিলাম। আমরা ভাবছিলাম শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক বিবর্তনের কথা। আমাদের ধারণা ছিল, পশ্চিম পাকিস্তানে ভুট্টো আর পূর্ব পাকিস্তানে মুজিব অবিভক্ত পাকিস্তানের কাঠামোতে পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে পারবেন না। তাঁরা দুজনই নিজেদের স্বতন্ত্র পন্থার কথা বিবেচনা করবেন।

প্রেখ্‌টঃ সুতরাং নির্বাচন ও আওয়ামী লীগের বিজয়ের পর···

ব্লাডঃ মুজিব, ভুট্টো, ইয়াহিয়ার মধ্যে অবশ্যই আলোচনা হয়েছে, কিন্তু কোনো ফল হয়নি। ডিসেম্বরে নির্বাচিত জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের তারিখ নির্ধারিত হয় ৩ মার্চ। অথচ ভুট্টোর চাপের কাছে নতি স্বীকার করে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। আমি মনে করি, এই একটি ঘটনাই পাক-ভারত যুদ্ধের জন্য পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের জ্ন দিয়েছে।

প্রেখ্‌টঃ অধিবেশন স্থগিত করার মাধ্যমে ভুট্টো কী সুবিধা নিতে চেয়েছিলেন? কালক্ষেপণ করে কী সুবিধাই বা পাওয়া যেত? ওই সময়ে আর কী-ই বা করা যেত?

ব্লাডঃ আমার ধারণা, ভুট্টো এর মাধ্যমে শেখ মুজিবকে তাঁর ছয় দফা দাবি থেকে সরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন। সম্ভবত মুজিব যাতে প্রধানমন্ত্রী হতে না পারেন সে চেষ্টাও ভুট্টো করেছেন। অথচ জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে মুজিবের দলের তো সুস্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। অথবা ভুট্টো অযথাই কালক্ষেপণ করছিলেন। কারণ ভুট্টো জানতেন, মুজিব প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। তাঁকে হতে হবে বিরোধী দলের নেতা। আর যদি যুক্ত সরকার হয়, তাহলে তিনি হয়তো পাবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ।

রেডিওতে অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণা শোনার পর আমরা সবাই আদমজী কোর্টের ছাদে উঠে গিয়েছিলাম। সে ভবনেই তখন কনসুøলেট জেনারেলের থাকার ব্যবস্থা ছিল। দেখলাম, আশপাশের অফিসগুলো থেকে বাঙালিরা বেরিয়ে আসছে। ভীমরুলের মতো ক্ষিপ্ত সবাই। এ ছিল তাদের ক্ষোভের স্বতঃস্কূর্ত বহিঃপ্রকাশ। কারণ তারা ইয়াহিয়াকে বিশ্বাস করেছিল। তিনি নির্বাচনের আয়োজন করেছেন। বাঙালিরা তাতে বিজয়ী হয়েছে। অথচ এখন তাদের বিজয়ের সুফল ভোগ করতে দেওয়া হচ্ছে না।

ওই দিনই দূতাবাস থেকে ওয়াশিংটনে একটি বার্তা পাঠানো হয়, যার কপি আমাদেরও দেওয়া হয়। তাতে বলা হয়, দূতাবাস মনে করে, পরিস্থিতি সামাল দিতে ইয়াহিয়া অত্যন্ত চতুর একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমি অনেকটা সরাসরিই মন্তব্য করেছিলাম যে আমরা সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে বিষয়টা দেখেছি। বাঙালিদের স্বতঃস্কূর্ত প্রতিক্রিয়া দেখে আমার অন্তত এটুকু মনে হয়েছে। আমি বলেছি, আমি পাকিস্তান ভাঙনের সূত্রপাত দেখেছি। ওয়াশিংটন থেকে আমাকে কড়া ভাষায় বলা হয়, ‘আর কোনো অতিরঞ্জন নয়।’

কিন্তু সেটাই ছিল ভাঙনের সূত্রপাত। কিন্তু অনেক দূরে থাকার কারণে দূতাবাস পূর্ব পাকিস্তানে সৃষ্ট ক্ষোভ ঠিকমতো মূল্যায়ন করতে পারেনি বলে আমি করি। বলতে পারেন, বিদ্রোহ শুরুর পর থেকে পূর্ব পাকিস্তানে কার্যত আওয়ামী লীগ সরকার চালাতে শুরু করে। যেন তারাই সরকার। স্পষ্টত একটি সংকট সৃষ্টির সুযোগ দিয়ে সেনাবাহিনী তখন ব্যারাকে অবস্থান নিয়েছে।
পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত মার্কিনিদের তখন সরিয়ে নেব কি না, এ সিদ্ধান্ত নিতে আমার সমস্যা হচ্ছিল। কারণ···

