National Events - http://events.amardesh.com
স্বাধীনতা ও খাদ্যাভাব
http://events.amardesh.com/articles/120/1/aaaaaaaaa-a-aaaaaaaaa/Page1.html
National Days
 
By National Days
Published on 03/26/2008
 

স্বাধীনতার সাঁইত্রিশ বছরেও দেশে এবার আবার তীব্র খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে। এ খাদ্যাভাব উত্তরবঙ্গের বার্ষিক মঙ্গা নয়। সরকার এবং সেনাবাহিনীর নানা শুভ উদ্যোগ সত্ত্বেও গোটা দেশে হাহাকার পড়ে গেছে। জিনিসপত্রের, বিশেষ করে চালের দাম এতটাই বেড়ে গেছে যে, তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নেই।

গত বছর দু’বার বন্যায় ফসলহানি ঘটেছে। ঘটেছে সিডরে। তা ছাড়া বিদ্যুৎ, সার, বীজ ইত্যাদি কৃষি উপকরণের অভাব তো ছিলই। কাজেই খাদ্যঘাটতি ছিল অবশ্যম্ভাবী।

আসলে সুজলা-সুফলা এই দেশেও খাদ্যাভাব নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতার আগে পাকিস্তানি আমলে দেখেছি, আমাদের টাঙ্গাইল জেলায় চৈত্র-বৈশাখ মাসে খাদ্যাভাব লেগেই থাকত। অঘ্রান মাসে কৃষকরা যে ধান পেতেন, চৈত্র মাসের আগেই তা শেষ হয়ে যেত। চাল কেনার টাকাও থাকত না তাদের হাতে। অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়ে দিন কাটাতেন তারা।

ধারণা করা গিয়েছিল, স্বাধীন দেশের সরকার কৃষির উন্নতির দিকে নজর দেবে। সহজলভ্য হবে কৃষি উপকরণ। উৎপাদন বাড়বে। খাদ্যাভাব থাকবে না।  বাস্তবে তা হয়নি। সঙ্কট রয়েই গেছে।

গত বছরের ২১ জুলাই একটি পত্রিকা জানায়, দেশে খাদ্য মজুদ প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। ধান-চাল আমদানি এবং সংগ্রহ­ কোনোটাতেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যায়নি। ফলে দুর্ভিক্ষ প্রায় অনিবার্য।

এক প্রাচীন কবি বলেছেন, তিনি সেই দেবীকে নমস্কার করেন যিনি সব প্রাণীতে ক্ষুধারূপে বিরাজমান। বেঁচে থাকতে হলে ক্ষুধাকে তুষ্ট বা প্রশমিত করা দরকার। কিন্তু শুধু নমস্কারে তা করা যায় না। রুচি ও প্রয়োজনমতো পানাহার করতে হয়। রবীন্দ্রনাথও বলেছেন, ‘সুরের খাদ্যে’ ‘নরের মিটে না ক্ষুধা’। ক্ষুধা মেটাতে যা লাগে, তা সহজলভ্য নয়। কোথাও নয়। সবার কাছে তো নয়ই।

‘দ্য ড্রিম সঙস’ গ্রন্থে মার্কিন কবি জন বেরিম্যান বলেছেন, তিনি ‘অনাহারী’। বলেছেন, খেতে হবে সম্ভবত ‘কিছুই না’। এর আগে এই কাব্যের নায়ক হেনরি দৃশ্যমান সবকিছুই খেয়ে ফেলেছিলেন। ক্ষুধার জ্বালায় মানুষ কখনো কখনো সত্যি তা খেতে বাধ্য হয়।

ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশে ১৯৮৪ সালে ভীষণ খাদ্যাভাব দেখা দেয়। তখন সেখানকার এক গো-উপাসক পরিবার গোমাংসে জীবন রক্ষা করেছিল। পরিবারের কর্তা বার্তা সংস্থা ইউএনআইকে জানানঃ ‘ঘরে খাবার ছিল না। হাতে ছিল না টাকা। বাড়ির সবাই উপোসী ছিলাম। পালের গরুগুলোও। সবাই মরতাম। তার আগে ওগুলোকে কেটেকুটে খেয়ে ফেললাম। তাই প্রাণে বেঁচে রয়েছি।’

জীবন রক্ষার এমন উপায়ও সবার থাকে না। তখন? সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তার উটপাখি কবিতায় প্রশ্ন তুলেছেন, ‘অখিল ক্ষুধায় শেষে কি নিজেকে খাবে?’

