National Events - http://events.amardesh.com
বর্ষবরণ : নানা দেশে নানা সাজে
http://events.amardesh.com/articles/130/1/aaaaaaa--aaaa-aaaa-aaaa-aaaa/Page1.html
National Days
 
By National Days
Published on 04/14/2010
 
কবে নববর্ষ তথা বর্ষবরণ উত্সবের উদ্ভব হয়েছিল তার প্রামাণ্য কুষ্টিনামা নেই। নেই এ উত্সব উদযাপনের কোনো নির্দিষ্ট বা সর্বজনীন একক পদ্ধতি।

পণ্ডিতদের ধারণা, আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে নববর্ষ তথা বর্ষবরণ উত্সবের সূচনা হয়েছিল ব্যাবিলনে। তখন বছর শুরুর ঋতু ছিল বসন্তকাল। নতুন কুঁড়ি, অঙ্কুরোদ্গম বা ফসল উত্পাদনের জন্য বসন্ত ঋতু ছিল প্রশস্ত সময়। চাষাবাদের এ সময়কে কেন্দ্র করে বর্ষ শুরুর রেওয়াজ গড়ে উঠেছিল সেখানে। ইতিহাস জানাচ্ছে, খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দে চান্দ্রমাস অনুসারে নববর্ষ উত্সব উদযাপন করা হতো ব্যাবিলনে। পরে জুলিয়াস সিজার প্রবর্তিত ক্যালেন্ডারে এ দিনটি চিহ্নিত হয় ২৩ থেকে ২৫ মার্চের মধ্যে। বিভিন্ন অঞ্চলে বর্ষ গণনার যে হেরফের দেখা যায়, তার একটি প্রধান কারণ হচ্ছে বর্ষগণনার একাধিক পদ্ধতির অনুসরণ। বিশ্বে এখন পর্যন্ত চালু রয়েছে তিন ধরনের বর্ষপঞ্জি—চান্দ্র বর্ষপঞ্জি, চান্দ্র-সূর্য বর্ষপঞ্জি এবং সৌর বর্ষপঞ্জি। এর মধ্যেও আবার নামের ভিন্নতা রয়েছে। যেমন ইরানে শামসি বর্ষপঞ্জি, বঙ্গদেশে বাংলা বর্ষপঞ্জি ইত্যাদি।

বর্ষবরণ : নানা দেশে নানা সাজে
কবে নববর্ষ তথা বর্ষবরণ উত্সবের উদ্ভব হয়েছিল তার প্রামাণ্য কুষ্টিনামা নেই। নেই এ উত্সব উদযাপনের কোনো নির্দিষ্ট বা সর্বজনীন একক পদ্ধতি।

পণ্ডিতদের ধারণা, আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে নববর্ষ তথা বর্ষবরণ উত্সবের সূচনা হয়েছিল ব্যাবিলনে। তখন বছর শুরুর ঋতু ছিল বসন্তকাল। নতুন কুঁড়ি, অঙ্কুরোদ্গম বা ফসল উত্পাদনের জন্য বসন্ত ঋতু ছিল প্রশস্ত সময়। চাষাবাদের এ সময়কে কেন্দ্র করে বর্ষ শুরুর রেওয়াজ গড়ে উঠেছিল সেখানে। ইতিহাস জানাচ্ছে, খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দে চান্দ্রমাস অনুসারে নববর্ষ উত্সব উদযাপন করা হতো ব্যাবিলনে। পরে জুলিয়াস সিজার প্রবর্তিত ক্যালেন্ডারে এ দিনটি চিহ্নিত হয় ২৩ থেকে ২৫ মার্চের মধ্যে। বিভিন্ন অঞ্চলে বর্ষ গণনার যে হেরফের দেখা যায়, তার একটি প্রধান কারণ হচ্ছে বর্ষগণনার একাধিক পদ্ধতির অনুসরণ। বিশ্বে এখন পর্যন্ত চালু রয়েছে তিন ধরনের বর্ষপঞ্জি—চান্দ্র বর্ষপঞ্জি, চান্দ্র-সূর্য বর্ষপঞ্জি এবং সৌর বর্ষপঞ্জি। এর মধ্যেও আবার নামের ভিন্নতা রয়েছে। যেমন ইরানে শামসি বর্ষপঞ্জি, বঙ্গদেশে বাংলা বর্ষপঞ্জি ইত্যাদি।

