আপনারা সবাই অবগত আছেন যে, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত বাংলাদেশকে সামরিক সহায়তা প্রদান করে। সেই সুবাদে ভারতীয় বাহিনী স্বাধীন বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ওই সময় আমি একজন অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যুদ্ধের মাঠ থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য ভারতের মুরতি একাডেমিতে যাই। সম্ভবত ডিসেম্বর মাসে আমি সেখানে ভারতীয় সেনানিবাসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত জিপ এম-৩৮ এবং সিজে-৫ ভারতীয় সেনাদের দ্বারা ব্যবহৃত হতে দেখে স্তম্ভিত হয়ে যাই। দেশে ফিরে ১৯৭১ সালে ফেব্রুয়ারি/মার্চ মাসে এবং বর্তমানে যে তথ্য পাওয়া গেছে তাতে ভারতীয় বাহিনী ওই সময় স্বাধীন বাংলাদেশে যে ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং অবাধ লুটপাট চালায় তার কিছু নিচে তুলে ধরা হলোঃ

ক. মুক্তিযুদ্ধ শেষে ভারতীয় বাহিনী প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ ও মিল কারখানার যন্ত্রপাতি লুট করে। এর উদ্দেশ্য ছিল সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে পঙ্গু করে ভারতনির্ভর করা। তদুপরি ২৫ বছরের ও সাত বছরের মৈত্রী চুক্তি তো ছিলই। আমি ভারত কর্তৃক বাংলাদেশে লুণ্ঠন চালানোর তথ্য উদঘাটনের জন্য কমিশন গঠনের জোর সুপারিশ করছি। যাতে ভারতকে ভবিষ্যতে বিচারের সম্মুখীন করা সম্ভব হয়।

খ. কৃষি ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ধ্বংস করার জন্য চালু করা হয় ফারাক্কা বাঁধ। এই মরণ ফাঁদ ফারাক্কার প্রভাবে আজ দেশের এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চলের পরিবেশ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছে। দেশের অনেক নদী নাব্যতা হারিয়ে মরা নদীতে পরিণত হয়েছে। ফলে নৌ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় জনজীবনে দুর্ভোগ নেমে এসেছে। চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ওই অঞ্চলে ব্যবসায়-বাণিজ্য। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে লবণাক্ততা। ফলে জমি উর্বরতা হারিয়ে বন্ধ্যা জমিতে শুধু পরিণত হচ্ছে না, ইতোমধ্যে অনেক প্রজাতির গাছ মরতে শুরু করেছে। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অসম্ভব নিচে নেমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা চরমভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় ওই অঞ্চলের প্রায় পৌনে ২ কোটি মানুষ আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়ে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই অঞ্চলে মরুকরণ প্রক্রিয়া প্রকট আকার ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সিডরের আঘাত এরই ফল।

গ. এর পর প্রতিবেশী দেশটি এ দেশীয় সেবাদাসদের দ্বারা আরম্ভ করে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র। যার যূপকাষ্ঠে বলি হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, চার জাতীয় নেতা, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, জেনারেল খালেদ মোশাররফসহ আরো অনেক নেতা। উদ্দেশ্য বাংলাদেশকে নেতাশূন্য করা। সংঘটিত হয় পরপর সেনাবিদ্রোহ, যার মূল পরিকল্পনা ছিল দেশের সেনাবাহিনীকে সমূলে বিনাশ করা।

ঘ. দেশের এই নাজুক পরিস্থিতিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রতিবেশী দেশের প্রত্যক্ষ মদদে আরম্ভ হয় শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র সন্ত্রাসী কার্যকলাপ। যা আজো শান্ত হয়নি।

ঙ. একটি সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের সার্বভৌম অংশ তালপট্টি দ্বীপ দখল করে নিয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ তার সমুদ্র সীমান্তস্থ মহীসোপান ও ইকোনমিক জোনের বিপুল সমুদ্রসম্পদ আহরণ থেকে ভবিষ্যতে বঞ্চিতই হবে না শুধু আখেরে আমরা একটি স্থলবেষ্টিত দেশে পরিণত হয়ে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে যাব।

চ. চলমান ধারাবাহিকতায় তথাকথিত বঙ্গভূমি আন্দোলনকে আলাদা করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। এর পেছনে ধর্মীয় বিশ্বাসভিত্তিক গোষ্ঠীগত বিভাজনের মাধ্যমে ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে খণ্ডিত করার অপপ্রয়াস নিহিত রয়েছে।

ছ. প্রতিবেশী দেশটির সীমান্ত ঘিরে ১০-১২ কিলোমিটার অভ্যন্তরে শত শত ফেনসিডিল তৈরির কারখানা স্থাপিত হয়েছে। যার একমাত্র উদ্দেশ্য, আমাদের কোমলমতী তরুণদের নেশাগ্রস্ত করে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংস করা, যাতে দেশ ও জাতি মেধা ও নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে।

জ. ইসরাইলের সাথে ভারতের সামরিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে খুব জোরে এবং অব্যাহতভাবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ উত্থাপিত হচ্ছে। যাতে প্রচারের তোড়ে বাংলাদেশকে একটি সন্ত্রাসী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়। এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য, সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশের হস্তক্ষেপ জায়েজ করা। যেমনটি ইরাক ও আফগানিস্তানে করা হয়েছে।

ঝ.

