রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র, দীন, একাকী। কিন্তু উত্সবের দিনে মানুষ বৃহত্, সে সমস্ত মানুষের সঙ্গে একত্র হইয়া বৃহত্, সেদিন সমস্ত মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করিয়া বৃহত্...।’ নিজেদের জীবনেও আমরা দেখি, একা একা আমরা কত অসহায়। অথচ দলেবলে থাকলে কী উচ্ছল। তার নমুনা দেখা যায় উত্সব অনুষ্ঠানে। দেখা যায় পহেলা বৈশাখের উত্সবাদিতে। বাংলা নববর্ষ আমাদের সবচেয়ে বড় ধর্মনিরপেক্ষ সামাজিক উত্সব। তবে একদা পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে গড়ে উঠেছিল আর্থ-সামাজিক কর্মকাণ্ডের সংস্কৃতি। পুণ্যাহ, হালখাতা এবং মেলা তার প্রমাণ। তিনটি অনুষ্ঠানই ছিল নিখাঁদ অর্থনৈতিক লেনদেন সম্পৃক্ত। আর সেই লেনদেনের জন্যই জনসমাগম। সামাজিক দেখা-সাক্ষাত্। সামাজিক মেলামেশার জন্য নববর্ষের অনুষ্ঠান তৈরি হয়নি। যেটা আমরা এখন করছি।

পুণ্যাহ অনুষ্ঠান ছিল খাজনা সংগ্রহের দিন। সেদিন জমিদার সেজেগুজে পেয়াদা-পাইক পরিবেষ্টিত হয়ে দেখা দিতেন প্রজাদের। দেবতা দর্শনের মতো হতদরিদ্র প্রজা কৃষক তাঁকে দেখত। পায়ের কাছে প্রজারা তাদের দেনাগুলো রাখত। কতকটা উপঢৌকনের মতো। জমিদার সেদিন কিছু খাবার, কখনও টাকা-পয়সা, কখনও কাপড়চোপড় দান করতেন উপহার হিসেবে। যদিও নগণ্য। তবুও সৌজন্য। প্রথা।

হালখাতায়ও ব্যবসায়ী মহলের সারা বছরের লেনাদেনা হিসাবই মূল অনুষ্ঠান। এখানেও পাওনা আদায়ের একটা শোভন সৌজন্য ছিল। ব্যবসায়ীরা রীতিমত চিঠি দিয়ে নিমন্ত্রণ জানাতেন ভোক্তাদের। বকেয়া আদায় উদ্দেশ্য হলেও ভোক্তাকে আতর পান মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো। ব্যবসায়ীরা পাটভাঙা কাপড়চোপড় পরে দোকানে বসতেন। ভোক্তারাও যেতেন সেজেগুজে পাটভাঙা কাপড় পরে। যেন কোনো উত্সবের আয়োজন। পুণ্যাহ আমি দেখিনি। শুনেছি বাবার কাছে। দাদুর জমিদারি ছিল। তাই পুণ্যাহ অনুষ্ঠান হতো। কিন্তু হালখাতা আমি দেখেছি। দু-তিনবার দোকানে গিয়েছি বাবার সঙ্গে। লেনাদেনা, নতুন খাতায় নাম তোলা ইত্যাদি বুঝিনি। কিন্তু আদর-আপ্যায়নটা খুব ভালো লাগত। কেমন সভ্য একটা প্রথা।