সহজ করে বলা যায়, পৃথিবীর সব দেশ ও জাতিতে নববর্ষের সূচনা দিবস আলাদা হওয়ার কারণ আবহাওয়া-জলবায়ু এবং পরিবেশগত ভিন্নতা। ধর্মবিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেও অঞ্চল ও গোষ্ঠীভেদে নববর্ষ উদযাপনের আলাদা দিন ও রীতি-রেওয়াজ চালু ছিল, রয়েছে। তবে সব ক্ষেত্রে বর্ষবরণ একটি মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান। আর একটি সর্বজনীন রীতি অতীত থেকে এ পর্যন্ত সর্বত্র চালু রয়েছে। তা হচ্ছে, আলোকসজ্জার আয়োজন। যেন অন্ধকার অতীতের মুখাগ্নি করে দীপাবলী জ্বালিয়ে আগামীর পথযাত্রার মানুষের সমন্বিত পথযাত্রা। আলোকিত জীবনের প্রতি এই অনুরাগের মর্মস্পন্দন সর্বত্র এক, অভিন্ন।

নববর্ষ উদযাপনের ইতিহাস স্বভাবতই বর্ষপঞ্জি বা ক্যালেন্ডারের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যখন বর্ষপঞ্জি ছিল না তখন এ দিনটি নির্ধারণ করা হতো ফসল বপন, ফসল তোলা বা ধর্মীয় উত্সব পালনের কালকে কেন্দ্র করে। এর অনেক পরে মানুষ সুনির্দিষ্টভাবে আবিষ্কার করেছে দিন-মাস-বছরের হিসাব-নিকাশ, তৈরি করেছে বছরপঞ্জি। সে অনুসারেই বছর পরিক্রমা চলছে। বছরান্তে ফিরে আসছে বর্ষবরণ দিবস।

এক.
তথ্য মতে, বর্ষপঞ্জি বা ক্যালেন্ডারের উদ্ভব হয়েছে খ্রিস্টজন্মের অনেক আগে। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০ অব্দ পর্যন্ত রোমান রাজারা সিংহাসনে বসতেন ১৫ মার্চ অর্থাত্ তখনকার প্রচলিত বছরের প্রথম দিনে। এ দিনটিকে বলা হতো ক্যালেন্ডস । এদিকে নতুন চন্দ্রোদয়ের প্রথম দিনকেও বলা হতো ক্যালেন্ডস । একই উচ্চারণ, শুধু ইংরেজি আদ্যাক্ষরের হেরফের। ‘সি’ এর বদলে ‘কে’। ক্যালেন্ডার শব্দটি এসেছে এই ক্যালেন্ডস শব্দ থেকে। তবে ক্যালেন্ডারের উদ্ভব ও বিকাশে মিসরীয় সভ্যতার অবদান সমধিক উল্লেখযোগ্য। মিসরীয়রাই প্রথম ফসলি মৌসুমের পটভূমিতে গণনার আধুনিক পদ্ধতির প্রচলন করে। তারা ৩০ দিনে মাস, ১২ মাসে বছর এবং এর সঙ্গে আরও পাঁচ দিন যোগ করে ৩৬৫ দিনে বছর গণনা করত। একসময় রোমানরা ফসল সংগ্রহের সময়কে ভিত্তি করে মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে গণনা করত বছর। পরে অর্থাত্ খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ অব্দে তারা ১২ মাস হিসাবে ৩৬৫ দিনে বছর গণনা শুরু করে।

খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের আগে প্রচলিত ছিল হিব্রু ক্যালেন্ডার। এ ক্যালেন্ডারের ভিত্তি ছিল ১২টি চান্দ্রমাস। দক্ষিণ আমেরিকার প্রাচীন মায়া ও আজটেক সভ্যতার একই সঙ্গে ব্যবহৃত হতো দুটো বর্ষপঞ্জি। ধর্মভিত্তিক বছর ছিল ২৬০ দিনের এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের কার্যপ্রণালী ভিত্তিক বছর ছিল ৩৬৫ দিনের। তখন ২০ দিনে ছিল মাস, আঠার মাসে বছর। বছর শেষে পাঁচ দিন বরাদ্দ ছিল উত্সবের জন্য। পণ্ডিতদের মতে, চান্দ্রমাস হিসেবে সবচেয়ে নির্ভুল ক্যালেন্ডার আরবি বর্ষপঞ্জি। হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর মদিনায় হিজরত করার ঘটনা থেকে গণনা শুরু হয় হিজরি সাল। বাহাই ধর্মাবলম্বীদের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী উনিশ দিনে মাস, বছর উনিশ মাসে বা ৩৬১ দিনে। ফ্রান্সে আধুনিক ক্যালেন্ডারের সূচনা ১৭৯০-এর দশকে। ১৭৯২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন বর্ষপঞ্জি চালু হয় সেখানে। এরপর ১৮০৬ সালের জানুয়ারি মাস থেকে আবার চালু হয় গ্রেগরিয়ান বা ইংরেজি ক্যালেন্ডার। অনেকের মতে, গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সূচনা রোমানদের হাতে ১৫৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। এরপর বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জিই সংস্কার হয়ে চালু হয় ইংরেজি ক্যালেন্ডার, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এ ক্যালেন্ডার অনুসারে নববর্ষের সূচনা দিবস পহেলা জানুয়ারি।

