১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা শুধু গৌরবোজ্জ্বল স্বাধীনতাই অর্জন করিনি, অর্জন করেছি গোটা জাতির জন্য পরম অহঙ্কার, পরম গর্ব। এই মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর কিছুসংখ্যক রাজাকার, আলবদর ছাড়া গোটা বাঙালি জাতিই অংশ নিয়েছিল-কেউ বা অস্ত্র-হাতে, কেউ বা অন্য কোনো উপায়ে। কেউ বা মুক্তিযোদ্ধাদের গোপনে আশ্রয় দিয়েছেন, কেউ বা ততোধিক গোপনে শত্রুসেনাদের অবস্থানের খবর এনে দিয়েছেন। গোটা জাতির এই ঐক্যবদ্ধতা, লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিষ্ঠা, দৃঢ়তা ও সাহসিকতা এ স্বাধীনতা অর্জনে প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল।
এ বিজয়ের প্রধান শক্তি বাঙালি জাতি হলেও তার এই সুমহান স্বাধীনতাযুদ্ধের পক্ষে গোটা বিশ্বেরই ছিল নৈতিক ও বৈষয়িক সমর্থন। প্রতিবেশী বন্ধুদেশ ভারতের কাছে আমাদের সেদিনকার ঋণ কখনো পরিশোধ করা যাবে না। তাৎক্ষণিকভাবেই প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন ভারত সরকার আমাদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছিল। আমাদের তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়ে, প্রশিক্ষণ দিয়ে, অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেছিল। প্রায় এক কোটির মতো শরণার্থীকে দীর্ঘ নয় মাস আশ্রয়, খাবার ও পরিধেয় বস্ত্রাদি দিয়ে যে অকল্পনীয় সাহায্য-সহযোগিতা করেছিল, তা ভোলার নয়। এ ছাড়া ভারতবর্ষ বিশ্বব্যাপী আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে এক সফল কূটনেতিক অভিযান চালিয়েছিল, যার ফলে আমরা সেদিন তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের ব্যাপক সমর্থন লাভ করেছিলাম। এদের ঋণও পরিশোধযোগ্য নয়। জাতিসংঘে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে আনা মার্কিন প্রস্তাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন বারবার ভেটো দেয়। দুঃখজনক হলেও সত্য যে সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সেদিন হাত মিলিয়েছিল চীনও। কিন্তু চীন-মার্কিন ও আরব দুনিয়ার বিরোধিতা সত্ত্বেও বাঙালি জাতির ঐক্যবদ্ধ শক্তি এবং ওপরে বর্ণিত বৈদেশিক সাহায্য-সহযোগিতার সম্মিলিত ফসল হলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন।

কিন্তু বাঙালি জাতি সীমাহীন দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে, ৩০ লাখ প্রাণের বিনিময়ে যে মহান স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, আজ সেই বিজয়, সেই স্বাধীনতা যেন অনেকটাই ্লান, বিবর্ণ এবং লক্ষ্যহীনতায় আক্রান্ত। কিন্তু কেন?
বাংলাদেশের যে পরিমাণ সম্পদ, যে পরিমাণ সামর্থ্য রয়েছে, তাতে এ দেশের এখনো পৃথিবীর অন্যতম দরিদ্রতম রাষ্ট্র হয়ে থাকার কোনো যুক্তিসংগত কারণ আছে কি? যেটুকু অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিগত ৩৬ বছরে অর্জিত হয়েছে, তাও প্রধানত বিদেশনির্ভর। কোটি কোটি মানুষ আজও দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। কৃষি খাত আজও মান্ধাতা আমলেরই রয়ে গেছে। বেকারত্বের অভিশাপে কোটি কেটি সম্ভাবনাময় যুবক-যুবতী দিশেহারা। ধর্মীয় উগ্রতা, সাম্প্রদায়িকতা ক্রমশই যেন পাকিস্তান আমলকে ছাড়িয়ে যেতে চাইছে। ধনী-গরিবে বৈষম্য, ধর্মীয় সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘুতে বৈষম্য, নারী-পুরুষে বৈষম্য আমাদের সমাজ-জীবনকে কুরে কুরে খাচ্ছে। তদুপরি রয়েছে বহুদিন ধরে চলে আসা বাঙালি-আদিবাসী বৈষম্য।

