National Events - http://events.amardesh.com
আদি পাপ: একাত্তরের অপরাধের বিচার
http://events.amardesh.com/articles/123/1/aaa-aaa-aaaaaaaaa-aaaaaaa-aaaaa/Page1.html
National Days
 
By National Days
Published on 03/27/2008
 

বাংলাদেশ এখনো অতীতের সঙ্গে ফয়সালা করে ওঠেনি আর অতীতও কখনোই তাকে ছেড়ে যায়নি| যে সমাজে মারাত্মক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এবং যেখানে বিশালসংখ্যক মানুষ তার শিকার হয়েছে, এমন সন্ত্রস্ত সমাজে অতীতের বিষয় নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু করা এক জটিল ব্যাপার| অতীত সেখানে বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে তাড়া করে ফেরে| এ রকম এক ক্ষতবিক্ষত সমাজের পক্ষে সম্ভব নয় অতীতের ক্ষত ভুলে যাওয়া বা যারা দায়ী তাদের ক্ষমা করা| তা তখনই সম্ভব, যখন অতীতের সঙ্গে একটা বোঝাপড়ার পথ বের করা হয়| কিন্তু প্রায় চার দশকে পা দেওয়া বাংলাদেশ তা করতে ব্যর্থ হয়েছে| একজন খ্যাতনামা বিশ্লেষকের ভাষায় বললে, এটাই বাংলাদেশের ‘আদি পাপ’|


আদি পাপ: একাত্তরের অপরাধের বিচার

বাংলাদেশ এখনো অতীতের সঙ্গে ফয়সালা করে ওঠেনি আর অতীতও কখনোই তাকে ছেড়ে যায়নি| যে সমাজে মারাত্মক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এবং যেখানে বিশালসংখ্যক মানুষ তার শিকার হয়েছে, এমন সন্ত্রস্ত সমাজে অতীতের বিষয় নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু করা এক জটিল ব্যাপার| অতীত সেখানে বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে তাড়া করে ফেরে| এ রকম এক ক্ষতবিক্ষত সমাজের পক্ষে সম্ভব নয় অতীতের ক্ষত ভুলে যাওয়া বা যারা দায়ী তাদের ক্ষমা করা| তা তখনই সম্ভব, যখন অতীতের সঙ্গে একটা বোঝাপড়ার পথ বের করা হয়| কিন্তু প্রায় চার দশকে পা দেওয়া বাংলাদেশ তা করতে ব্যর্থ হয়েছে| একজন খ্যাতনামা বিশ্লেষকের ভাষায় বললে, এটাই বাংলাদেশের ‘আদি পাপ’|

সামাজিক নিপীড়নের কিছু অন্তর্নিহিত লক্ষণ রয়েছে| পরবর্তী প্রজন্মগুলোকেও তা পীড়িত করতে থাকে| খুবই ভুল হবে যদি ভাবা হয় যে সরাসরি নির্যাতিতদের বিদায়ের মধ্য দিয়ে তাদের উত্তরসূরিদের মধ্যে আতঙ্কের ঘোর, যাতনা, দু:খ কিংবা হাহাকার কমতে থাকবে| তা হয় না| একমাত্র অপরাধের ‘সুবিচারই’ যাতনার নিষ্কাশন ঘটানোর নিশ্চয়তা দেয় এবং বাংলাদেশের এখন সেটাই দরকার|

বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের চালচলন দেখে মনে হচ্ছে যে তারা দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাখ্যাত হওয়া ১৯৭১ সালের অপরাধের বিচার শুরুর প্রক্রিয়া হাতে নিচ্ছে না| তা হলে বলতে হবে যে আগেকার সরকারগুলোর মতো এই সরকারও সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধার জন্য একাত্তরের ভাবাবেগকে ব্যবহার করতে চাইছে| অথচ এই সরকারের দুই মূল কারিকাশক্তি প্রধান উপদেষ্টা ও সেনাপ্রধান তাঁদের শাসনের গোড়াতেই জনগণের মধ্যে একাত্তরের অপরাধের সুবিচারের বিরাট আকাáক্ষা জাগিয়েছিলেন| তাঁদের কথায়, জনগণের মধ্যে চাপা থাকা আবেগ ও কষ্টের অনুভূতির ঝরনা কপাট খুলে ঢলের মতো বেরিয়ে পড়েছে| একই সঙ্গে অনেকের মধ্যে আশা জেগেছে যে এবার বোধহয় দোষীদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং ক্ষতিগ্রস্তরা সুবিচার পাবে|


