খান সারওয়ার মুরশিদ
সাবেক ভিসি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

সবচেয়ে বড় কথা হলো আমরা স্বাধীন একটি রাষ্ট্র পেয়েছি। এর জন্যে আমাদের অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। যা আমরা পাইনি তা হলো একটি সুগঠিত রাষ্ট্র। আমরা সাধারণভাবে রাষ্ট্র নির্মাণে ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের যে ব্যবস্থা রয়েছে তা হলো ব্রিটিশ আমলের ব্যবস্থা, যার জন্য আমরা পাকিস্তানের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বেশি দূর এগোতে পারিনি। স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা কতগুলো জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ধ্বংসের কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিলাম। সে প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা দুর্বল করেছিলাম, বিকৃত করেছিলাম। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা চলে জাতীয় সংসদকে আমরা কার্যকর করতে পারিনি। বিচার ব্যবস্থাটিকে দুঃখজনকভাবে কলংকিত এবং দুর্বল করেছিলাম এখন অবশ্য পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয়েছে।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এতোদিনেও উন্নত হয়নি। ছাত্র সংখ্যা অবশ্য বেড়েছে কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান আশানুরূপ হয়নি। আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি কিন্তু মুক্তিতো আজও পাইনি। আমরা কিছু কিছু পশ্চাৎপদ ধারণা লালন করি যার ফলে দেশে দারিদ্র্য এবং অসহায়দের দুঃখ-দুর্দশা আরও বেড়েছে। এর অভিশাপ থেকে কবে মুক্তি পাবো জানি না।

যে প্রত্যাশা নিয়ে আমরা স্বাধীন হয়েছিলাম, সে প্রত্যাশা আজও পূরণ হয়নি। রাষ্ট্রের ধর্ম নিরপেক্ষতা চেয়েছিলাম কিন্তু আমাদের বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আচরণের মধ্যে তার জন্যে অনুকূল পরিবেশ আজও সৃষ্টি হয়নি বা সৃষ্টি করতে পারিনি। অপরদিকে আমরা জঙ্গিবাদের জন্যে ক্ষেত্র প্র‘ত করেছি। আমরা চেয়েছিলাম সত্যিকারের গণতন্ত্র এবং মানুষের জন্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। যেখানে ঘটবে অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক মুক্তি কিন্তু এগুলো আমরা আদৌ পাইনি। আমাদের মাথা-পিছু গড় আয় হয়তো বেড়েছে কিন্তু সত্যি সত্যি তার সঠিক তথ্য আছে কি?

 

মেজর জেনারেল (অবঃ) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক
আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক

আমরা একটা স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছি, ভৌগোলিক সীমানার অভ্যন্তরে সার্বভৌমও পেয়েছি, নিজেদের মতো করে রাজনীতি করার অধিকার এবং সুযোগ পেয়েছি; দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে অবহেলা করে দল কেন্দ্রিক ও ব্যক্তি কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নের লাগামহীন স্বাধীনতা পেয়েছি। আরও পেয়েছি কিছু সুযোগ সেগুলো কাজে না লাগার অধিকারও পেয়েছি। যথা- মানুষের কল্যাণের জন্য পরিশ্রম করা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বলিষ্ঠ করা, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা, তথা পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশকে একটা আধুনিক রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা।

কি পাইনি বললে বলতে হয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের পূর্ণাঙ্গ আন্তরিকতা, আমলাতান্ত্রিক নেতৃত্বের পূর্ণাঙ্গ দক্ষতা, সামাজিক নেতৃত্বের উন্নয়নমুখী দৃঢ়তা এবং ব্যবসায়ীক নেতৃত্বের সাহসী সততা। আরও কি পাইনি, তার তালিকা অতি দীর্ঘ কেবল দু’একটি মাত্র উল্লেখ করতে চাই। পৃথিবীর বুকে আরও দশটা দেশের মতো সম্মান পাইনি, মুক্তিযোদ্ধারা জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় গঠনমূলক সম্মান পাইনি, দরিদ্রতা ধনীদের আন্তরিক সহমর্মীতা পাইনি এবং ইত্যাদির ফলশ্রুতিতে যেটা পাইনি সেটা হচ্ছে বলিষ্ঠ জাতীয় নেতৃত্ব। যেটা এত দুঃখের মধ্যে পেয়েও গর্বিত থাকি সেটা হচ্ছে একটি গণমুখী, উন্নয়নমুখী, শৃংখলামুখী, সংবিধানমুখী সামরিক বাহিনী। যেটা পাইনি সেটা হচ্ছে সার্বিক বুদ্ধিজীবী মহলের সামরিক বাহিনীর প্রতি গঠনমূলক সমালোচনা ভিত্তিক মমত্ব। পেয়েছি বলিষ্ঠ মিডিয়া, পাইনি একতাবদ্ধ মিডিয়া। পেয়েছি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, পাইনি ঐতিহ্য রক্ষার দৃঢ় অঙ্গীকার, পেয়েছি বিজয় দিবস, পাইনি বিজয়কে অর্থবহ করার দৃঢ় ও বিস্তারিত অঙ্গীকার।

