বাঙালি বৌদ্ধদের নববর্ষ
বাংলাদেশের বৌদ্ধধর্ম খুবই সুপ্রাচীন। গৌতম বুদ্ধের জীবদ্দশাতেই বৌদ্ধধর্ম এদেশে প্রচারিত হয়েছিল। পাল রাজত্বের সময় (অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী) বাঙালি বৌদ্ধরা চারশ’ বছর এদেশ শাসন করেছিল। এছাড়া চন্দ্রবংশ, দেববংশ ও খজাবংশ নামে বৌদ্ধ রাজবংশও বিভিন্ন এলাকায় রাজত্ব করেছিলেন। অতীতের বৌদ্ধ গৌরব ও ঐতিহ্য সোমপুরী মহাবিহার (পাহাড়পুর), শালবন বিহার (কুমিল্লা), বাসুবিহার (বগুড়া প্রাচীন পুন্ড্রবর্ধন) এবং পণ্ডিত বিহার (চট্টগ্রাম)-এর ধ্বংসাবশেষ থেকে আবিষ্কৃত হয়ে আলোর পাদপ্রদীপে এসেছে। বাঙালি বৌদ্ধ মনীষী অতীশ দীপংকর, পণ্ডিত শীলভদ্র শান্তি রক্ষিত, কমল শীল, চন্দ্রগোমিন বাংলার সীমা পেরিয়ে বিশ্বে জ্ঞানচর্চার মশাল জ্বালিয়েছিলেন। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে বৌদ্ধধর্ম অন্তর্ধান করলেও বৃহত্তর চট্টগ্রাম বরাবরই বৌদ্ধধর্মের শিক্ষাকে অম্লান রেখেছিল। বর্তমানের বাঙালি বৌদ্ধ সম্প্রদায় এদেশের আদি বৌদ্ধদের বংশধর—এরা এদেশের ভূমিজ সন্তান।
বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা, রাখাইন সম্প্রদায়ও বৌদ্ধধর্মাবলম্বী। সমতল এলাকার বড়ুয়া বৌদ্ধরা হলো বাঙালি বৌদ্ধ সম্প্রদায়। তারা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী, ঢাকা এলাকায় বসবাস করে। এদের সংখ্যা বর্তমানে পাঁচ লাখ। বাংলাদেশের একটি ক্ষুদ্র সম্প্রদায়।
বাঙালি বৌদ্ধদের নিজস্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি রয়েছে, বিভিন্ন উত্সব ও পর্ব বিদ্যমান। এদেশের অন্যান্যের মতো তারাও বাংলার নববর্ষ অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে উদযাপন করে। নববর্ষকে আন্তরিকতার সঙ্গে পালনের বৈশিষ্ট্য হলো এই বৈশাখ মাসেই মহাকারুনিক বুদ্ধ জন্মগ্রহণ করেন—বৈশাখী পূর্ণিমা তথা বুদ্ধ পূর্ণিমায় তিনি বোধিজ্ঞান লাভ করেন এবং মহাপ্রয়াণ করেন। বুদ্ধের জীবনের তিনটি প্রধান ঘটনা বৈশাখী পূর্ণিমায় সংঘটিত হয়েছিল বলে বৈশাখ মাসের গুরুত্ব বৌদ্ধদের কাছে অপরিসীম। এই মাস বৌদ্ধদের কাছে অতি পবিত্র মাস। থেরবাদী বৌদ্ধদের মহিলারা এ মাসে পুত্রসন্তান জন্ম দেয়ার কামনা করে এবং এতে ভাগ্যবতী বলে মনে করে। বৌদ্ধেরা বৈশাখ মাসের প্রথম দিনটিকে তথা নববর্ষকে বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে। বৈশাখী পূর্ণিমায় বুদ্ধের জন্ম, বুদ্ধত্ব লাভ এবং মৃত্যু হয়েছিল।