একাত্তরের অপরাধ
কীভাবে কেবল ‘যুদ্ধাপরাধ’ ও ‘যুদ্ধাপরাধীদের’ প্রসঙ্গই একাত্তরের একমাত্র প্রসঙ্গ হয়ে উঠল, তার অর্থ উদ্ধার করা খুবই কঠিন| যুদ্ধাপরাধীদের বিচারই হোক বা আর যা-ই হোক, সব সংগঠন, সংবাদপত্র, অন্যান্য গণমাধ্যম এবং এ-বিষয়ক আলোচনায় ‘বিশেষভাবে’ যুদ্ধাপরাধের ওপরই জোর দেওয়া হয়| ব্যাপারটা যেন এ রকম যে ১৯৭১ সালে কেবল যুদ্ধাপরাধ ছাড়া আর কোনো অপরাধের ঘটনা ঘটেনি! বাংলাদেশে এখন কেবল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য রব ওঠা এবং কেবল এর ওপরই নজর থাকার ফলে অভিযুক্ত ও দোষীদের অনেকেই আইনের খুঁটিনাটির মধ্যে যুদ্ধাপরাধের সংজ্ঞা নিয়ে ঘোরপ্যাঁচ খেলার সুযোগ পাচ্ছে|

বাস্তবে একাত্তরে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় যে অপরাধটি ঘটেছিল সেটি যুদ্ধাপরাধ নয়, গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ| পৃথিবীতে এর তুল্য জঘন্য অপরাধের কথা আর জানা নেই| ১৯৭১ সালে নাগরিকত্ব, জাতীয়তা, বর্ণ ও ধর্ম পরিচয়ই যুদ্ধের শিকারদের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিয়েছিল|

পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসরেরা অভিসন্ধিমূলকভাবেই বাঙালিদের নৃতাত্ত্বিক ও জাতিগত পরিচয়কে নিশানা করেছিল| তাদের লক্ষ্য ছিল আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে বাঙালিদের ধ্বংস করা| আর ধর্মের জন্য বিশেষভাবে নজর ছিল হিন্দু বাঙালিদের প্রতি| কখনো যদি তদন্ত করে অপরাধের প্রকৃতি উন্মোচিত হয় এবং তা যদি আইনের খাপের মধ্যে মিলিয়ে দেখা হয় তাহলে দেখা যাবে, এ অপরাধ ১৯৪৮ সালের জেনোসাইড কনভেনশন এবং ১৯৭৩ সালে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনাল) অ্যাক্টে বর্ণিত গণহত্যার সংজ্ঞার সঙ্গে ভালোভাবেই মিলে যায়|

এর পরের স্তরের অপরাধটি সংঘটিত হয়েছিল অন্য নির্যাতিতদের বিরাট একটি অংশের ওপর| এটি হলো মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ| সংক্ষেপে, আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে এর অর্থ হলো, ব্যাপকবিস্তৃতভাবে অথবা একটানা ও সংগঠিতভাবে কোনো বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর সচেতনভাবে আক্রমণ করা| অন্য ভাষায় বললে, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হলো বড় আকারে নিরীহ বেসামরিক মানুষদের হত্যা করা কিংবা তাদের বিরুদ্ধে বড় আকারের আক্রমণ পরিচালনা ও অমানবিক কার্যকলাপ চালানো| ১৯৭১ সালে, বেশির ভাগ আক্রান্তরা ছিল নিরস্ত্র জনসাধারণ, সশস্ত্র যোদ্ধা নয়| যারা অস্ত্র বহন করত তাদের বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য অন্য আইন প্রযোজ্য, কিন্তু কোনো অবস্খাতেই বেসামরিক জনসাধারণকে আক্রমণ করা যেতে পারে না|

