- Home
- বিজয় দিবসঃ ১৬ই ডিসেম্বর
- স্মৃতিচারণঃ বিজয়ের রথে প্রথম প্রত্যাবর্তন
স্মৃতিচারণঃ বিজয়ের রথে প্রথম প্রত্যাবর্তন
- By Article Poster
- Published 12/16/2007
- বিজয় দিবসঃ ১৬ই ডিসেম্বর
-
Rating:




ষোলই ডিসেম্বর আমার জীবনে উদভ্রান্ত সৈনিকের মতো এসেছিল।। বিজয়ী কোনো এক সৈনিক যেন আমার মধ্যে উদ্ভাসিত হয়েছিল, উৎকণ্ঠিত হয়েছিল, উদ্দাম হয়েছিল। এই দিনটিকে আমি যেভাবে আলিঙ্গন করতে চেয়েছিলাম, সেভাবে সেই দিন আমি অতিবাহিত করিনি।
আমি ছিলাম কলকাতায়। দুই মাস পূর্বে বন্ধু সীতার আশ্রয়ে থেকে বালিগঞ্জে ডাক্তার নন্দীর বাড়িতে আমি স্থায়ীভাবে থাকার সুযোগ পাই। যুদ্ধের প্রথম দিকে তাঁরা ছিলেন জলপাইগুড়িতে। সে কারণে বন্ধু সীতার পার্ক সার্কাসের অফিসে পূর্ববর্তী পাঁচ মাস আশ্রিত ছিলাম।
আমার এই নতুন ঠিকানা স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী সরকারের কতৃêপক্ষের জানা ছিল। এই বাড়ি থেকে আমি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে নিয়মিত লেখক হিসেবে কাজ করতাম।
একাত্তর সালের নভেম্বর মাস শেষ হওয়ার সময় আমরা জানতাম মুক্তিযুদ্ধের শেষ প্রান্তে এসে গেছি। তেসরা ডিসেম্বর ছিল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের দিন। এইদিন ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যৌথবাহিনী গঠনের প্রস্তাব দেন এবং প্রকৃতপক্ষে এই তিন তারিখ থেকেই ভারত বাংলাদেশের পক্ষে পূর্বাঞ্চলে যুদ্ধ ঘোষণা করে। সেই দিন থেকেই জেনারেল অরোরার নেতৃত্বে যৌথবাহিনীর মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয়। এই দিনটির কথা আমরা অনেক পূর্ব থেকে আকাঙক্ষা করেছিলাম। যুদ্ধ তখন ভারত ও পাকিস্তান পর্যায়ে চলতে শুরু করে। প্রকৃতপক্ষে এই তিন তারিখে পাকিস্তান পশ্চিমাঞ্চলে ভারতের ওপর প্রথম আক্রমণ করেছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করার প্রশ্ন ছাড়াও পাকিস্তানের ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে আক্রমণের শক্তিকে খর্ব করার জন্য বাংলাদেশের জয়েন্ট কমান্ডে আক্রমণ শুরু করে। তার ফলে পাকিস্তানকে পূর্ব ও পশ্চিম-দুই ভূখণ্ডে শক্তি বিভাজন করে যুদ্ধ করতে হয়েছিল এবং তখনি পাকিস্তান নিশ্চিত হয়ে যায় যে বাংলাদেশকে আর স্বাধীনতা অর্জনের পথ থেকে ফেরানো যাবে না। যৌথ কমান্ড গঠন তখন এই যুদ্ধের নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।
ভারত ইতিপূর্বে এপ্রিল মাস থেকে বাংলাদেশের যুবক ও মধ্য বয়সী ব্যক্তিদের ভারতে যুদ্ধ চালনা ও প্রশিক্ষণ দিতে থাকে। সেই সময়ে বাংলাদেশের দশটি সেক্টরে কমান্ডারগণ প্রকাশ্য ও গেরিলা যুদ্ধে পাকিস্তানিদের অতর্কিতে আক্রমণ করে সর্বত্র ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছিল। এমনকি এই মুক্তিযোদ্ধা গেরিলারা অস্ত্র ও ট্রেনিং প্রাপ্তির পর সিলেট, যশোর, খুলনা, রাজশাহী ও দিনাজপুর অঞ্চলের কোনো কোনো অংশে মুখোমুখি যুদ্ধে জয়লাভ করেছিল। বলতে গেলে তখন ছিল বাংলাদেশের বহু অংশ খণ্ডিত যুদ্ধক্ষেত্র।