আর মেলা তো পুরোপুরি কট্টর বিকিকিনির কর্মকাণ্ড। নিখাঁদ ব্যবসা। নতুন নতুন রকমারি জিনিস সাজিয়ে বসতেন দোকানিরা। বিক্রি এবং প্রদর্শনী তো হতোই, অর্ডারও নেয়া হতো। মেলায় চারু ও কারুশিল্পীদের জিনিসপত্রের চূড়ান্ত বিজ্ঞাপন হতো দেখা শোনা ও কেনার মাধ্যমে। খাবার জিনিসের নাম করতে গেলে বেলা কেটে যাবে। পাশাপাশি থাকত নাচ-গান, যাত্রাপালা, সার্কাস, লাঠিখেলা, পুতুল নাচ ইত্যাদি সবটাই টাকার খেলা। তবে মেলার দুটো বিষয় অন্যরকম। তা হলো পুণ্যাহ এবং হালখাতার মতো একান্ত পুরুষ প্রযোজিত এবং পুরুষ পরিচালিত নয় মেলা। এক. মেলার পরিসর অনেক বড়। আয়োজন বড়। লোকসমাগম অসংখ্য। দুই.
প্রচুর মহিলা দোকানদার বসে যান তাদের হাতে তৈরি জিনিস এবং পিঠেপুলি, মোয়া, কদমা, খই, খাগড়া, চুড়ি, দুল ইত্যাদি নিয়ে। মেলার অর্থকরী কর্মকাণ্ডে মহিলাদের ব্যাপক অংশগ্রহণ নিয়ে কেউ কোনো কথা বলেনি। না ফতোয়া, না সামাজিক বাধা। আমি শুনিনি কোনো দিন।

নাগরিক জীবনের নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ পালনের সংস্কৃতি আমরাই তৈরি করছি। পুণ্যাহ নেই, হালখাতা নেই (ব্যতিক্রম ছাড়া), শুধু মেলা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা যায়নি। তবে একটা বিষয় সত্য। তা হলো বৈশাখী উত্সব পালনের পেছনে রাজনৈতিক চেতনা যতটা কাজ করেছে, সাংস্কৃতিক চেতনা ততটা নয়। পাকিস্তানিরা আমাদের ভাষা ও সুকুমার সংস্কৃতি তথা নাচগানের ওপর শাসনদণ্ড চাপাতে চেয়েছিল, সেটা ভেঙে খান খান করার জন্যই মহাসমারোহে নববর্ষের নাগরিক জীবনচারিতা তথা সংস্কৃতির উদ্বোধন করা হয়েছে। যেভাবেই হোক, পহেলা বৈশাখের উত্সব আমার খুব ভালো লাগে। তবে এ দেশের লৌকিক জীবনাচারের মধ্যে থেকে কিছু কিছু প্রথা গড়ে তুলতে হবে। সভ্যতার লেবেল এঁটে যাকে শনাক্ত করতে পারবে প্রজন্মেরা। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় এ সভ্যতা হলো এ উপমহাদেশে প্রচলিত নির্দিষ্ট ভূগোলখণ্ডের মধ্যে আবদ্ধ এক প্রকার সদাচার। মনুর দেয়া নাম। এই সদাচারের মধ্যে অবিচার এবং নিষ্ঠুরতা থাকলেও তা পালনীয়। সুখের বিষয়, মনুর সদাচার লগ্ন নিষ্ঠুরতা এবং অবিচার (সতীদাহ এবং বিধবা বিবাহ নিষিদ্ধ) ভেঙে ফেলেছেন মুক্তবুদ্ধির সাহসী মানুষেরা (রাজা রামমোহন রায় এবং পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর)। এখনও অবাক হই সংস্কৃতির প্রথাভিত্তিক সদাচারে পুরুষ বিধানে দণ্ডিত হয়েছে শুধু মেয়েরাই। সেটা ভেঙেছেও পুরুষেরা।

আমরা কী চাই বৈশাখী উত্সবের সংস্কৃতিতে? নববর্ষের প্রসন্ন প্রভাতে পান্তা ইলিশ খাওয়া কি আজও প্রশংসিত প্রথা হয়েছে? তা ছাড়া পান্তা ইলিশ খায় কারা? বিত্তবান শৌখিন মানুষজন। সে পান্তাও ফ্রিজে রাখা পদার্থ। টক টক আমানিও নয়। সাধারণ মানুষ কিন্তু নাড়,ু মোয়া, মুরলি, কদমা, বাতাসাই বেশি পছন্দ করে। ফলাহার তথা ভেজানো চিঁড়ে দই-মিষ্টি কলা মেশানো খাবারের দোকান দেখেছি। এ ক্ষেত্রে ত্রুটি দুটো। এক. ভেজা খাবার মানেই পানি-কাদায় পরিবেশ নোংরা হয়ে যাওয়া; দুই. অস্বাস্থ্যকর।