সর্বোচ্চ অপরাধের দায়
ওপরে বলা অপরাধের কোনো একটিও যে করেছে বা আদেশ, উসকানি, সহায়তা, পক্ষ নেওয়া, সাহায্য, ইন্ধন, মদদ অথবা তাতে অন্য কোনোভাবে অবদান রাখাসহ সজ্ঞানে এ ধরনের অপরাধ বিস্তারে ভূমিকা রাখা যে-কাউকে ব্যক্তিগতভাবে এর জন্য দায়ী করা উচিত| তা হলেও, খেয়াল রাখতে হবে, যাতে যারা পরিকল্পনা করেছিল বা সংগঠিত করেছিল অথবা আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনীর মতো অপরাধী সংগঠন চালাত, তাদের বিষয়েই বেশি নজর দেওয়া হয়| কারণ সংঘটিত অপরাধের সর্বোচ্চ দায়দায়িত্ব এদেরই| সুতরাং এদের শাস্তি দেওয়ায় সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা থাকা উচিত এবং তা করা উচিত অগ্রাধিকারের ভিত্তিতেই|

বিচারের দায়িত্ব
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইন তথা আন্তর্জাতিক অপরাধ, গণহত্যার অপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ইত্যাদির জন্য প্রণীত আইন অনুসারে তদন্ত ও বিচার রাষ্ট্রের ‘ঐচ্ছিক’ বিষয় নয়, ‘দায়িত্ব’| রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে সরকারের পয়লা কর্তব্য হচ্ছে গণহত্যা তদন্তে কমিশন গঠন করা এবং তার প্রতি দায়বদ্ধ থেকে দায়ীদের তদন্ত করে বিচারের মুখোমুখি করার ব্যবস্খা করা|

১৯৭৩ সালের ১১ মে, বাংলাদেশের গণহত্যা প্রশ্নে পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে ভারতের বিরুদ্ধে ঠিক এ যুক্তিই পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে তোলা হয়েছিল| ওই তারিখে জাতিসংঘের সদস্য-রাষ্ট্রের মধ্যে বিবাদ-মীমাংসায় হল্যান্ডের হেগে অবস্খিত জাতিসংঘের বিচারিক সংস্খা বিশ্ব আদালতে (আইসিজে) পাকিস্তান একটি মামলা করে| ভারতের হাতে আটক ১৯৫ জন অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীকে গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারের জন্য বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর ঠেকাতে এ মামলা করা হয়েছিল|

মামলার আরজিতে পাকিস্তানের বক্তব্য ছিল এই যে, “১৯৪৮ সালের ৯ ডিসেম্বরের ‘কনভেনশন অন দ্য প্রিভেনশন অ্যান্ড পানিশমেন্ট অব জেনোসাইড’-এর আলোকে বর্তমানে ভারতের হেফাজতে থাকা এবং পাকিস্তানি ভূখণ্ডে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করার দায়ে অভিযুক্ত ১৯৫ জন অথবা যেকোনো সংখ্যক পাকিস্তানি নাগরিকের বিচার করার সম্পূর্ণ অধিকার পাকিস্তানেরই রয়েছে| অন্য কোনো সরকার কিংবা কর্তৃপক্ষ এ ধরনের বিচারকার্য করার উপযুক্ত পক্ষ নয়|’’

পাকিস্তান এও বলে যে, ‘‘উপরিউক্ত যুদ্ধবন্দীদের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য গণহত্যার অভিযোগ, ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ কিংবা ‘যুদ্ধাপরাধের’ ধারণা তাদের ওপর প্রযোজ্য নয়|” অন্যভাবে বললে, পাকিস্তান সবীকার করে নিল যে বাংলাদেশে অবস্খানরত শীর্ষস্খানীয় সামরিক নেতৃত্ব ওই ১৯৫ জন যুদ্ধবন্দী ‘গণহত্যা চালিয়েছে’| এভাবে তারা বাংলাদেশ যে অভিযোগ করে আসছে তাতেই আরও জোর দিল| পাকিস্তানের এ চেষ্টা কাজে লাগেনি কারণ, ভারত এ বিষয়ে আইসিজের এখতিয়ার সবীকার করেনি|

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) গণহত্যার দায়ের বিষয়টি সবীকার করে নেওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান তার অভিযুক্ত নাগরিকদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচারের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে| একই কাজ বাংলাদেশও করেছে, অথচ গণহত্যাটি সংঘটিত হয়েছিল তার ভূখণ্ডে তার নাগরিকরদের ওপর| পরিণামে বঞ্চিত হয়েছে নিযুত লক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ|
তাই বাংলাদেশ সরকার কোনো অজুহাতেই একাত্তরের অপরাধের তদন্ত ও বিচারের দায় এড়াতে পারে না| আগের সরকার÷লোর ব্যর্থতা কিংবা বর্তমান সরকারের সময়সবল্পতা অথবা অন্য কোনো কিছুর ওজর তোলা উচিত নয়| সরকারের এভাবে দায়িত্ব এড়ানোর অর্থ বাংলাদেশে অপরাধের দায়মুক্তির যে সংস্কৃতি মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে, প্রতিরোধের বদলে তাকে বরং আরো জোরদার করে|