ছয়ই ডিসেম্বর ভারত রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। সমসাময়িককালেই ভুটান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। সাত তারিখে যখন মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর কাছে যশোর ও নিকটবর্তী অঞ্চলে পাকিস্তানি কমান্ডের পতন ঘটে তখনই বুঝতে পারা যায় যে, পাকিস্তানি বাহিনী মুখোমুখি যুদ্ধে সপ্তাহখানেকের মধ্যেই পরাজিত হতে বাধ্য হবে। প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানি বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে পনেরো তারিখে চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়।
ষোলোই ডিসেম্বর যখন চূড়ান্তভাবে পরাজয় স্বীকার করে জেনারেল নিয়াজির পাকিস্তানবাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়, সে সময় নির্ধারিত হয় যে বিকাল চারটায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানবাহিনী যৌথবাহিনীর নিকট আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করবে। এই সিদ্ধান্ত যখন পনেরো তারিখ রাতে জানানো হয়, তার কয়েক দিন পূর্বে বারো তারিখের দিকে কলকাতায় ষোলো তারিখে আত্মসমর্পণের সম্ভাবনা সম্পর্কে খবর ছড়িয়ে পড়ে। এই সময় আমার পরম বন্ধু এম আর আখতার (মুকুল) ও আমি আত্মসমর্পণের সময় উপস্থিত থাকার কথা চিন্তা করি। আমরা প্রথমে মুজিবনগর সরকারের সচিবালয়ে (থিয়েটার রোড) গিয়ে সারেন্ডারের সময় উপস্থিত থাকার আকাঙক্ষা ব্যক্ত করি। দেখা গেলো, আমাদেরই সচিবালয় থেকে খোঁজা হচ্ছিল। মন্ত্রী পরিষদের সচিব মি· টি এইচ ইমাম একটি রুম থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, আপনাদেরই খুঁজছিলাম। আপনারা কি সারেন্ডারের সময় ঢাকায় থাকার কথা ভাবছিলেন? আমরা আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠলাম। তিনি বললেন, যাওয়ার ব্যবস্থা আপনাদেরই করতে হবে। আমরা সর্বপ্রকার অনুমতিপত্র আপনাদের দেয়ার ব্যবস্থা করছি। যাওয়ার পন্থা আপনাদেরই বের করতে হবে। তিনি আমাদের পোশাক কেমন হবে সেই নির্দেশও দিলেন এবং জানালেন যে, ডেলহৌসি স্কয়ারের একটি বাড়িতে ভারতীয় কমান্ডের একটি অফিস থাকবে। তারাই ট্রান্সপোর্টের ব্যবস্থা করবেন ও চূড়ান্ত অনুমতি দেবেন।