প্রাচীন চীনা সভ্যতায় প্রচলিত ছিল চান্দ্রবর্ষ। চান্দ্রবর্ষ অনুসারে নববর্ষ পালিত হতো ১৭ জানুয়ারি থেকে ১৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে, পূর্ণিমার দিন। এখনও ঐতিহ্য অনুযায়ী চীনারা এ নিয়মেই নববর্ষ পালন করে।

দুই.
বঙ্গদেশে (বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ) বছরের শুরু বৈশাখের প্রথম দিন। কবে থেকে এর প্রচলন, তা নিয়ে মতভেদ আছে। বেশিরভাগ পণ্ডিতের মতে, বাংলা সাল চালু হয় সম্ভবত আরবি নয়শ’ হিজরির দিকে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুজন মুসলিম শাসকের নাম। একজন বাংলার সুলতান হোসেন শাহ, অন্যজন মোগল সম্রাট আকবর। ৯০৩ হিজরি অর্থাত্ ১৪৯৭ খ্রিস্টাব্দে হোসেন শাহের রাজত্বের শুরু। তখন থেকেই হিজরি বা চান্দ্র বছর অনুসারে নতুন করে বঙ্গাব্দের সূচনা। অনেকের মতে, বঙ্গাব্দের প্রবর্তন করেন সম্রাট আকবর (১৫৫৬ খ্রি.)। মতান্তরে, বাংলা সাল সম্পর্কে যে হস্তলিপি পাওয়া গেছে তা প্রমাণ করে বঙ্গাব্দ প্রবর্তনের ঘটনা আরও আগের। তবে বেশিরভাগ পণ্ডিতের মতেই, হোসেন শাহই বাংলা সালের প্রকৃত প্রবর্তক। আকবরের সময় তা পেয়েছে শাসনতান্ত্রিক সালের মর্যাদা। তিনি প্রজা ও কৃষকদের মধ্যে ঋণ বিতরণ, খাজনা আদায় এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে বাংলা বর্ষপঞ্জিকে কার্যকর করেন।

প্রাচীন বাংলায় বছরের প্রথম মাস ছিল অগ্রহায়ণ। ‘অগ্র’ মানে শ্রেষ্ঠ, ‘হায়ণ’ অর্থ ‘ব্রীহি’ বা ধান জন্মানোর সময়। দু’য়ে মিলে অগ্রহায়ণ। কালে অগ্রহায়ণের জায়গা দখল করেছে বৈশাখ। এখন বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ সরকারি ছুটির দিন অর্থাত্ জাতীয় মর্যাদায় অভিষিক্ত নববর্ষ দিবস।

তবে কোনো গ্রামীণ ধর্মশাস্ত্র বা পুঁথিপত্রে বাংলা নববর্ষ উত্সবের উল্লেখ নেই। চিন্তাহরণ চক্রবর্তী তাঁর ‘বাঙালির পালা-পার্বণ’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘নববর্ষের উল্লেখ কোনো প্রাচীন ধর্মশাস্ত্রে মেলে না।’ তাঁর মতে, ইংরেজি ‘নিউ ইয়ার্স ডে’র অনুকরণেই বাংলা নববর্ষ পালন শুরু হয়। ‘পূজা-পার্বণ’ গ্রন্থে যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি বলেছেন, বাংলা নববর্ষ উত্সব খুব প্রাচীন নয়। কেউ কেউ বলেন, বাংলায় স্বদেশি আন্দোলনের যুগে নববর্ষ একটি পুণ্যদিবসের মর্যাদা লাভ করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নববর্ষ বলতে বৈশাখ মাসের প্রথম দিনকে বুঝিয়েছেন। সাধারণত ইংরেজি নববর্ষের সঙ্গে একটি ধর্মীয় ভাব জড়িত থাকে। খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরা এদিন গির্জায় প্রার্থনা সভায় যোগ দেন। অন্যদিকে বাংলা নববর্ষ উদযাপন স্রেফ সাংস্কৃতিক তথা লোকাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