 

মেজর জেনারেল (অব·) কেএম শফিউল্লাহ
সেক্টর কমান্ডার, এস ফোর্স

স্বাধীনতা নামে আমরা একটা স্বাধীন দেশ পেয়েছিলাম। কিন্তু যে উদ্দেশ্য নিয়ে এ দেশটা আমরা স্বাধীন করেছিলাম সে উদ্দেশ্যে আমরা পৌঁছতে পারিনি। এটা অমি বলবো না যে আমাদের কারও অনাগ্রহের কারণে। আসলে যখন দেশটা স্বাধীন হয়েছিল তখন ছিল সেটা একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ। তার অবকাঠামো বলতে কিছুই ছিল না। তাই বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে একটা পূর্ণতা দেওয়ার জন্যে যে সময়ের প্রয়োজন ছিল ঐ সময়কার সরকার সে সময়টুকু পায়নি। কারণ, আমাদের মধ্যেই এমন কিছু শক্তি এসে ভর করেছিল যে, আমরা তাদেরকে চিহ্নিত করতে পারিনি। কে প্রকৃত শত্রম্ন কে প্রকৃত বন্ধু সেটা আন্দাজ করাও ছিল দুঃসাধ্য। একজন ঠাহর করতে পারলেও অন্যজনের কাছে সে ছিল মিত্র। সুতরাং তাদেরকে চিহ্নিত করা খুব কঠিন ছিল। তারা আমাদের পাশে বসেই সর্বনাশগুলো করেছে। তা না হলে এই বাঙালি জাতির যে আশা-ভরসা ছিল একটা স্বাধীন সোনার বাংলা গড়ার, সেই গঠন প্রক্রিয়ায় তারা বাধ সেধেছিল।

’৭৫-এর বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর সমস্ত কার্যক্রমের চাকা একেবারেই উল্টো পথে চালিত হতে থাকলো। আমরা আমাদের নতুন প্রজন্মকে তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছি। আজ যখন তারা আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে আমাদেরকে আপনারা এই গুরু দায়িত্ব আগে কেন দিলেন না। বা গুরু দায়িত্ব যে কাঁধে আপনারা নিয়েছিলেন এর অংশিদারিত্ব কেন আপনারা করলেন না।

স্বাধীনতার এই ছত্রিশ বছর পর যখন আবার পেছন ফিরে তাকাই তখন নিজেকে নিজের কাছে খুব অস্বস্থিবোধ করি। এজন্য যে, আমরা কি সত্যি আমাদের দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করতে ব্যর্থ হয়েছি? আমি শুধু নতুন প্রজন্মের কাছে এই কথাটিই রাখবো যে, আমরা দেশ স্বাধীন করেছি। ব্যর্থতার দায়ভার কাঁধে নিয়েই তোমাদের কাছে সেই দায়িত্ব তুলে দিচ্ছি। আশা করি তোমরা সেই দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হবে। স্বাধীনতার ছত্রিশ বছর পর যখন দেখি ঐ সময়কার পরাজিত শক্তি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাচ্ছে, তখন জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবার দায়িত্ব তখন তোমাদের। তোমরা নতুন প্রজন্মরা যারা দেশকে ভালবাসো তারা আমাদের বাকি কাজগুলো সমাপ্ত করবে।

আমার শেষ কথা হলো, স্বাধীনতা অর্জন করা যেমন কষ্টকর, এটা রক্ষা করা তার চেয়েও বেশি কষ্টকর। আশাকরি তোমরা এর দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবে এবং এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রাখতে পারবে।

 

