বাংলা ভাষা পৃথিবীর এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও সমৃদ্ধ ভাষা। পৃথিবীর প্রায় চার হাজার ভাষার মধ্যে জীবিত যে দেড়শ’ মৌলিক ভাষা রয়েছে, তার মধ্যে বাংলা ভাষার অবস্থান ষষ্ঠ অবস্থানে। প্রথম দিকের ক্রমিকে যেসব ভাষা রয়েছে এগুলোর মধ্যে খোদ ইংরেজি ভাষারই নিজস্ব বর্ণমালা না থাকায় ধার করা রোমান বর্ণমালায় তারা চলে। তাদের নিজস্ব কোনো সনও নেই। বাংলা ভাষা এদিক থেকে এক অনন্য স্বাতন্ত্র্যের দাবিদার। বাংলা ভাষার স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ মিলে রয়েছে ৫০টি হরফের একটি নিজস্ব বর্ণমালা। অপরদিকে সিলেটী নাগরী নামে বাংলা ভাষার রয়েছে ৩২ হরফের আরেকটি স্বতন্ত্র বর্ণমালা। একই ভাষার দু-দুটি বর্ণমালা থাকার কারণে বাংলা পৃথিবীর অন্যতম এক শ্রেষ্ঠ ভাষা।

বাংলা ভাষার এ শ্রেষ্ঠত্বের গৌরবকে আরও উজ্জীবিত উচ্চকিত করে এর নিজস্ব সন ব্যবস্থাপনা। সারা বিশ্বে একসময় উপনিবেশ স্থাপনের কারণে ইংরেজি ভাষা আন্তর্জাতিক ভাষার মর্যাদা লাভে সক্ষম হয়। কিন্তু ইংরেজি ভাষার বর্ণমালা যেমন রোমান হরফ, তেমনি ইংরেজি সন নামে ব্যাপক পরিচিত সনটিও তাদের দেশে সৃষ্ট নয় এবং খোদ ইংরেজদের দেশেও এটি ইংরেজি সন নামে পরিচিত নয়। এটি মূলত হজরত ঈসা আলাইহিসসালামের জন্ম সাল থেকে শুরু করা খ্রিস্টাব্দ বা ঈসায়ি সন।
মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশসহ উপমহাদেশে এ সনটি ইংরেজদের দ্বারা আমদানি হওয়ায় এটিকে ইংরেজি সন বলে ডাকা হয়। এটি মারাত্মক ভুল। এ ভুল যত দীর্ঘমেয়াদিই হোক না কেন তা আমাদের পরিহার করে চলতে হবে, কেননা পৃথিবীতে কোথাও ইংরেজি সন বলে কোনো সন নেই।

আমাদের বাংলা ভাষার জন্য রয়েছে আমাদের নিজস্ব সন ব্যবস্থা। বাংলা ভাষায় প্রচলিত বাংলা সন ছাড়াও আরও প্রায় ৩০টির মতো সনের ব্যবহার দৃষ্ট হয়। সনের এ বিচিত্র ব্যবহারের দিক বিবেচনায় বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান সম্ভবত এক নাম্বারে। সনের এ বৈচিত্র্য এবং বিশাল ভাণ্ডার আন্তর্জাতিক ভাষা বলয়ে আমাদের মাতৃভাষার মর্যাদাকে আরও সম্মানিত স্থানে প্রতিষ্ঠার যোগ্যতা রাখে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রচলিত বাংলা সন ছাড়াও আরও বেশ কিছু সনের ব্যবহার দেখা যায়। বিশেষ করে প্রাচীন পুঁথি, পুঁথির পাণ্ডুলিপি, অনুলিখিত কপি, বিভিন্ন শিলালেখ, ইষ্টকলিপি, দলিল, দস্তাবেজ, ইত্যাদিতে কালজ্ঞাপক যেসব সন ও তারিখ দেখা যায়, সেগুলোর নিরিখেই বাংলাদেশে এতগুলো সনের ব্যবহার ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।