ক্ষুধায় মানুষ আত্মহননেও বাধ্য হয়। একবার ফিলিপাইনের ডাভো প্রদেশের এক প্রত্যন্ত এলাকায় ৬৪ ব্যক্তি খিদের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে জেনে-শুনে বিষ খেয়েছিল।

বিশ্বব্যাংক হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে, ২০৩০ সালে বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে লোকসংখ্যা দাঁড়াবে ১ হাজার ৫৪০ জন। এখন এই সংখ্যা এক হাজার। এখনই বাংলাদেশ পৃথিবীর সর্বাধিক ঘণবসতিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম।

পৃথিবীর জনসংখ্যা বছরে ৮০ লাখ ৬০ হাজার করে বাড়ছে। ঢাকায় এক কর্মশালায় বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, প্রাচুর্যের দেশ আমেরিকাতেও অন্তত ১ কোটি লোক অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটায়। আমরা জানি, পৃথিবীতে অন্তত ৮ কোটি লোক প্রায় অভুক্ত থাকেন। তাদের মধ্যে অনেকেই শিশু। অনাহারীদের মধ্যে অন্তত ৫০ লাখ লোক অপুষ্টিজনিত রোগে মারা যায়।
‘কোয়ান্টাম ইভোলিউশন’ (ছৎথষয়ৎশ ঊংসলৎয়মসষ) গ্রন্থের লেখক অধ্যাপক জনযো ম্যাকফেডেন (ঔসভষযসপ গধঋথননপষ) তার এক নিবন্ধে (দ্য নেশন, ব্যাংকক, আগস্ট ২৪, ২০০৫) এসব পরিসংখ্যান দিয়ে বলেছেন, আগামী ২০ বছরে জনসংখ্যা পরিস্থিতি যা দাঁড়াবে, তার সাথে তাল মিলাতে হলে ধান চাষের উৎপাদন অন্তত ৩০ শতাংশ বাড়াতে হবে।

কি করে তা সম্ভব? তিনি বলেছেন, হয় আবাদি জমির পরিমাণ বাড়াতে হবে, না হয় বাড়াতে হবে উৎপাদনের পরিমাণ।

আবাদি জমির পরিমাণ না বাড়িয়েও উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যেই সৃষ্টি হয়েছে জেনিটিক্যালি মডিফাইড (জিএম) ধান। এই ধান অতি উচ্চফলনশীল, খরা-বন্যা প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ মোকাবেলা করতে সক্ষম। এর চাষে সেচের তেমন প্রয়োজন পড়ে না। লাগে না কীটনাশকও। ফলে উৎপাদন ব্যয় খুবই কম পড়ে। কীটনাশকের খারাপ প্রভাবও এড়ানো যায়।

সরকারের তরফ থেকে বলা হয়, চিন্তার কারণ নেই। উৎপাদন বেড়েছে। মজুদও রয়েছে ভালো। উৎপাদন বৃদ্ধির সরকারি পরিসংখ্যান বা খাদ্যাভাবের কারণ শুনে মানুষের পেটের খিদে মেটে না। কখনোই না।

আধুনিক আরবি ভাষার অন্যতম প্রধান কবি সালহ নিয়াজী তার ‘তৃতীয় বিশ্ব’ কবিতায় বলেছেন, ‘আজকের কবি ওসব অঙ্কটঙ্কে তুষ্ট নন/ তার আগামীকাল মানে এক্ষুনি/খিদে পেলে তিনি শাসকের পথ আগলে দাঁড়ান/শীত লাগলে টেনেহিঁচড়ে নেন পতাকা।’

বাংলাদেশের রফিক আজাদ আরো এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছিলেন। রফিক শুধু কবি নন, মুক্তিযোদ্ধাও। দেশকে তিনি ভালোবাসেন। এখনো ভালোবাসেন বঙ্গবন্ধুকে। তবু ১৯৭৪ সালে তিনি দাবি করেছিলেন, ‘ভাত দে হারামজাদা!’ হুমকি দিয়েছিলেন, ভাত না পেলে তিনি ‘মানচিত্র’ খাবেন।