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

১৯৭১ সালের দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে আমরা একটি নতুন দেশ পেয়েছি। আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন স্বাধীন, সার্বভৌম একটি দেশ। বাঙালি জাতিসত্তার একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। যার ফলে, বিশ্বের কাছে আমাদের বাংলা ভাষা ও জাতিসত্তা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। জাতিসংঘে আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারি। আমাদের আরো প্রাপ্তি হলো স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে একটি দেশের ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছি। গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্রে এবং আমাদের যত সৃজনশীল ও সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ড আছে, তা নির্বিঘ্নে করার সুযোগ পেয়েছি। যার ফলে আমাদের সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হয়েছে। অনেক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও অর্থনীতি, সমাজনীতি, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে আমরা মোটামুটি একটি অবস্থানে পৌঁছতে পেরেছি। আশা রাখি, এখান থেকে আমরা আরো সামনে এগোতে পারবো।

স্বাধীনতা অর্জনের ৩৬ বছর হবার পরও আমাদের অপ্রাপ্তি কিন্তু রয়েই গেছে। এতদিনেও আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে পারিনি। আমাদের গণতন্ত্র চর্চাকে পরিশীলিত করতে পারিনি এবং আমরা শুরু করেছিলাম একটি চমৎকার সংবিধান দিয়ে কিন্তু সেটিকে রক্ষা করতে পারিনি। আমাদের চারদিকে মৌলবাদের প্রসার ঘটেছে, সামাজিক বৈষম্য বাড়ছে। শিক্ষার বিস্তার হলে শতভাগ শিক্ষা আমরা নিশ্চিত করতে পারিনি। জনগণের চিকিৎসার সার্বজনীন প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা আমাদের একান্ত কাম্য।

 

হাসনাত আবদুল হাই
কথাশিল্পী ও কলামিষ্ট

মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতার মাধ্যমে আমরা একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে পরিচিত হয়েছি। একটি রাষ্ট্রের যে সমস্ত প্রতিষ্ঠান ও দলিল থাকে যেমন- বিচার বিভাগ, জাতীয় সংসদ, সরকার, সংবিধান, বিভিন্ন আইন-কানুন এই সব আমরা পেয়েছি। যদিও এদের মধ্যে কোনটি কিছুকালের জন্য অবলুপ্ত করা হয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে ছিল গণতান্ত্রিক আদর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা, যেখানে মানুষের মৌলিক অধিকার স্বীকৃত হবে এবং জাতি, ধর্ম, শ্রেণী, নির্বিশেষে সকলের জন্য সুযোগ-সুবিধা সমানভাবে প্রাপ্তির নিশ্চিতি থাকবে। সুপরিকল্পিত উপায়ে ন্যায়ভিত্তিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে সকলের জীবন-যাপন ক্রমাম্বয়ে উন্নত হবে- এই আশাও করেছিল এদেশের মানুষ। দুঃখের বিষয় স্বাধীনতা প্রাপ্তির ৩৬ বছর পরও গণতন্ত্র এখনও প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। এবং এর জন্য যেসব প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা রাখার কথা সেসব অভ্যন্তরীণ ও বাইরের কারণে শক্তি সঞ্চয় করতে পারেনি। মৌলিক অধিকার উপভোগের ক্ষেত্রেও দুর্বল শ্রেণীর জন্য নানা প্রতিবন্ধকতা দেখা দিয়েছে এবং অন্যদের ক্ষেত্রে এই প্রসঙ্গে মাঝে মাঝেই অস্বাভাবিক অবস্থার জন্য (সামরিক শাসন) ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশ তার অস্তিত্ব রক্ষা করলেও সুশাসন বলতে যা বুঝায় তা এখনও অর্জন করা যায়নি।

অর্থনৈতিক যে উন্নতি হয়েছে তা অব্যবস্থাপনা ও ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য সাবলীল ও নিরবচ্ছিন্ন হতে পারেনি। এর চেয়েও দুশ্চিন্তার কারণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল উপভোগের ক্ষেত্রে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে পার্থক্য। অর্থনৈতিক যে বৈষম্য ক্রমবর্ধমান তার পেছনে রয়েছে একটি শ্রেণীর লোভ, লালসা এবং দুর্নীতিপরায়ণতা) সামাজিক মূল্যবোধের এই অবক্ষয় যে কত প্রকট তা সম্প্রতি উদঘাটিত হয়েছে। এবারের বিজয় দিবস এমন সময়ে উদযাপিত হচ্ছে যখন দেশ এবং জাতি এক সন্ধিক্ষণে উপনীত।

অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং স্বাধীনতার যে প্রতিশ্রুতি ছিল আপামর জনসাধারণের ভাগ্যন্নোয়নের জন্য সেই প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে সঠিক পথে যাত্রা করার সিদ্ধান্ত নেয়ার এখনই সময়। এ ক্ষেত্রে আর কোন ভুল-ভ্রান্তি করা হলে বা ক্ষুদ্র স্বার্থকে বৃহত্তর স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দিলে জাতির অস্তিত্বই বিপন্ন হবে। সঠিক পথে যাত্রা করার গুরুত্বের প্রতি সমগ্র জাতির দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবারের বিজয় দিবস বিশেষভাবে তাৎপর্যময়। ০

 

মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদ
সাবেক সচিব ও রাষ্ট্রদূত

আমরা দেশ পেয়েছি, পতাকা পেয়েছি, জাতীয় সঙ্গীত পেয়েছি, জাতিসংঘের সদস্যপদ পেয়েছি। কিন্তু যা পাইনি তাহলো যে উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম এবং স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম তা আজও পাইনি। ইতোমধ্যে আরো কিছু নতুন মাত্রা আমাদের পাওয়ার তালিকায় সংযোজিত হয়েছে তাহলো-পৃথিবীর সর্বপ্রথম দুর্নীতিপরায়ণ দেশ, আত্মঘাতি সংঘর্ষি রাজনীতির দেশ ইত্যাদির কিছু প্রাপ্তি আমাদের তালিকা। এ জন্যে জাতি হিসাবে আমরা লজ্জিত ও দুঃখিত। তবে যখনই দেখি মানব সৃষ্ট কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে জাতির জীবনে অসহনীয় দুর্ভোগ নেমে আসে তখনই আমাদের দেশের মানুষ তার সহজাত মমতাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে পরস্পরের পাশে দাঁড়াতে নির্ধিদায় এগিয়ে আসে এতে মনে হয় আমাদের সব শেষ হয়ে যায়নি। অনেক সম্ভাবনা এখনও আমাদের সামনে রয়েছে। আমি তাই মনে করি আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ একটি আশ্চর্য বিভিন্ন বিপরীতের সংমিশ্রণে সমৃদ্ধ। সত্যি সেলুকাসের ভাষায় বড় বিচিত্র এই দেশ আমাদের।

 

আছাদুর রহমান খান
একজন মুক্তিযোদ্ধা

ভারতের মেঘালয় প্রদেশের ‘তুরা’ ট্রেনিং ক্যাম্পে ২য় ব্যাচে ট্রেনিং নিয়ে কেএম মাহবুবুল আলম কোম্পানীর ১নং প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের জন্য মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়ার সৌভাগ্য লাভ করি। সিলেট, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জ জেলার আওতাধীন বিভিন্ন স্থানে পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের সহচরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যাই। মদন থানা এলাকায় দীর্ঘদিন যুদ্ধ করি। মদন থানাধীন বাসইর বাজারে আমার গ্রম্নপসহ অবস্থানকালে তাড়াইল থানাধীন মৌগাও গ্রামের আমার স্কুল জীবনের বন্ধু অরুণ ও কারংকার আব্দুস সালাম ভাই নিয়মিতভাবে তাড়াইল থানা হেড কোয়ার্টারে অবস্থিত পাক বাহিনী ও তাদের সহচরদের অবস্থান সম্পর্কে খবর দিত। তাদের খবরের ওপর ভিত্তি করে তাড়াইল থানা মুক্ত করার লক্ষ্যে থানা আক্রমণ করার সংকল্প গ্রহণ করি। লক্ষ্য ‘হয় থানা মুক্ত করব নয়ত জীবন দিব’। যদি মরি তাহলে তাড়াইলবাসী চিরদিন মনে রাখবে। এই চিন্তাই ছিল প্রেরণার প্রধান উৎস। সেইদিনটি ছিল ১২ অক্টোবর ১৯৭১ সন। আমার কম্পানী কমান্ডার কেএম মাহবুবুল আলম এর অনুমতি নিয়ে আমার প্লাটুনের ৩৬ জনের মধ্যে ১৯ জন মুক্তিযোদ্ধা ও কাজী আলম কোম্পানীর মুক্তিযোদ্ধারাসহ তাড়াইল থানা মুক্ত করার উদ্দেশ্যে ফতেহপুর দেওয়ান বাড়ি হতে রাতে দুইভাগে যাত্রা করি। কাজী আলম সাহেবের কোম্পানী সাচাইল দিয়ে থানার নিকটবর্তী হয়ে গুলি ছুঁড়তে থাকে এবং আমার দল সহিলাটী নদীর পাড় থেকে গুলি ও মর্টার শেল নিক্ষেপ এবং এক্সপ্লোসিভ বিস্ফোরণ ঘটাতে থাকি। এক পর্যায়ে জানতে পারি কাজী আলম আহত হওয়ায় তার দলবলসহ অবস্থান ত্যাগ করেছে। কিন্তু আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকে। পরবর্তীতে ১৩ অক্টোবর ১৯৭১ইং তারিখ রাজাকারসহ পাক-বাহিনী থানা হেড কোয়ার্টার ছেড়ে পালিয়ে যায় এবং আমার নেতৃত্বে বেলা অনুমান সাড়ে তিনটায় তাড়াইল আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে আসে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয়।

