ডিসেম্বর ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদগুলোর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) মোট ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসনে এবং প্রাদেশিক পরিষদের (পূর্ব পাকিস্তান) ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়। আওয়ামী লীগের এই বিজয় ছিল পাকিস্তানের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানি তথা বাঙালি জনগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ এবং শান্তিপূর্ণ বা অহিংস প্রতিবাদ।
ডিসেম্বর ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদগুলোর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) মোট ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসনে এবং প্রাদেশিক পরিষদের (পূর্ব পাকিস্তান) ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়। আওয়ামী লীগের এই বিজয় ছিল পাকিস্তানের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানি তথা বাঙালি জনগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ এবং শান্তিপূর্ণ বা অহিংস প্রতিবাদ। পাকিস্তান সামরিক শাসকদের জন্য এই ফলাফল ছিল অপ্রত্যাশিত আর অগ্রহণযোগ্য, ফলে তারা আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার গঠনের স্বাভাবিক ও সঙ্গত দাবিকে অগ্রাহ্য করে বিভিন্ন টালবাহানা শুরু করে। শেখ মুজিব মার্চ ১৯৭১ থেকে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেন। অসহযোগ আন্দোলনে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের কারণে পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক শাসকদের ক্ষমতা বা কতৃêত্ব ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে এবং এক পর্যায়ে তা সেনাছাউনির মধ্যে সীমিত হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামরিক শাসকের এতটাই প্রতিকূলে চলে যায়, ৮ মার্চ গভর্নর হিসেবে লে. জেনারেল টিক্কা খানকে শপথ পাঠে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি বি এ সিদ্দিকী অসম্মতি জ্ঞাপন করেন।
মার্চের শুরু থেকে আন্দোলন দমনের নামে সামরিক শাসকরা এলোমেলোভাবে জনগণের ওপর ফায়ারিং ও পরিণতিতে হত্যা শুরু করে। এর বিরুদ্ধে নিরীহ জনসাধারণের প্রতিবাদ বাড়তে থাকে। কখনো কখনো তা সহিংস রূপ নিতে থাকে। বাঙালিদের সাথে সাথে নিরপরাধ অবাঙালিরাও মাঝে মধ্যে বলিরপাঁঠা হতে থাকে। এ সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের দু-একটি সরকারি ভবন ছাড়া সব সরকারি ও বেসরকারি ভবনে পাকিস্তানি পতাকার বদলে উড়তে থাকে লাল, সবুজ আর সোনালী রঙের নতুন তৈরি বাংলাদেশের পতাকা। এক দিকে সামরিক শাসকদের অনড় মনোভাব, অপর দিকে জনগণের দাবি মাঝামাঝি কিছুই থাকল না। সব রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হতে শুরু করল, একটি পথই খোলা থাকল সঙ্ঘাত। পাকিস্তান সামরিক শাসকরা সম্ভবত এটাই চাচ্ছিল। অন্তত ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে তাদের সামরিক প্রস্তুতি দেখে ধারণা করা যাচ্ছিল, তারা সশস্ত্র পন্থায় রাজনৈতিক সমাধান করতে চায়। পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত বিদেশী নাগরিকরাও পাকিস্তানি আক্রমণের পূর্বাভাস পাচ্ছিল তাই ৮ মার্চে ডাচ, জার্মান, ব্রিটিশ নাগরিকরা এ দেশ ছেড়ে চলে যায়। ১০ মার্চ জাতিসঙ্ঘের কর্মকর্তারাও দেশ ত্যাগের অনুমতি পায়।
