১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বরে খবর পাওয়া গেল যে, পরদিন সকাল নটার মধ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকায় আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু ১৬ তারিখ সকালে জানলাম যে, সাময়িক যুদ্ধবিরতির সময় দুপুর তিনটে পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তার কারণ জেনেছিলাম অনেক পরে, কিন্তু ওই মুহূর্তে আমার উদ্‌বেগ অনেক পরিমাণে বেড়ে গিয়েছিলঃ যুদ্ধবিরতির সময় কেন বাড়ানো হলো, ১৬ তারিখেই আত্মসমর্পণ হচ্ছে কি না, ঢাকার সাধারণ নাগরিকদের অবস্থা কেমন, আত্মীয়স্বজনেরা কী অবস্থায় আছেন, নিশ্চিতভাবে কিছুই জানতে পারছিলাম না। অস্থির হয়ে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম কলকাতার রাস্তায়। রেডিও সেটের সামনে বসে থাকার মতো ধৈর্য ছিল না, আবার পথে বেরিয়ে পড়েছি বলে বেতারের সর্বশেষ সংবাদও শুনতে পারছিলাম না। শরীর-মনকে গ্রাস করেছে এক অদ্ভুত চাঞ্চল্য, এক অনাস্বাদিত অনুভূতি।
এক ফাঁকে বাসায় এসে শুনি, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে আমার ডাক এসেছিল। ছুটে গেলাম সেখানে। এক কর্মকর্তা বললেন, প্রধানমন্ত্রী ব্যস্ত আছেন-কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। বললাম, পাশের বারান্দায় অপেক্ষা করছি, তাঁর অবসর হলে আমাকে খবর দেবেন।

বারান্দায় একটা টেবিল ঘিরে জটলা। সবাই খোশগল্পে মেতে আছেন। এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে মানুষ এত নিশ্চিন্ত থাকতে পারে! আমার ভালো লাগছিল না। এক সময়ে গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকারের খোঁজ করলাম। বলা হলো, আত্মসমর্পণ-অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে তিনি ঢাকায় গেছেন। ‘আত্মসমর্পণ হচ্ছে তাহলে?’-জানতে চাই আমি।-‘সে তো ঘণ্টাখানেক আগে হয়ে গেছে।’

সবাই তাই এত নিশ্চিন্ত! আর আসল খবর জানতে না পেরে দুর্ভাবনার শেষ ছিল না আমার! দ্রুত ছুটে যাই প্রধানমন্ত্রীর অফিসঘরে। তাঁর অবসর হলে আমাকে ডেকে দিতে বলেছিলাম যাঁকে, ঘটনাধারার উত্তেজনায় তিনি তা ভুলে গিয়েছিলেন। তিনি ইঙ্গিত করলেন প্রধানমন্ত্রীর শয়নকক্ষে ঢুকে পড়তে। সেখানে আরো অনেকে ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী আমাকে দেখে বললেন, ‘এতক্ষণে এলেন!’ আমি যে আগে এসে বসে আছি, সে-কথাটাও তাঁকে বলতে পারলাম না।

তাজউদ্দীন আহমদের জীবনের সবচেয়ে সাফল্য ও গৌরবের মুহূর্ত এটি।

এপ্রিল মাসে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে তাজউদ্দীন যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলে নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন, তখন তিনি প্রধানমন্ত্রী হননি। তারপর যখন তিনি সেই পদ গ্রহণ করলেন, তখন ভারতীয়দের কাছে এ-কথা প্রমাণ করার প্রয়োজন তাঁর হলো যে, তিনি নির্বাচিত গণপরিষদ-সদস্যদের আস্থাভাজন। ওদিকে দলের তরুণ নেতারা তাঁর নেতৃত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে নানারকম অপপ্রচার চলছে। এই অবস্থায় দলের কাছে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করারও প্রয়োজন তাঁর। বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি কোনো আপোস করতে রাজি নন। তাঁরই পররাষ্ট্র-মন্ত্রী যখন মার্কিন প্রশাসনের সহায়তায় পাকিস্তানের সঙ্গে আপোস করতে উদ্যত হয়, তখন তাজউদ্দীন কঠোর ব্যবস্থা নেন এই সহকর্মীর বিরুদ্ধে। পাকিস্তানের মোকাবেলা করা হয়ে ওঠে তাঁর প্রধান দায়িত্ব। অক্টোবর মাসে ‘দেশদ্রোহী’ গণপরিষদ-সদস্য ও প্রাদেশিক পরিষদ-সদস্যদের আসন শূন্য ঘোষণা করে পাকিস্তান যখন সেসব ক্ষেত্রে উপনির্বাচনের ব্যবস্থা নেয় এবং ডিসেম্বরে গণপরিষদের অধিবেশন বসবে বলে বিজ্ঞপ্তি প্রচার করে, তখন আমার উদ্‌বেগ দেখে তাজউদ্দীন বলেছিলেন, ‘যত খুশি নির্বাচন করুক, ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লি বসতে দেবো না।’ তাঁর আত্মবিশ্বাসে সেদিন অবাক না হয়ে পারিনি। তিনি মনে করতেন, মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সাফল্যই বঙ্গবন্ধুর মুক্তি নিশ্চিত করবে। তাজউদ্দীন তাঁর সমস্ত মেধা ও শক্তি নিয়োগ করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধকে সফল করতে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে সেই সফলতা এলো। সফলতা এলো সীমাহীন রক্ত, অশ্রু আর স্বেদের বিনিময়ে।