বারো তারিখ থেকে আমাদের আয়োজন শুরু হলো ঢাকায় প্রত্যাবর্তনের। সে সময় আমাদের দুই বন্ধুর পকেটে একটি পয়সাও অতিরিক্ত ছিল না। সাতচল্লিশ সাল থেকে দেশবিভাগের সময়ে এক সম্ভ্রান্ত পরিবার নিউমার্কেটের নিকটে রেডিয়েন্ট প্রেস নামে একটি প্রেস প্রতিষ্ঠা করছিলেন। একাত্তর সালে সেই প্রেস একটি সুবৃহৎ মুদ্রণালয়। প্রেসের মালিক আমাদের দুজনের চাইতে বয়সে বেশি হলেও বন্ধু হয়ে গিয়েছিলেন। সেদিন সন্ধ্যায় মুকুল আর আমি তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, আমাদের পোশাক নেই। তিনি সারেন্ডারের সময় উপস্থিত হবার কথা শুনে উল্লসিত হয়ে উঠলেন এবং বললেন, আজকে সন্ধ্যাতেই আমাদের অফিসে নামকরা দর্জির কাছে আপনাদের পাঠিয়ে দিচ্ছি। এই দর্জিই আমাদের সমস্ত কাপড় তৈরি করে। আমরা দুজন তার লোকের সাথে সেই এলাকায় দর্জির দোকানে উপস্থিত হলাম।
এই দোকানে আমরা দুজনে ‘কেমোফ্লেস’ সৈনিকের কাপড় দিয়ে সামরিকবাহিনীর ব্রুস শার্ট ও ফুলপ্যান্ট তৈরির অর্ডার দিলাম। দেখা গেলো, দর্জি মিলিটারি পোশাক তৈরি করতে অভিজ্ঞ। পনেরোই ডিসেম্বর তিনি আমাদের কেমোফ্লেস সৈনিকের পোশাক ডেলিভারি দিলেন। পরের দিন ষোলোই ডিসেম্বর বিকেলে পরাজিত পাকিস্তান বাহিনীর জেনারেল নিয়াজির আত্মসমর্পণের তারিখ নির্ধারিত হয়। আমরা সেই তারিখে সকালে ভারতীয় সৈনিক অফিসারদের সিটি ক্যাম্প ডেলহৌসি স্কয়ারে উপস্থিত হই। সেখানে আমরা এক বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলাম। গিয়ে দেখি স্কোয়ারের একটি বারোতলা বিল্ডিংয়ের মধ্যবর্তী তিনটি তলা ভারতীয় বাহিনীর দখলে। বিদেশ থেকে কয়েক শ’ সাংবাদিক তখন ঐ স্কোয়ারের বিল্ডিংয়ে উপস্থিত। ভারতীয় সাংবাদিকও ছিল তিন থেকে চার শত। এই বিপুল সংখ্যক সাংবাদিককে ভারত থেকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া অসাধ্য বলে মনে হচ্ছিল। সে সময় প্রত্যেক সাংবাদিককে মিত্রবাহিনীর পক্ষ থেকে বিশেষ পাস দেয়া হচ্ছিল। কিন্তু তাদের ঢাকায় বিকেল চারটার পূর্বে নিয়ে যাওয়া ছিল অসম্ভব কাজ। প্রথমত এত বিপুল সংখ্যক ট্রান্সপোর্ট কতৃêপক্ষের হাতে ছিল না। দ্বিতীয়ত যশোর থেকে সমস্ত আন্তঃজেলা পথ ছিল বিপজ্জনক। পাকিস্তানি বাহিনী সমস্ত ক্রসকান্ট্রি রাস্তায় মাইন পুঁতে রেখেছিল। সে ক্ষেত্রে সরকারিভাবে যৌথবাহিনী কোনো যানবাহনের ব্যবস্থা করেনি। তাছাড়া কলকাতা থেকে এত লোককে বিমানে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। পাঁচই ডিসেম্বর থেকে ভারতীয় বাহিনী পাকিস্তানি বাহিনীকে হটাবার জন্য তেজগাঁও বিমানবন্দরে
ব্যাপক গোলাবর্ষণ করে। ফলে প্রত্যেকটি রানওয়ে বিমান অবতরণের জন্য সম্পূর্ণভাবে অনুপযুক্ত হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ সমস্ত বিমানপথ ছিল বোমার আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত। পাকিস্তানিরা এই বিমান আক্রমণের ভয়ে চার তারিখ থেকেই তেজগাঁও বিমানবন্দরের রানওয়ে দিয়ে সকল বিমান ওঠানামা বন্ধ করে দিয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে এইদিন থেকেই পাকিস্তান বিমানবাহিনীর কোনো বিমানকে ঢাকার আকাশে উড়তে দেখা যায়নি। তেজগাঁও মিলিটারি বিমানঘাঁটিও স্তব্ধ হয়ে যায়। এই অবস্থায় যৌথবাহিনী ঢাকার মধ্যে কোনো বিমান ব্যবহার করতে পারেনি।
