- Home
- বিজয় দিবসঃ ১৬ই ডিসেম্বর
- যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও জাতীয় অপরাধবোধ
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও জাতীয় অপরাধবোধ
- By Article Poster
- Published 12/16/2007
- বিজয় দিবসঃ ১৬ই ডিসেম্বর
- Unrated
স্বাধীনতা যুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের নেতারা তাঁদের বক্তব্য ও বিবৃতির মধ্য দিয়ে যে স্পর্ধা দেখিয়ে চলেছেন, তাতে পুরো জাতির সঙ্গে আমরাও বি্নিত হয়েছি, হয়েছি ক্ষুব্ধ। আবার শংকিত হয়েছি এই ভেবে যে ক্ষুদ্র এই দলের শক্তির উৎস তাহলে কোথায়। কোন জোরে তারা মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে এতটুকুও কুণ্ঠা বোধ করছে না। জামায়াতে ইসলামী তাদের সংগঠনের নামের পর বাংলাদেশ লেখে, আমরা এর নৈতিক ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলতে চাই। কেননা, বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হোক, ইতিহাস সাক্ষী, জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মী, যাঁরা এখনো তাঁদের দলের বিভিন্ন পদে আসীন, তাঁরা তা চাননি। বাংলাদেশ যেন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে না পারে সে জন্য হত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজসহ সব চেষ্টাই তাঁরা করেছিলেন। স্বাধীনতার পরেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তাঁরা দিনের পর দিন বিরূপ প্রচারণা চালিয়েছেন। এর জন্য বেশি গবেষণা-অনুসন্ধানের দরকার পড়ে না, জামায়াতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম-এর একাত্তর ও তৎপরবর্তী ইসুøগুলো দেখলেই এর প্রমাণ মিলবে।
মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকার কারণে ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ভূখণ্ডে জামায়াতে ইসলামীর কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ছিল। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর জামায়াতে ইসলামী এ দেশে আবার তাদের কর্মকাণ্ড আরম্ভ করে। ১৯৯২ সালে শহীদ-জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে যে আন্দোলন হয়েছিল, তাতে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। গণ-আদালতে বিচার হয় জামায়াতে ইসলামীর এমন অনেক নেতার, যাঁরা যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এ আদালতের রায় তৎকালীন সরকার কার্যকর না করলেও জনমত গঠনে এটি ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল, বিশেষ করে তরুণ প্রজ্নের ওপর, যারা ঠিক সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভ করার সুযোগ পায়নি। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ওই আন্দোলনের ফলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা/দেশ কর্তৃক আশীর্বাদপুষ্ট হওয়া সত্ত্বেও জামায়াতের জনসমর্থন কমতে থাকে। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ২২২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১৮টি আসনে জয়ী হয়, কিন্তু ’৯৬ সালের নির্বাচনে জামায়াত ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোট পায় ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ, আসন পায় মাত্র তিনটি। ২০০১ সালের নির্বাচনে জামায়াত বিএনপির সঙ্গে জোট করে ১৭টি আসন পায়। এ নির্বাচনে জামায়াত এককভাবে ভোট পায় ৪ দশমিক ২৯ শতাংশ।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট জাতীয় সংসদের দুই-তৃতীয়াংশের অধিক আসনে জয়লাভ করলে ক্ষমতার ভারসাম্যে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়; এবং গণতন্ত্র বিকাশের জন্য এটি যে স্বাস্থ্যকর ছিল না, বিগত বছরগুলোতে তার প্রমাণ আমরা পেয়েছি। বিএনপির সঙ্গে সরকার গঠনের পর জামায়াত স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নানা সুযোগ ব্যবহার করে তখন থেকে তারা ধর্মভিত্তিক চরমপন্থী দলগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে থাকে, যাদের ধারাবাহিক ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের জন্য এক বিরাট সমস্যা হয়ে দেখা দেয়।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে আমরা বিভিন্ন সময়ে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের প্রতিক্রিয়াশীল ও উগ্র কর্মকাণ্ড দেখে আসছি। ১৯৭১ সালে তারা ধর্মের নামে খুন, ধর্ষণ, লুটতরাজসহ কোনো অপকর্ম করতে বাকি রাখেনি। বারবার আমরা ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অশুভ প্রভাব লক্ষ করেছি। বিভিন্ন সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষেধের কথা বলা হলেও ১৯৭৫ সালের পর রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের তরফ থেকে এ ব্যাপারে তেমন একটা কথাবার্তা শোনা যায়নি। সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড· এ টি এম শামসুল হুদা ও প্রধান উপদেষ্টা ড· ফখরুদ্দীন আহমদ যুদ্ধাপরাধীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ অনভিপ্রেত বলে মন্তব্য করেছেন। আমাদের কাছে এটা ইতিবাচক বলে মনে হয়েছে।
নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু করার জন্য বর্তমান সরকার ইতিমধ্যে অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তারা যদি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ গ্রহণ করে, তাহলে তা শুধু নির্বাচনকেই কলুষমুক্ত করবে না, এটি পুরো জাতিকে দীর্ঘদিনের অপরাধবোধ থেকে মুক্তি দেবে। নির্বাচনকে সুষ্ঠু, অবাধ ও অর্থপূর্ণ করার জন্য আমরা ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি জানাচ্ছি। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মূল সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদের অনুশর্ত বাদ দেওয়ার পর ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো রাজনীতি করার অধিকার লাভ করে। তবে এখনো বর্তমান সরকার বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২০ ধারা অনুযায়ী ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে পারে।
পৃথিবীর সব সভ্য দেশ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে যথোপযুক্ত শাস্তি দিয়েছে। জার্মানির সংবিধানে সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে সে দেশের কোনো নাগরিক যদি নাৎসি বাহিনীর নির্যাতন ও গণহত্যাকে অস্বীকার করে, তবে তা হবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। হিটলারের বর্বরতা সে দেশের পাঠ্য বইগুলোতে যথার্থভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তাহলে আমরা কী করে নিজেদের সভ্য বলে দাবি করি তা ভাবতে আমাদের অবাক লাগে।
১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার তো দূরে থাক, আমরা তাদের রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছি, আর তারই ধারাবাহিকতায় তারা এখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেন, মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে অশালীন উক্তি করেন। আমাদের দাবি, অবিলম্বে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (টাইব্যুনালস) আইনের অধীনে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে প্রসিকিউটর নিয়োগ করা হোক, যাতে করে তারা খুঁজে বের করতে পারে কারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তান-বাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেছিল। কারা সাধারণ বাঙালি, মুক্তিযোদ্ধা ও বুদ্ধিজীবীদের খুন করেছিল, কারা নারীদের শ্লীলতাহানিসহ অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল। তদন্ত থেকে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ জোগাড় করার পর অবিলম্বে রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর সদস্য, যাদের বিরুদ্ধে হত্যাসহ সুনির্দিষ্ট অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিচার কার্যক্রম শুরু করার উদ্যোগ গ্রহণের জন্য আমরা সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছি।
১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের সরল পাঠ থেকে এটা স্পষ্ট যে ট্রাইব্যুনাল গঠন, প্রসিকিউটর নিয়োগ, তদন্তের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ-সবই করতে হবে সরকারকে। এখানে ব্যক্তি উদ্যোগের কোনো সুযোগ নেই। প্রচলিত আইনে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে যেখানে রাষ্ট্র সংক্ষুব্ধ হয় এবং রাষ্ট্রকেই বাদী হয়ে মামলা করতে হয়। যুদ্ধাপরাধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্ব তা-ই এবং আরও অনেক বেশি। বিশেষ করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে জামায়াতের নেতাদের সর্বাত্মক বিরোধিতা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন-মরণ লড়াইয়ের নথিবদ্ধ দালিলিক ইতিহাস রয়েছে। সে জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রের যেমন দায় রয়েছে, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের বিচারের ব্যাপারেও রাষ্ট্র তার দায় এড়াতে পারে না। রাষ্ট্র যদি তার এই দায় অস্বীকার করে, তবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইনগত ও নৈতিক ভিত্তি অত্যন্ত নড়বড়ে হয়ে যাবে। এক গুমোট জাতীয় অপরাধবোধ সংক্রমিত হয়ে চলবে বাঙালি জাতির অস্তিত্বের মধ্যে, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে।
বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে মানুষের জীবন যখন বিপর্যস্ত, বিদ্যুৎ ও সার সংকট, বিশেষ করে দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতিতে মানুষ যখন দিশেহারা, তখন যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টিকে সামনে এনে আমরা মূল সমস্যা থেকে জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন দিকে সরাতে চাইছি না। উল্লিখিত সমস্যাগুলো সমাধানে যেখানে সরকারের প্রচুর জনবল, অর্থবল এবং বিদেশি সাহায্য প্রয়োজন হবে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য এর কোনো কিছুই প্রয়োজন নেই। বিজয়ের এই মাসে সরকার যদি কয়েকটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দেয় এবং কয়েকজন প্রসিকিউটর নিয়োগ করে দেয়, তাহলে জনগণ, সুশীল সমাজ ও শহীদ পরিবারের সহযোগিতায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার রক্তস্মাত এই বাংলার মাটিতেই সফলভাবে করা সম্ভব বলে আমরা বিশ্বাস করি।
**************************
লেখকঃ হাফিজুর রহমান কার্জন, শামীম রেজা, মু· জিয়াউর রহমান, জিনাত হুদা অহিদ, মশিউর রহমান, এ কে এম গোলাম রব্বানী, সুমন কান্তি বড়ুয়া, ইসরাফিল শাহীন ও রোবায়েত ফেরদৌস
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক।
দৈনিক প্রথম আলো, ১৬ ডিসেম্বর ২০০৭