তিন.
দেশ-জাতি ও সম্প্রদায়ভেদে নববর্ষ বা বর্ষবরণ উত্সবের স্বরূপ আলাদা। সবই ঐতিহ্যের সুতোয় গাঁথা বিভিন্ন রেওয়াজের সমন্বয়। বর্তমানকালে মিসরে নববর্ষে চাঁদ দেখে নববর্ষ ঘোষণা করেন দেশের ধর্মনেতা বা প্রধান মুফতি। বিশেষ ধরনের খাবারসহ ভোজ উত্সব এবং নতুন কাপড় পরার নিয়ম সেখানে। তারপর ঈদের মতো পরস্পর শুভেচ্ছা বিনিময়। ইরানে প্রাচীনকাল থেকেই নববর্ষে নওরোজ উত্সব পালিত হয়ে আসছে। এদিন কৃষকরা ক্ষেতে বপন করে বিভিন্ন শস্যের বীজ, ঘরদোর সাজায়, নতুন পোশাক পরে।

‘হাফত-সিন’ নামের বিশেষ খাবার এদিনের সর্বজনীন খাবার, যা সাত রকমের উপকরণে তৈরি করা হয়। আমেরিকান ও জার্মানরা নববর্ষ উপলক্ষে শিশু শোভাযাত্রার আয়োজন করে। এর প্রচলন হয়েছিল ‘চৌদ্দ শতকে’। গ্রিসের রক্ষণশীলরা বছরের শেষ দিনে অপশক্তিকে তাড়াবার জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে মেতে ওঠে নতুন বছর বরণ করার নানা আয়োজনে। স্কটল্যান্ডে নববর্ষ উত্সব পরিচিত ‘হগমানে’ নামে। বছরের শুভাগমন স্মরণে কোনো কোনো গ্রামে মানুষ রাস্তায় ঢেলে দেয় ব্যারেল ব্যারেল টার। এদিন ‘ফার্স্ট ফুটিং’ নামে উপহার সামগ্রী দেয়ার একটি প্রথা চালু রয়েছে সেখানে। সুইজারল্যান্ড ও অস্ট্রিয়ায় সেন্ট সিলভেস্টারের পোশাকে সজ্জিত হয়ে নববর্ষকে স্বাগত জানায়, বর্তমানে আমেরিকা-ইংল্যান্ডসহ ইউরোপের প্রায় সব দেশেই ইংরেজি নববর্ষের আয়োজন খুবই জাঁকজমকের সঙ্গে উদযাপন করা হয়। ৩১ ডিসেম্বর নিউইয়র্ক ইভ পার্টি বা থার্টিফার্স্ট নাইট এখন সারা বিশ্বে পরিচিত। নতুন বছরে ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ সম্ভাষণ এখন আন্তর্জাতিক সম্ভাষণে পরিণত বলা যায়। আমেরিকায় নববর্ষে স্বজনদের বাড়ি বেড়ানোর ধুম পড়ে। পরদিন আমেরিকানরা জাতীয় খেলা ফুটবল দেখে এবং বাদ্যসহকারে বের করে শোভাযাত্রা। ঘোড়ার গাড়ির পেছনে এগিয়ে চলা এ শোভাযাত্রার নাম ‘রোজেস প্যারেড’।

চীন দেশে পূর্ণিমার শুরুর দিন থেকে শুক্লপক্ষের পনের দিন উত্সব চলে নববর্ষ উপলক্ষে। পৃথিবীতে একমাত্র চীনারাই নববর্ষ পালন করে প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী। নববর্ষের প্রথম দিনে তারা স্বর্গ ও পৃথিবীর দেবতাকে তুষ্ট করে নানা উপাসনা-উপাচারে, দ্বিতীয় দিন পূর্ব পুরুষের মঙ্গল কামনা করা হয়। ‘ওয়েইলু’ নামক বিশেষ ভোজনের আয়োজন করা হয় এদিন। পক্ষব্যাপী আলাদা আলাদা অনুষ্ঠানের মধ্যে সপ্তম দিনটি পালিত হয় ‘শস্য দিবস’ নামে।