তারপর ৩৬ বছর পার হয়ে গেল।

এই সময়ের মধ্যে পাকিস্তানিদের হাতে নয়, নিজেদের সেনাদের হাতে নিহত হয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এ এইচ এম কামরুজ্জামান, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী। মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে অভ্যুত্থান-পাল্‌টা অভ্যুত্থানে নিহত হয়েছেন খালেদ মোশাররফ, জিয়াউর রহমান, এম এ মনজুর এবং আরো অনেকে; ফাঁসির মঞ্চে প্রাণ দিয়েছেন আবু তাহের। ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বরে এ-কথা অভাবিত ছিল।

সেই ১৬ ডিসেম্বরে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের যে-মূর্তিটি আমাদের মনে অঙ্কিত ছিল, তার থেকে অনেক দূরে চলে এসেছি আমরা। বাংলাদেশ সামরিক শাসনের অধীন হয়েছে বারংবার, গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি এখানে। ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি থেকে ভ্রষ্ট হয়েছে রাষ্ট্র, প্রবর্তিত হয়েছে রাষ্ট্রধর্ম, বিস্তার ঘটেছে সাম্প্রদায়িকতার। কল্যাণ-রাষ্ট্রের চিন্তাও আমাদের মনে আর স্থান পায় না, বাজার অর্থনীতির কল্যাণে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধিতে। ১৯৭২ সালে একটি ভালো সংবিধান রচনা করেছিলাম আমরা-ছিঁড়েখুঁড়ে তার এখন করুণ অবস্থা।

এই ৩৬ বছরে আমরা যে কিছু অর্জন করিনি, তা নয়।

বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, বাংলাদেশে দারিদ্র কমেছে, খাদ্য-উৎপাদনে যথেষ্ট সাফল্য এসেছে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে উন্নতি ঘটেছে, জীবনযাত্রার মান কিছু বেড়েছে, জ্নহার কমেছে, গড় আয়ু বেড়েছে, নারীর কর্মস্থান বৃদ্ধি পেয়েছে-তারা ক্রমশ সংগঠিত হচ্ছে, পোশাকশিল্পে অর্জন ভালো, শ্রমশক্তি রপ্তানিও মন্দ নয়। তবে দেশে দুর্নীতি হয়েছে ব্যাপক, রাজনৈতিক অস্থিরতাও নিত্যনৈমিত্তিক। তার ওপর, প্রকৃতির নিষ্ঠুরতাও জীবনকে বিপর্যস্ত করছে ঘনঘন।

এই অর্জন-বিসর্জনের যোগ-বিয়োগ মিলিয়ে কোথায় আছি আমরা, তা তলিয়ে দেখতে হবে।

তবে ১৯৭১ সালের ঈপ্সিত লক্ষে আমরা যে পৌঁছোতে পারিনি, এতে সন্দেহ নেই। এ-কথাও সত্য যে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর যে-দোসরেরা সেদিন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, যুদ্ধাপরাধ করেছিল, তাদেরকে আমরা আজো বিচারের সম্মুখীন করতে পারিনি। আমাদের এই অপারগতার কারণেই আজ তারা মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করে, মুক্তিযোদ্ধাকে অপমান করে।

এবারে চারদিক থেকে তাদের বিচারের দাবি উঠেছে নতুন করে।

১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন পাশ হয়েছিল, সে-আইন এখনো বহাল আছে। সেই আইনের আওতায় ট্রাইব্যুনাল গঠন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হোক। ট্রাইব্যুনালের কাজে সহায়তার জন্যে তার আগে একটি কমিশন গঠন করা যেতে পারে যুদ্ধাপরাধসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের জন্যে। কমিশন এসব তথ্য যাচাইবাছাই করে ট্রাইব্যুনালের সামনে হাজির করবে। প্রয়োজন হলে ট্রাইব্যুনালে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সংশ্লিষ্ট করা যেতে পারে। তবে বিচার হতে হবে। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রকেই বিচার চাইতে হবে। কারণ যে-অপরাধ তারা করেছিল, সে-অপরাধ কেবল ব্যক্তিবিশেষের প্রতি নয়, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ। রাষ্ট্রকে তাই এগিয়ে আসতে হবে।

এই ১৬ ডিসেম্বরে এটিই আমাদের প্রত্যাশা।

**************************
লেখকঃ  আনিসুজ্জামান
দৈনিক প্রথম আলো, ১৬ ডিসেম্বর ২০০৭