২৭ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান ন্যাশনাল শিপিং করপোরেশনের জাহাজ ‘এমভি সোয়াত’ করাচি থেকে রওনা হয়ে ৩ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছে। এ জাহাজে আনা হয় তিন হাজার টনেরও বেশি অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ। জাহাজে আরো আসে ২০ বেলুচ রেজিমেন্ট। ২ মার্চ থেকে ২৪ মার্চের মধ্যে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সি-১৩০ এবং পিআইএ’র বেসামরিক বিমানযোগে এসে পৌঁছে প্রায় ১২ হাজার পাকিস্তান সৈনিক।
সামরিক শাসকরা মার্চ মাসের মাঝামাঝি তৈরি করে বাঙালির বিরুদ্ধে ইতিহাসের অন্যতম নিষ্ঠুর ও ধ্বংসাত্মক সামরিক পরিকল্পনা অপারেশন সার্চলাইট। অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে পাকিস্তানি সামরিক শাসক বাঙালির ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন নস্যাৎ করা এবং সামরিক শক্তিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নেয়। এর আগে ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি পূর্ব পাকিস্তানের মার্শাল ল’ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর লে. জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খান পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন। এর নাম দেয়া হয়েছিল অপারেশন ব্লিট্জ। এ পরিকল্পনায় সামরিক অভিযানের পাশাপাশি রাজনৈতিক পদক্ষেপও সমান গুরুত্ব পায়।
১ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর অ্যাডিমিরাল এস এম আহসান সামরিক শাসকদের সাথে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে মতের অমিল হওয়ায় গভর্নর পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর জেনারেল ইয়াকুবকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে ৪-৫ মার্চ রাতে ঢাকা ত্যাগ করেন। একইভাবে ৫ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ও মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর জেনারেল ইয়াকুবের সাথে আন্দোলন দমন প্রশ্নে সামরিক শাসকদের মতের অমিল দেখা দেয়। জেনারেল ইয়াকুব বাঙালির ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন দমন প্রশ্নে মাত্রাতিরিক্ত সামরিক শক্তি ব্যবহারের বিরোধিতা করেন। কোনো বোঝাপড়া না হওয়ার ফলে ৫ মার্চ তিনি উভয় পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং ৭ মার্চ লে. জেনারেল টিক্কা খানকে গভর্নর ও মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটরের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে ৮ মার্চ ঢাকা ত্যাগ করেন। ৬ মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান ঘোষণা দেন, ২৫ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের প্রথম বৈঠক বসবে।
জেনারেল টিক্কা ঢাকা পৌঁছেই পরিস্থিতি বিচার করে ধারণা করেন, রাজনৈতিক আলোচনার চেয়ে সামরিক অ্যাকশনের মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানো সহজ হবে অথবা আগের দুই গভর্নর/মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর পরিস্থিতি শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি শক্ত সামরিক পরিকল্পনার প্রয়োজন অথবা রাজনৈতিক আলোচনা ব্যর্থ হলে সামরিক অভিযানের প্রয়োজন হতে পারে বিবেচনায় ১৫ মার্চ জেনারেল টিক্কা ১৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজাকে সামরিক অভিযানের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেন।
১৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকা আগমন করেন। একজন প্রেসিডেন্টকে যেভাবে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা দেয়া হয় ওই দিন তার সবই অনুপস্থিত ছিল। ছিল না কোনো ফুলের তোড়া বা মালা নিয়ে ছোট শিশুর দল, বেসামরিক কর্মকর্তা বা অভিজাত বেসরকারি ব্যক্তিরা। দেখা যায়নি সাংবাদিকদের দৌড়াদৌড়ি আর ছবি তোলার প্রতিযোগিতা। প্রেসিডেন্টকে অভ্যর্থনা জানাতে এসেছিলেন জেনারেল টিক্কা, জেনারেল রাজা, মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি খান (পূর্ব পাকিস্তান গভর্নরের বেসামরিকবিষয়ক প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার) এবং পূর্ব থেকে ঢাকায় অবস্থানরত মেজর জেনারেল এ ও মিঠ্ঠা খান (কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল)। প্রেসিডেন্টের সফরসঙ্গী হয়ে এলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আবদুল হামিদ খান, প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লে. জেনারেল পীরজাদা, মেজর জেনারেল ইফতেখার জানজুয়া (মাস্টার জেনারেল অব অর্ডনেন্স), মেজর জেনারেল গোলাম ওমর (জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রধান)। এর আগে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এত উচ্চপর্যায়ের অফিসাররা কখনো পূর্ব পাকিস্তান সফরে আসেননি।
প্রেসিডেন্ট রাজনৈতিক সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে শেখ মুজিবের সাথে আলোচনার জন্য প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে ঢাকা আসেন কিন্তু তিনি ঢাকা পৌঁছেই সন্ধ্যায় জেনারেলদের সাথে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে রমনার প্রেসিডেন্ট হাউসে (পরে সুগন্ধা নামকরণ করা হয়) আলোচনায় বসেন। সম্ভবত এই সভাতেই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া উপস্থিত জেনারেলদের সামরিক অভিযান পরিকল্পনা করার জন্য সবুজ সঙ্কেত দেন। ১৬ মার্চ জেনারেল টিক্কা, জেনারেল রাও ও জেনারেল রাজাকে সামরিক অপারেশন পরিকল্পনা করার নির্দেশ দেন। এ দু’জন অফিসার একত্রে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (কমান্ড ও স্টাফ কলেজ) প্রশিক্ষক ছিলেন এবং এ ধরনের সামরিক পরিকল্পনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন।
১৭ মার্চ সন্ধ্যায় জেনারেল টিক্কা প্রেসিডেন্টের সাথে দেখা করেন। রাজনৈতিক আলোচনা পরিকল্পনা অনুযায়ী না এগোনোর কারণে প্রেসিডেন্ট জেনারেল টিক্কার কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং সামরিক প্রস্তুতির জন্য জেনারেল টিক্কাকে আবারো নির্দেশ দেন। জেনারেল টিক্কা সেনানিবাসে ফেরত এসে রাত ১০টায় জেনারেল রাজাকে ফোন করে সামরিক প্রস্তুতি চূড়ান্ত করতে বলেন।
১৮ মার্চ সকালে জিওসি’র অফিসে জেনারেল রাজা ও জেনারেল রাও অপারেশন সার্চলাইটের বিস্তারিত পরিকল্পনা করেন। জেনারেল রাও অপারেশনের পরিধি, সাফল্যের শর্ত ইত্যাদি বিষয় আর জেনারেল রাজা বিভিন্ন ব্রিগেড ও ইউনিটের দায়িত্ব ও করণীয় নির্ধারণ করেন। এই অপারেশনের মৌলিক বিষয়গুলো ছিলঃ
১. সব গুরুত্বপূর্ণ শহরে একত্রে আক্রমণ পরিচালনা করা হবে। আক্রমণ রাতে পরিচালনা করা হবে। যেহেতু পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত সৈনিকদের প্রায় ৬০ শতাংশ বাঙালি তাই অপারেশনের বিষয়টি যত দূর সম্ভব শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গোপন রাখা হবে।
২. পূর্ব পাকিস্তানের সাথে বহির্বিশ্বের সব ধরনের যোগাযোগ (আকাশ ও নৌপথসহ) বিচ্ছিন্ন করা হবে।
৩. বেতার ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করা হবে এবং সব অনুষ্ঠান মার্শাল ল কর্তৃপক্ষ পরিচালনা করবে।
৪. গুরুত্বপূর্ণ আওয়ামী লীগ নেতাদের গ্রেফতার করা হবে।