এটা আমাদের জন্য এক গর্বের বিষয় যে, পৃথিবীর প্রায় ২৫ কোটি বাংলা ভাষীর বাংলা সন নামে নিজস্ব সন ছাড়াও রয়েছে একটি বিশাল সন ব্যবস্থাপনা। বাংলাদেশে এ যাবত আবিষ্কৃত ও ব্যবহৃত সনগুলো হলো : (১) বাংলা সন, (২) হিজরি সন, (৩) খ্রিস্টাব্দ বা ঈসায়ি সন (ইংরেজি), (৪) বৌদ্ধাব্দ, (৫) শকাব্দ বা শাক সন, (৬) সম্বত্, (৭) মঘীসন, (৮) লক্ষণাব্দ, (৯) ত্রিপুরাব্দ, (১০) নেপাল সংবত্, (১১) গুপ্তকলা, (১২) শ্রী হর্ষাব্দ, (১৩) বলবাব্দ বা বলভ কলা, (১৪) মলাব্দ বা বিষ্ণুপুরী সন, (১৫) চৈতন্যাব্দ, (১৬) পরগনাতি সন, (১৭) সরাইল সন, (১৮) নসরত্শাহী সন, (১৯) দানিশাব্দ, (২০) রাজরা সন, (২১) বিশ্ব সিংহ শক, (২২) রত্ন পিঠস্য নৃপতে শক, (২৩) অমলি সন, (২৪) যবন নৃপতে শকাব্দ, (২৫) সদর সন, (২৬) মন্দারন সন, (২৭) মিলিক সন (বাঘা), ২৮) জমিদারি সন, (২৯) সর্বসিদ্ধ সন বা শ্রীরামসিদ্ধি সন, (৩০) পালাব্দ ইত্যাদি।

এ সনগুলোর প্রত্যেকটির পরিচয়, ব্যবহার এবং কোথায় কোথায় এগুলোর অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল বা আছে ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বড় গ্রন্থ রচনা করা সম্ভব।
বাংলা সন ছাড়াও ঈসায়ি বা খ্রিস্টীয় সন এবং হিজরি সন এদেশে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এসব সনের ব্যাপক ব্যবহার ও জনপ্রিয়তার মুখে উপরি উল্লিখিত ৩০টি সনের প্রায় ২৭টিই এখন প্রায় লুপ্ত। তবে এ ত্রিশটি সনের কোনো একটি সনের নাম পাওয়ার পর পাঠক যদি মনে করেন সংশ্লিষ্ট সনটির সমীকরণে বাংলা সন, ঈসায়ি সন বা হিজরি সনে কোন বছর, কোন তারিখ বা কোন মাস হবে তাহলে তাকে সনের বিশাল ক্ষেত্রে গবেষণা করা ছাড়া সিদ্ধান্তে পৌঁছা কঠিন হবে। বক্ষ্যমান প্রবন্ধে আমার জ্ঞানের সীমানা দিয়ে অতি সংক্ষেপে বহুল ব্যবহৃত সনগুলোর সঙ্গে অপ্রচলিত সনগুলোর সমীকরণ তথা রূপান্তর কৌশল সম্পর্কে কিঞ্চিত্ আলোকপাত করার চেষ্টা করব।

১. ঈসাব্দ বা ঈসায়ি সন : হজরত ঈসা আলাইহিসসালামের জন্ম থেকে এ সন গণনা শুরু হয়। খ্রিস্টানরা হজরত ঈসাকে (আ.) যিশু খ্রিস্ট বলে ডেকে থাকেন এবং এ সুবাদে তাঁর জন্ম তারিখ থেকে গণনা শুরু হওয়ায় এ সনকে তারা খ্রিস্টাব্দ বলে ডাকে। মুসলমানরা যিশুকে হজরত ঈসা (আ.) নামে ডাকার কারণে বিশ্বের নানা ভাষা ও মুসলিম দেশগুলোয় সনটিকে ঈসবি বা ঈসায়ি সন বলে ডেকে থাকে। বাংলা সনের সঙ্গে ঈসায়ি সনের পার্থক্য ৫৯৩ বছর। বাংলা সন প্রবর্তনের সময় ৯৬৩ হিজরি সনকে স্থির রেখে পরবর্তী অংশ সৌর সনে রূপান্তরকালে এ পার্থক্য গড়ে ওঠে। ৯৬৩ পরবর্তী বাংলা সনের সঙ্গে (১ বৈশাখকে ১৪ এপ্রিল ধরে) ৫৯৩ যোগ করলে মোটামুটি ঈসায়ি সন পাওয়া যাবে। অন্যদিকে যে কোনো ঈসায়ি (ইংরেজি) সন থেকে ৫৯৩ বাদ দিলে বাংলা সন মিলবে।