প্রেখ্‌টঃ এটা মার্চের···

ব্লাডঃ পঁচিশে মার্চ সন্ধ্যায় প্রথম হামলা শুরু হয়। সে রাতের কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে। কয়েকজন বাঙালি ও কনস্যুলার কোরের কয়েকজনকে সেদিন নৈশভোজে দাওয়াত করেছিলাম। একটি ছবি দেখারও আয়োজন ছিল। স্টেলা ডালাস, না, ভুল বলেছি, ছবিটি ছিল কাস কিম্বারলিং। লানা টার্নার আর স্পেন্সার···কী যেন নাম?

প্রেখ্‌টঃ স্পেন্সার ট্রেসি?

ব্লাডঃ হ্যাঁ। ছবিটি শেষ হওয়ার মুহূর্তে আমার সিআইএ সহকর্মীর কাছ থেকে ফোন পেলাম। তিনি অফিসে আটকে আছেন। রাস্তায় ব্যারিকেড। বাঙালিদের কয়েকজন গাছ কেটে রাস্তায় ফেলে রেখেছেন। সেনাবাহিনী তখন বেরোতে শুরু করেছে।

প্রেখ্‌টঃ সেনাবাহিনী কি সহিংসতার কারণে বেরিয়েছিল। হামলার পেছনে ইন্ধন জোগায় কোন বিষয়টি?

ব্লাডঃ আসলে যা ঘটেছিল তা হচ্ছে, ভুট্টোকে নিয়ে ইয়াহিয়া ঢাকায় আসেন মুজিবের সঙ্গে আলোচনা করতে। উদ্দেশ্য, এর কোনো সুরাহা করা যায় কি না। পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ওই সময় আমাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না।

প্রেখ্‌টঃ কেন ছিল না?

ব্লাডঃ পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের যাঁদের আমরা চিনতাম, তাঁদের বেশির ভাগকেই সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। যেমন গভর্নর, জেনারেল অফিসার কমান্ডিং। অবশ্য পরে তাঁদের পেয়েছি। তাঁরাও সামরিক হামলার বিরোধিতা করেছিলেন।

প্রেখ্‌টঃ ও···।

ব্লাডঃ এ কারণেই তাঁদের প্রত্যাহার করা হয়। তা ছাড়া রাষ্ট্রপতি সফরে এসেছেন। তাঁরা সবাই তখন মুজিব ও ভুট্টোর সঙ্গে। তবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমাদের তখন যোগাযোগ ছিল। তাঁদের কাছ থেকে আমরা যে অনুভূতির কথা জেনেছি, তাকে রোলার কোস্টারের সঙ্গে তুলনা করাই ভালো। অর্থাৎ এই তাঁরা আশাবাদী, পরক্ষণেই আবার হতাশ, এরপর আবার আশাবাদী। কিন্তু হঠাৎ পঁচিশে মার্চ বিকেলে ইয়াহিয়া বৈঠক ভেঙে দিয়ে ভুট্টোকে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে যান। আর সে রাতেই মিলিটারিরা পাশবিক হামলা চালায়।

প্রেখ্‌টঃ এর আগে কি বড় ধরনের সহিংস কিছু ঘটেছিল?

ব্লাডঃ না, পরে অবশ্য দাবি করা হয় যে, এমন কিছু···। বাঙালিরা পাকিস্তানি পতাকা দেখা মাত্রই ছিঁড়ে ফেলেছে। পাকিস্তানি সেনাদের কাছে কয়েকটি বাজারের দোকানিরা জিনিসপত্র বিক্রি বন্ধ করে দেয়। কিন্তু সহিংসতার ঘটনা ঘটেছিল খুবই কম। এক মার্কিন কর্মকর্তার সঙ্গে কয়েকজন বাঙালি উদ্ধত আচরণ করেছিল। ভদ্রমহিলা বিষয়টি আমাকে জানান। আমি সেটি আওয়ামী লীগকে জানাই। আমাকে বলা হয়, ‘আমরা বিষয়টি দেখছি। এ নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না।’ কার্যত তারাই ছিল সরকার। এ কারণে ৫ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ; সামরিক হামলার আগের এই সংক্ষিপ্ত সময়ে আমরা তাদের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছিলাম।

প্রেখ্‌টঃ আমার ধারণা, দূতাবাস তখনো পশ্চিম পাকিস্তানি কতৃêপক্ষের সংস্পর্শেই ছিল। তারা কি পাকিস্তানিদের কোনোভাবে প্রভাবিত করতে চেয়েছিল? অর্থাৎ সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী ছিল?
ব্লাডঃ আমাদের সুনির্দিষ্ট কোনো অবস্থান ছিল কি না, সেটাই আমার জানা নেই।

প্রেখ্‌টঃ পূর্ব পাকিস্তানে আপনার অবস্থান কী ছিল?