বহু ভাষাভাষী ও সংস্কৃতির দেশ ভারতে সম্রাট আকবরের সময় যে নওরোজ উত্সব হতো তা সর্বভারতীয় উত্সবের মর্যাদা পায়নি। অনেকে ভারতীয় বর্ষবরণ উত্সবকে দিওয়ালি উত্সব বলে অভিহিত করেন। দিওয়ালি অর্থ দীপাবলী বা আলোর উত্সব। এটি হয় বিভিন্ন রাজ্য বা সম্প্রদায়ের নিয়ম অনুযায়ী। দিওয়ালি ধর্মীয় উত্সবও বটে। লক্ষ্মীপূজাসহ চলে দেবদেবীর স্মৃতিতর্পণ করার উদ্দেশে ভজনসঙ্গীত, কৃষ্ণকীর্তন ইত্যাদি। পাঞ্জাবে নববর্ষ উত্সব পরিচিত বৈশাখী নামে। নববর্ষে পুষ্পসজ্জা প্রায় সর্বভারতীয় রেওয়াজ, দক্ষিণ ভারতের অঞ্চল বিশেষের মজাদার খাবার ও পুষ্পোপহার গুরুত্বপূর্ণ প্রথা। তবে বর্তমানে ইংরেজি নববর্ষ পালন সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান উত্সব হয়ে উঠেছে।

ভিয়েতনামে নববর্ষকে সংক্ষেপে ‘টেট’ শব্দে অভিহিত করা হয়। ভিয়েতনামীদের বিশ্বাস, ঈশ্বর ঘরে ঘরে বাস করেন। নববর্ষে বেড়াতে যান স্বর্গে। সেখানে বসে মর্ত্যের লোক কী করছে, তা খতিয়ে দেখেন। বলা হয়, কার্প মাছের পিঠে চড়ে ঈশ্বর ভ্রমণেও বের হন। এ বিশ্বাসে অনেকে নদী বা পুকুরে কার্প মাছ ছাড়েন। জাপানে নববর্ষ উদযাপন করা হয় ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুসারে। শুভদিন হিসেবে অন্তত সূর্যাস্ত পর্যন্ত নববর্ষে হাস্যমুখর থাকে জাপানিরা। লোকাচার অনুযায়ী মন্দভাগ্য এড়াতে অনেকে বাড়ির সামনে টানিয়ে রাখে বিশেষভাবে তৈরি রশি। পারসিক অগ্নিউপাসকদের নববর্ষ ৩১ মার্চ। নতুন পোশাক, উত্তম আহার এবং বেড়ানো তাদের উত্সবের প্রধান অনুষঙ্গ।

চার.
বাংলা নববর্ষ পালন আধুনিক বাঙালি জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য সাংস্কৃতিক দিক। বহুমাত্রিক লোকাচার যুক্ত হয়েছে এর সঙ্গে। সাধারণ বাঙালি সমাজে সংস্কার আছে, নববর্ষ অর্থাত্ পহেলা বৈশাখের দিনটি সারা বছর কেমন কাটবে তার ইঙ্গিতবাহী বলে মনে করা হয়। তাই বাঙালি জীবনে এর আলাদা কদর। প্রথম বৈশাখের সূর্যকে স্বাগত জানাতে এত আয়োজন। একটি উচ্চারণই এদিন প্রতিভাত হয় নানাভাবে সবার মনে—‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে’। বৈশাখে ঘরে ফেরার রেওয়াজও বেশ পুরনো। প্রবচন আছে, এদিন বাইরে থাকতে নেই।

