মুক্তিযুদ্ধের অবিকৃত ইতিহাসের অভাব সম্পর্কে নিয়মিত অভিযোগ শোনা যায়। পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে শোনা যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের ব‘নিষ্ঠ ইতিহাস নেই, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করা হচ্ছে। ঐ অভিযোগের পেছনে যে ভিত্তি নেই তা নয়। কারণ আমাদের দেশের পেশাদার ঐতিহাসিকগণ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনায় তেমনভাবে এগিয়ে আসেননি আর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাঠ্যপুস্তকে ও সরকারী দলিলপত্রে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের তথ্য পরিবর্তনের প্রয়াস চলেছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ দলমত নির্বিশেষে প্রযোজ্য অন্যথা যে মুজিবনগর সরকারের পরিচালনায় একাত্তরে এ দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করলো, দেশ স্বাধীন হলো, সে সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের মূল্যায়ন কোনোদিন হলো না কেন? ইদানিং বিভিন্ন নবগঠিত রাজনৈতিক দলের উদ্যোক্তাগণ বাংলাদেশের জাতীয় নেতাদের তালিকা স্থির করছেন সে সব তালিকায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের নাম নেই। এই একটি উদাহরণ থেকেই মুক্তিযুদ্ধের ব‘নিষ্ঠ ইতিহাসের অভাবের পরিচয় পাওয়া যায়। একাত্তরের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ যে একটি বেসরকারী সরকারের পরিচালনায় হয়েছিল তা কি অস্বীকার করা যাবে।

অনেক অসঙ্গতি এবং উদ্দেশ্যমূলক বিভ্রান্তি সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লেখা হয়নি বা ডকুমেন্টেশন হয়নি এমন অভিযোগ যথার্থ নয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বহু দিক আছে- রাজনৈতিক, একাত্তরের রণাঙ্গন, দেশ থেকে বিতাড়িত প্রায় এক কোটি শরণার্থী, দেশের বাইরে মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসীদের অংশগ্রহণ, পাকিস্তানীদের গণহত্যা, নারী নির্যাতন, লুণ্ঠন ও ধ্বংসযজ্ঞ, পাকিস্তানের সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটির যুদ্ধাপরাধ ইত্যাদি। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক পটভূমি নিয়ে অনেক লেখা হয়েছে। গণহত্যা, নারী নির্যাতন, শরণার্থী সমস্যা নিয়ে বিশেষ লেখা হয়নি। একাত্তরের রণাঙ্গন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৈনিক ও সেনাপতিদের অনেকেই তাদের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখে বাংলা ভাষায় যুদ্ধ সাহিত্যের অভাব পূরণ করেছেন। লিখিত ইতিহাস ছাড়াও একাত্তরের রণাঙ্গনের বা যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বর্ণিত হচ্ছে একটি বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেলে গত ৭ই মার্চ থেকে প্রতিদিন, যা চলবে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত ‘মুক্তিযুদ্ধ প্রতিদিন’ নামে। এই অনুষ্ঠানটিকে একাত্তরের রণাঙ্গনের ব‘নিষ্ঠ মৌখিক ইতিহাস বলা যেতে পারে। এই সাক্ষাৎকার ভিত্তিক অনুষ্ঠানটিতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি দিনের এক একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা উঠে আসছে এবং তা বর্ণনা করছেন সেই ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা সরাসরিভাবে যুক্ত এক বা একাধিক ব্যক্তি। যদি ‘মুক্তিযুদ্ধ প্রতিদিন’ অনুষ্ঠানটি সিডি এবং মুদ্রিত অবস্থায় প্রকাশিত হয় তাহলে একাত্তরে বাঙালীর শৌর্য, বীর্য, ত্যাগ, তিতিক্ষা এবং কি চরম মূল্যের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে তার যথার্থ ইতিহাস পাওয়া যাবে।