ব্লাডঃ না, আমার সে রকম কোনো চেষ্টা ছিল না। কী ঘটছে, আমি কেবল সেটাই জানার চেষ্টা করেছি।

প্রেখ্‌টঃ মুজিবের সঙ্গে কথা বলেছিলেন?

ব্লাডঃ না, মুজিবের সঙ্গে কথা হয়নি। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে কথা হয়েছে। এ বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে আমরা সমস্যাটার একটা শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধান চেয়েছি।

প্রেখ্‌টঃ ওই সময় বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলা থেকে আপনার কী অনুভূতি হয়েছিল?

ব্লাডঃ আমি ভাবতে পারিনি পাকিস্তানি মিলিটারি হামলা চালাবে। তবে আমি জানতাম, পূর্ব পাকিস্তানে তারা সৈন্য বৃদ্ধি করছে। আমরা বিমানবন্দরে গিয়েছিলাম। সেখানে দেখলাম পিআইএ বিমান নামছে। প্রতিটিতে খাকি স্ন্যকস আর সাদা শার্ট পরা সমবয়সী যুবকেরা। বিমান থেকে নেমে সবাই কুচকাওয়াজ করে ট্রাকে উঠছেন। জানলাম, এঁরা সবাই সৈনিক। তবে এটা মনে হয়েছিল, দ্রুত পাকিস্তানের বিভক্তি ঘটিয়ে সামরিক হামলার অবসান ঘটবে। হয়েছিলও তা-ই। এ হামলা ছিল বেপরোয়া।

আমার ধারণা, পাকিস্তানি সেনাদের একটা বড় অংশ মনে-প্রাণে বিশ্বাস করত, বাঙালিদের তারা আতঙ্কিত করে তুলতে পারবে। বাঙালিদের ব্যাপারে তাদের বেশির ভাগেরই মনোভাব ছিল খুব উদ্ধত। তাদের ধারণা ছিল, বাঙালিরা ভীরু, শিল্পমনা; দাঙ্গা-ফ্যাসাদ বোঝে না, কোনো কঠোর অবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না।

প্রেখ্‌টঃ হামলার ধরনটা কী ছিল? রাস্তায় ব্যারিকেড, আর কী?

ব্লাডঃ না না। সামরিক সামর্থø আছে এমন সব বাঙালি ইউনিট ধ্বংস করতেই পাকিস্তানি সেনারা সবার আগে বের হয়। এটা ছিল সুপরিকল্পিত। এসব বাঙালি ইউনিটের মধ্যে ছিল পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস বা ইপিআর। ইপিআরে পাকিস্তানি কর্মকর্তা থাকলেও সেখানে বাঙালি জওয়ান ছিল। এটা ছিল আধাসামরিক ধরনের এক বাহিনী। পুলিশ ও সীমান্ত নিরাপত্তার দায়িত্ব এদের ওপর ন্যস্ত ছিল। পাকিস্তানি সেনারা প্রথমেই ইপিআর ব্যারাকে হামলা চালায় এবং যত বেশি সংখ্যায় সম্ভব তাদের হত্যা করে।

প্রেখ্‌টঃ আপনি একটু আগে ‘ধ্বংস’ শব্দটি উচ্চারণ করেছেন। আক্ষরিক অর্থেই কি আপনি ধ্বংস বুঝিয়েছেন?

ব্লাডঃ হ্যাঁ। ওরা তাদের ধ্বংস করতে চেয়েছিল। পারলে সবাইকে হত্যা করতে চেয়েছিল। পুলিশ সদর দপ্তরেও এ রকম হামলা চালানো হয়।

প্রেখ্‌টঃ কোনো উসকানি ছাড়াই তো এসব হামলা করা হয়?

ব্লাডঃ হ্যাঁ, কোনো রকম উসকানি ছাড়াই। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও হামলা চালায়। কারণ বিক্ষোভে তখন ছাত্রদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। তারা ছাত্রাবাসগুলোতে মেশিনগান নিয়ে হামলা করে। আমার ধারণা, তারা মর্টারও ব্যবহার করে। বিপুলসংখ্যক ছাত্র হত্যা করা হয়। তারা আওয়ামী-সমর্থক সংবাদপত্র অফিসে ট্যাংক হামলা চালিয়ে ভবনটি উড়িয়ে দেয়।

প্রেখ্‌টঃ আওয়ামী লীগের কী হলো?