এক অপরাধ, দুই আইন
এটা এখনো এক রহস্য যে একই অপরাধের জন্য কেন বাংলাদেশ দুই ধরনের আইন প্রণয়ন করল| সবাধীনতা অর্জনের কয়েক সপ্তাহের মাথায়, ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি, প্রেসিডেন্টের আট নম্বর অধ্যাদেশে ‘বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আইন’ নামে একটি আইন প্রণীত হয়| এটি করা হয়েছিল মূলত ‘কতিপয় ব্যক্তি, ব্যক্তিবর্গ অথবা কোনো সংগঠনের সদস্য হিসেবে, যারা প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষভাবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দালালি করেছিল, যে সেনাবাহিনী বেআইনিভাবে ও নৃশংস শক্তি দিয়ে বাংলাদেশে দখলদারি কায়েম করেছিল এবং যেসব ব্যক্তি গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনে সাহায্য ও সমর্থন যুগিয়েছিল’, তাদের বিচারের উদ্দেশ্যে| অন্যভাবে বললে, এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল দালালদের বিচার|

অপর আইনটি পাস হয় এর প্রায় দেড় বছর পর, ১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই তারিখে| এটি ছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩| এর উদ্দেশ্য ছিল ‘সশস্ত্র বাহিনী, প্রতিরক্ষা অথবা তাদের সহযোগী বাহিনীর’ সদস্যদের জন্য, যারা সাতটি বড় ধরনের অপরাধ করেছিল| এর মধ্যে আছে: মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ| এটা অনেককে দ্বিধায় ফেলে দিয়েছিল এ জন্য যে, ওইসব অপরাধের মূল হোতাদের বিচারে এ আইনটি করতে কেন দীর্ঘ সময় লেগে গেল আর কেনই বা সবাধীনতার মাত্র পাঁচ সপ্তাহের মধ্যেই স্খানীয় দালালদের বিচারের জন্য আইন তৈরি হয়ে গেল!

কার্যত একই অপরাধের জন্য দালাল ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্য আলাদা আইন করা হয়েছিল| যদিও বাস্তবে সশস্ত্র বাহিনীর একজন সদস্যকেও আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন আইন ১৯৭৩-এর আওতায় আনা না গেলেও কয়েক হাজার দালালকে ঠিকই ধরা হয়েছিল|

কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই এই দ্বিচারিতা আইনের অধীনে সবার মর্যাদা সমান, আইনের এই মৌল প্রপ—ের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল| এবং পরিণামে, বিশেষ করে যাদের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন ১৯৭৩ প্রণয়ন করা হয়েছিল, যুদ্ধাপরাধীদের সেই ১৯৫ জনকে পাকিস্তানে ফিরে যেতে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দালাল আইনের ধারও কিছুটা কমে গেল| ১৯৭১ সালে সংঘটিত অপরাধের জন্য যদি একটিমাত্র আইন থাকত এবং তার জন্য পর্যাপ্ত সাংবিধানিক সুরক্ষা দেওয়া হতো, তাহলে হয়তো ওই আইনের আরও তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা আমরা দেখতে পেতাম|

বিচার না করা কিংবা ‘সাধারণ ক্ষমা’
দালাল আইনে সে সময় বেশ কয়েকটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল| এসবের মাধ্যমে ডা· এম এ মালেকের নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের মুখ্য সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়| অপরাধে লিপ্ত হওয়া এবং সহযোগিতার জন্য জামায়াতের শীর্ষস্খানীয় নেতাদেরও এ আইনে দোষী সাব্যস্ত করা হয়| আরও অনেকের বিরুদ্ধে তদন্ত চলে এবং অন্য কয়েক হাজার লোককে আটক করা হয়|