৫. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসগুলো দুষ্কৃতকারী ও অস্ত্রের জন্য তল্লাশি করা হবে।
৬. পূর্ব পাকিস্তানে সব বেসামরিক প্রশাসন অচল ও অস্তিত্ব শূন্য হয়ে পড়ায় সামরিক অপারেশন বেসামরিক প্রশাসনের সাহায্যার্থে পরিচালিত হবে না বরং গৃহযুদ্ধ বিবেচনায় সরাসরি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে এই অপারেশন পরিচালনা করা হবে।
৭. বিভিন্ন সেনানিবাসে অবস্থিত বাঙালি সৈনিকদের নিরস্ত্র করা হবে।
এই পরিকল্পনা লেখার জন্য দুই জেনারেল হালকা নীল রঙের অফিসিয়াল প্যাড ব্যবহার করেন আর লেখার কাজটি কাঠপেনসিল দিয়ে সারেন। পাঁচ পৃষ্ঠাব্যাপী এই পরিকল্পনাতে মোট ১৬টি অনুচ্ছেদ ছিল। পরিকল্পনার ক্রোড়পত্রতে ১৬ ব্যক্তির নাম উল্লেখ ছিল যাদের গ্রেফতার করতে হবে। অপারেশনের নাম করা হয় অপারেশন সার্চলাইট। নতুন পরিকল্পনার মাধ্যমে তারা জেনারেল ইয়াকুবের তৈরি অপারেশন ব্লিটজ বাতিল করে দেন। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সম্ভাব্য বাধা বা হুমকি হিসেবে সেনাবাহিনীর বাঙালি ইউনিট, আধাসামরিক ইউনিট (ইপিআর), পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতাদের চিহ্নিত করা হয়। এ জন্য পরিকল্পনায় সুপারিশ করা হয়, সব সশস্ত্র বাঙালি ইউনিটকে নিরস্ত্র করা হবে আর রাজনৈতিক নেতাদের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনা করার নামে বৈঠকে এনে সেখান থেকে গ্রেফতার করা হবে।
১৯ মার্চ জেনারেল টিক্কা খান অপারেশন সার্চলাইট অনুমোদন করেন। ২০ মার্চ বিকেলে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল হামিদ জেনারেল রাজার বাসায় বসে অপারেশন সার্চলাইটের পরিকল্পনার অনুমোদন দেন। তবে তিনি বাঙালি সামরিক ইউনিটগুলোকে নিরস্ত্র করতে নিষেধ করেন। কিন্তু ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর), পুলিশ, মুজাহিদ ইত্যাদি বাহিনীকে নিরস্ত্র করার অনুমোদন দেন। এরপর পরিকল্পনাটি প্রেসিডেন্টকে জানানো হলে তিনি রাজনীতিবিদদের তার সাথে বৈঠকরত অবস্থায় গ্রেফতার করা ছাড়া বাকি বিষয়ে অনুমোদন দেন। সংশোধিত পরিকল্পনা প্রেসিডেন্ট ও সেনাপ্রধানের অনুমোদনের পর অপারেশন সার্চলাইটের অপারেশনাল অর্ডার তৈরি হয়। এ সময় এই অপারেশন কার্যকর করার চূড়ান্ত তারিখ ও সময় নির্ধারণ করা হয়নি।
২৩ মার্চ বিকেলে ঢাকা সেনানিবাসের অফিসার্স মেসে জেনারেল হামিদকে অপারেশন সার্চলাইটের সংশোধিত ও চূড়ান্ত অপারেশনাল অর্ডার দেখানো হয়, তা তিনি অনুমোদন দেন। ২৪ মার্চ ইয়াহিয়া নিশ্চিত হন যে শেখ মুজিব বাঙালির ন্যায্য অধিকার প্রশ্নে কোনো ছাড় দিতে প্রস্তুত নন, তাই তিনি জেনারেল টিক্কা ও জেনারেল রাওকে ডেকে অপারেশন সার্চলাইট কার্যকর করার চূড়ান্ত অনুমোদন দেন। ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইট কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, তবে আক্রমণ শুরুর সময় তখনো অনির্ধারিত রাখা হয়। ২৫ মার্চ জেনারেল রাও যশোর সেনানিবাসে, জেনারেল রাজা কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম সেনানিবাসে এবং কর্নেল সাদুল্লাহ্ রংপুর, রাজশাহী ও সিলেট সেনানিবাসে হেলিকপ্টরযোগে গমন করেন এবং উপস্থিত অবাঙালি কমান্ডারদের কাছে এই অপারেশন অর্ডার মৌখিকভাবে পৌঁছে দেন, আদেশের কোনো লিখিত কপি কাউকে দেয়া হয়নি।
২৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া প্রেসিডেন্ট হাউস থেকে ঢাকা সেনানিবাসে ফ্লাগ স্টাফ হাউসে বিকেলের চা-নাশতার জন্য আসেন। সন্ধ্যার আগে প্রেসিডেন্টের মোটরকেড প্রেসিডেন্ট হাউসে ফিরে যায়, এ সময় গাড়িতে চার তারা (জেনারেলদের গাড়ির প্রতীক) ও প্রেসিডেন্টের ফ্লাগ লাগানো ছিল এবং আউট রাইডার হুটার বাজাতে বাজাতে প্রেসিডেন্ট হাউসে ফেরত যায় তবে প্রেসিডেন্টকে ছাড়া, প্রেসিডেন্টের ভূমিকায় গাড়িতে ছিলেন লজিস্টিক এরিয়া কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার রফিক।
২৫ মার্চ সন্ধ্যা ৬টায় সব ফরমেশনকে জানানো হয়, অপারেশন ওই রাত ১টার পর কোনো এক সময় শুরু করা হবে। বিকেল ৪টার সময় পাকিস্তান থেকে একটি বোয়িং বিমান তেজগাঁও বিমানবন্দরে অবতরণ করে। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বিমানটি স্টার্ট করা হয়। রাত ৮টায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে জেনারেল হামিদ একটি ছোট প্রাইভেট কারে করে ওই বিমানে তুলে দেন। প্রেসিডেন্টের পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগের বিষয়টি অপারেশনের গোপনীয়তার সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল বলে এ সময় প্রেসিডেন্টকে বিদায় দেয়ার জন্য কোনো সামরিক কর্মকর্তাও উপস্থিত ছিল না। প্রেসিডেন্ট নিঃশব্দে ওই বিমানে উড়ে করাচি রওনা হন। রাত সাড়ে ১২টার দিকে বিমানটি করাচির আকাশে পৌঁছলে সিভিল অ্যাভিয়েশনের ডাইরেক্টর জেনারেল ঢাকায় ইস্টার্ন কমান্ড হেড কোয়ার্টারে সংবাদটি জানান। প্রেসিডেন্টের নিরাপদে পাকিস্তান পৌঁছানোর ওপর নির্ভর করছিল অপারেশন সার্চলাইট শুরুর সময়, তাই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া করাচি পৌঁছানোর পর আক্রমণ শুরুর সময় রাত দেড়টা নির্ধারণ করা হয়। রাতের কোনো এক সময় অপারেশন সার্চলাইট কার্যকর করা হবে বিবেচনায় সারাদিন ধরেই ঢাকা সেনানিবাসে আক্রমণ বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলতে থাকে। সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া হয়। প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও যানবাহন বরাদ্দ করা হয়। সেনানিবাস থেকে বেরোনোর জন্য সন্ধ্যার পর থেকেই হানাদার বাহিনী অস্থির হয়ে পড়ে খাঁচার বাঘ যেমন খাঁচা থেকে বেরোনোর জন্য অস্থির থাকে। রাত ১১টায় সেনাবাহিনী ছাউনি ছেড়ে শহরের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে আর বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেয়। অবশেষে রাত দেড়টায় সেনাবাহিনী পাকিস্তানের সার্বভৌম অখণ্ডতা ও নিরাপত্তার নামে শুরু করে ইতিহাস কুখ্যাত বিভীষিকাময় ও বীভৎস সামরিক তাণ্ডব অপারেশন সার্চলাইট।
জেনারেল রাও ৫৭ ব্রিগেড সদরদফতরে বসে ঢাকা শহরের অপারেশন নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন, আর জেনারেল রাজা তার অফিস থেকে পূর্ব পাকিস্তানের অন্য এলাকার অপারেশন নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন। জেনারেল টিক্কা ২৬ মার্চ ভোর রাতে শেরেবাংলা নগরে মার্শাল ল সদরদফতরে আসেন এবং অপারেশনের অগ্রগতি লক্ষ করতে থাকেন।
চার দিকে গুলির শব্দে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায় ঢাকাবাসীর, জেগে দেখে রাতের অন্ধকার ভেদ করে আকাশজুড়ে ছুটে বেড়াচ্ছে প্রজ্বলিত গোলাগুলি আর দাউ দাউ করে জ্বলছে বস্তি এলাকার কাঁচা বাড়িগুলো। ঘুমের মধ্যেই শহীদ হয়ে যায় হাজারো নিরপরাধ মানুষ, জানতেও পারে না কী ছিল তাদের অপরাধ। শুরু হয় পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত হওয়ার শেষ দৃশ্য বা বাংলাদেশ জন্মগ্রহণের প্রসব বেদনা।
**************************
অবঃ লে. কর্নেল মুহাম্মদ লুৎফুল হক
দৈনিক নয়াদিগন্ত, ২৬ মার্চ ২০০৮