কলকাতায় আগত আশ্রিত এক হাজারের মতো দেশি-বিদেশি সাংবাদিক ও ক্যামেরাম্যান ষোলো তারিখ সকাল থেকে ঐ বাড়িতে উৎকণ্ঠার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে থাকে। তবুও এঁদের মধ্যে কয়েকজন দুঃসাহসী সাংবাদিক ভারতীয় আর্মির অনুমতি না-নিয়ে ট্যাক্সি ভাড়া করে ঢাকার পথে যাত্রা করেন। কিন্তু তাঁরা দুর্গম ও অচেনা পথ দিয়ে আসার ফলে পাকিস্তানি আর্মির সারেন্ডার করার পূর্বে ঢাকায় পৌঁছুতে পারেননি। প্রকৃতপক্ষে আমরা শত সাংবাদিক কেউ জানতাম না যে, সড়কপথ অনিরাপদ এবং তেজগাঁও বিমানবন্দরে বিমান অবতরণের কোনোই সম্ভাবনা বাস্তবে ছিল না। আমরা প্রায় এক হাজার দেশি-বিদেশি সাংবাদিক ও ক্যামেরা ক্রু (ভারতীয়সহ) সন্ধ্যার পরে বাধ্য হয়ে ক্ষুব্ধ অবস্থায় ডেলহৌসি স্কয়ারের সেই বাড়িটি পরিত্যাগ করি। দুই বন্ধু মুকুল ও আমি চরম নৈরাশ্যের মধ্যে ‘যুদ্ধ-সাংবাদিক’ হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছুতে পারলাম না। বিকেল চারটায় জেনারেল নিয়াজি সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে সারেন্ডার করেন। এই ঐতিহাসিক দিন, সময় ও ঘটনাকে আমরা আমাদের জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু অতিমাত্রায় আগ্রহ ও চেতনার মধ্যে তা সম্ভব হলো না। আমরা এখনো জানি না কোনো দেশি-বিদেশি সাংবাদিক ও ফটোগ্রাফার সারেন্ডার স্থলে সেদিন উপস্থিত ছিলেন কিনা? সরকারি ও আর্মির সাংবাদিক ও ফটোগ্রাফারগণ এই ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী অবশ্যই ছিলেন এবং তাঁরাই সম্ভবত অন্যান্য পত্রিকা, নিউজ এজেন্সি, টেলিভিশনে সাংবাদিকদের আত্মসমর্পণের সংবাদ প্রদান করেছিলেন।
প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদনে আমি ও আমার বন্ধু মুকুলই কেবল ছিলাম সাংবাদিক প্রতিনিধি। আমরা দুজনই ঢাকায় আসতে ব্যর্থ হই। বাংলাদেশ সরকারের সমস্ত ন্যায়সঙ্গত অনুমতিপত্র আমাদের হাতে ছিল। ভারতীয় সরকারও আমাদের দুজনকে স্থায়ী আইডেনটিটি কার্ড দিয়েছিল। তবে অবশ্য কলকাতা সামরিক ক্যাম্পের অধীনে। সেই কার্ড এখনো আমরা তুলে রেখেছি। সেইদিন থেকে আমাদের ঢাকায় স্বাভাবিক প্রত্যাবর্তনের মানসিক প্র‘তি শুরু হয়। কেমোফ্লেস করা ব্রুস শার্ট ও প্যান্টের মায়া আমরা ছাড়তে পারিনি। ভাবলাম, যখনই দেশে যাই এই পোশাক পরেই যাবো- এতে যুদ্ধের গন্ধ আছে।