২. হিজরি সন : ৬২২ ঈসাব্দে হজরত মুহাম্মদের (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের স্মারক হিসেবে এ সন চালু হয়। ওই সনের জুলাই মাসের ১৬ তারিখ থেকে হিজরি সন গণনা শুরু হয়। এটি চান্দ্রমাস ভিত্তিক একটি সন। স্বয়ং আল্লাহপাক চাঁদকে সময় গণনা এবং হজের নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে পবিত্র কোরআন শরীফে আয়াত নাজিল করেছেন। এটি মুসলমানদের কাছে পবিত্র সন। এ সনে বছর গণনা করা হয় ৩৫৪ দিন ৯ ঘণ্টায়। সৌর সনের সঙ্গে তাই ১০-১১ দিন করে পার্থক্য গড়ে ওঠে, যার ব্যবধান প্রতি ৩৩ বছরে ১ বছরের সমান হয়।

বিশ্বব্যাপী ইসলামের অগ্রযাত্রার সঙ্গে এ সনটিও সব দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে ইসলামী পর্ব এবং ধর্মীয় বিধিবিধান পালনের স্বার্থে পৃথিবীর যে প্রান্তেই একজন মুসলমান বাস করুক না কেন, তার হিজরি সনের নানা হিসাব তার আহ্নিক এবং নৈমিত্তিক কাজকর্মের অনুষঙ্গী। ফলে সনটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক মর্যাদায় বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।

বাংলাদেশে কোথাও কোথাও ‘মোহাম্মদী সন’ নামে একটি সন ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। এ লেখক গবেষণা ও বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, এটি মূলত হিজরি সনকেই ভিন্ন নামে ব্যবহারের একটি রূপ। এ কারণে বর্তমান আলোচনায় সনটিকে আলাদা হিসেবে দেখানো হয়নি। ফলে এর রূপান্তর কৌশলও হবে হিজরি সনের অনুরূপ।

৩.

বাংলা সন : সম্রাট আকবরের সময় এ সন চালু হয়। সম্রাটের আদেশক্রমে তার সভার পণ্ডিত ও অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা আমির ফতেহউল্লাহ শিরাজী বাংলা সন প্রবর্তন করেন। সন প্রবর্তনের সময় হিজরি সন থেকে এ সন চালু করা হয়। ৯৬৩ হিজরিকে স্থির সংখ্যা ধরে এর পরবর্তী অংশ সৌর সন হিসেবে ধরার ফলে এর পরবর্তী অংশ সৌর সনে রূপান্তরের মাধ্যমে একে বাংলা সনে রূপ দেয়া হয়। হিজরি সনকে উত্স সন হিসেবে ধরার ফলে এ সনের গণনাও শুরু হয় ৬২২ ঈসাব্দের ১৬ জুলাই ১ হিজরি ১ বাংলা হিসেবে।

শিরাজী সাহেব হিজরিকে উত্স সন হিসেবে গণনা করলেও বাংলা সনের মাসের নামগুলো (১১টি মাসের নাম) এসেছে শকাব্দ থেকে। ফলে সনটি উপমহাদেশের প্রধান দুই ধর্মাবলম্বী হিন্দু ও মুসলমান উভয়ের কাছে একটি পবিত্র সনের মর্যাদা লাভ করে। সম্রাট আকবর খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে এ সন চালু করেন। ফলে সন চালুর সময় থেকে অদ্যাবধি বাংলাদেশের জমির খাজনা বাংলা সনের হিসাবে পরিশোধ করা হয়ে আসছে। সামপ্রতিক বছরগুলোতে কোনো কোনো ঊর্ধ্বতন মহল (সাবেক একজন এলজিআরডি মন্ত্রী কর্তৃক) খাজনা আদায়ের সঙ্গে বাংলা সনের ব্যবহারের এ একটি ঐতিহ্যকেও মুছে ফেলার দুঃসাহস ও অপউদ্যোগ গ্রহণ করতে দেখা গেছে। তারা তহশিল অফিসের নাম পরিবর্তন, তহশিলদারের পদবি পরিবর্তনসহ শেকড়ের গোড়া উপড়ানোর জন্য বাংলা সনের হিসেবে খাজনা আদায়ের পরিবর্তে ব্যাংকের মাধ্যমে ঈসায়ি সনের হিসাবে খাজনা আদায়ের পরীক্ষামূলক উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। জনগণ তাদের এ উদ্যোগে সায় না দেয়ায় ঐতিহ্য ধ্বংসের এ উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। এ বিষয়ে দেশ ও স্বাজাত্যবোধে জাগ্রত জনগোষ্ঠীকে আরও সতর্ক থাকতে হবে।