ব্লাডঃ যে বাজারগুলোর ব্যবসায়ীরা পাকিস্তানি সেনাদের কাছে খাদ্যসামগ্রী বিক্রি করতে চায়নি, সেগুলো তারা ধ্বংস করে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে হিন্দু শিক্ষকদের হত্যা করে। তাঁদের একজনকে আমি বিশেষভাবে চিনতাম। বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ, দার্শনিক। তাঁর রক্তে রাজনীতির লেশমাত্র ছিল না। শুধু হিন্দু বলেই তাঁকে হত্যা করা হয়।

প্রেখ্‌টঃ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের কী অবস্থা ছিল?

ব্লাডঃ মুজিবের মতো যাঁদের পাওয়া যায়, তাঁদের সবাইকে গ্রেপ্তার করা হয়। অনেকে পালিয়ে যান। অনেকেই গ্রেপ্তার এড়াতে সক্ষম হন।
প্রেখ্‌টঃ দূতাবাসের তৎপরতা কী ছিল? সামরিক কতৃêপক্ষ কি আপনাদের আটকে রেখেছিল? তারা কি আপনাদের বাইরে বেরোতে নিষেধ করেছিল?

ব্লাডঃ হ্যাঁ। তখন তো সান্ধ্য আইন বলবৎ ছিল। প্রায় ৩৬ ঘণ্টা আমাদের বাইরে বেরোতে দেওয়া হয়নি। সে রাতে আমরা বাসার ছাদে উঠেছিলাম। সেখান থেকেই যুদ্ধ-পরিস্থিতি দেখেছি। সেখান থেকে হানাদারদের দেখা গেছে, ট্যাংকের বোমা আর মেশিনগানের শব্দ শোনা গেছে। দূতাবাসের সঙ্গে আমাদের তিন সপ্তাহ কোনো যোগাযোগ ছিল না। কোনো টেলিফোন ছিল না। তিন সপ্তাহ পর মিলিটারিরা আমাকে একটি সামরিক ফোন থেকে দূতাবাসে কথা বলার সুযোগ দেয়। সৌভাগ্যবশত আমাদের দূতাবাসের বিমান অ্যাটাশে আমাদের সঙ্গে ছিলেন। সামরিক হামলার আগেই তিনি এসেছিলেন। আমি তাঁকে পাঠাতে বলেছিলাম। তিনি থাকাতে আমাদের অনেক উপকার হয়। কারণ, ২৫ মার্চ থেকে আমরা যুদ্ধ নিয়ে রিপোর্ট করছিলাম, গৃহযুদ্ধ। এখানে তিনিই ছিলেন একমাত্র মার্কিন সেনাসদস্য। ব্রিটিশদেরও এ রকম একজন ছিলেন। এঁরা থাকায় যুদ্ধের প্রতিবেদনে সামরিক পরামর্শ পেতে সুবিধা হয়।

প্রেখ্‌টঃ গেরিলা যুদ্ধে ভারত কি তখন সক্রিয় সহায়তা দিয়েছিল?

ব্লাডঃ না, না, এত আগে তারা সক্রিয় হয়নি।

প্রেখ্‌টঃ দূতাবাসের প্রতিক্রিয়া কী ছিল? আমার ধারণা, আপনি তো সবই দূতাবাসকে জানিয়েছেন। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে দূতাবাস কী ব্যবস্থা নেয়?

ব্লাডঃ বলা যায়, দূতাবাস আমাকে অবিশ্বাস করেছে। অবশ্য পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে দূতাবাসকে বলা হচ্ছিল, তেমন কিছুই ঘটেনি। দূতাবাসের মন্তব্য ও চিঠিতে অবিশ্বাসের এই মনোভাব প্রকাশ পেতে থাকে। এটা ছিল অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক।

প্রেখ্‌টঃ বিদেশিদের ওপর কোনো হামলা হয়েছিল?

ব্লাডঃ না। আমরা একটি গৃহযুদ্ধের মধ্য পড়তে যাচ্ছি, তেমন আশঙ্কা। দুটো কারণে আমি মার্কিনিদের এখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ছিলাম। প্রথমত, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে জেনেছি মার্কিনিরা বিপদমুক্ত। মার্কিনিদের বিষয়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। কেউই ব্যক্তিগত কোনো বিপদের আশঙ্কা করেনি। তা ছাড়া মার্কিনিদের সরিয়ে নেওয়া হলে এটা মনে হতো যে আমরা গৃহযুদ্ধ ও সংঘাতের অনিবার্যতা মেনে নিয়েছি। আমাদের থাকার মানে হচ্ছে, এখনো সংকট নিরসনের সুযোগ আছে।

প্রেখ্‌টঃ স্বদেশিদের ঝুঁকিতে রেখে আপনার নার্ভাস লাগেনি?