নববর্ষে শুধু নতুন করে সাজগোজই দ্রষ্টব্য হয়ে ওঠে না, উপহার-উপচারের হুল্লোড় ছড়িয়ে পড়ে এ পাড়া থেকে ওপাড়ায়। পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে প্রাচীন অনুষ্ঠান ‘হালখাতা মহরত’। ব্যবসায়ীদের কাছে দিবসটির তাত্পর্য অনেক। নতুন বছরে নতুন করে লাভ-লোকসানের খতিয়ান। এর প্রচলন হয়েছিল সম্রাট আকবরের সময়। এখনও আগের মতো দোকানে দোকানে হয় মিলাদ-মহফিল, পুজো-আচ্চা, আলোকসজ্জা, মিষ্টি বিতরণ ইত্যাদি। হিন্দু ব্যবসায়ীরা সিদ্ধিদাতা গণেশের পা ছুঁইয়ে শুরু করেন নতুন ‘হালখাতা’র উদ্বোধন ও উত্সব। সংস্কার আছে, এদিন কেউ বাকি দেবে না, চাবেও না। নববর্ষের আরেক দিক মেলা-খেলা। মেলার সেই গ্রামীণ জৌলুস এখন আর নেই। বটের ছায়া নেই—নদী তীরে, নেই গাঙপাড়ের শোভা-সৌন্দর্য। আজকাল মেলা বসে পাকা রাস্তার ধারে কিংবা শহরে, যার অনেকটাই প্রাণহীন।

নববর্ষের আরেক উত্সব প্রথম বৈশাখে জমিতে ‘হাল দেওয়া।’ তাও একালে একেবারেই আয়োজনহীন হয়ে উঠেছে।

রাজধানীর রমনা বটমূলে প্রতি বছর হয় বৈশাখ বরণ অনুষ্ঠান। বেলা ওঠার আগেই জেগে ওঠে মাঙ্গলিক সুরলহরী—‘এসো হে বৈশাখ।’ আবৃত্তি, আলোচনা, গণমাধ্যমে বিশেষ আয়োজন এখন সুপ্ত হয়ে যায়নি। যাত্রা, পালাগান, বাউল, কীর্তন আগের মতো না জমলেও নিঃশেষ হয়ে যায়নি। পহেলা বৈশাখের ভোজ একটি অপরিহার্য আয়োজন। অঞ্চল বিশেষে নানা জাতের খাবারও চালু আছে। শহরে ‘পান্তা-ইলিশ’ ভোজের ব্যবস্থা হয় প্রতি বছর। তবে তা আক্ষরিক অর্থেই এখন পরিণত হয়েছে নাগরিক ভড়ং-এ। একেবারেই লোক দেখানোর ঐতিহ্যপ্রীতি আর কি!

বর্ষবরণের আরেক দিক পাহাড়ি আদিবাসীদের বৈসাবি বা বিজু মেলা। জানা যায়, বৈসাবি নামের উত্পত্তি হয়েছে ত্রিপুরা আদিবাসীদের বৈসু, মারমাদের সাংগ্রাই, চাকমাদের ‘বিজু’র আদ্যাক্ষর নিয়ে। এখন দশ ভাষাভাষী তেরো আদিবাসী সম্প্রদায় মিলে পালন করে বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ উত্সব বৈসাবি। আদিবাসী সাঁওতাল, গাড়ো সমাজেও জাঁকজমকের সঙ্গে বর্ষবরণ উত্সব পালিত হয়। এদিন তীর-ধনুক নিয়ে জঙ্গলে শিকার করতে যাওয়া সাঁওতাল সম্প্রদায়ের একটি ঐতিহ্যবাহী রেওয়াজ।

পাঁচ.
নববর্ষে মানুষের চিরন্তন অভিলাষ শান্তি ও স্বস্তিপূর্ণ আরেকটি বছর। এদিনে অতীতের দুঃখ-গ্লানি ধুয়ে মুছে নতুনভাবে জীবন শুরু করার স্বপ্ন রচনা করেন সবাই। সেই প্রাণাবেগই যেন ধরা পড়ে নববর্ষ পালনের বহুমাত্রিক আয়োজনে সব কিছুর মূলে সেই একই বিষয়—শান্তিপূর্ণ জীবন আর সমৃদ্ধ আগামী। এ আকাঙ্ক্ষা বিশ্বজনীন, সর্বজনীন। যেন একটি ইচ্ছেই প্রতিভাত হাজারো পানে—সুখ চাই, শান্তি চাই, বাঙালি জাতিরও সমন্বিত প্রার্থনা, জীবন সুখময় হোক, ঋদ্ধ হোক জাতির মনন, সংসার দিগন্তে দেখা দিক অমলিন সুবর্ণ রেখা—আগামী বসন্তের শেষ দিবসের মধ্যরাত নাগাদ। তারপর ফের সেই বৈশাখ আবাহন—এসো, এসো হে বৈশাখ।


**************************
দৈনিক আমার দেশ
১৪ এপ্রিল ২০১০
১লা বৈশাখ ১৪১৭