‘উজান’ উপন্যাসে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ও ক্ষুধার্ত মানুষের এই মারমুখী অবস্থার কথা বলেছেন। আসলে খাদ্যের জন্য কান্নাকাটি আর হানাহানি চলে আসছে বাইবেল কথিত ‘সৃষ্টির ষষ্ঠ দিন’ থেকেই। তবু নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ভাষায় বলা যায় না যে, ‘এখানে মন বড় কৃপণ এখানে থাকব না।’ মানুষের বিরুদ্ধে কৃপণতার অভিযোগ যেমন সত্য, তেমনি সত্য তার ঔদার্যের কথাও।

ছোটবেলায় মির্জাপুরে দেখেছি, দানবীর রণদাপ্রসাদ সাহা প্রতি বছর অন্তত একবার করে ‘লঙ্গরখানা’ খুলতেন। শত শত মানুষকে খাদ্য দান করতেন। মার্কিন কংগ্রেস সদস্যরা ১৯৮৫ সালে প্রস্তাব করেন, প্রতি বছর ২৪ নভেম্বর সবাই উপবাস করে যে খাদ্য বাঁচানো যাবে, তা দুর্ভিক্ষপীড়িত এলাকায় পাঠানো হবে।

ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের এমন কোনো কোনো সাহায্য সব সময় প্রকৃত প্রাপকের হাতে পৌঁছে না। সাতে-ভূতে খেয়ে ফেলে। ধরা যাক, বিশ্বের খাদ্যভাণ্ডার বলে পরিচিত পাশ্চাত্যের দেশগুলোয় এমন ঘটে না। অনুমান করা যাক, সেখানে হাতেমতাইয়ের সংখ্যাও অনেক। আমেরিকার মতো উদ্বৃত্ত এলাকার মানুষ তবু ক্ষুধামুক্ত নয় কেন? অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, অন্তত ১৫ লাখ আমেরিকানের দিন কাটে অন্নকষ্টে।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন তার ছবিতে মন্বন্তরের পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন। ছেঁড়াছেঁড়াভাবে এখনো তার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। এখনো অনেকের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কথিত ‘গরম ভাত’ জোটে না।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রাকৃতিক কারণে ফসলহানি, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং উৎপাদন বাড়াতে ব্যর্থতার ফলে খাদ্যাভাব হয়।

আমাদের দেশে খরা, বন্যা প্রভৃতি প্রতি বছরই ঘটছে। গত আড়াই দশকে জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এদের আবাসিক ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে লেগেছে বিপুল পরিমাণ আবাদি ও আবাদযোগ্য জমি। এদিকে চাষাবাদের আধুনিক পদ্ধতি ও উপকরণ এখনো অনেকের নাগালের বাইরে। মোটকথা, খাদ্যশস্যের চাহিদা যতটা বাড়ছে, উৎপাদন ততটা নয়। তবু স্বীকার করতে হয় যে, খাদ্য সঙ্কটের মূল কারণ খাদ্যের অভাব নয়, অপ্রাপ্তি।

এই অপ্রাপ্তির প্রধান দুটো কারণ­ সামাজিক এবং অর্থনৈতিক।
মোপাসাঁর গল্পে একটা বুড়ো ঘোড়া যে মাঠে অনাহারে প্রাণ হারায়, সেখানে তার নাগালের বাইরে ঘাসের অভাব ছিল না। কিন্তু দড়ি খুলে সে তা খেতে পারেনি।

গত শতাব্দীর সাত বা সত্তরের দশকে বাংলাদেশ, ভারত ও ইথিওপিয়াসহ বহু দেশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। উন্নত বিশ্বে যে পরিমাণ খাদ্যশস্য পশুকে খাওয়ানো হয়, তার মাত্র ১০ শতাংশ দিয়ে এই ঘাটতি মেটানো সম্ভব ছিল।

আলাদাভাবে চীন, ভারত ও বাংলাদেশের পরিস্থিতি ছিল আরো অবাক করা।
চীনের ঘটনাটা কমিউনিস্ট শাসনের প্রথম দিকের। তখন আইন করা হয় যে, চাষিরা রাষ্ট্রের পক্ষে সমবেতভাবে শস্য ফলাবেন আর রাষ্ট্র সবাইকে প্রয়োজনমতো অন্নবস্ত্র দেবে। কাগজে-কলমে গোলাভরা ধানের এই সুসময়ে, ১৯৫৮ সালে, চীনে প্রায় ৩০ লাখ লোক অনাহারে প্রাণ হারান।
ভারতে ১৯৭৮ সালে ধান ও গমের ফলন এমন ভালো হয় যে, তা মজুদ রাখাই সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তখনো সে দেশের শতকরা অন্তত ৩০ জন অনাহারে-অর্ধাহারে কাটায়।