ব্লাডঃ হ্যাঁ, নিশ্চয়। এটা খুব ভয়ঙ্কর একটা দায়িত্ব ছিল। কারণ, পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে। অবশ্য মার্কিন নাগরিকদের দিক থেকে আমার ওপর কোনো চাপ ছিল না।

প্রেখ্‌টঃ ওয়াশিংটনের অবস্থান কী ছিল? তারা কি আপনাকে কিছু করতে বলেছিল?

ব্লাডঃ না, ওই সময় থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন রাষ্ট্রদূত আমাকে একটি বার্তা পাঠান। তাতে বলা হয়, ‘আপনার প্রতি আমার একটাই পরামর্শঃ সতর্কতার ব্যাপারে ভুল করবেন না।’ আমি নিশ্চিত নই, তিনি কী বোঝাতে চেয়েছিলেন! কিন্তু সামরিক হামলার পর দ্রুত পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ওয়াশিংটনের ধারণা ছিল, যেহেতু সবকিছু পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে, সুতরাং মার্কিন নাগরিকদের বিপদ হওয়ার কোনো কারণ নেই। অথচ বিপদ ছিল।

প্রেখ্‌টঃ কিসের বিপদ? কাদের কাছ থেকে?

ব্লাডঃ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কাছ থেকে। এমনও ঘটেছে, বন্দুক ঠেকিয়ে মার্কিনিদের ভয় দেখানো হয়েছে; হত্যারও হুমকি দেওয়া হয়েছে। এমনও হয়েছে, সন্ধ্যার পর পাকিস্তানি সেনারা ব্যারাক থেকে বেরিয়ে এসে মার্কিন নাগরিকদের বাসভবনে ডাকাতি করেছে। এক ঘটনায় তারা বন্দুক ঠেকিয়ে এক মার্কিন মহিলার হাতঘড়ি ছিনিয়ে নেয়। একজন মার্কিনি আমার কাছে স্বীকার করেছে যে সে এক পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করে কবর দিয়েছে। ওই পাকিস্তানি তাকে খুন করতে চেয়েছিল।

এর পর থেকে আমরা বাঙালিদের আশ্রয় দিতে শুরু করি; বিশেষ করে যেসব হিন্দু বাঙালি নিরাপদ স্থানে পালানোর চেষ্টা করছিল, তাদের। আমাদের কর্মকর্তারা তাদের আশ্রয় দিয়েছিল। আমরা সবাই তা করছিলাম। ওয়াশিংটন থেকে আমাকে বলা হলো, আমাদের এই কর্মকাণ্ড তাঁরা জেনেছেন। আমরা যেন তা বন্ধ করি।

আমি জবাব দিলাম, যা করছি তা চলতে থাকবে। আমরা তাদের ফিরিয়ে দিতে পারি না। এরা কোনো রাজনৈতিক শরণার্থী নয়, এরা অত্যন্ত দরিদ্র, নি্নবিত্ত শ্রেণীর হিন্দু। শুধু হিন্দু বলেই তাদের হত্যা করা হবে-এমন ভয়াল আতঙ্ক গ্রাস করেছিল তাদের।

প্রেখ্‌টঃ আপনাদের কি হিন্দু কর্মকর্তা ছিলেন?

ব্লাডঃ হ্যাঁ। হিন্দু, মুসলিম-দুই ধর্মের কর্মকর্তাই ছিলেন। তাঁরা বেশ মিলেমিশে কাজ করতেন। এটা ছিল আরেক বিপদ। আমার মনে হয় না, আমি আশ্রয় দিতে নিষেধ করলেই তাঁরা সেটা মানতেন। আসলে স্বদেশি বাঙালিদের প্রতি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের কর্মকর্তারা তখন মানবিক সাড়া দিচ্ছিল। আমার বাসায় একদল বাঙালি পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। বাসার সামনেই তারা তাঁবু গাড়ে। বামপন্থীদের পক্ষ থেকে আমাকে হত্যার কয়েকটি হুমকির কারণে আমার বাড়ি পাহারা দিতে পুলিশ পাঠানো হয়। যুদ্ধ শুরু হলে তারাও তাদের জীবন নিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তারা তাদের সরকারি পোশাক খুলে ফেলে এবং আমার বাসার পেছনে মাটির নিচে অস্ত্র পুঁতে রাখে। পরে দায়িত্বপ্রাপ্ত এনসিও এসে আমাকে বলেন, যুদ্ধের সময় তিনি কিছু করেননি। তিনি পাকিস্তানি সেনাদের কাছে রাইফেল ফেরত দিতে চান। তাঁর ইচ্ছা, আমি তাঁর দায়দায়িত্ব নিই এবং তাঁকে নিয়ে সেনাক্যাম্পে যাই।

