১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাস। চারদিকে কনকনে শীত। এই শীতের ভেতর ৬ ডিসেম্বর ভারতের স্বীকৃতি লাভ! মুক্তি ও মিত্র বাহিনীর যৌথ কমান্ডে পরিচালিত যুদ্ধে একেকটি বিজয়ের সংবাদ। আকাশে বিমানের শব্দে ভয় নেই যেন কারও। ‘ওই বিমান পাক বাহিনীর না মিত্র বাহিনীর-সেই প্রশ্ন অবান্তর। সব বিমানই মিত্র বাহিনীর! আমাদের বিজয় অবশ্যম্ভাবী। আট মাসের বিনিদ্র রজনীর অবসান সমাগত প্রায়।’ এ রকম অনুভূতি আমাদের।
৭ ডিসেম্বর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভাষণ দিয়েছেন। তাঁর ভাষণ প্রচারিত হয়েছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে। ওই ভাষণে তিনি বিজয়ের আসন্ন বার্তা দিয়েছেন। মুক্তিবাহিনী ও মিত্র বাহিনীর জওয়ানদের উৎসাহিত করেছেন। দেশের আগামী দিনগুলোয় শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সমাজের কথা বলেছেন। পররাষ্ট্রনীতিতে জোটনিরপেক্ষতার কথা বলেছেন। একটি সদ্য স্বাধীন দেশের বিপ্লবী গণতান্ত্রিক সরকারের যে বক্তব্য হওয়া উচিত ছিল, ওই ভাষণে তা ছিল পূর্ণমাত্রায়। তার পরও তিনি অভ্যন্তরীণ ও বহিঃশত্রুর ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা করেছেন। ওই সব শত্রু থেকে সাবধান থাকতে অনুরোধ জানিয়েছেন।

আমরা মুক্তিবাহিনীর শিবিরে বসে ওই ভাষণ শুনি। আমাদের পত্রিকা অফিসের সবাই আসন্ন স্বাধীনতার ঊষালগ্ন দেখার প্রত্যাশায় উজ্জীবিত। আমরা আমাদের পত্রিকা অফিসের জন্য সরবরাহকৃত অস্ত্রগুলোতে হাত বোলাই। এসএমজি পরিষ্কার করি। গ্রেনেডগুলোও পরিষ্কার করি।
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির ভাষণের পর মনে করি আমাদের এ মুহূর্তে দায়িত্ব অনেক। তাড়াতাড়ি পত্রিকার সংখ্যা বের করতে হবে। রাষ্ট্রপতির ভাষণের সতর্কতার দিকগুলো প্রচার করতে হবে। শাকের ভাই (মসিহউদ্দিন শাকের, পরবর্তী সময়ে সূর্য দীঘল বাড়ী চলচ্চিত্রের পরিচালক) কাগজ-কলম নিয়ে বসে যান। অল্পক্ষণের ভেতর লিখে ফেলেন ‘চূড়ান্ত মুহূর্তের আবেদন’। আমি ওই কাগজ নিয়ে স্টেনসিলে হাত লাগাই। অল্পক্ষণের ভেতর লিখে ফেলি। করটিয়া সা’দত কলেজের ছাত্র আব্দুল খালেক ডুপ্লিকেট মেশিন চালু করে দেন (আব্দুল খালেক আমাদের ক্যাম্পে ‘ডুপ্লিকেট বিশেষজ্ঞ’ রূপে অভিহিত)। আমাদের চূড়ান্ত মুহূর্তের আবেদনের ছাপা শেষ। মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পগুলোয় পৌঁছে দেওয়া হয় প্রচারপত্র। প্রচারপত্র বিলি করা হয় ময়মনসিংহ সদর দক্ষিণ ও ঢাকা সদর উত্তর সাব-সেক্টরের বিভিন্ন এলাকায়। যোগাযোগহীন ওই অবস্থায় এক দিনের ভেতরেই প্রায় প্রত্যেক গ্রামে বিলি করা হয় চূড়ান্ত মুহূর্তের আবেদন।