বাংলাদেশে প্রায় একই ঘটনা ঘটেছিল সাতের দশকের মাঝামাঝি সময়ে। তখন মোট এবং মাথাপিছু চাহিদার তুলনায় খাদ্যশস্যের যোগান বেশি থাকা সত্ত্বেও কোনো কোনো এলাকায় দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। জনশ্রুতি, বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষাবস্থা সৃষ্টির ব্যাপারে অন্তত তিনটি মহলের হাত ছিল। একশ্রেণীর যাজক চাচ্ছিলেন, দুর্ভিক্ষ দীর্ঘস্থায়ী হোক। তারা ক্ষুধার্তকে খাদ্য দিয়ে বশ করে ‘ধর্ম’-এর দীক্ষা দেবেন। রাজনীতিবিদদের এক অংশ চাচ্ছিলেন, ক্ষুধার্তরা ক্ষেপে গিয়ে সরকারের পতন ঘটাক। একটি বিদেশী সরকার চাচ্ছিলেন, খাদ্যের প্রয়োজনে বাংলাদেশ সরকার তাদের কাছে মাথা নোয়াক।

খাদ্যাভাব কাটাতে হলে সবার ক্রয়ক্ষমতার ব্যবস্থা করতে হবে। উপার্জনের সুযোগ দিতে হবে সবাইকে। উৎপাদন বাড়ানো এবং চাষের খরচ কমানো গেলে দামও কম হবে। তখন ধান সহজলভ্য হবে অনেকের কাছেই। অন্যথায় সমস্যা থেকেই যাবে।

খাদ্য সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করার সাথে সাথে বাড়াতে হবে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা। ‘দুর্ভিক্ষপ্রবণ’ এই দেশের সরকারের সে ইচ্ছা থাকা চাই। অবিলম্বে সম্মিলিতভাবে সে উদ্যোগ না নিলে মুক্তি নেই। স্বাধীনতাও অর্থহীন হবে তা হলে।


**************************
লেখকঃ অরুণাভ সরকার
কবি ও সাংবাদিক
দৈনিক নয়াদিগন্ত, ২৬ মার্চ ২০০৮


স্বাধীনতা ও খাদ্যাভাব

স্বাধীনতার সাঁইত্রিশ বছরেও দেশে এবার আবার তীব্র খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে। এ খাদ্যাভাব উত্তরবঙ্গের বার্ষিক মঙ্গা নয়। সরকার এবং সেনাবাহিনীর নানা শুভ উদ্যোগ সত্ত্বেও গোটা দেশে হাহাকার পড়ে গেছে। জিনিসপত্রের, বিশেষ করে চালের দাম এতটাই বেড়ে গেছে যে, তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নেই।

গত বছর দু’বার বন্যায় ফসলহানি ঘটেছে। ঘটেছে সিডরে। তা ছাড়া বিদ্যুৎ, সার, বীজ ইত্যাদি কৃষি উপকরণের অভাব তো ছিলই। কাজেই খাদ্যঘাটতি ছিল অবশ্যম্ভাবী।

আসলে সুজলা-সুফলা এই দেশেও খাদ্যাভাব নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতার আগে পাকিস্তানি আমলে দেখেছি, আমাদের টাঙ্গাইল জেলায় চৈত্র-বৈশাখ মাসে খাদ্যাভাব লেগেই থাকত। অঘ্রান মাসে কৃষকরা যে ধান পেতেন, চৈত্র মাসের আগেই তা শেষ হয়ে যেত। চাল কেনার টাকাও থাকত না তাদের হাতে। অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়ে দিন কাটাতেন তারা।

ধারণা করা গিয়েছিল, স্বাধীন দেশের সরকার কৃষির উন্নতির দিকে নজর দেবে। সহজলভ্য হবে কৃষি উপকরণ। উৎপাদন বাড়বে। খাদ্যাভাব থাকবে না।  বাস্তবে তা হয়নি। সঙ্কট রয়েই গেছে।

গত বছরের ২১ জুলাই একটি পত্রিকা জানায়, দেশে খাদ্য মজুদ প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। ধান-চাল আমদানি এবং সংগ্রহ­ কোনোটাতেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যায়নি। ফলে দুর্ভিক্ষ প্রায় অনিবার্য।