আমি রাইফেলগুলো ও তাঁকে নিয়ে কাছের পাকিস্তানি সেনাক্যাম্পে যাই। ভদ্রলোক কী করছিলেন, আমার আঙিনায় কেন রাইফেল রেখেছিলেন, এসব দিয়ে তিনি কী করেছিলেন-সবই খুলে বলি। আশা করি, তিনি নিরাপদে ছাড়া পেয়েছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিলাম আমাদের সরিয়ে নিতে ওয়াশিংটনের সুপারিশ চাওয়া দরকার। সময়টা এপ্রিলের মাঝামাঝি। ওয়াশিংটনের সুর পাল্টে গেল। আগে যেখানে বলা হতো, ‘যা কিছুই করতে চাও, শুধু আওয়াজ পাঠাও’। এখন বলা হলোঃ ‘অপেক্ষা করো। আমাদের ভাবতে দাও। তুমি কি সত্যিই তা করতে চাও?’

অবশেষে ওয়াশিংটন আমাদের সরিয়ে নিতে রাজি হলো। এবার গোঁ ধরল পাকিস্তান সরকার। তাদের কথা, যদি যেতেই হয় তাহলে আমাদের যেতে হবে ঢাকা থেকে করাচি এবং ব্যবহার করতে হবে পিআইএর বিমান। যেসব বিমানে পাকিস্তান থেকে এখানে সৈন্য আনা হচ্ছে, তাতেই তারা আমাদের ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়।

পাকিস্তানের প্রস্তাবে সম্মত হয় ওয়াশিংটন। আমাদের স্ত্রী, সন্তান, জরুরি প্রয়োজন নেই এমন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঢাকা থেকে শ্রীলঙ্কা হয়ে করাচিতে যেতে হলো। সময়ের হিসাবে তা নিউইয়র্ক থেকে লন্ডন যাওয়ার সমান। পাকিস্তান সরকারের আশঙ্কা ছিল, আমাদের লোকজনের কেউ কেউ শ্রীলঙ্কায় বিমান থেকে নেমে যেতে পারে। তাই বিমানে ওঠার পরপরই তাদের সবার পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়। পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া হয় করাচি নামার পর।

প্রেখ্‌টঃ আমেরিকান সাংবাদিকদের অবস্থান কী ছিল? তাঁরা কী পরিস্থিতি তুলে ধরছিলেন?

ব্লাডঃ মার্কিন নাগরিকদের প্রত্যাহারের পরদিন মার্কিনসহ সব বিদেশি সাংবাদিককে নিষিদ্ধ করা হয়।

প্রেখ্‌টঃ এটা কি প্রত্যাহারের দিন?

ব্লাডঃ না, না। মার্কিনিদের প্রত্যাহারের আগেই তাদের বিমানে তুলে বের করে দেওয়া হয়।

প্রেখ্‌টঃ কবে? হামলার দিন?

ব্লাডঃ আমার ধারণা, ২৬ মার্চ।

প্রেখ্‌টঃ তার মানে, কোনো মার্কিন সাংবাদিক ছিলেন না।

ব্লাডঃ না, ছিলেন, মাত্র দুজন। একজন এসেছিলেন গোপনে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে। আরেকজন পালিয়ে থেকে গিয়েছিলেন। আমরা আমাদের বাসভবনে তাঁদের লুকিয়ে রেখেছিলাম, যাতে তাঁরা তাঁদের কাজটা করতে পারেন।
প্রেখ্‌টঃ তাঁরা কি তাঁদের লেখা পাঠাতে পারতেন?

ব্লাডঃ পারতেন।

প্রেখ্‌টঃ আপনিও কি তাঁদের লেখা পাঠাতেন?

ব্লাডঃ হ্যাঁ, পাঠাতাম। ওই সময়ে অন্য কারও লেখা আমি এত বেশি পরিমাণে পড়িনি। কারণ বাণিজ্যিক ওয়্যারলেস তখন ছিল বন্ধ। আমাদের, মানে কনসাল জেনারেলদের নিজস্ব যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল। পাকিস্তানিদের দেওয়া সুবিধায় আমরা নির্ভর করিনি। তবে অধস্তন কর্মকর্তারা সেটা পারতেন না।

প্রেখ্‌টঃ আমরা জানি, ওয়াশিংটনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আপনি ও আপনার পদে কর্মরত অন্যদের বিরোধ তুঙ্গে উঠেছিল।