২·
একাত্তরের তিন যুগ পরের ডিসেম্বর চলছে। আমি এখন প্রৌঢ়ত্বের দ্বারগোড়ায়। সবখানে যেন একধরনের দমবদ্ধকর পরিবেশ। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর মূল্য আকাশচুম্বী। সমাজে নিঃস্বকরণ প্রক্রিয়ায় অতিদরিদ্রের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। অন্যদিকে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলছে মুষ্টিমেয় লুটেরাগোষ্ঠী। শিক্ষা আজ অর্থের হাতে বন্দী। টাকা ছাড়া শিক্ষালাভের সুযোগ নেই। গ্রামবাংলায় আধুনিক শিক্ষার নামে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার সংখ্যা বাড়ছে। উন্নয়নের মাপকাঠিতে বিশ্বে আমাদের অবস্থান হয়ে পড়ছে নিন্মমুখী।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মৌন মিছিল করার অজুহাতে এই ডিসেম্বরে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই শিক্ষকদের মূল অপরাধ তাঁরা প্রগতির কথা বলেন, অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলেন। তাঁরা শিক্ষক হিসেবে আপন আদর্শবোধে তাড়িত। ছাত্রদের মুক্তচিন্তার আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়তে চান তাঁরা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে তাঁদের রয়েছে অন্তর্গত ঐকতান।

স্বাধীনতার তিন যুগ পরেও এ দেশে প্রগতিশীল ব্যক্তিরা মৌলবাদীদের হামলার শিকার হন। মিথ্যা অপবাদ দিয়ে বিভিন্ন সংগঠন, পত্রিকার বিরুদ্ধে মিছিল হয়। ধর্মের নামে মানুষ মানুষকে গালি দেয়; কাফের, মুরতাদ বলে। একাত্তরে যারা পালিয়ে বেঁচেছিল, তারা এখন মাথা উঁচু করে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধাপরাধী বলে আখ্যায়িত করে; দেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়নি বলে মন্তব্য করে! পাকিস্তান রক্ষার নামে পাক বাহিনীর সহযোগী হওয়ার পক্ষে যুক্তি দেখায়। এসব আমরা শুনি। এসব দেখে ও শুনে নিজের ভেতর কেমন জানি একধরনের তাগিদ অনুভব করি। মনে হয়, শত্রুবেষ্টিত সমাজকাঠামোয় আবার একটা আঘাত প্রয়োজন। আবার একটা চূড়ান্ত মুহূর্তের আবেদন প্রয়োজন। উত্তর প্রজ্ন দায়িত্ব নেবে কি সেই আবেদন লেখার?

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত প্রচারপত্রটি নি্নে হুবুহু তুলে দেওয়া হলো।

চূড়ান্ত মুহূর্তের আবেদন
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের এক বিশেষ পর্যায়ে এসে গেছি আমরা। কার্যতঃ ভারতও আমাদের পরিপূর্ণ স্বীকৃতি দিয়ে ফেলেছে ৪ঠা ডিসেম্বরের এক বেতার প্রচারের মাধ্যমে। আকাশবাণী থেকে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের অত্যধিক বাড়াবাড়ির পরিপ্রেক্ষিতে ভারত যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে; তবে তার কাজ হবে বাংলাদেশে বাঙালীদের উপর গত আট মাস ধরে অকথ্য নির্যাতনকারী নরপশু পাকবাহিনীকে আত্মসমর্পণ করানো, তথা বাংলাদেশের সরকারের হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়া-ভারতের নিজস্ব স্বার্থে লড়াই চালিয়ে যাওয়া নয়।
এ এক বিরাট সুসংবাদ! বুঝতে হবে আমাদের বিজয়ের সর্বশেষ পর্যায় এটাই। আর সে জন্যেই এত দিনের সংগ্রামী বাংগালীকে এবারে যেতে হবে আরও কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে। বিশ্বমানবতার শত্রু সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা একদিকে এ ক’ মাস ধরে অস্ত্রসস্ত্র ও গোলাবারুদ দিয়ে সাহায্য করে এসেছে বর্বর ইয়াহিয়ার জঙ্গীশাহীকে এবং নেহাত দায়ে পড়া ভাবে ভারতে আশ্রিত এক কোটী মানুষের জন্যে পাঠিয়েছে নামমাত্র সাহায্যদ্রব্য, কিন্তু একবারও ‘বাংলার মানুষ আজ কেন বিদেশে শরণার্থী হ’ল?’-এ বিষয়টির প্রতিকারে এগিয়ে আসেনিঃ আর যখন আমরা আমাদের চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করতে চলেছি, আমেরিকা এসেছে শান্তির বুলি নিয়ে। নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব উত্থাপন করেছে অবিলম্বে যেন পাকভারত যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যায়। আমাদের প্রশ্ন, এটা কি আদৌ পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধ? এ যুদ্ধ স্বাধীনতাকামী বাংগালীদের বিরুদ্ধে অত্যাচারী উপনিবেশবাদী পাকিস্তানের। কাজেই ভারতের এ থেকে সরে দাড়ানোর কোনোই মানে হয় না। অবশ্য আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন আমেরিকার এ ধৃষ্টতাকে নাকচ করে দিয়েছে জাতিসংঘের দরবারে। মুনাফেক মার্কিনী দসুø, যার হাত ভিয়েতনামী মা ও শিশুদের তাজা রক্তে ভেজা, সে চায় আজ নিরাপত্তা পরিষদের মধ্যস্থতা।