বর্তমানে বাণিজ্য আগ্রসন কী পর্যায়ে পৌঁছেছে তা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। বাজারে গেলেই এর ব্যাপকতা লক্ষ করা যাবে। এভাবে চলতে থাকলে পাট শিল্পের মতো অন্য সব সেক্টরে বন্ধ্যত্ব নেমে আসতে বেশি দেরি হবে না। ফলে আমাদের অমিত সম্ভাবনার দেশ প্রতিবেশী দেশটির করুণার পাত্রে পরিণত হবে। বর্তমানে চাল রফতানি নিয়ে ভারতের অমানবিক সিদ্ধান্ত আমাদের চালের বাজারকে কিভাবে অস্থিতিশীল করেছে এবং তার ফলে দেশের মানুষ কী সমস্যা মোকাবেলা করছে তার বর্ণনার দরকার আছে বলে মনে হয় না। এর পরও ভারত প্রতিবেশী বন্ধু দেশ, কী নিষ্ঠুর পরিহাস! প্রতিবেশী দেশটি বাংলাদেশের অভিন্ন ৫৪টি নদীর মধ্যে ৫৩টিতে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে বাঁধ, গ্রোয়েন ও স্পার নির্মাণ করে একতরফা পানি প্রত্যাহার আরম্ভ করেছে। ফলে দেশ আক্রান্ত হচ্ছে প্রবল খরা ও বন্যায়। তদুপরি ২০১৬ সালের মধ্যে আন্তঃনদী সংযোগ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশের উজান দিয়ে অভিন্ন আন্তর্জাতিক ৫৪টি নদীর পানি ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ভারত নিয়ে যাবে বাংলাদেশকে তার পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে অতীব নিষ্ঠুরভাবে বঞ্চিত করে। এটা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারত কর্তৃক পারমাণবিক যুদ্ধ শুরুর চেয়েও ভয়াবহ। এটা বাস্তবায়িত হলে আগামী ৩০-৪০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ মরুভূমিতে পরিণত হয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে।

ট. রাজনৈতিক অঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ ও বিপক্ষ ধারার সৃষ্টিতে পরোক্ষ সহায়তা দিয়ে প্রতিবেশী দেশটি অতীব দক্ষতার সাথে জাতিকে বিভক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। সক্ষম হয়েছে বাঙালি ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের বিভক্তির সৃষ্টিতেও। যার অপনোদন প্রায় অসম্ভব। বাঙালি ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের বিভাজনের দুর্লঙ্ঘ দেয়ালকে ভেঙে জাতি একদিন একই মঞ্চে দণ্ডায়মান হবে­ এমন আশা বর্তমানে এমনকি অদূর ভবিষ্যতেও প্রায় অসম্ভব বলে মনে হয়। বিষয়টির প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। জাতীয়তাবাদের বাধার বিন্দাচলকে অতিক্রম করতে হলে রাজনৈতিক অংশগ্রহণে নির্দলীয় জননীতির প্রয়োগ নিশ্চিত করতে একটি দল নিরপেক্ষ জননীতিকেই প্রাথমিকভাবে অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ সমধিক সমীচীন হবে বলে আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে প্রতিভাত হয়েছে। সর্বশেষ সামনে এসেছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে উপমহাদেশে বন্ধুহীন করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রতিবেশী দেশটি তার চরম এবং শেষ অস্ত্র যে প্রয়োগ করতে চায় না তাই বা বলি কী করে। যেমন বাংলাদেশ সরকার পক্ষ হয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচার আরম্ভ করলেই স্বভাবতই পাকিস্তানও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় হবে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান উপমহাদেশের দু’টি মুসলিম দেশ পরস্পরের শত্রুতামূলক মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়ানোর কারণে বাংলাদেশ উপমহাদেশে বন্ধুহীন হওয়ায় এবং বাংলাদেশ আক্রান্ত হলে পাকিস্তান বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াবে না, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চরম ব্যবস্থা গ্রহণের আগে আমাদের চরম ও পরম শত্রু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ডামাডোলে এমনি একটা মোক্ষম সুযোগের অপেক্ষায় যে নাই তা কি হলফ করে বলা যাবে? নিশ্চয়ই না। তাই বিষয়টির প্রতি সব সচেতন নাগরিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এবং বিষয়টি নিয়ে একটি নির্মোহ ও গভীর চিন্তার আবেদন জানাচ্ছি।

একটু গভীরভাবে লক্ষ করলে প্রতিভাত হবে যে, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের পরম উদাহরণকে সামনে রেখেই ঠিক একই পন্থায় ’৭১-এর মতো করে জাতিকে একই বেদিতে ইস্পাতদৃঢ় অবস্থান নিয়ে ভারতীয় আগ্রাসনকে এবং বহির্বিশ্বের আগ্রাসনকেও মোকাবেলা করতে হবে। এ বিষয়ে জাতিকে সচেতন করা একান্ত প্রয়োজন। আমি মনে করি, জাতীয় প্রত্যাশা পূরণে এটাই হবে শেষ লড়াই, যাতে আমাদের অবশ্যই জয়লাভ করতে হবে, যা আমরা সর্বতোভাবে অর্জন করতে সক্ষম। আমাদের আছে ১৩.৫০ কোটি এক ভাষা সংস্কৃতির জনগোষ্ঠী। তন্মধ্যে ১২ কোটি মুসলমান। এক ভাষা, এক ধর্ম ও এক জাতি। আমাদেরকে পরাজিত করতে পারে এমন শক্তি কোনো দেশের নেই। অনাগতকালে সোনার বাংলাকে রক্ষা করতে হলে হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগরের মধ্যস্থিত ৫৪টি নদীবিধৌত অঞ্চল সমন্বয়ে গঠন করতে হবে স্বাধীন রাষ্ট্রপুঞ্জের কমনওয়েলথ। আসুন এর মাধ্যমে সোনার বাংলায় পলাশীর অশনি সঙ্কেতকে চিরতরে সমাধিস্থ করি।

**************************
লেখকঃ অবঃ মেজর জেনারেল আলম ফজলুর রহমান
সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ রাইফেলস।
দৈনিক নয়াদিগন্ত, ২৬ মার্চ ২০০৮