ব্লাডঃ আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে নিক্সন, কিসিঞ্জার ও তাঁদের লোকজন আমলাতন্ত্রের বিপক্ষে ছিলেন। অন্তত শেষ দিকে আমাদের এটাই মনে হয়েছে। আমি আমলাতন্ত্রের বাইরের লোক নই। ওয়াশিংটন গিয়ে আবিষ্কার করলাম, পররাষ্ট্র দপ্তরে কর্মরত প্রত্যেকেরই কার্যত আমাদের মতো অভিজ্ঞতা হয়েছে। বাইরে থেকে আমরা তা জানতাম না। আপনি জানেন, কীভাবে পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে নির্দেশনা আসে। কিন্তু বাস্তবে কারা এসব লিখছে তা কিন্তু আপনি বলতে পারবেন না।

প্রেখ্‌টঃ আপনার একটা ধারণা ছিল, আপনার ও ওয়াশিংটনের মত ভিন্ন-বিশেষত মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করে কীভাবে সংকট নিরসন করা যাবে, সে বিষয়ে।

ব্লাডঃ হ্যাঁ।

প্রেখ্‌টঃ অথবা যেভাবে ঘটনা ঘটছিল তা নিয়ে ধারণাগত ভিন্নতা ছিল। আমি বলতে চাইছি, এই মতদ্বৈধতা কি সুনির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে ছিল? এটা কি মার্কিনিদের প্রত্যাহারের বিষয়ে, নাকি আগের প্রতিবেদনগুলো নিয়ে?

ব্লাডঃ এটা সুনির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে এটা হতে পারে ২৫ মার্চের হামলার পর, যখন আমরা ওয়াশিংটনকে জানাতে থাকলাম। আমরা সেটা করেছিলাম কোনো রাখঢাক না রেখে। কূটনৈতিক সৌন্দর্যের ছদ্মাবরণে আমরা সেটা ঢেকে দিইনি। ওই রাতে সম্ভবত পাঁচ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়। আমাদের কাছে প্রমাণও ছিল। গ্রামাঞ্চলে আমাদের ক্যাথলিক যাজক ছিলেন। পাকিস্তানি সেনারা হিন্দু অধুøষিত গ্রামগুলোয় মেশিনগান নিয়ে হামলা করার সময় তাঁরা জীবন বাঁচাতে ক্যাথলিক মিশনে আশ্রয় নেন। আহতদের চিকিৎসার জন্য আমরা সেখানে আমেরিকান ডাক্তার পাঠিয়েছিলাম। আসলে তাঁরা স্ব-উদ্যোগেই সেখানে যান। এ রকম মার্কিন প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়েও নৃশংসতার খবর পাঠাচ্ছিলাম।

প্রেখ্‌টঃ আর দূতাবাস?

ব্লাডঃ কিন্তু ভিন্নমতের রিপোর্ট ছিল যে···

প্রেখ্‌টঃ এ বিষয়ে আলোচনার আগে দূতাবাসের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বলুন। তাঁরা আপনাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করেছেন? তাঁরা কি আপনাদের সমর্থন জুগিয়েছেন, নাকি সমালোচনা করেছেন, নাকি হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন? আপনাদের প্রতিবেদন তাঁরা কীভাবে মূল্যায়ন করতেন? তাঁদের নিশ্চয়ই কিছু ধারণা ছিল।

ব্লাডঃ যত দূর মনে পড়ে, তাঁরা আমাদের প্রতিবেদন সন্দেহের চোখে দেখতেন-আমরা আসলেই ঠিক ঠিক তাঁদের জানাচ্ছি কি না।
প্রেখ্‌টঃ তাঁরা যেমনটি আশা করছিলেন আপনারা তেমনটি বলছিলেন না।

ব্লাডঃ হ্যাঁ, তাই।

প্রেখ্‌টঃ আপনি এই ‘ভিন্নমতের প্রতিবেদন’ কখন পাঠিয়েছিলেন?

ব্লাডঃ সঠিক তারিখটা মনে নেই।

প্রেখ্‌টঃ মার্কিনিদের প্রত্যাহারের পর?

ব্লাডঃ না, প্রত্যাহারের আগে।

প্রেখ্‌টঃ এপ্রিলে?