সুশাসন বলতে যা বোঝায়, তা আমরা আজও অর্জন করতে পারিনি। গণতন্ত্র? তাও যেন মরীচিকা। জাতি প্রধানত দুটি দলে বিভক্ত। দল দুটিতে আজও অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র অর্জিত হয়নি। তেমনই আবার দুই বড় দলের দুই নেত্রী পর্যায়ক্রমে প্রধানমন্ত্রী অথবা বিরোধীদলীয় নেত্রীর আসন অলংকৃত করলেও জাতীয় স্বার্থ নিয়ে তাঁরা কখনো আলোচনায় বসতে পারেন না। ফলে গণতন্ত্রের, বিশেষ করে সংসদীয় গণতন্ত্রের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি যে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, তা কখনো দেখা যায়নি। সৃষ্টি হয়নি পারস্পরিক সমঝোতা বা সহযোগিতার পরিবেশ। বরং দলগুলোর মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক অবিশ্বাস, সন্দেহ এবং তা থেকে রাজনীতিতে আমদনি হচ্ছে সহিংসতার।

শিল্পের বিকাশ না ঘটায় এবং মানসম্মত উৎপাদন না হওয়ায় আমরা রয়েছি আমদানিনির্ভর একটি জাতি হিসেবে। শ্রমজীবী মানুষের কাজের সুযোগ তাই সৃষ্টি হতে পারছে না, ফলে দারিদ্র্য দূরীকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি সাফল্যের মুখ দেখে না।

শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের অবস্থার কথা কারও অজানা নেই। দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক মান তালিকায় ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। মানসম্পন্ন শিক্ষার দিকে অগ্রসর হওয়া জরুরি কর্তব্য হলেও এ ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী কোনো পরিবর্তনের লক্ষণ আজও পরিদৃষ্ট হচ্ছে না। ফলে জীবনের নানা ক্ষেত্রে আমরা আধুনিকতার ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতা সংগ্রামের লক্ষ্য তো এ রকম ছিল না। বরং যে মহান লক্ষ্যে আমাদের শহীদেরা আত্মদান করেছেন, যাঁরা লুণ্ঠিত ও নির্যাতিত হয়েছেন, যাঁরা নানাভাবে অত্যাচারিত ও নিগৃহীত হয়েছেন, তাঁদের সবারই লক্ষ্য ছিল একটি উন্নত বাংলাদেশ, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা। যে বাংলাদেশ হবে সকল প্রকার বৈষম্যমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত, স্বাবলম্বী ও শোষণমুক্ত। সেই লক্ষ্যটি আজও অপূর্ণ রয়ে গেছে মূলত প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের ব্যর্থতার জন্য। তাদের কারণেই দেশবাসী দেখতে পেয়েছে ব্যাপক দুর্নীতি, স্বজনপ্রিয়তা, ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থের নির্লজ্জ প্রকাশ, নির্বাচনে নগ্ন মনোনয়ন-বাণিজ্য, প্রশাসনসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে স্থবির করে দেওয়া। এসব কারণে আমাদের জাতীয় অগ্রগতি কেবলই বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে।

আমাদের সমুদ্র, আমাদের পাহাড়, আমাদের খনিগুলো, আমাদের বনজ সম্পদ-সবই লুণ্ঠিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আমাদের ভাষা-শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিও যথেষ্ট পরিমাণে এগোতে পারেনি, যদিও আমাদের রয়েছে ভাষা আন্দোলনের এক গর্বিত ইতিহাস। আজ যেন আমরা ভুলেই যেতে বসেছি যে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ আদৌ সম্ভব হতো না, যদি না ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে জাতীয়তাবোধের ব্যাপক উ্নেষ ঘটত। আমরা যেন এক চরম বি্নৃতিপ্রবণ জাতিতে পরিণত হয়েছি। ভুলে যেতে বসেছি আমাদের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আন্দোলনের সুমহান ঐতিহ্য। ইতিহাস-ঐতিহ্যকে শুধু ভুলে যেতে বসেছি তা নয়, অনেকে তা বিকৃত করারও অপচেষ্টা করে যাচ্ছি।

নেতিবাচক দিকগুলোর দিকে নজর রেখে, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে বরং আজকের দিনে আমাদের নতুন করে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন, যাতে আমরা আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে একটি সুখী, সুন্দর, উন্নত ও অগ্রসরমাণ বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারি। তাতেই রয়েছে আজকে বিজয় দিবস পালনের সার্থকতা।

**************************
লেখকঃ  রণেশ মৈত্র
মুক্তিযোদ্ধা। রাজনীতিবিদ।
দৈনিক প্রথম আলো, ১৬ ডিসেম্বর ২০০৭