সন্ধ্যার পরে আমরা ছিলাম বিষণ্ন। আমরা মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হয়েছি- এই বাস্তব সত্য আমাদের সামনে থাকা সত্ত্বেও আমরা বিষণ্নতায় আচ্ছন্ন ছিলাম। মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তনের তীব্র আকাঙক্ষাই আমাদের বাকরুদ্ধ করে রেখেছিল। পরের দিন থেকেই আমরা ভাবছিলাম কীভাবে দেশে প্রত্যাবর্তন করা হবে। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে পরদিন সকালে যোগাযোগ করলাম। আমরা তখনও ভাবিনি যে, এত শীঘ্র দেশে প্রত্যাবর্তন করতে পারবো। এখন আমাদের উৎকণ্ঠা- কী করে দেশে প্রত্যাবর্তন করবো এবং নতুন দেশে আমাদের কীইবা করণীয় থাকবে। স্বাভাবিকভাবেই আমরা মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে দাঁড়ালাম।
আমরা জানতে পারলাম, ঢাকা প্রত্যাবর্তনের কোনো পথই সাময়িককালের জন্য উন্মুক্ত নেই। কেবলমাত্র কলকাতা বা আগরতলা থেকে হেলিকপ্টার যোগে ঢাকার সাথে সেই সময় যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে।
ভারতীয় বিমানের পাকিস্তানিদের ওপর অনবরত বোমা বর্ষণের সময় তেজগাঁও বিমানবন্দরটি বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল (তখন জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছিল না)। রানওয়েগুলোতে বোমার আঘাতে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল। এমনকি আমাদের বর্তমান প্রেসিডেন্টভবনেও বোমা বর্ষণ করা হয়, শত্রম্নপক্ষের লোক যাতে আশ্রয় নিতে না পারে।
প্রতিদিন মুজিবনগর সরকারের সচিবালয়ের সাথে আমরা যোগাযোগ রক্ষা করছিলাম- কবে পর্যন্ত দেশে প্রত্যাবর্তন করা যাবে? এটাই ছিল তখন আমাদের উৎকণ্ঠা ও আকাঙক্ষা। বলা হলো, কমিউনিকেশন পুনরুদ্ধারের পরে পরেই ঢাকায় প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা হচ্ছে। আমরা তখন কলকাতায় কেবল আড্ডা দেই এবং দেশে প্রত্যাবর্তনের চিন্তায় উৎকণ্ঠিত।
এমন এক পর্যায়ে একুশে ডিসেম্বর রাত বারোটার পর আমার আশ্রয়দাতার বাড়িতে টেলিফোন বেজে উঠলো। অপর প্রান্ত থেকে খোঁজা হচ্ছিল আমাকে। পারিবারিক আড্ডা থেকে দৌড়ে গেলাম। আমাকে বলা হলো, আজ ভোর চারটার সময় আপনাকে নিয়ে যাওয়া হবে এয়ারপোর্টে।ঠিক চারটায় আপনি বাসায় জেগে থাকবেন।
কোথা থেকে তারা আমার এই ঠিকানা পেলেন জানি না- হয়তো সচিবালয় থেকে। এই টেলিফোনের নির্দেশ আমাকে বিশ্বাস করতে হলো দেশে প্রত্যাবর্তনের আশায়। ঢাকা হলে এই অবস্থার মধ্যে এই জাতীয় টেলিফোন আমরা বিশ্বাস করতাম না।
ঠিক ভোর চারটার সময় বাড়ির গেটে গাড়ির হর্ন বেজে উঠলো। ও বাড়ির সবাই সেদিন আমরা ভোর চারটা পর্যন্ত জেগে ছিলাম। ধার করা একটা অ্যাটাচিতে টুকিটাকি জিনিস গুছিয়ে রেখেছিলাম। আবার সেই ক্যামোফ্লেস করা মিলিটারি ইউনিফর্ম গায়ে দিলাম। ভোর চারটায় আমার যাত্রা শুত্রম্ন হলো স্বদেশের পথে।