ব্লাডঃ প্রত্যাহারের আগে। এপ্রিলের প্রথমার্ধের কোনো এক সময়ে হবে। আমার কর্মীদের মধ্য থেকে ১২-১৩ জন ভিন্ন মতের বার্তাটির খসড়া তৈরি করেছিলেন। সেটা আমি করিনি। তাঁরা আমার কাছে এসে বললেন, ‘আমরা এই বিবৃতি পাঠাতে চাই। যুক্তরাষ্ট্র এই নৃশংসতার নিন্দা জানাতে ব্যর্থ হওয়ায় আমরা খুবই হতাশ।’ এঁরা ছিলেন এআইডি, ইউএসআইএতে কর্মরত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। আমি সেটা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিই এবং পাঠিয়েও দিই। সঙ্গে এর সমর্থনে দীর্ঘ একটি বিবৃতিও পাঠাই। তাতে লিখি, ‘আমি নিজে এটা লিখিনি। আমাকে এটা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এঁরা সবাই আমার সেরা কর্মকর্তা। তাঁরা যা বলছেন, আমি তা বিশ্বাস করি। তাঁদের আবেগ-অনুভূতির সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত।’ অনেকটা গোপনেই এটা পাঠিয়েছিলাম।

প্রেখ্‌টঃ হেনরি কিসিঞ্জার বলেছেন, আপনি এটা এমন গুরুত্বহীনভাবে পাঠিয়েছেন যে তা ফাঁস হয়ে যেতে পারত।

ব্লাডঃ সেটা ঠিক নয়। আমার এটা শীর্ষ পর্যায়ে পাঠানো উচিত ছিল। ‘গোপনীয় (সীমিত বিতরণ)’ শব্দটা আমরা সর্বোচ্চ পর্যায়ের কোনো কিছুতে ব্যবহার করতাম। এখন যেমন কোনো কিছুতে ‘এক্সডিস’ লিখলে সেটা ওপরমহলকে নির্দেশ করে। আমার তা লেখা উচিত ছিল। এবার মনে পড়েছে। আমরা এটা পাঠিয়েছি দূতাবাসে, ওয়াশিংটনে এবং পাকিস্তানে অন্যান্য কর্মকর্তার কাছে। দূতাবাস অবশ্যই অন্যান্য কর্মকর্তার কাছ থেকে তা তাৎক্ষণিকভাবে কব্জায় নিয়ে নেয়।

প্রেখ্‌টঃ দূতাবাসের প্রতিক্রিয়া কী ছিল?

ব্লাডঃ রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সে সময়ে আমার কখনো কোনো কটুবাক্য বিনিময় হয়নি।

প্রেখ্‌টঃ মানে দূতাবাস থেকে আপনি বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া পাননি। ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়া কী ছিল? কেউ কি এর কোনো জবাব দিয়েছিল? কেউ কি বলেছিল-আপনি ঠিক বা আপনি ভুল করেছেন?

ব্লাডঃ আমরা খবরের কাগজ পেতে শুরু করলাম। কিন্তু তখন···

প্রেখ্‌টঃ তা ফাঁস হয়ে যায়।

ব্লাডঃ তখন আমরা জানতে পারি, তা ফাঁস হয়ে গেছে।

প্রেখ্‌টঃ ভিন্নমতের চিঠিটি ফাঁস হওয়ার ঘটনা ঢাকায় আপনার কাজ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কী প্রভাব ফেলেছিল? আপনি কি বাঙালি রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছিলেন?

ব্লাডঃ না, তাদের অনেককেই মেরে ফেলা হয়েছে বা অনেকে আত্মগোপনে চলে গেছেন। অবশ্য পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তারা আমাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য খুবই উদ্বিগ্ন ছিলেন।

পাঞ্জাবের গভর্নর টিক্কা খানকে গভর্নর হিসেবে ঢাকায় পাঠানো হলো। তিনি সেনাবাহিনীর একজন লেফটেন্যান্ট জেনারেল। বেলুচিস্তানে লৌহমানব হিসেবে তিনি পরিচিতি পেয়েছিলেন। সামরিক হামলার পরপরই তিনি শপথ নেন। সে অনুষ্ঠানে আমি না গিয়ে একজন জুনিয়র অফিসারকে পাঠাই। একদিন বিকেলে কাজ শেষে আমি অফিস থেকে বেরোচ্ছি। এমন সময় জিপে করে পাকিস্তানি এক সেনা ক্যাপ্টেন আসেন। সঙ্গে রিভলবার। আমাকে তিনি বলেন, ‘গভর্নর আপনাকে তাঁর অফিসে নিয়ে যেতে বলেছেন।’ আমি গেলাম। তাঁর সঙ্গে গালগল্প হলো। পরদিন খবরের কাগজে বেরোলো, ‘আমেরিকান কনসাল জেনারেল গভর্নরের সঙ্গে দেখা করেছেন।’ কিন্তু আমি সেটা করেছিলাম অস্ত্রের মুখে। 
 

**************************
লেখকঃ  আর্চার কে ব্লাড
দৈনিক প্রথম আলো, ১৬ ডিসেম্বর ২০০৭