সরকার প্রথমবারের মতো ১৯৭৩ সালের ১৬ মে দালাল আইনের অধীনে সাজাপ্রাপ্ত ও অভিযুক্ত সুনির্দিষ্ট কিছু লোককে ক্ষমা প্রদান করে| ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর, আরেক দফা সাধারণ ক্ষমায় যাদের বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ ও আগুন লাগানোর অভিযোগ নেই, এমন অভিযুক্ত ও সাজাপ্রাপ্তদেরও ক্ষমা প্রদর্শন করা হয়| এ রকম গণহারে মুক্তি দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল পুরাতন বিবাদ মিটিয়ে ফেলে সবাইকে আবার দেশগঠনে সামিল করা কিন্তু এর ফল হয় ঠিক বিপরীত|

এ কাজে ১৯৭১ সংঘটিত অপরাধের জন্য যারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সেই ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কোনো আলাপ-পরামর্শ করা হলো না| এভাবে একতরফা সিদ্ধান্তের মাধ্যমে রোপিত হলো প্রবাদকথিত ‘আদি পাপের’ বীজ| দুর্নীতি, সবজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য কেবল পুঁটি মাছেরাই নয়, রাঘব-বোয়ালেরাও কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে গেল|

এই সাধারণ ক্ষমার আদেশ আইনগতভাবেও ছিল ত্রুটিপূর্ণ| সংবিধানের ৫৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসারে বিচারাধীনদের নয়, রাষ্ট্রপতি কেবল তাদেরই ক্ষমা করতে পারেন, যাদের সাজা দেয়া হয়েছে| সাধারণ ক্ষমার এ বিকৃতির ফলে সরকার কার্যত সব রকম তদন্তকাজ বন্ধ করে এবং অন্যদেরও ছেড়ে দেয়| শাস্তিপ্রাপ্তদের এভাবে ছেড়ে দেওয়া ছিল বেআইনি|

বিচার-বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, অভিযোগের তদন্ত করতে অনিচ্ছার অর্থ সরকার অপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের বিচারের মুখোমুখি করতে চায় না| একে নমনীয়তা বা সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন বলে না| এই সাধারণ ক্ষমার আদেশের জন্য পরবর্তী সরকার÷লোর ওপরও বিচারের জন্য কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা রইল না| তবে এই মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নতুন করে তদন্ত চালানোয় সাধারণ ক্ষমার আদেশ কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়| কেবল তা-ই নয়, এ আদেশের জায়গায় নতুন আরেকটি আদেশ জারি করে দিলেই চলে|

কিন্তু যা করা হয়েছিল
এ গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বাংলাদেশের জনগণের জীবন, সম্পদ ও ভবিষ্যতের ওপর কী রকম কম্পনক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে, তার পরিমাপ কেউ করতে পারে না| যুদ্ধ-পরবর্তী নতুন সরকারও যন্ত্রণা ও দু:খের সুনামির মাত্রা সম্পর্কে কোনো ধারণাই করতে পারেনি| জনগণকে যে বিপর্যয় ও দু:খের সাগর পাড়ি দিতে হয়েছে তারা তার অংশীদার হতে পারেননি| এ বিষয়ে সামাজিক স্তরে অনেক ব্যক্তি ও সংগঠন সক্রিয় রয়েছে কিন্তু কেউই নির্যাতিতদের সংগঠিত করেনি, তাদের কথা শুনতে চাননি| মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যায় যারা ক্ষতিগস্ত হয়েছে এবং এর প্রভাব যাদের ওপর পড়েছে, তাদের জন্য সরকারের তরফ থেকেও নেওয়া হয়নি কোনো ‘পদক্ষেপ’| কিন্তু তা না করা হলেও ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার কবল থেকে স্খানীয় দালালদের বাঁচাতে তাদের আটক করে রাখা হয়| অনেকের বিরুদ্ধে স্পেশাল ট্রাইব্যুনালও গঠন করা হয়| কতিপয় মূল দালালের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়| এর পেছনে প্রাথমিক সমর্থন থাকলেও আইনগতভাবে এটি ছিল ত্রুটিপূর্ণ| এ ধরনের নাগরিকত্ব হরণ কিন্তু আইনি প্রক্রিয়ায় শাস্তির অংশ হিসেবে করা হয়নি, করা হয়েছে নির্বাহী আদেশে| এর অবশ্যম্ভাবী কার্যফল হিসেবে পরে সবার নাগরিকত্বই ফিরিয়ে দেওয়া হয়|