এক প্রাচীন কবি বলেছেন, তিনি সেই দেবীকে নমস্কার করেন যিনি সব প্রাণীতে ক্ষুধারূপে বিরাজমান। বেঁচে থাকতে হলে ক্ষুধাকে তুষ্ট বা প্রশমিত করা দরকার। কিন্তু শুধু নমস্কারে তা করা যায় না। রুচি ও প্রয়োজনমতো পানাহার করতে হয়। রবীন্দ্রনাথও বলেছেন, ‘সুরের খাদ্যে’ ‘নরের মিটে না ক্ষুধা’। ক্ষুধা মেটাতে যা লাগে, তা সহজলভ্য নয়। কোথাও নয়। সবার কাছে তো নয়ই।

‘দ্য ড্রিম সঙস’ গ্রন্থে মার্কিন কবি জন বেরিম্যান বলেছেন, তিনি ‘অনাহারী’। বলেছেন, খেতে হবে সম্ভবত ‘কিছুই না’। এর আগে এই কাব্যের নায়ক হেনরি দৃশ্যমান সবকিছুই খেয়ে ফেলেছিলেন। ক্ষুধার জ্বালায় মানুষ কখনো কখনো সত্যি তা খেতে বাধ্য হয়।

ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশে ১৯৮৪ সালে ভীষণ খাদ্যাভাব দেখা দেয়। তখন সেখানকার এক গো-উপাসক পরিবার গোমাংসে জীবন রক্ষা করেছিল। পরিবারের কর্তা বার্তা সংস্থা ইউএনআইকে জানানঃ ‘ঘরে খাবার ছিল না। হাতে ছিল না টাকা। বাড়ির সবাই উপোসী ছিলাম। পালের গরুগুলোও। সবাই মরতাম। তার আগে ওগুলোকে কেটেকুটে খেয়ে ফেললাম। তাই প্রাণে বেঁচে রয়েছি।’

জীবন রক্ষার এমন উপায়ও সবার থাকে না। তখন? সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তার উটপাখি কবিতায় প্রশ্ন তুলেছেন, ‘অখিল ক্ষুধায় শেষে কি নিজেকে খাবে?’

ক্ষুধায় মানুষ আত্মহননেও বাধ্য হয়। একবার ফিলিপাইনের ডাভো প্রদেশের এক প্রত্যন্ত এলাকায় ৬৪ ব্যক্তি খিদের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে জেনে-শুনে বিষ খেয়েছিল।

বিশ্বব্যাংক হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে, ২০৩০ সালে বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে লোকসংখ্যা দাঁড়াবে ১ হাজার ৫৪০ জন। এখন এই সংখ্যা এক হাজার। এখনই বাংলাদেশ পৃথিবীর সর্বাধিক ঘণবসতিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম।

পৃথিবীর জনসংখ্যা বছরে ৮০ লাখ ৬০ হাজার করে বাড়ছে। ঢাকায় এক কর্মশালায় বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, প্রাচুর্যের দেশ আমেরিকাতেও অন্তত ১ কোটি লোক অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটায়। আমরা জানি, পৃথিবীতে অন্তত ৮ কোটি লোক প্রায় অভুক্ত থাকেন। তাদের মধ্যে অনেকেই শিশু। অনাহারীদের মধ্যে অন্তত ৫০ লাখ লোক অপুষ্টিজনিত রোগে মারা যায়।
‘কোয়ান্টাম ইভোলিউশন’ (Quantum Evolution) গ্রন্থের লেখক অধ্যাপক জনযো ম্যাকফেডেন (Johnjoe McFadden) তার এক নিবন্ধে (দ্য নেশন, ব্যাংকক, আগস্ট ২৪, ২০০৫) এসব পরিসংখ্যান দিয়ে বলেছেন, আগামী ২০ বছরে জনসংখ্যা পরিস্থিতি যা দাঁড়াবে, তার সাথে তাল মিলাতে হলে ধান চাষের উৎপাদন অন্তত ৩০ শতাংশ বাড়াতে হবে।

কি করে তা সম্ভব? তিনি বলেছেন, হয় আবাদি জমির পরিমাণ বাড়াতে হবে, না হয় বাড়াতে হবে উৎপাদনের পরিমাণ।