বাঙালি হিসেবে তো বটেই, বৌদ্ধ হিসেবেই ধর্মীয় দিক থেকে বাংলার নববর্ষের গুরুত্ব বৌদ্ধদের কাছে খুবই বেশি। এ কারণে তারা পরম উত্সাহসহকারে দিনটি উদযাপন করে। নববর্ষে বাড়িঘর ও আঙিনা পরিষ্কার করা হয়। সাত পুকুরের জলকে একত্রিত করে বাড়ির সমগ্র এলাকায় ছিটিয়ে দেয়া হয়। বাড়ির দরজায়, গৃহের আসবাবপত্রে কেয়াফুল ও নিমপাতা একত্র করে বেঁধে দেয়া হয়। বছরের শেষ দিন অর্থাত্ চৈত্রসংক্রান্তি থেকে উত্সবের প্রস্তুতি শুরু হয়। শুধু নিজেদের বাড়িঘর নয়, বৌদ্ধবিহারও তারা পরিষ্কার করে এবং পবিত্র বুদ্ধমূর্তিগুলোকে ডাবের জল আর দুগ্ধ দিয়ে ধৌত করা হয়।
নববর্ষে বৌদ্ধরা নববস্ত্র পরিধান করে সকালে স্নান করে বৌদ্ধবিহারে যায়। ভিক্ষুদের আহার্য প্রদান করে, দান-দক্ষিণা দেয়। শীল গ্রহণ করে। এদিন প্রবীণেরা উপোসথ গ্রহণ করে। বিকালে আবার বিহারে যায়, শীলগ্রহণ করে এবং রাতে বুদ্ধমূর্তির সামনে বাতি জ্বালায়। বিকালে আয়োজিত হয় ধর্মালোচনা সভা। রাতে বিহারে বিহারে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় এবং অনেক বিহারে বুদ্ধকীর্তন পরিবেশিত হয়।
এদিন আনন্দ উত্সবের দিন, মিলনের দিন, শুভেচ্ছা বিনিময়ের দিন। ছোটরা বড়দের প্রণাম করে আশীর্বাদ নেয়। বড়রাও প্রাণভরে ছোটদের আশীর্বাদ করে। সেদিন বাড়িতে বাড়িতে উত্তম খাদ্য রান্না করা হয়। পায়েস রান্না করা হয়। মিষ্টির আয়োজন হয়। একে অপরের বাড়ি যায়, পায়েসান্ন খায়, মিষ্টি খায়, ভাববিনিময় করে। পারস্পরিক আলিঙ্গনে মৈত্রী বন্ধন সুদৃঢ় করে।
নববর্ষ পালনের আর এক বৈশিষ্ট্য হলো বৌদ্ধরা মৃত আত্মীয়স্বজন, আপনজন এবং জ্ঞাতিবর্গের উদ্দেশে ভিক্ষু সংঘকে অন্নদান করে, দানদক্ষিণা দেয়। সাধারণত এক সপ্তাহ ধরে এই অনুষ্ঠান করা যায়। তবে নববর্ষে অধিকতর শ্রেয়। একে বলা হয় জ্ঞাতিপূজা, পূর্ব পুরুষদের স্মরণ ও পূজা। এটার নিয়ম হলো বাড়ির উঠানের সামনে পূর্ব-দক্ষিণ কোণে চার ফুট উঁচু একটি বাঁশের মাচাং (মঞ্চ) তৈরি করতে হয়। নববর্ষে দুপুর বারোটার আগে খাদ্যভোজ্য পানীয়, ফলমুল ইত্যাদি থালায় সুন্দরভাবে সাজিয়ে মাচাংয়ে রেখে সূত্র উচ্চারণপূর্বক পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে উত্সর্গ করা হয়। মঞ্চের নিচে বাতি জ্বালানো হয়। মাচাংয়ের উদ্দেশে প্রণামও করা হয়। এ উত্সর্গের সময় বাড়ির সবাই উপস্থিত থাকে। এ পূজার আবেদন হলো পূর্বপুরুষের পারলৌকিক সদগতি কামনা করা।
নববর্ষের দিনে গরিবদের খাওয়ানো হয়। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং অভ্যাগতের খাওয়ার রীতি আছে। বৌদ্ধ যুবকেরা, ছেলেরা নববর্ষের পূর্বদিন মাথার চুল কাটে। অনেকেই কাঁচা হলুদ মেখে নববর্ষে স্নান করে। মেয়েরাই এটি বেশি পছন্দ করে।
প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন, নববর্ষের পূর্বের দু’দিন বাঙালি বৌদ্ধরা চৈত্রসংক্রান্তি উত্সবও পালন করে। বৌদ্ধরা এই উত্সবকে বিয়ু উত্সব বলে। নববর্ষের পূর্বের দিন মূল বিযু এবং তার পূর্বের দিন হলো ফুল বিয়ু। এ উত্সবকে চাকমারা বলে বিজু উত্সব। মারমা-রাখাইনেরা বলে সাংগ্রাই।