সাধারণ ক্ষমার মধ্যে বিবাদ-মীমাংসার যে উচ্চাশা ছিল তা ভেঙে পড়ে অ-বিচারের চাপের কাছে| বিচার না হওয়ায় কিংবা ক্ষমার কারণে যারা ছাড় পেয়েছে তারা আবার সংগঠিত হয় এবং একপর্যায়ে বাংলাদেশের অস্তিত্বের মূলে যে উদার ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা ছিল তার বিরোধিতা দাঁড় করায়| আজকের ইসলামপন্থীরা হলো সেই ব্যক্তিবর্গ, যারা সাধারণ ক্ষমার দ্বারা লাভবান হয়েছে| তারা এখনো তাদের পুরোনো সংগঠন÷লোরই নেতৃত্ব দেয় এবং বিশ্বাস রাখে সেই একই মতাদর্শে|

কার্যত গণহত্যা ও নির্যাতনের শিকার কেউই কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ বা সান্তñনা পাননি| এমনকি হারানো সম্পত্তিও অনেক ক্ষেত্রে ফিরে আসেনি| নির্যাতিতদের বাধ্য করা হয় নিজে থেকেই উঠে দাঁড়াতে এবং জীবন চালিয়ে যেতে| সংগ্রাম ও জীবন উৎসর্গের স্নারক হিসেবে কিছু স্নৃতিসৌধ অবশ্য নির্মিত হয়েছে| এমনকি নিহতদের মধ্যেও বিভাজন করা হয় প্রতিবছর ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস পালনের মাধ্যমে| অথচ অন্য লাখ লাখ শহীদের জন্য জাতীয় শোক ও স্নরণে কোনো একক দিবস নেই| আজতক বাংলাদেশ নির্যাতনবিরোধী দিবস বা গণহত্যা দিবস বলে কোনো কিছু ঘোষণা করেনি|

উপসংহার
যাঁরা ভেবেছিলেন নিহতদের গায়েব হয়ে যাওয়া এবং নির্যাতিতদের কণ্ঠ বিলীন হয়ে যাওয়ার পর বিচারের দাবিও মরে যাবে, তাঁরা ভুল ভেবেছিলেন| জাতি এখন আবার একাত্তরের গণহত্যার বিচারের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ| যে অতীতকে অনেকে পাশ কাটাতে চেয়েছে, সেই অতীত আবার বড় শক্তি নিয়ে ফিরে এসেছে|

অতীতের সঙ্গে বর্তমানে বোঝাপড়া এখনো বাকি আছে বাংলাদেশের| নইলে ১৯৭১ প্রশ্নে যে উত্তেজনা ও সংঘাতের ফাটল সমাজে রয়েছে, অন্য কোনো সময় তা আরও বিস্তৃত হতে পারে| একাত্তরের ক্ষত এতই গভীর যে বিচার ছাড়া তা সহসা শুকানোর নয়| নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্তদের মনে করিয়ে দিতে হবে যে তাদের যন্ত্রণা অন্যরাও বোধ করে এবং অন্যরাও তার অংশীদার| এ বিষয়ে যাবতীয় কার্যকলাপ তাদের লক্ষ্য করে এবং তাদের কেন্দ্র করেই হওয়া উচিত|

একাত্তরের অপরাধের বিচার ছাড়া কোনো প্রতিকারই যথেষ্ট নয়| সংঘাত-পরবর্তী সমাজে শান্তি আসার একমাত্র শর্তই হলো বিচার| সরকার যদি একটি গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ ও উন্নত বাংলাদেশ চায়, তাহলে তাদের অবশ্যই দায়িত্ব এড়ানোর পথ পরিহার করতে হবে| তাদের উচিত অতীতের দায় মেটানো| নচেৎ সব উদ্যোগই বিভ্রম বলে গণ্য হবে|
সারা দুনিয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের বলছে, বিচারই উত্তম সান্তñনা এবং বলছে যে বিচার ছাড়া শান্তি হয় না|


**************************
ড· আহমেদ জিয়াউদ্দীন: আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ও বেলজিয়ামে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের প্রতিষ্ঠাতা|
ইংরেজি থেকে ভাষান্তর ফারুক ওয়াসিফ
দৈনিক প্রথম আলো, ২৬ মার্চ ২০০৮