দেশবাসীগণ, আপনারা এ চক্রান্তে কখনও বিভ্রান্ত হবেন না। বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী চক্রের তাঁবেদার ও পাঞ্জাবী ধনিকদের অস্ত্রধারী-পেয়াদা ইয়াহিয়ার জমজ আইয়ুবের সময়ে পাকিস্তান থেকে আরও একবার হামলা হয়েছিল শান্তিপ্রিয় ভারতের উপর; এবং দেশে জারী হয়েছিলো জরুরী আইন, দেশরক্ষাবিধি প্রভৃতি কালা কানুন-সবই জনসাধারণের গণ-তান্ত্রিক আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্যে। এবারও ইসলামের নামে সেই পুরানো ধুয়ো তোলা হচ্ছে। এসব অপপ্রচার থেকে সদা সতর্ক থাকুন! এছাড়াও রয়েছে তথাকথিত সমাজবাদী গণ-চীন। যখন গ্রামবাংলার পথেঘাটে লক্ষ লক্ষ নিরীহ জনতা অসহায়ত্বের শিকার হয়েছে পাক-দসুøদের অত্যাচারের, তখন চীন বলেছে এ-টা নিতান্ত পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার। সম্প্রতি সে আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের বিরুদ্ধেও প্রচারণা শুরু করেছে। কিন্তু আমরা ভুলে যাইনি ১৯৬২ সালে চীনই আক্নিকভাবে আক্রমণ করেছিল ভারতকে; এবং মাত্র গতবছরও সে সোভিয়েত ইউনিয়নের সীমান্তে শুরু করেছিল ধ্বংশাত্মক অভিযান। অতএব চীন সম্পর্কেও সাবধান থাকুন; বস্তুতঃ সে আমেরিকারই দোসর!

জনগণের প্রতি নির্দেশাবলীঃ
১। গুজবে কান দেবেন না; গুজব রটনাকারীকে ধরিয়ে দিন।
২। মুক্তিযুদ্ধের পরিকল্পনার কথা গোপন রাখুন।
৩। পাক বাহিনীর গতিবিধির খবর মুক্তিবাহিনীকে জানিয়ে দিন।
৪। শত্রুর সরবরাহ সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে দিন।
৫। বিমান আক্রমণের সময় নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিন।
৬। মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বতোভাবে সাহায্য করুন।
মনে রাখবেন, শত্রুর প্রতিটি বুলেট আপনার পয়সায় কেনা। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধে ব্যয়িত আপনার প্রতিটি পয়সা স্বাধীনতাকে এগিয়ে নিয়ে আসছে।

বাংলাদেশ গণসাধারণতন্ত্র সরকারের আঞ্চলিক প্রচার দফতর কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত।


**************************
লেখকঃ মো· শফিকুল ইসলাম, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। দৈনিক প্রথম আলো, ১৬ ডিসেম্বর ২০০৭