সারা কলকাতা শহর কুয়াশায় আচ্ছন্ন। তখনও সূর্য ওঠেনি। একটা লম্বা জিপ আমাকে নিয়ে সোজা দমদম এয়ারপোর্টে উপস্থিত হলো। গৃহে ফেরার তীব্র আকাঙক্ষায় আমি অজানা অপরিচিতদের সাথেই বিমানবন্দরে উপস্থিত হলাম। আমার পূর্বে আরো ছয়-সাতজনকে সেখানে আনা হয়েছিল। সেখানে গিয়ে আমি বন্ধু মুকুল, বন্ধু সমর দাস, কামাল লোহানী ও বন্ধু মূসাকে দেখতে পেলাম। পাকিস্তান রেডিওর কয়েকজন বাঙালি অফিসারও একই ফ্লাইটে ঢাকায় আসার জন্য বিমানবন্দরে পৌঁছান। একটু পরে ভারতীয় সামরিকবাহিনীর ক্যাপ্টেন আমাদের জানালেন যে, কুয়াশা কেটে গেলেই আমরা ঢাকার দিকে যাত্রা করবো। ঢাকার বিমানবন্দর অনেকাংশে সারাই করা হয়েছে। একটি রানওয়ের অংশবিশেষে আমরা নামার নির্দেশ পেয়েছি।
কুয়াশা চলে যেতে সময় নিলো। দীর্ঘ অপেক্ষার পর যাত্রা শুরু- নয় মাস পর মুক্তিযুদ্ধ শেষে আমরা স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করতে শুরু করলাম।
আমাদের প্লেনটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের- সংক্ষিপ্ত স্থানে এই প্লেন নামতে পারে এবং এর জন্য খুব অল্প রানওয়ে লাগে। এই বিমানকে বলা হয় ‘স্টল বিমান’ অর্থাৎ এই সমস্ত বিমান খুব অল্প পরিসর রানওয়েতে নামার ক্ষমতা রাখে। এরা প্রধানত যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিক ও মালামাল বহন করে। বিমানটি ওঠার ও নামার জন্য সামনের দিকে কোনো দরোজা ছিল না। পেছনের লেজের দিকটা যান্ত্রিকভাবে খুলে যায়। এ যেন হাঙরের মুখ। পেছন দিকে হা করা এই বিমানে উঠলাম এবং ঢাকা এসে এই পথেই আবার নামলাম।
ঢাকায় আমরা বিলম্বে পৌঁছালাম বাইশে ডিসেম্বর সকাল দশটার পর। এই সময় আমাদের আত্মীয়স্বজন, স্ত্রী-পুত্র কোথায় আছে সঠিকভাবে কেউ জানতো না। বিমানের ভেতরে বসার কোনো সিট ছিলো না। শুধু কিছু চাল, আটা, আলুর বস্তা ছিল- আমরা তারই ওপর বসে দেশাত্মবোধক গান গাইতে গাইতে ঢাকার আকাশে পৌঁছালাম। আমাদের বিমান যখন ঢাকার বিধ্বস্ত বিমানবন্দরে অবতরণ করলো, সেই সময় আমরা কোনো জনসমাগম বা আত্মীয়স্বজনকে দেখতে পেলাম না। কারণ আমরা আমাদের পরিবারের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করে ঢাকায় ফিরিনি।
বিমানবন্দর টারম্যাকে আমাদের স্টল বিমানটি এসে দাঁড়াবার পর মুক্ত বাংলাদেশের সকাল আমাদের আলিঙ্গন করলো। আমরা কেউ ভাবিনি, এভাবে এত শীঘ্র আমরা স্বাধীন স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করবো। আমরাই ছিলাম প্রথম মুক্তিযোদ্ধা ব্যাচ, যারা সরকারিভাবে সরকারের উদ্যোগে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করি। এই বিমানটি পরে কলকাতায় দু’বার করে যায় এবং একবার সেক্রেটারি ও অন্যান্য অফিসার এবং পরবর্তীতে মুক্তযুদ্ধকালীন সরকারের মন্ত্রীদের ঢাকায় নিয়ে আসা হয়।
আমরা অবাক বিস্ময়ে টারম্যাকের ওপর দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করার সময় হঠাৎ তিনজন ফটোগ্রাফার ও দু