‘মুক্তিযুদ্ধ প্রতিদিন’ অনুষ্ঠানে মূলত একাত্তরের রণাঙ্গন বা মুক্তিবাহিনীর বীরত্বগাথা বর্ণিত হলেও এটা শুধু যুদ্ধ বর্ণনা বা রণাঙ্গনের ইতিহাস নয়, এই যুদ্ধের রণাঙ্গনের সঙ্গে সম্পর্কিত ঘটনাবলী বিবৃত হচ্ছে সংশিস্নষ্টদের মুখে। সুতরাং ‘মুক্তিযুদ্ধ প্রতিদিন’ যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটা বড় অভাব পূরণ করছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সাহিত্য রচনা করতে গিয়ে আমাদের সৃজনশীল লেখকেরা বাস্তব অপেক্ষা কল্পনা এবং আবেগের আশ্রয় গ্রহণ করছেন বেশি। মুক্তিযুদ্ধ কোনো কাল্পনিক ঘটনা নয়, মুক্তিযুদ্ধের বিশালতা, গভীরতা, ব্যাপকতা এতই অপরিসীম যে, কোনো সাধারণ প্রতিভাসম্পন্ন লেখকের কল্পনার দৌড় ততদূর পৌঁছুতে সক্ষম নয়। ‘মুক্তিযুদ্ধ প্রতিদিন’ অনুষ্ঠানে আমরা আমাদের দেশের ‘জানা অজানা মানুষের মুখে মুক্তিযুদ্ধের যে সব কাহিনী শুনেছি তাকে এককথায় বলতে হয় ‘বিস্ময়কর।’ এ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দর্শক স্রোতারা মুক্তিযুদ্ধের এমন অনেক তথ্য জানতে পেরেছেন যা আমাদের যথার্থভাবে জানা ছিল না। আমাদের মধ্যে কয়জন জানতেন যে, মুক্তিযুদ্ধের সময় ৬১ জন তরুণ মুক্তিযুদ্ধা ওয়ারকমিশন পেয়েছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্বে তারা মুক্তিবাহিনীর নিয়মিত সৈনিকদলের বিভিন্ন ব্যাটালিয়নের বিভিন্ন কোম্পানীর কমান্ডার হিসেবে অত্যন্ত বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন। এছাড়াও একাত্তরের রণাঙ্গনের অসংখ্য যুদ্ধের কাহিনী উঠে এসেছে এই অনুষ্ঠানে, যার প্রতিটি নিয়ে এক একটি উপন্যাস বা গদ্য মহাকাব্য রচিত হতে পারে। মুক্তিবাহিনীর নৌ কমান্ডোদের এবং বৈমানিকদের অপরিসীম বীরত্বগাথা শোনা গেছে এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের মুখেই।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে এক একজন সাধারণ মানুষ কিভাবে অসাধারণ হয়ে উঠেছিলেন ‘মুক্তিযুদ্ধ প্রতিদিন’ অনুষ্ঠানে তা শুনলে হয়তো মনে হতে পারে রূপকথা শুনছি। কিন্তু ‘মুক্তিযুদ্ধ প্রতিদিন’ রূপকথা বা কল্পকাহিনী নয়, বরং একাত্তরের রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের অবিকৃত ব‘নিষ্ঠ ইতিহাস। কেবল পেশাদার ঐতিহাসিক বা ইতিহাসের অধ্যাপকরাই যে একটি জাতির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জনকে ইতিহাসে রূপায়িত করতে পারেন তা নয়, বরং ঐ ইতিহাস যারা সৃষ্টি করেছেন তারাই পারেন সে ইতিহাসকে যথার্থভাবে দেশ ও জাতির সামনে তুলে ধরতে। ৭ই মার্চ থেকে ১৬ই ডিসেম্বর ২০০৭, মোট ২৮৪ দিন প্রায় সমসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধার মুখে যে ২৮৪টি কাহিনী বর্ণিত হয়েছে তা আগাগোড়া মেলালে একাত্তরের রণাঙ্গনের এক অকথিত ইতিহাস রচিত হয়েছে বলতে হয়। যারা বলেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নেই, মুক্তিযুদ্ধের ডকুমেনটেশন বা তথ্য প্রমাণাদি নেই, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের দলীয়করণ করা হয়েছে, তাদের অভিযোগের জবাব ‘মুক্তিযুদ্ধ প্রতিদিন’ অনুষ্ঠান। যেখানে দল মত শ্রেণী পেশা লিঙ্গ বয়স নির্বিশেষে বাঙালী জাতি স্বাধীনতার জন্য পাগলের মতো যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, যে বালক কোনোদিন নিজের পাড়া, মহল্লা বা গ্রামের চৌহদ্দি পার হয়নি, সে আত্মীয় পরিজন ঘর বাড়ী ছেড়ে সীমান্ত পেরিয়ে পাহাড়ে জঙ্গলে ট্রেনিং নিয়ে দেশে এসে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, অকাতরে প্রাণ দিয়েছে। সারা বাংলাদেশে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের কবর ছড়িয়ে রয়েছে আর রয়েছে পাকিস্তান ও দেশের রাজাকার, আলবদর, আল-শাম্‌স ও শান্তিকমিটির মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্যতম অপরাধের সাক্ষ্য প্রমাণ। এই যুদ্ধাপরাধীরা কতো নিরীহ বাঙালীকে না নির্মমভাবে হত্যা করেছে, কত লক্ষ লক্ষ বাঙালীকে নিষ্ঠুরভাবে দেশছাড়া করেছে, কতো লক্ষ লক্ষ মা-বোনের চরম সর্বনাশ করেছে? ‘মুক্তিযুদ্ধ প্রতিদিন’ অনুষ্ঠানটি মূলত একাত্তরের রণাঙ্গনের কাহিনী হলেও প্রসঙ্গক্রমে ঐ বিষয়গুলোও উঠে এসেছে। আরও উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধে বাঙালীর শত্রুমিত্রের কথা। মুক্তিযুদ্ধের ছত্রিশ বছরের মধ্যে যেমন মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকারের ভেদাভেদ লুপ্ত প্রায়, তেমনি একাত্তরে বাঙালীর মরণপণ স্বাধীনতা সংগ্রামে বহির্বিশ্বে কে আমাদের শত্রু আর কে মিত্র ছিল তা-ও আমাদের ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। আলোচ্য অনুষ্ঠানটিতে প্রাসঙ্গিকভাবেই মুক্তিযুদ্ধে আমাদের শত্রু ও মিত্রদের তৎপরতা বারবার উল্লেখিত হয়েছে।