বাংলা সনের সমসাময়িক আরও কয়েকটি সন রয়েছে। বাংলা সনের তারিখ গণনাসহ শুরুর তারিখও একই হওয়ায় এগুলো নিয়ে বিস্তারিত আরোচনা করা হলো না।

৪. বৌদ্ধাব্দ : বুদ্ধের (শাক্যমুনি) নির্বাণ লাভের কাল থেকে বৌদ্ধাব্দ গণনা শুরু হয়। বৌদ্ধদের গ্রন্থে এবং শিলালিপিগুলোতে এ সনের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। গৌতম বুদ্ধের নির্বাণ লাভের কাল সম্পর্কে উপমহাদেশের বৌদ্ধ পণ্ডিতদের সঙ্গে চীনা বৌদ্ধ পণ্ডিতদের বিতর্ক রয়েছে। উপমহাদেশের পণ্ডিতরা ঈসা-পূর্ব (খ্রিস্টপূর্ব) ৪৮৭ সনে বৌদ্ধ নির্বাণ লাভ করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। অপরদিকে চীনা পণ্ডিতরা নির্বাণ লাভ ৬৩৮ ঈসা পূর্বাব্দে সংঘটিত হয়েছিল বলে মানে। বাংলাদেশের বৌদ্ধরা বৌদ্ধপূর্ণিমা বা বৈশাখী পূর্ণিমাসহ অন্যান্য উপাসনার তারিখ এ সনের হিসাবেই করে থাকে। ঢাকার রামপুরা বৌদ্ধ বিহারসহ দেশের অন্যান্য বৌদ্ধ বিহারে এ সনের ব্যবহার দৃষ্ট হয়।

৫. শকাব্দ : শক নামক নৃপতি প্রবর্তিত বছর। হজরত ঈসার (আ.) জন্মের ৭৮ বছর পর এবং বাংলা সনের ৫১৫ বছর আগে এর শুরু। উপমহাদেশে বাংলা সন চালুর আগে রাজকীয় সন হিসেবে হিজরি সন চালু থাকলেও পাশাপাশি এ শকাব্দের ব্যবহারও ছিল। ভারত সরকার ডক্টর মেঘনাদ সাহার নেতৃত্বে গঠিত সংস্কার কমিটির সুপারিশক্রমে শকাব্দকে যুগোপযোগী সংস্কার করে সর্বভারতীয় সনরূপে গ্রহণ করেছে।

৬. সম্বত্ : হজরত ঈসার (আ.)র জন্মের ৫৭ বছর আগে উজ্জয়িনীরাজ বিক্রমাদিত্য প্রবর্তিত অব্দ। বাংলা সনের সঙ্গে ৬৫০ যোগ করলে সম্বত্ পাওয়া যায়।

৭. মঘী সন : প্রাচীন আরাকানের বৌদ্ধ ধর্মীয় রাজাদের মঘ বলা হয়। মঘদের প্রবর্তিত সনকেই মঘী সন বলে। ৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে এ সন শুরু ধরে গণনা করা হয়। বাংলা সন থেকে ৪৫ বাদ দিলে মঘী সন পাওয়া যায়। মধ্যযুগে আরাকানে বাংলা সাহিত্যের ব্যাপক চর্চা হলেও সেখানে বাংলা সন প্রবেশ লাভ করেনি। কবিরা তাঁদের কাব্যে মঘী সনের ব্যবহার করেছেন। এতে বোঝা যায়, এটি সরকারি সন হিসেবে চালু ছিল।

আমাদের বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলেও এ সনের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। গত শতাব্দীতে জন্মগ্রহণকারী চট্টগ্রামের কৃতী সন্তান আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদের জন্মকুষ্টি লেখা হয় মঘী সনের হিসাবে।

৮. নেপাল সংবত্ : নেপাল সংবত্ ৮৮০ ঈসাব্দে শুরু হয়েছে বলে জানা যায়। বাংলা পুঁথিতে এ সনের স্বল্প ব্যবহার দৃষ্ট হয়।