অবশ্য পান্তা ইলিশ খেতেও পানি-কাদা অপরিহার্য। সে ক্ষেত্রে কাটা ফল, মানে তরমুজ-বাঙ্গি, ফুটি, কলা ইত্যাদি সুন্দর করে কেটে কলা বা শালপাতায় খাওয়া যায়। ছোটো ছোটো মাটির খুরিতে দুই আর আইসক্রিম খাওয়ার মতো বাঁশের বা কাঠের চামচ থাকতে পারে এবং প্রত্যেক দোকানে উচ্ছিষ্ট ফেলার জন্য শোভনব্যবস্থা রাখা যায়। কিছু খেয়েই পাত্রগুলো চিল কাকের মতো ছুড়ে ফেলার প্রবণতা বর্জন করতে হবে। এটা না শোভন, না সংস্কৃতি, না প্রথার দাবিদার। সভ্যতা তো নয়ই। কথা হলো, সুন্দরের প্রতি পরিচ্ছন্নতার প্রতি আমাদের দায় এড়িয়ে যাব কেন? নাগরিক জীবন হবে সাজানো-গোছানো। ব্যস্ততা থাকবে। থাকবে না উচ্ছৃঙ্খলতার বন্য উল্লাস।

নববর্ষের জীবনাচারকে সাজানো কঠিন হলেও করতে হবে কাজটা। আগে থেকে পরিকল্পনা করে দোকানপাটের জায়গা বেঁধে দেয়া যায়। বই মেলা, বাণিজ্য মেলা, শিক্ষা মেলা, আইটি মেলায় যেমন বাণিজ্য চলে বাঁধা বরাদ্দ দোকানে। ঠিক সেই রকম। যে যেখানে পারল বাণিজ্য সম্ভারে ডালা সাজিয়ে বসে পড়ল, এটা বন্ধ হওয়া উচিত। বৈশাখী মেলায় একমাত্র প্রাণ জুড়ানো আয়োজন বটমূলের গানের অনুষ্ঠান। ঠেলাঠেলি চেঁচামেচি হৈচৈয়ের জ্বালায় সেখানেও কি শান্তি আছে? প্রশ্ন তুলেছিলাম বৈশাখে গড়ে তোলা নাগরিক সংস্কৃতি নিয়ে। কেমন জীবনাচার আমরা গড়তে চাই? এসব কথা তো শিক্ষিত আলোকিত মানুষদেরই বলতে হবে। আপনা-আপনি হবে না কোনো কিছু। হয়ওনি কোনোদিন। মুখে আমরা শ্রেণী-বৈষম্য দূর করার কথা বলি অনেকেই। সেটা যে হবে না, তা জেনেও বলি। কারণ সবচেয়ে সস্তা কথা কিনা! তবে নাগরিক জীবনে বৈশাখী তথা নববর্ষের সংস্কৃতি কিন্তু শ্রেণীবৈষম্যের সৃষ্টি করে ফেলেছে। একদিনে বিভিন্ন বুটিক শপে তৈরি বিচিত্র ফ্যাশনের কাপড়চোপড় পরা সচ্ছল মানুষ, অন্যদিকে হতশ্রী মানুষের সমাহার। তবে প্রিয়জনকে একটা বই উপহার দিয়ে নববর্ষের প্রথা সৃষ্টি করলে কেমন হয়? নিশ্চয় ভালো হবে। সবচেয়ে আনন্দের কথা, নববর্ষের সব আয়োজনে এখনও সামাজিক মেলামেশা এক অনাবিল সৌহার্দের আবহ তৈরি করে। ধর্ম-বর্ণ বয়স চাপা পড়ে যায় মানসিক সৌন্দর্য বোধ এবং ‘সমস্ত মানুষের সঙ্গে একত্র হইয়া বৃহত্’ হওয়ার সুকুমার চেতনায়। এ প্রথাকে আমরা লালন করবই। ছড়িয়ে দেব প্রজন্মের অন্তরে। শুভ নববর্ষ।


**************************
দৈনিক আমার দেশ
১৪ এপ্রিল ২০১০
১লা বৈশাখ ১৪১৭