আবাদি জমির পরিমাণ না বাড়িয়েও উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যেই সৃষ্টি হয়েছে জেনিটিক্যালি মডিফাইড (জিএম) ধান। এই ধান অতি উচ্চফলনশীল, খরা-বন্যা প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ মোকাবেলা করতে সক্ষম। এর চাষে সেচের তেমন প্রয়োজন পড়ে না। লাগে না কীটনাশকও। ফলে উৎপাদন ব্যয় খুবই কম পড়ে। কীটনাশকের খারাপ প্রভাবও এড়ানো যায়।

সরকারের তরফ থেকে বলা হয়, চিন্তার কারণ নেই। উৎপাদন বেড়েছে। মজুদও রয়েছে ভালো। উৎপাদন বৃদ্ধির সরকারি পরিসংখ্যান বা খাদ্যাভাবের কারণ শুনে মানুষের পেটের খিদে মেটে না। কখনোই না।

আধুনিক আরবি ভাষার অন্যতম প্রধান কবি সালহ নিয়াজী তার ‘তৃতীয় বিশ্ব’ কবিতায় বলেছেন, ‘আজকের কবি ওসব অঙ্কটঙ্কে তুষ্ট নন/ তার আগামীকাল মানে এক্ষুনি/খিদে পেলে তিনি শাসকের পথ আগলে দাঁড়ান/শীত লাগলে টেনেহিঁচড়ে নেন পতাকা।’

বাংলাদেশের রফিক আজাদ আরো এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছিলেন। রফিক শুধু কবি নন, মুক্তিযোদ্ধাও। দেশকে তিনি ভালোবাসেন। এখনো ভালোবাসেন বঙ্গবন্ধুকে। তবু ১৯৭৪ সালে তিনি দাবি করেছিলেন, ‘ভাত দে হারামজাদা!’ হুমকি দিয়েছিলেন, ভাত না পেলে তিনি ‘মানচিত্র’ খাবেন।

‘উজান’ উপন্যাসে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ও ক্ষুধার্ত মানুষের এই মারমুখী অবস্থার কথা বলেছেন। আসলে খাদ্যের জন্য কান্নাকাটি আর হানাহানি চলে আসছে বাইবেল কথিত ‘সৃষ্টির ষষ্ঠ দিন’ থেকেই। তবু নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ভাষায় বলা যায় না যে, ‘এখানে মন বড় কৃপণ এখানে থাকব না।’ মানুষের বিরুদ্ধে কৃপণতার অভিযোগ যেমন সত্য, তেমনি সত্য তার ঔদার্যের কথাও।

ছোটবেলায় মির্জাপুরে দেখেছি, দানবীর রণদাপ্রসাদ সাহা প্রতি বছর অন্তত একবার করে ‘লঙ্গরখানা’ খুলতেন। শত শত মানুষকে খাদ্য দান করতেন। মার্কিন কংগ্রেস সদস্যরা ১৯৮৫ সালে প্রস্তাব করেন, প্রতি বছর ২৪ নভেম্বর সবাই উপবাস করে যে খাদ্য বাঁচানো যাবে, তা দুর্ভিক্ষপীড়িত এলাকায় পাঠানো হবে।

ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের এমন কোনো কোনো সাহায্য সব সময় প্রকৃত প্রাপকের হাতে পৌঁছে না। সাতে-ভূতে খেয়ে ফেলে। ধরা যাক, বিশ্বের খাদ্যভাণ্ডার বলে পরিচিত পাশ্চাত্যের দেশগুলোয় এমন ঘটে না। অনুমান করা যাক, সেখানে হাতেমতাইয়ের সংখ্যাও অনেক। আমেরিকার মতো উদ্বৃত্ত এলাকার মানুষ তবু ক্ষুধামুক্ত নয় কেন? অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, অন্তত ১৫ লাখ আমেরিকানের দিন কাটে অন্নকষ্টে।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন তার ছবিতে মন্বন্তরের পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন। ছেঁড়াছেঁড়াভাবে এখনো তার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। এখনো অনেকের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কথিত ‘গরম ভাত’ জোটে না।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রাকৃতিক কারণে ফসলহানি, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং উৎপাদন বাড়াতে ব্যর্থতার ফলে খাদ্যাভাব হয়।