৯. ত্রিপুরাব্দ : পার্বত্য ত্রিপুরায় প্রচলিত এ সন ৬২১ ঈসাব্দে আরম্ভ হয় বলে ধারণা করা হলেও প্রকৃতপক্ষে বাংলা সনের নতুন যাত্রার শুরুর (৯৬৩ হি.) বাংলা ৩ বছর পর শুরু হয় বলে পুঁথিতে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়। ঈসায়ি সন থেকে ৫৯০ বাদ দিলে ত্রিপুরাব্দ পাওয়া যায়। এটিও একটি সৌর সন।

১০. লক্ষ্মণাব্দ : সেন রাজবংশের সর্বশেষ রাজা লক্ষ্মণ সেন এ সন প্রবর্তন করেন । সংক্ষেপে এটিকে লং সং বলা হয়। এটি ১১১৮ ঈসায়ি থেকে শুরু হয় বলে ধরা হয়। আইনে আকবরির মতে, সম্রাট আকবরের নবতর সন প্রতিষ্ঠাকালে ৪৬৫ লক্ষ্মণাব্দ ছিল। বাংলাদেশে এ সনের ব্যবহার খুবই কম।

১১. পরগণাতি সন বা সরাইল সন : বখতিয়ার খিলজির বঙ্গ জয়ের স্মারকে শুরু হওয়া এ সনটি পরগণাতি সন নামে বিভিন্ন স্থানে পরিচিত। সনটি সরাইল এলাকার সরাইল সন নামেও পরিচিতি লাভ করেছে। ১৮৯৩ সনে সরাইল এলাকায় জরিপ কাজ চালানোর সময় সেটেলমেন্ট অফিসার বাবু কালিশংকর সেন এ সনটির ব্যবহার লক্ষ্য করেন। ১৮৯২ সনে সনটির ৬৯৩ বছর চলছে বলে তিনি উলেখ করেন। ফলে সনটি ১৮৯২-৬৯৩=১১৯৯ ঈসায়ী সন থেকে শুরু হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। উল্লেখ্য, বখতিয়ার খিলজি বাংলা জয়ের আগে ১১৯৯ সনে বিহার জয় করেন। তবে সনটি যে মুসলমানদের দ্বারা সৃষ্ট, এতে কোনো সন্দেহ নেই। পরগণাতি সন নামে দেশের অন্যান্য স্থানেও এর ব্যবহার পুঁথিতে লক্ষ্য করা যায়।

১২ শাহুর সন : ‘সুর সন’ এবং ‘আরবি সন’ নামেও এটি পরিচিত। এটি হিজরি সনের সৌররূপ সন । ৭৪৫ হিজরি সনের ১ মহররম (১৩৪৪ ঈসায়ি সনের ১৫ মে) এ সন গণনা শুরু হয়। দিল্লির সুলতান মুহম্মদ তুঘলক (১৩২৫-১৩৫১) দিল্লি থেকে রাজধানী (দেবগিরিতে) দৌলতাবাদে স্থানান্তরকালে ফসলের মাধ্যমে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে এটি চালু করেন। ‘আবজাদ’ শব্দের দ্বারা এর বর্ষ লেখা হতো। মারাঠি পঞ্জিকায় এ সনের ব্যবহার দৃষ্ট হয়।

১৩. নসরত্শাহী সন : রাজার ক্ষমতারোহণের কালজ্ঞাপক ‘রাজসক’ নামে পরিচিত এ ধারার সনগুলো অনেক ক্ষেত্রে রাজার মৃত্যু বা পতনের পর বন্ধ হয়ে গেছে। কতকগুলো বেশ কিছুদিন চলার পর আরেকটি সন চালু হওয়ায় তা এমনিতেই আস্তে আস্তে লয় পেয়েছে। অনেক সময় কোনো জনপ্রিয় রাজার মৃত্যুর পর তাঁর স্মারকে এ ধরনের সন চালুরও উদাহরণ রয়েছে। বাংলার স্বাধীন সুলতানী আমলের হোসেনশাহী যুগের সুলতান নাসির উদ্দিন নসরত্শাহের (১৫১৯-১৫৩২) নামে ‘নসরত্শাহী সন’ নামে একটি সন চালুর উদাহরণ পাওয়া যায়। বাংলা সনের সঙ্গে দুই যোগ করলেই নসরত্শাহী সন হয়।

১৪. আমলি সন : বাংলা ভাষার বিভিন্ন প্রাচীন বইয়ে এ সনের ব্যবহার দেখা যায়। ১১৮৫ আমলি সনে শকাব্দ ১৭০০ সাল লেখা হয়। ফলে ১৭০০-১১৮৫=৬২৫ আমলি হয় যা বাংলা সনের সঙ্গে মাত্র ৩ বছরের ব্যবধান। প্রকৃতপক্ষে এটি বাংলা সনেরই সমসাময়িক এবং কেবল নামের ক্ষেত্রেই এর ব্যবধান।