এই যে এতো কথা বললাম, তার কারণ হলো মুক্তিযুদ্ধ করে আমরা পেয়েছি আমাদের স্বাধীনতা, যা নিয়ে আজো গর্বে বুক ভরে যায়, আর পাইনি বললে বলতে হয় যে আশা নিয়ে আমরা যুদ্ধ করেছিলাম সে আশা তো আজো পূরণ হয়নি। আশাকরি পরবর্তী প্রজন্মরা এসে সেটা পূরণ করতে পারবে। ০

 

আসাদ চৌধুরী
কবি

একটা পতাকা, একটা জাতীয় সঙ্গীত এবং বাংলা ভাষায় কথাবার্তা বলার একটা শাসক পাওয়া গেল এবং পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীত বিজয় ছাড়া অর্জন করা যায় না। বিজয়ের জন্য যুদ্ধ অনিবার্য এবং এটি রাজনৈতিক ঘটনা। পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে যে জয়ী হয়েছিলাম এটি সরকারী প্রচারযন্ত্রে অনেকদিন পরেই আমরা জানতে পারলাম। কিন্তু যুদ্ধ পরাধীদের বিচার আজও হয়নি।

খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, বস্ত্র, স্বাস্থ্য- এসব সেবা থেকে জনগণ আজও বঞ্চিত। এর জন্য নিশ্চয়ই ত্রিশ লক্ষ লোক প্রাণ দেননি। মানুষের মর্যাদা একেবারে নিচের দিকে নেমে গেছে। ব্যর্থ রাজনীতি, দেশপ্রেমহীন রাজনীতি, প্রতিশোধ পরায়ণ রাজনীতি- এদেশের মানুষের সম্মান এবং মর্যাদাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে। প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকগণ, সাহিত্যিকগণ, শিল্পীগণ এবং সুশীল সমাজের কেউ কেউ ইতিহাস তুলে ধরার ফলে এই প্রথম বারের মতো সত্য কথা বলার সুযোগ তারা পাচ্ছে এবং সেই সুযোগও তারা দিচ্ছেন, ফলে একাত্তরের সেই আবেগ, অনুভূতি ও চেতনা বেশকিছুটা ফিরে এসেছে। গত ৩৬ বছরের মধ্যে এটিকে আমি বড় প্রাপ্য বলে মনে করি।

সুখ আমরা ভাগ করতে শিখিনি। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্লাইভ হেসটিংসরা এ দেশের টাকা চুরি করে নিজেদের দেশে নিয়ে গিয়েছিল। আমাদের দেশের সোনার ছেলেরা ব্যাংকক-সিঙ্গাপুরে টাকা রাখে, তোষকে-বালিশে টাকা রাখে, এগুলো যে ধিক্কারজনক কাজ এটা মানুষ জানতে পারছে, বুঝতে পারছে, কিন্তু দ্রব্যমূল্যের হাহাকারের দাপটে যেনো মনে হয় সবই ব্যর্থ হতে চলেছে। তবে সিডরের ক্ষেত্রে দুর্গত মানবতার জন্য আমরা যেভাবে দুঃখ ভাগ করছি, আমাকে ৭১ সাল স্মরণ