আমাদের দেশে খরা, বন্যা প্রভৃতি প্রতি বছরই ঘটছে। গত আড়াই দশকে জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এদের আবাসিক ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে লেগেছে বিপুল পরিমাণ আবাদি ও আবাদযোগ্য জমি। এদিকে চাষাবাদের আধুনিক পদ্ধতি ও উপকরণ এখনো অনেকের নাগালের বাইরে। মোটকথা, খাদ্যশস্যের চাহিদা যতটা বাড়ছে, উৎপাদন ততটা নয়। তবু স্বীকার করতে হয় যে, খাদ্য সঙ্কটের মূল কারণ খাদ্যের অভাব নয়, অপ্রাপ্তি।

এই অপ্রাপ্তির প্রধান দুটো কারণ­ সামাজিক এবং অর্থনৈতিক।
মোপাসাঁর গল্পে একটা বুড়ো ঘোড়া যে মাঠে অনাহারে প্রাণ হারায়, সেখানে তার নাগালের বাইরে ঘাসের অভাব ছিল না। কিন্তু দড়ি খুলে সে তা খেতে পারেনি।

গত শতাব্দীর সাত বা সত্তরের দশকে বাংলাদেশ, ভারত ও ইথিওপিয়াসহ বহু দেশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। উন্নত বিশ্বে যে পরিমাণ খাদ্যশস্য পশুকে খাওয়ানো হয়, তার মাত্র ১০ শতাংশ দিয়ে এই ঘাটতি মেটানো সম্ভব ছিল।

আলাদাভাবে চীন, ভারত ও বাংলাদেশের পরিস্থিতি ছিল আরো অবাক করা।
চীনের ঘটনাটা কমিউনিস্ট শাসনের প্রথম দিকের। তখন আইন করা হয় যে, চাষিরা রাষ্ট্রের পক্ষে সমবেতভাবে শস্য ফলাবেন আর রাষ্ট্র সবাইকে প্রয়োজনমতো অন্নবস্ত্র দেবে। কাগজে-কলমে গোলাভরা ধানের এই সুসময়ে, ১৯৫৮ সালে, চীনে প্রায় ৩০ লাখ লোক অনাহারে প্রাণ হারান।
ভারতে ১৯৭৮ সালে ধান ও গমের ফলন এমন ভালো হয় যে, তা মজুদ রাখাই সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তখনো সে দেশের শতকরা অন্তত ৩০ জন অনাহারে-অর্ধাহারে কাটায়।

বাংলাদেশে প্রায় একই ঘটনা ঘটেছিল সাতের দশকের মাঝামাঝি সময়ে। তখন মোট এবং মাথাপিছু চাহিদার তুলনায় খাদ্যশস্যের যোগান বেশি থাকা সত্ত্বেও কোনো কোনো এলাকায় দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। জনশ্রুতি, বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষাবস্থা সৃষ্টির ব্যাপারে অন্তত তিনটি মহলের হাত ছিল। একশ্রেণীর যাজক চাচ্ছিলেন, দুর্ভিক্ষ দীর্ঘস্থায়ী হোক। তারা ক্ষুধার্তকে খাদ্য দিয়ে বশ করে ‘ধর্ম’-এর দীক্ষা দেবেন। রাজনীতিবিদদের এক অংশ চাচ্ছিলেন, ক্ষুধার্তরা ক্ষেপে গিয়ে সরকারের পতন ঘটাক। একটি বিদেশী সরকার চাচ্ছিলেন, খাদ্যের প্রয়োজনে বাংলাদেশ সরকার তাদের কাছে মাথা নোয়াক।

খাদ্যাভাব কাটাতে হলে সবার ক্রয়ক্ষমতার ব্যবস্থা করতে হবে। উপার্জনের সুযোগ দিতে হবে সবাইকে। উৎপাদন বাড়ানো এবং চাষের খরচ কমানো গেলে দামও কম হবে। তখন ধান সহজলভ্য হবে অনেকের কাছেই। অন্যথায় সমস্যা থেকেই যাবে।

খাদ্য সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করার সাথে সাথে বাড়াতে হবে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা। ‘দুর্ভিক্ষপ্রবণ’ এই দেশের সরকারের সে ইচ্ছা থাকা চাই। অবিলম্বে সম্মিলিতভাবে সে উদ্যোগ না নিলে মুক্তি নেই। স্বাধীনতাও অর্থহীন হবে তা হলে।


**************************
লেখকঃ অরুণাভ সরকার
কবি ও সাংবাদিক
দৈনিক নয়াদিগন্ত, ২৬ মার্চ ২০০৮