১৫. দানিশাব্দ : ‘আইন-সার-সংগ্রহ’ এবং ‘মনিহরণ’ নামক বইয়ে এ সনের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। সনের উত্পত্তি সম্পর্কে বিতর্ক রয়েছে তবে উভয় বইতেই এ সনটির গণনায় বাংলা সনের সঙ্গে পার্থক্য সুস্পষ্ট। ১২৪৭ বাংলা সনে দানিশাব্দ ৯১ হয়। কাজেই ১২৪৭-৯১=১১৫৬ বাংলা সন। ১৭৪৯ ঈসায়ি থেকে এ সনের শুরু। গুপ্ত প্রেস পঞ্জিকাতে চলতি শতাব্দীর প্রথম দশকগুলোতেও এ সনের প্রচলন লক্ষ্য করা যায়।

১৬. সর্বসিদ্ধ বা শ্রীরামসিদ্ধ সন : বগুড়া জেলার প্রাচীন নাথ সম্প্রদায়ের তীর্থস্থানরূপে পরিচিত যোগীর ভবনের কয়েকটি বাংলা শিলালেখে এ সনের উল্লেখ পাওয়া গেছে। ‘সর্বসিদ্ধ সন ১১৭৩ শ্রী সুফল’ (ধর্মডুব্দী মন্দির গাত্রে) এবং ‘শ্রীরামসিদ্ধ সন ১১৭৩ সাল আমলে শ্রীনাথ নারায়ণ’ (সর্বমঙ্গলার মন্দির দ্বারে) এর উল্লেখ রয়েছে। তবে এ জন্মসাল সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।

১৭. মিলিক সন : রাজশাহীর বিখ্যাত বাঘা শরীফের পীর হজরত শাহ দৌলা ও শাহ আবদুল হামিদ দানিশমন্দের উত্তরাধিকারী হজরত মুহাম্মদ রফিক প্রতিষ্ঠিত ‘রফিকি ওয়াকফ এস্টেটে’ এ সনের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। ১০৩৭ হিজরি মোতাবেক ১৬২৭ ঈসাব্দের ১ সেপ্টেম্বর এ এস্টেট প্রতিষ্ঠিত হয়। মিলিক সনের প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট তারিখ পাওয়া যায়নি। তবে এ সনটি অগ্রহায়ণ মাস থেকে শুরু হয়। দানিশাব্দের সঙ্গেও এর আংশিক মিল লক্ষ্য করা যায়।
এছাড়াও আর যেসব অপ্রধান সন বাংলাদেশে চালু ছিল সেগুলোর মধ্যে গুপ্তকলা, শ্রী ঈসাব্দ (৪৫৮ ঈসাব্দ), পল্লভাব্দ বা বল্লভ কলা (৩১৮), মল্লাব্দ বা বিষ্ণুপুরী সন (৬৯৬), চৈতনাব্দ (১৫৩৩ ঈসাব্দ), রাজরা সন, জমিদারি সন (বাংলা সন-১০১ = জমিদারি সন), বিশ্বসিংহ শক, মন্দারণ সন, যবন নৃপতে শকাব্দ, রত্ন পীঠস্য নৃপতে শক, পালাব্দ, বিষ্ণুপুরী সন ইত্যাদি। এসব সনের বেশিরভাগই এখন অব্যবহৃত। কিন্তু আমাদের সমাজ বিবর্তনের ইতিহাসের প্রতি বাঁকে বাঁকে অবস্থান করে এগুলো জ্ঞানের এবং কালের সাক্ষী হিসেবে বিরাজ করবে আবহমান কাল। পুঁথি সাহিত্যের বিরাট ভাণ্ডারে এবং পাণ্ডুলিপি পাঠ বিষয়ে গবেষণা চালাতে গেলে এসব লুপ্ত সন সম্পর্কে জ্ঞান আহরণ জরুরি। এসব সন সম্পর্কে জ্ঞান না থাকলে প্রাচীন সাহিত্যের পাঠ থেকে আমাদের জাতীয় ইতিহাস রচনা ও এর পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে না।


মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম
**************************
দৈনিক আমার দেশ
১৪ এপ্রিল ২০১০
১লা বৈশাখ ১৪১৭