বসন্তের সমাগমে জাগরণী গানে মুখর হয় বৌদ্ধ গ্রামগুলো। বৌদ্ধ বাড়িতে এই উত্সবের নাম বিষুব সংক্রান্তি যা চৈত্রসংক্রান্তিও। এ সংক্রান্তিতে বাঙালি বৌদ্ধেরা বাড়িতে বাড়িতে ২/৩ দিন ভোরে এবং সন্ধ্যায় ‘জাক’ দেয়। এই ‘জাক’ শব্দটি মনে হয় জাগ তথা জাগরণী থেকে এসেছে। জাক দেয়া হলো কেয়াফুল, বিষকাডালী নামক লতাগাছ, নিমপাতা শুকনো খড়ের সঙ্গে মিলিয়ে আগুনের সাহায্যে পোড়ানো অনুষ্ঠান। সঙ্গে গানও হয়। এগুলো আঞ্চলিক গান। জানা যায়, বহুদিন থেকেই এই অনুষ্ঠান বাঙালি বৌদ্ধদের মাঝে চলে এসেছে। গানে গানে রোগ-শোক দূরীভূত হওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয় এবং বাড়িতে ধনসম্পদ বৃদ্ধির জন্য কামনা করা হয়। এই যে কামনা এর দ্বারা মনে হয় এতে তান্ত্রিক মহাযান বৌদ্ধধর্মের চিন্তাধারার অবশেষ রয়ে গেছে। কারণ বৌদ্ধধর্ম ত বিরাগ ধর্ম। তবে এই ‘জাক’ দেয়ার একটি সার্বজনীন উপযোগিতা রয়েছে। বসন্তকালে বসন্ত রোগের প্রাদুর্ভাব হয়। কেয়াকুল, বিষকাডালি, নিমপাতা ও শুকনো খড় একত্রে পোড়ালে যে তীব্র গন্ধ মিশ্রিত ধোঁয়া বের হয় তার দ্বারা বসন্তের জীবাণু নষ্ট হয়। বিযু উত্সবে নাড়ু, পিঠা, খই, করই তৈরি করা হয়। একে অন্যের বাড়ি যায়, শুভেচ্ছা বিনিময় করে এবং ঘরের তৈরি নাড়ু, পিঠা পরিবেশন করা হয়।
বিয়ু উত্সব এবং নববর্ষ উপলক্ষে বৌদ্ধমেলা অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশ-বিদেশের পর্যটক আসে। বৌদ্ধমেলার মধ্যে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার মহামুনি মেলা প্রসিদ্ধ। এই মেলায় আমেরিকার কর্নেল অলকট (বৌদ্ধ গবেষক), ইতালির ভিক্ষু লোকনাথ ভারতের আনন্দ কৌশল্যায়ন এবং জাপানের ড. কিমুরা যোগ দিয়েছিলেন এবং নববর্ষের ত্যাগধর্মের দেশনা করেছিলেন।
প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন, বর্তমানে বৌদ্ধদের সংক্রান্তি ও নববর্ষের চমক অনেকটা ম্লান হয়েছে—অথচ এগুলোই তো তাদের আপন বৈশিষ্ট্য, আপন সংস্কৃতি ও পরিচিতি। আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক কিছু হারিয়ে গেছে। হয়তো এমন দিন আসবে এর প্রতি আকর্ষণ আর থাকবে না।
আগে বৌদ্ধপল্লীতে ব্রাহ্মণেরা এসে বৌদ্ধদের সংক্রান্তি ও নববর্ষের কথা জানিয়ে দিত কয়েকদিন আগে। তারপর আসত ডোম সম্প্রদায়ের লোকেরা, সঙ্গে থাকত বাজাবাদ্যি ও নৃত্য। তারাও জানিয়ে দিত সংক্রান্তি ও নববর্ষ সমাগত। প্রতিটি উঠানে তারা নৃত্যগীত করত। বৌদ্ধ-পরিবার তাদের চালডাল দিত। এই ঢোলের বাজনা দেহে শিহরন জাগাত, উত্সবের মেজাজ তখনই তৈরি হতো। এখন গ্রামের সে ঐতিহ্য আর নেই।
-অধ্যক্ষ ড. প্রণব কুমার বড়ুয়া
**************************
দৈনিক আমার দেশ
১৪ এপ্রিল ২০১০
১লা বৈশাখ ১৪১৭