মোট কথা ‘মুক্তিযুদ্ধ প্রতিদিন’ অনুষ্ঠানে ১৯৭১ সালের ৩৬ বছর পরে হলেও যেরূপ নিরপেক্ষ ও ব‘নিষ্ঠভাবে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে তাতে এ অনুষ্ঠানের আয়োজক, ব্যবস্থাপক, প্রযোজক ও উপস্থাপককে তাদের সত্যনিষ্ঠার জন্য অভিনন্দন জানাতেই হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক ডামাডোল এবং পটপরিবর্তন যে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গীকে ঝাপসা বা পক্ষপাতদুষ্ট করতে পারেনি সেটা বাস্তবিকই এ দেশে একটা দুর্লভ ব্যাপার। একটা কথা না বললেই নয় যে, একজন রাজাকার চিরকাল রাজাকার, সে কখনো মুক্তিযোদ্ধা হতে পারে না কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধা চিরদিন মুক্তিযোদ্ধা নয়, পদস্খলন হলে সে আর মুক্তিযোদ্ধা নয়। দীর্ঘ ছত্রিশ বছর পরেও মুক্তিযুদ্ধ প্রতিদিন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপক ও উপস্থাপক যথার্থই প্রমাণ দিলেন যে, তারা আজও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। কোনো দল বা সরকার বা প্রভুর মনোরঞ্জনের জন্য তারা ‘মুক্তিযুদ্ধ প্রতিদিন’ অনুষ্ঠান করছেন না বরং তারা ১৯৭১ সালের মতো ২০০৭ সালেও ৭ই মার্চ থেকে ১৬ই ডিসেম্বর ২৮৪ দিন প্রতিদিন মুক্তিযুদ্ধ কার চলেছেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নয় মাস কেন নয় বছরেও বলে শেষ করা যাবে না, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কোনোদিন পুরোনো হবে না, কোনোদিন ফুরিয়ে যাবে না, কারণ এ হচ্ছে আমাদের অস্তিত্বের জন্য মরণপণ সংগ্রামের রক্তাক্ত ইতিহাস।

‘মুক্তিযুদ্ধ প্রতিদিন’ অনুষ্ঠান প্রচারকারী বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেলটি একটি জাতীয় কর্তব্য সম্পন্ন করেছেন এবং প্রমাণ রেখেছেন যে, এটি মুক্তিযুদ্ধের চ্যানেল। আমরা আশা করবো ঐ অনুষ্ঠানের আয়োজকরা ‘মুক্তিযুদ্ধ প্রতিদিন’ অনুষ্ঠানটিতে মৌখিকভাবে মানচিত্রসহ যে ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে তা লিপিবদ্ধ ক’রে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করবেন আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পুরো অনুষ্ঠানটিকে সিডিতে ধারণপূর্বক যারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে চান তাদের পাবার ব্যবস্থা করবেন। আমাদের বর্তমান প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানে না, তাদের ইতিহাস সচেতন করতে, তাদের জাতীয় বীরদের শ্রদ্ধা করতে শেখাতে হলে ‘মুক্তিযুদ্ধ প্রতিদিন’ অনুষ্ঠানের কোনো বিকল্প নেই। আশা করি ‘মুক্তিযুদ্ধ প্রতিদিন’ অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তারা এই কাজটি করে জাতির চিরকৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ হলেন।

**************************
লেখকঃ  রফিকুল ইসলাম
দৈনিক ইত্তেফাক, ১৬ ডিসেম্বর ২০০৭